13TH issue bangla, Lipi Magazine, Poetry, Online Magazine, Prose

শনিবারের লিপি – ১৩ তম সংখ্যা – সপ্তাহিক প্রত্রিকা

লেখক

সুনীতা

সুনীতা

গিরিধারী ভবন, কলকাতা

সমগ্র লেখা

শব্দপদী

শব্দ কিছু উড়িয়ে দিলাম খোলা আকাশে
ছাদের কোণে দাঁড়িয়ে,
মেঘলা আলোহীনতা ছুঁয়ে যায়
গভীর খাদ, ছোট্ট ডানা
আঁধারি আলোয় এগোয়
আসান শব্দতরী, যেন ঘুড়ি
ছিন্ন বিনিসুতো
একরোখা টানে শব্দলহরী
উদাসীন এত ঢেউ
শব্দ আর শব্দ জেগে থাকে
সকল বালখিল্য শেষে
ঘরে, পথে, রোদে, জলে- আরশিতে
শব্দ এখানে সিঁড়িভাঙা
নিঃশব্দ তার ওঠানামা
পায়ে পায়ে ঘোরে,
চূড়ো করা মাথার ওপরে
আরও গেলে পাবে চরাচর
(নিঃ)শব্দ পাষাণের ভার
নিয়ত শূন্যে ভাসায়, ডোবায়
অপার, অপর

কবি পরিচিতি : সুনীতা জন্মসূত্রে উদ্বাস্তু নন, তবে জন্ম বেলঘরিয়ার উদ্বাস্তু কলোনিতে। মা শ্রীমতী মমতা মিত্র, বাবা শ্রী গৌরাঙ্গ মিত্র। ছোটবেলায় ঠাকুমার কাছে রূপকথার গল্পের পরিবর্তে অদেখা ভিটেমাটির গল্প শুনে বড় হওয়া। শিশুমনে প্রশ্ন উঠত, 'আমাগো আসল দ্যাশ তাহইলে কোনটা, আম্মা?' – দেশ মানে তো আসলে সীমানা। মানুষই টানে, মানুষেরা মানে; কারা যেন সেই সীমানা পেরোতে চায় – সীমানা আর সীমানা পেরোনোর প্রচেষ্টার অন্তর্ভেদ হল কবিতা – যা কবির মানসিক যাপনের অবলম্বন। কবিতা তার কাছে বিচ্ছেদিত সময়ের সাঁকো।

লিপি

দুই বসন্ত

সৌমেন দেবনাথ

বয়স গেছে কিন্তু যৌবন যায়নি। আজো আঙুররঙা টসটসে দেহতনু। এখনো অদ্ভুত মাদকতা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে সর্ব অবয়বে। বড় বেশি আবেদনময়ী মহিলা। কেউ বলবেন না উনি বাইশ-তেইশ বছরের এক কন্যা সন্তানের জননী। আজো লাগে সেই কুড়ি বছরের মতো। আটোসাটো শরীরের গাঁথুনী।

আপেলের ন্যায় রাঙা জাহ্নবীর স্বামী মারা গেছেন বছর পনের আগে। সেই থেকে সংসারের জোয়াল কাঁধে নিয়েছেন তিনি। কিন্তু এতটুকু তার আঁচ পড়েনি শরীরে। যেন সোনার শরীর, শত তাপ আর চাপে উজ্জ্বলতা বাড়ছে। বিকেলের সোনারোদ শরীরে পড়লে শরীরটা হয়ে যায় শিল্পীর নিপুণ হাতে তৈরি অকল্পনীয় ছবি।
স্বামী মারা যাওয়ার সাথে সাথে গ্রামবাসী জাহ্নবীকে নিয়ে কত বাজে মন্তব্য করেছিলেন। মালবী বৌদি কটাক্ষ করে বলেছিলেন, বর মরেছে ঘরের অভাব হবে না। যেমন সুন্দরী হয়ে জন্মেছে বর যাবে বর পাবে।

স্বামীহারা এক বৌয়ের মনের অবস্থা বোঝার চেয়ে তাঁর ঘাড়ে নানা অপবাদের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছিলেন গ্রামবাসী। কাকলির মা বলেছিলেন, বর মরেছে, দেবরের অভাব আছে নাকি! গ্রামের সব ছেলেই তার দেবর, বর মেরেছে দেবরদের জন্যই। ঘরের বৌ পরের সাথে এত আলাপ করে এই মহিলাকে না দেখলে বিশ্বাসই হতো না।
মাটির পুতুলের সৌন্দর্য আছে, রূপ-রং লাবণ্যও আছে, প্রাণের স্পন্দন নেই। জাহ্নবীও মাটির পুতুলের মতো প্রাণের স্পন্দনহীন রূপ লাবণ্যের একজন হয়ে গেলো। সবাই যে কটাক্ষ করতেন, বা শত্রুপনা করতেন তা নয়। কেউ কেউ এসে সান্ত্বনাও দিয়ে যেতেন। সুভদ্রার মা এসে জাহ্নবীকে সান্ত্বনা দিতেন, বলতেন, মেয়েদের জীবন এমনি দিদি। স্বামীহীন কানাকড়ির চেয়ে মূল্যহীন। স্বামীই সম্বল, স্বামীহীন নিঃসম্বল। মেয়েরা লাউয়ের ডগা। খুঁটি পেলেই আঁকড়ে বাঁচে। মেয়েটাকে কোলে পিঠে মানুষ করো।

জাহ্নবীর চোখ দিয়ে জল ঝরতো। প্রথমে রাকেশকে সহ্যই করতে পারতো না জাহ্নবী। বাবা তাঁর অমতে তাঁকে বিবাহ দিয়েছিলেন, একারণে বাবা ও রাকেশকে ইচ্ছামত বকতেন। অপমান করতেন। প্রতিবেশীরা জাহ্নবীর সম্বন্ধে জেনে গেলে রাকেশ পথে প্রান্তরে বন্ধুদের দ্বারা টিটকিরির স্বীকার হতেন। পবন তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে বলেছিলেন, কিরে বৌ বকে! কেমন পুরুষ! পুরুষ নামের কলঙ্ক! বৌ বকবে কেন? বৌ থাকবে জব্দ।

রাকেশ মানুষের কথা শুনেও না শোনার ভান করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, সময়ের সাথে সাথে সব ঠিক হয়ে যাবে। সময় সবচেয়ে বড় শিক্ষক।
মনকে বুঝ দিতেন রাকেশ। জাহ্নবীর মন বোঝার চেষ্টা করতেন। কোল আলো করে স্নেহা আসলো। রাকেশ ভেবেছিলেন এবার জাহ্নবী ভালো হয়ে যাবে। কিন্তু তার লক্ষণ তিনি দেখলেন না। মনকে বুঝ দিলেন, ওর চরিত্রই হয়ত এমন, একটু রগচটা। কিন্তু যেদিন তাঁর সম্পর্কের কথা শুনলেন সেদিনই রাকেশ খুব ভেঙে পড়েছিলেন। হঠাৎ করে রাকেশ মারা যান। যে মানুষটাকে জাহ্নবী সহ্যই করতে পারতেন না তাঁর মৃত্যুতে জাহ্নবী কী কান্নাকাটিই না করেন। মালবী বৌদি কাটাক্ষ করে বলেছিলেন, দেখো, কী মায়াকান্না। কত অভিনয় জানে এই বাজে মহিলা!
কাকলির মা বলেছিলেন, স্বামীকে অসহ্য করলে স্বামীর মন-মানসিকতা ভালো থাকে? মানসিক পীড়ায় স্নেহার বাবা মারা গেছেন। নাও স্নেহার মা, যাকে সহ্য হতো না সে বিদায় নিয়েছে। তোমার হাড় জুড়ালো তো!
রুহিনীর পিসি বলেছিলেন, অতি সুন্দরী তো, রাকেশে মন ভরেনি। নে, এবার নায়ক ধরে বিয়ে করিস।
মালবী বৌদি তীর্যক চেয়ে বলেছিলেন, বাসি ভাত খাবার জন্য কাক বসে আছে! বিয়ে?
কাকলির মা বলেছিলেন, পুরুষ মানুষ চেনো না বৌদি, সুন্দর দেখলে সরে না। ভেবো না জাহ্নবী পড়ে থাকবে!
রুহিনীর পিসি বলেছিলেন, এবার বুঝবি বাস্তবতা কী?

এরপর পনের ষোল বছর চলে গেছে। জাহ্নবী মেয়েকে মানুষ করে তুলেছেন। একা থাকলেই কাঁদেন। মেয়ে প্রশ্ন করলেই কাঁদেন। স্বামীহীন নারীর জীবন আসলেই কঠিন। স্বামীহীন পথ চলা নারীর কত কঠিন উনি হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন, পাচ্ছেন। মা মেয়ে একত্রে ঘর থেকে বের হলে মানুষজন মেয়ের দিকে না তাকিয়ে মায়ের দিকেই বেশি তাকান। আর ভাবেন, নিরেট মহিলা। কোনো অপূর্ণতা উনার মাঝে নেই। জীবনের মাস্তুল বেয়ে দিনগুলো হুহু করে পার হয়ে গেলেও যৌবন তাঁর দেহ থেকে আজো বিদায় নিতে চায় না। যেদিক দিয়ে হেঁটে যান পিছন দিয়ে নদীতে ঢেউ উঠে, গাছে গাছে ঝড় বয়। এখন কত সংযত থাকেন, পোশাক-পরিচ্ছদে নেই আড়ম্বতা। তবুও মানুষের নজর আটকে যায় তাঁর দেহ-প্রকোষ্টে। যথেষ্ট সংযত হয়ে পথে ঘাটে বের হন। আর ভাবেন মনে মনে, স্বামী থাকলে তাঁর হাত ধরে তাঁকে সম্বল করে পথে উঠতে পারতেন। সম্বলটি ভেঙে গেছে। আজ তাঁকে সম্বল করে তাঁর মেয়ে পথে উঠে। মেয়ে মাকে সম্বল করে যেখানে মা নিজেই বেশি সহায়হীনা। আয়ত গভীর চোখ। চোখে যে মায়ার মেলা তা আর মেলে ধরেন না। চশমা পরেন। মাঝে মধ্যে মেয়ের সাফল্য শুনলে একটু ঠোঁটে হাসেন। কী অদ্ভুত রূপ সৃজন হয় তখন। ঠোঁটে লেগে থাকা হাসির জ্যোৎস্না দেখে স্নেহা বলে, মা, তুমি পৃথিবীর সেরা মা।

জাহ্নবী থেমে যায়, রূপের প্রশংসা শুনে শুনে তিনি বিষিয়ে গেছেন। নিজের রূপকে যত আড়াল করতে চান তত তাঁর রূপ প্রকাশ পেয়ে যায়, মেলে যায় রূপ ততোধিক। নিজের রূপের প্রতি তাই বিতৃষ্ণা জাগে আজ তাঁর।
আজ কলেজ থেকে ফিরে স্নেহা মায়ের উপর খুব চটেছে। মাকে বললো, মা, কাকলির মা কাকলিকে বলেছেন তুমি নাকি আমার বাবার মৃত্যুর জন্য দায়ী?
জাহ্নবী বললেন, এসব কী বলছিস মা!
স্নেহা আরো বললো, আমার বাবাকে একদিনও শান্তি দাওনি নাকি, কেনো? আমাকে কেনো পিতৃহারা করেছো?

জাহ্নবী কিছু বলতে চাচ্ছিলেন। স্নেহা না শুনে নিজ ঘরে চলে গেলো। জাহ্নবী মেয়ের পিছন পিছন মেয়ের ঘরে এসে মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, তোর দাদু আমাকে তোর বাবার সাথে জোর করে বিয়ে দেন।
মাকে থামিয়ে স্নেহা বললো, তুমি প্রেম করতে!
জাহ্নবী চুপ হয়ে গেলেন। বড় ঘরের মেয়ে ছিলেন জাহ্নবী। ছোটবেলাতেই বোঝা গিয়েছিলো জাহ্নবী একদিন মিস ডায়ানাকেও সৌন্দর্যে হার মানাবেন। ক্লিও-প্রেট্রাও তাঁর রূপের কবলে পড়ে সেরা সুন্দরীর মুকুটটা নিজ হাতেই জাহ্নবীকে তুলে দেবেন। ধারণাটা সত্যের চেয়েও আরো সত্যে পরিণত হয়। অভাবের তাপ লাগেনি শরীরে, সংকটের মুখে পড়েনি এক মুহূর্তের জন্য, এমনি পরিবেশে বেড়ে উঠেন তিনি।

জোড়া ভ্রু’র মাঝে তারা ফুলের খসে পড়া পাপড়ির মতো সরু টিপ থাকতো। চোয়ালের ধার জুড়ে ক্ষুদ্রকায় সোনালী পশম বিকেলের হালকা আলোয় চিকমিক করতো রেশমের মতো। স্বর্ণের এক ফালি চেন কচি বুকের উপর বাঁক খেতো। দুলতো দামী দুল কানের পাতায়। সৈকতের বালির মতো নাকে নোলক ঝিকমিক করতো যা আজ তিনি ইচ্ছাপূর্বক এবং বাধ্যতামূলক ভাবে দেহ থেকে সরিয়ে ফেলেছেন। বিবাহের পূর্বে জাহ্নবীর বাড়ির আশেপাশে অনেক যুবকের ভিড় জমতো। সকলে তাঁকে এক নজর দেখবেন বলে এপাশ দিয়ে ওপাশ দিয়ে ঘুরতেন। কেউ একটু কথা বলার জন্য ফিটফাট হয়ে আসতেন। চোখে চোখ পড়লে নিঃশেষ হয়ে যেতেন কেউ কেউ। রূপের আগুন এমনি; শরীর থেকে খসে পড়া উড়না টেনে অতিকায় সুন্দর মনোরম বুকটা ঢাকতে ঢাকতে সবাইকে পিছনে তৃষ্ণার মাত্রা বাড়িয়ে চলে যেতেন অন্দর মহলে। আড়ালে গেলে আস্ফালন যেত দ্বিগুণ বেড়ে। দীঘির মাঝে এ এমনি একটি পদ্ম ছুঁতে পাওয়া ছিলো তো অকল্পনীয়। এক পলক দেখতে পাওয়া সৌভাগ্যের ছিলো। বড় খেয়ালি ছিলেন জাহ্নবী। খেলার ছলে একটু দেখা দিয়ে যেতেন। কেউ যদি সেটুকু দেখতে পেতেন, তবে তিনি বলতেন, দূরেই থাকো, কাছে এলে আবার হারিয়ে যাবে। আশায় থাকা ভালো, আশা ফুরায় না।
এমন একটি অনিন্দ্য সুন্দর শোভনীয় কিংবা কমনীয় মেয়েকে বৌ হিসেবে পাওয়া যে কারোরই স্বাধ জাগতে পারে কিন্তু তাঁর যোগ্য স্বামী তিনি কী হতে পারবেন তা ভাবাও সচেতন বিবেকের কাজ। তাই বিবাহের প্রস্তাব প্রেরণের পূর্বে কেউ এত ভাবতেন যে, কেনো জীবনকে আরো সুন্দর করে সাজাননি, জীবনটা সজ্জিত হলে ভবিষ্যৎ রজ্জিত হলে এমন মেয়েকে ঘরে তোলা মামুলি ছিলো। এত ভাবতে গিয়ে কেউ আর এগুতে পারতেন না। কেউ কেউ বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে এসেছিলেন কিন্তু জাহ্নবীর বাবা গ্রাহ্য করেননি। তাতে কী দু’নয়ন মেলে আঁখির তুষ্টি পূরণ করে তো তাঁকে স্বচক্ষে সম্মুখ হতে একটু হলেও দেখা গিয়েছিলো। এই যেন ঢের প্রাপ্তি।
নতুন নতুন প্রস্তাব আসা শুরু করলে প্রস্তাব গ্রহণের পূর্বেই ঘোটককে বাড়িতে ঢুকতে নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়। জাহ্নবীর বাবা ভাবলেন, আমি নিজে ছেলে দেখে তার হাতে মেয়েকে তুলে দেবো।

সবাই যাকে এত কাছে পেতে চান, একান্ত আপন ডোরে বাঁধতে চান, তাঁরও তো চাওয়া থাকতে পারে। জাহ্নবী প্রবীর নামের তাঁর এক সহপাঠীকে ভালোবাসতেন। অন্যান্যরা দেখে হা-হুতাশ করতেন, ঐ মেয়ে প্রবীরের মত একটা দুষ্টু ছেলেকে কিভাবে ভালোবাসতে পারেন? একেই কী বলে সুন্দরীর পছন্দ?
কালোর মধ্যে দেখতে হলেও প্রবীরকে দেখতে মোটেও মন্দ লাগতো না। সৌকুমার্য ছিলো চেহারার মাঝে। চেহারায় সৌন্দর্যের আতিশয্য না থাকলেও এমন চেহারার ছেলেকে মেয়েরা অপছন্দ করতেও পারেন না। মেধাবী। সব বিষয়ে যেন কম বেশি জানেনই।

জাহ্নবীর সাথে প্রবীরের যেদিন থেকে মন বিনিময় হয়ে গেলো সেদিন থেকেই অকারণে জাহ্নবীর নিরাপত্তা বেড়ে গেলো। কেউ কুনজরে তাকাতে সাহস পেতেন না, বাজে মন্তব্য করতেও কেউ সাহস পেতেন না। কারণ প্রবীর রগচটা ছিলেন, অন্যায়কে প্রশ্রয় দিতেন না, অন্যকে শাসন কিংবা শিক্ষা দিতেও হাত কাঁপতো না। এমন পুরুষোচিত প্রবীরকে জাহ্নবী খুব পছন্দ করতেন।
কিন্তু বাবার পছন্দকে অগ্রাহ্য করার সাহস হয়ে উঠেনি জাহ্নবীর। রাকেশের ঘরে বধু হয়ে এসে উঠেন।

স্নেহার আজ মন খুব খারাপ। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে অনেকক্ষণ কান্না করলো। বাবার ছবিটা বুকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে গেলো। জাহ্নবী মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, মা, ভাত এনেছি। দুটো খেয়ে নে।
স্নেহা উঠলো না। জাহ্নবী বললেন, তোর বাবাকে আমি মারবো কেনো? প্রথম প্রথম তোর বাবার সাথে আমার ঝগড়া হতো। মানুষ সেটুকুই দেখেছেন। তোর বাবাকে যদি আমি না-ই ভালোবাতাম তবে সকল সমালোচনার জবাব দিয়ে এই বৈধব্য সাজ এতকাল বহন করছি কেনো?
স্নেহা মাকে বললো, তোমার জীবনের ছোট্ট একটা ভুল তোমার জীবনকে অঙ্গার করে দিয়েছে। মা, এমন ভুল যেন আমি না করি।
জাহ্নবী ভাত তুলে তুলে স্নেহাকে খাওয়ায়ে দিলেন। কখন যে চোখে দু’ফোঁটা জল চলে এলো বুঝতেও পারেননি।

অনেক দিন পর জাহ্নবী ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে যেয়ে স্তব্ধ হয়ে গেলেন। প্রবীরকে দেখে জাহ্নবীর শরীরে শিহরণ গোল্লাছুট খেলে গেলো। চোখে তাঁর অমল হাসি জেগে উঠলো। চোখে চোখে দীর্ঘক্ষণ কথা হয়ে গেলো। কৈশোরের দিনগুলো নিমেষেই সামনে ভেসে উঠলো। নিজের চোখের দেখাকে কেউ বিশ্বাস করতে পারছেন না। শতকালের সাধনাকে সামনে দেখে প্রবীর কী করবেন বুঝতে পারলেন না। বিভেদ বা বিচ্ছেদ হলেও অবসান তো হয়নি। মনের অলিন্দে পোনা মাছের মতো তো জাহ্নবী অনবরত কলবল করতেন। ম্যানেজারকে বলে প্রবীর জাহ্নবীকে নিয়ে একটা রেস্তোরাঁয় গিয়ে বসলেন। প্রবীর বললেন, এত নিষ্প্রাণ হয়ে গেছো কেনো? ডালহীন লতার মতো নেতিয়ে পড়েছো কেনো? ক্লান্তি তো তোমাকে স্পর্শ করতে পারতো না!

জাহ্নবী বললেন, এই পৃথিবীর সবাই আমার রূপের প্রশংসা করেছেন, আমিও রূপের দেমাগ দেখিয়েছি। আমার জ্বর হতে পারে মানুষ মানতেই পারেন না। আমার মন খারাপ থাকতে পারে মানুষ বিশ্বাসই করেন না। আমার কষ্ট থাকতে পারে মানুষ মেনে নিতেই পারেন না। আমি কী রক্তে মাংসে গড়া মানুষ নই?
প্রবীর আশ্চর্য হয়ে বললেন, আমার কথার প্রতিউত্তরে তুমি এভাবে প্রতিক্রিয়া দেখালে ঠিক বুঝলাম না!

জাহ্নবী বললেন, যার মুখ থেকে হাসি ফুরাতো না তার জীবনে হাসি রাজত্ব করতে পারেনি। যে খুব ভালো একটা ঘরের স্বপ্ন দেখতো সে ঘর পেলেও স্বপ্নের সাথে বাস করতে পারেনি। এত দুরন্ত ছিলাম, জীবন জুড়ে তার কোনো দুরন্তপনা নেই। জীবনে কখনো নিজের কাজও নিজে করিনি, অথচ গোটা জীবনটার ভার আমার একার কাঁধে চড়ে বসলো! কত সঙ্গপ্রিয় ছিলাম আমি, অথচ কত বছর আমি কতটা একা!

প্রবীর খুব উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন, কী হয়েছে তোমার, তুমি এমন করে কথা বলছো কেনো?
জাহ্নবী বললেন, প্রবীর, আমার বসন্ত চিরতরে শেষ হয়ে গেছে। আমার জীবন যৌবন খুন হয়ে গেছে। মৃত্যুগঙ্গা আমার সব কেড়ে নিয়েছে। সংসারের চৌকাঠে পা না রাখতেই আমার স্বামী আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। না হয় কথা কাটাকাটি হতো, তাই বলে এভাবে একা করে দিয়ে চলে যাবে? আমি কী তাকে শুধু কষ্টই দিয়েছি? আমি কী তার কাঁধে মাথা রেখে স্বপ্ন গাঁথিনি? তার চোখে চেয়ে জীবনের নকশিকাঁথা বুনিনি?

প্রবীর কথাগুলো শুনে বজ্রাহত হলেন। বললেন, এতকাল পরে দেখা হলো তোমার এই কথা শুনবো বলে? কেনো আবার দেখা হলো? তুমি সুখের রাজ্যে আছো রানী হয়ে আমি তো এই ছবিই দেখেছি।
জাহ্নবী বললেন, বুঝেছো, আমার মেয়েও আমাকে অপরাধী করে।
প্রবীর জাহ্নবীর দিকে মুখ তুলে তাকালেন। চোখের মণিজোড়া নীল পাথরের মতো টকটক করছে। সদ্য তৈরি ঘিয়ের মতো উজ্জ্বল চেহারা আজো আছে অথচ তার মাঝ থেকে কত কিছুই হারিয়ে গেছে যা তাঁকে নুব্জ করে দিলেও মলিন করতে পারেনি।

প্রবীরের রক্ত কণিকায় উষ্ণতার স্রোত বেড়ে গেলো। জাহ্নবী মায়াবী কণ্ঠে বললেন, প্রবীর, তোমার খবর বলো।
প্রবীর বললেন, তোমার বিবাহ হওয়ার কথা শুনে আমিও আর অপেক্ষা করিনি। সদ্য স্নানরত পৌরাণিক নায়িকার মতো বৌ পেয়েছি। আমায় খুব যত্ন করে মিনাক্ষী। আমার ছেলে আদর, বিবিএ করছে। তোমার মেয়ে কিসে পড়ছে?
জাহ্নবী বললেন, ইংরেজিতে অনার্স করছে।
প্রবীর বললেন, খুব ভালো। চলো, তোমার সাথে বাসায় যাবো। মেয়েটাকে দেখবো। তোমার বাসাটাও চেনা হবে।

জাহ্নবী বললেন, প্রবীর, তুমি সমাজকে যেভাবে জানো আমি জানি না সেভাবে। সমাজের সাথে যুদ্ধ করে আমি বেঁচে আছি। সমাজের বিরুদ্ধস্রোত তুমি জানো না। মানুষের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে আমি বেঁচে আছি। সমাজের কটাক্ষ উচ্চারণ প্রতিনিয়ত ভোক্ষণ করে আমি পথ চলি। তুমি আমার সাথে আমার বাড়ি যাবে না। তুমি আমার বেঁচে থাকাটুকু জিইয়ে রাখো।

প্রবীর বললেন, মানুষ সভ্য হবার চেয়ে বর্বর হচ্ছে বেশি। আত্মচর্চার চেয়ে মানুষ পরচর্চা পরনিন্দা বেশি করে। নিজ ঘরের খোঁজ রাখে না পরের ঘরের থালা বাটি উল্টায়। মানুষ অদ্ভুত, মানুষের আচরণ আরো অদ্ভুত। তুমি ভাববে এসব যারা করে তারা পঁচা মনের। যার মুখে যত নোংরা কথা মনে রাখবে তার মন আরো বেশি নোংরা। তুমি কানে নেবে না। মনে রাখবে না। মনে রেখো জল যতই নোংরা হোক, হাঁসের পালক ধরে রাখে না। নোংরা জল হাঁসকে মলিন করতে পারে না।
হ্যাঁ-ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে জাহ্নবী বললেন, আজ তো ব্যাংক থেকে টাকা নেয়া হলো না। কাল মেয়েকে সাথে করে আসবো। তখন আমার মেয়েকে দেখো।
আবার শুরু হলো নতুন করে পথ চলা। পরদিন স্নেহাকে সাথে করে ব্যাংক থেকে টাকা উঠালেন জাহ্নবী। স্নেহাকে দেখে প্রবীর আশীর্বাদ করে দিলেন। স্নেহার সুমিষ্ট বাচনভঙ্গি, জ্ঞানের গভীরতা আর শালীনতার ভেতর আভিজাত্যের ছাপ দেখে বিমুগ্ধ হলেন প্রবীর। জাহ্নবী বিদায় নিয়ে বাড়ির পথ ধরলেন। স্নেহ উৎসুকের সাথে বললো, ব্যাংকের ঐ স্যারকে মনে হয় চেনো, মা!

জাহ্নবী বললেন, আমরা একসাথে পড়তাম। আমার খুব ভালো বন্ধু ছিলো।
স্নেহা চুপ হয়ে গেলো। উচ্ছলতা হঠাৎ কমে গেলো। রাতে প্রবীর ফোন করে বললেন, জাহ্নবী, আমাদের কপালে বিবাহ লেখা ছিলো না, আমাদের দু’জনের পথ দুটো হয়ে গিয়েছিলো। আমরা পারিনি, কিন্তু আমাদের সন্তানরা পারবে। ওদের দু’হাত যদি আমি এক করে দিই, তোমার আপত্তি থাকবে?
জাহ্নবীর চোখে মুখে ঝিলিক জাগলো। কলসের গলার মতো খাঁজ কাটা কোমরের দুলুনিতে খোলা চুল শীষ ফোঁটা ধানের মতো দোলা খেলো। দীর্ঘদিন যার ঠোঁটে মৃদু হাসিটিও আসেনি তাঁর ঠোঁটে বাঁধ ভাঙা খুশির জোয়ার। অবারিত আনন্দের ঢেউ খেলে গেলো মনে। বললেন, তুমি আমার মনের কথাটিই বলেছো। তোমার স্পর্শে থাকতে পারিনি, কিন্তু তোমার সাহচর্য আর হারাবো না।
মায়ের হঠাৎ খুশি খুশি ভাব স্নেহাকে ভাবাতে বাধ্য করলো। সুযোগ থাকলে সে কোথাও পালিয়ে বাঁচতো।

পরদিন জাহ্নবী মেয়েকে মিষ্টি করে বোঝাতে সক্ষম হলেন। আদরের সাথে দেখা করতে ক্যাম্পাসে গেলো স্নেহা। স্নেহা মনে মনে প্রচণ্ড রেগে আছে, আদরের থেকে অপ্রত্যাশিত আলাপ পেলেই নিকৃষ্ট আচরণটাই সে করবে। স্নেহার সাথে প্রাথমিক সাক্ষাৎ হলো। আদর বললো, বাবা তো ঠিকই বলেছে, তুমি একটা দারুন মেয়ে।
স্নেহা প্রশংসায় কর্ণপাত না করে বললো, ক্যাম্পাস, আড্ডা, ঘুম। বাইরে আর কী করেন?

আদর বললো, স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচিতে আছি। নির্দিষ্ট সময় অন্তর রক্তদান করি, রক্তদানে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করি। ছিন্নমূল পথশিশুদের সহয়তায় একটা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে যুক্ত আছি। আর্ত-মানবতার সেবায় শীতকালে শীতার্তদের মাঝে সংগৃহীত শীতবস্ত্র বিতরণ করি। সাহিত্য সংগঠনে যুক্ত আছি। ডিবেট করি। সাংস্কৃতির সব ধারাতে একটু একটু পদচারণা আছে।

স্নেহা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে মনে মনে ভাবলো, সব ছেলেই মেয়েদের সাথে এমন মিষ্টি মিষ্টি আলাপ করে কৃতিত্ব দেখায়। মুখে বললো, রেজাল্ট কেমন করছেন?
আদর হেসে বললো, ভালো রেজাল্ট মানেই ভালো মানুষ তা নয়। যারা যত ভাল রেজাল্ট করে তারা তত অহংকারী আর রিজার্ভ। মানুষ ও সমাজের জন্য কিছু করার প্রয়াস তাদের কম দেখি। মানবতার সেবায় ব্রত মানুষই ভালো মানুষ। অধ্যয়ণ করে ভালো রেজাল্ট করা যায়, ত্যাগাদর্শ না থাকলে মহৎ হওয়া যায় না। আমাদের সমাজে মেধাবীদের অভাব নেই। কিন্তু মেধা প্রয়োগ করে না।
স্নেহা তীর্যক চেয়ে বললো, আর বন্ধু সার্কেল?

আদর বললো, আমি একক কোনো বন্ধুতে বিশ্বাসী নই। আমার অনেক বন্ধু। খুব স্ফূর্তি করি। ছুটি পেলেই ঘুরতে চলে যাই দল গুছিয়ে। মা, মাটি, মানুষ নিয়ে নিয়মিত পত্রিকায় কলাম লিখি।
স্নেহা আসল কথাতে ফিরলো, আপনার বাবা নাকি আমার মায়ের খুব ভালো বন্ধু?
আদর হ্যাঁ-সূচক ভঙ্গিমায় বললো, বাবার কাছে আপনার মায়ের কথা শুনেছি। একসাথে পড়তেন। উনারা কত ভালো, বন্ধুদের ভোলেন না, আর আমরা দু দিনের মাঝেই বন্ধুদের ভুলে যাই।
বেশি পাত্তা দেয়া ঠিক হবে না বলে হঠাৎ করে স্নেহা বাড়ি চলে এলো। মা বললেন, আদর ছেলেটা কেমন? ভালো তো নিশ্চয়!
আদরের প্রতি মায়ের পজিটিভ কৌতূহল স্নেহার চোখে খুব বাঁধলো। বেশক্ষণ ভেবে স্নেহা বললো, ভালো! অন্য ছেলেদের মতো না। তাঁর চিন্তা চেতনা শুদ্ধ। জীবনমুখী ভাবনা মুগ্ধ করার মতো।
মেয়ের মুখ থেকে কথাগুলো শুনে জাহ্নবী খুব খুশী হলেন। প্রবীরকে ফোন করে বললেন, ছেলেকে কিছু জিজ্ঞাসা করেছো?
প্রবীর বললেন, হ্যাঁ। ওরা পরস্পর পরস্পরের সাথে আরো মিশুক। পরস্পর পরস্পরকে আরো চিনুক। নিজেরা নিজেদের যত সম্ভব কাছের করে নিক।
জাহ্নবী বললেন, তোমার স্ত্রী কিছু মনে করবেন না তো?
প্রবীর বললেন, আমার স্ত্রী অনেক ভালো। বড় ভালো মেয়ে। তোমাকে হারানোর বেদনা সে ভুলিয়ে দিয়েছে। বড় মনের একটা মেয়ে ও।
জাহ্নবীর মুখে হাসি জাগলো। মায়ের মুখের হাসি কতকাল স্নেহা দেখেনি। সাম্প্রতিক সময়ের মায়ের মুখের হাসি তার সহ্য হতো না। কিন্তু আজকে কেনো যেন মাকে বুকে জড়িয়ে নিতে ইচ্ছে হলো। মায়ের বুকে মুখ লুকাতে ইচ্ছে হলে।
আদর ফোনে স্নেহাকে জানালো, আজ ক্যারিয়ার বিষয়ক একটা ওয়ার্কশপ আছে, তুমি কী যাবে আমার সাথে?
স্নেহা আদরের ফোন পাওয়ার সাথে সাথে যে বিরক্তটুকু হয়েছিলো, এমন প্রস্তাব পেয়ে রাজি হয়ে গেলো। ওরা ওয়ার্কশপে যোগ দিলো। অন্যদিন ফোনে আদর বললো, তুমি তো ইংরেজিতে অনার্স করছো। স্পোকেন-এ দখল নিতে তোমার কোর্স করার দরকার আছে। তুমি ইচ্ছা পোষণ করলে তোমাকে আইইএলটিএস-এ ভর্তি করে দিতে পারি।
আজকের প্রস্তাবটাও স্নেহার ভালো লাগলো। আদরের সাথে দেখা হতেই বললো, আপনি কিন্তু বলেছিলেন একক বন্ধুতে আপনি বিশ্বাসী নন। অথচ নানা কায়দায় আপনি আমার সঙ্গ নিচ্ছেন।
আদর খুব সিরিয়াস হলো কথাটি শুনে। বললো, বাবা তোমার সাথে দেখা করতে পাঠান। তোমার সাথে দেখা না করলে তিনি কষ্ট পান। তোমার সাথে দেখা করতে হলে তোমাকে নানা অজুহাতে ডাকতে হয়। তুমি আমাকে অপরাধী করতে পারো না।
স্নেহা বললো, আমিও আপনার ডাকে আসি কারণ আপনার সাথে দেখা করলে আমার মায়ের মুখে হাসি ফোঁটে। আমার মা জনম দুখী। আপনার বাবা, আমার মা যা চাই, আমি তা কল্পনাও করি না। আমি বাবার মুখটা পর্যন্ত মনে করতে পারি না, বাবার আদর কেমন জানি না। তার জন্য কাউকে আমি দায়ী করতে পারি না। আপনি আপনার বাবাকে পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দেবেন আমার অমতের ব্যাপারটা। আমি চাই-ও না আমার বিষয়ে আপনার ন্যূনতম আগ্রহ থাক।
জাহ্নবী আর প্রবীর উভয়ই জেনে গেলেন মেয়ে ছেলের মতামত। পরের দিন উনারা দেখা করলেন। দু’জনেরই মুখ অন্ধকার। কেউ কথা বলছেন না। প্রথমে প্রবীরই মুখ খুললেন, বললেন, বিবাহের কথা আদর শুনতেই চায় না। বড় হবে, অনেক বড়। মানবতার সেবায় জীবন উৎসর্গ করবে!
জাহ্নবী বললেন, আমার মেয়ে কখনো রাগে না, কিন্তু গতকাল খুব রাগ দেখিয়েছে। অ্যাম্বিশন, সাকসেস, ক্যারিয়ার, প্রতিষ্ঠা নিয়ে ব্যস্ত। বৃত্তি নিয়ে বিদেশ যাবে। জ্ঞানী হবে।

প্রবীর বললেন, আমরা যেতাম পার্কে, নিরিবিলি কোনো প্রান্তরে, রেস্তোরাঁয়। ওরা যায় পাবলিক লাইব্রেরিতে, সেমিনারে, সিম্পোজিয়ামে, ওয়ার্কশপে, সাইবার ক্যাফেতে। এরা সময় আমাদের মত প্রেমালাপ করে নষ্ট করে না। এদের সময়ের অনেক মূল্য।
জাহ্নবী বললেন, কিন্তু ওরা অনুরাগটা পাবে কোথায়? যন্ত্র যুগে যান্ত্রিক হয়ে প্রেম কী ওরা ভুলে যাচ্ছে। মেয়ে বললো, এখন প্রেমসর্বস্ব জীবন নয়। প্রতিষ্ঠা চায়। প্রতিষ্ঠা দিয়ে করবে কী? অনুরাগহীন সম্পর্ক টুক করে লাগলে যে ভেঙে যায়।
প্রবীর বললেন, জাহ্নবী, আমাদের স্বপ্ন পূর্ণ হয় না। থাকুক ওরা ওদের উদ্দেশ্য নিয়ে। কী লজ্জায় না পড়েছি দু’জন ওদের সামনে গিয়ে। আমরা ভেবেছি, ওরা নিজেদের মাঝে সম্পর্ক গড়ে নিয়েছে। কে জানতো ওদের কথার মাঝে হালকা চড়ক! চলুক ওরা ওদের মতো, ওদের পথে। আমরা তো আর হারাবো না। আমাদের অনুভূতির আদান প্রদান হবে জাহ্নবী, কিন্তু অতৃপ্তি নিয়ে থাকতে হবে। আর জীবন মানেই অতৃপ্তি।
জাহ্নবী বললেন, এভাবে দু’জন জীবনের অলিগলি পথ পাড়ি দিতে দিতে দুটি নিষ্প্রাণ জীবনের ইঁদুর দৌঁড় দেখতে দেখতে না হয় দীর্ঘশ্বাসই ফেলবো। এর বেশি তো কিছুই নয়।
আঁচলটা মাথার ছাতা করে জাহ্নবী হাটতে লাগলেন। প্রবীরের কাছে একটা ছাতা থাকা সত্ত্বেও জাহ্নবীকে ছাতার তলে নিতে পারলেন না। দোকানে গেলেন ছাতা কেনার জন্য।

লিপি
শ্যামাপ্রসাদ সরকার

শ্যামাপ্রসাদ সরকার

কলকাতা

সমগ্র লেখা

নিশি না ফোরাতে....

আজ সকাল থেকে লখাই মিত্তিরের দলবল হাঁক ডাকে পাড়া গরম করে দিচ্ছে। ওরা আবার লোকাল কাউন্সিলারের কি যেন একটা সূত্রে আত্মীয় হয়। সেজন্য ধরাকে সরা ভাবাটাই এখন দস্তুর। ওরা শিগগিরই এলাকা দখল করে কন্ডোমোনিয়াম সহ একটা এনক্লোজার বানাবে নির্মীয়মান “নিউ নুকস্ এনক্লোজার” আর মিনি টাউনশীপ প্রজেক্ট “সিটি লাইটস্” এর জন্য।
আর তাতেই পুরনো আদ্যিকালের বাড়ি দুটোর সিকিটাক অংশ ভাঙতে হবে। আসলে নতুন আর পুরনো কিছুই একসাথে থাকতে পারেনা। যুগধর্মের ঋজু নিশান বুক ফুলিয়ে আর মাথা উঁচু করে সে কথাটাই এখন বলছে।
……
ঘাটের কাছ দিয়ে যে রাস্তাটা পূবদিকে চলে গেছে সেখানেই মল্লিকদের “নিধুকুঞ্জ” আর “প্যারীভিলা” দুটো জোড়া বাড়ি বটে তবে ওদের মালিক আর ক্যাম্পাস এক। বাবু কলকাতার ধ্বংসাবশেষ ঘাটের বাঁধানো পাড় থেকে ওই বাড়ি দুটোর অবয়বকে ছুঁয়ে আছে। সেটাই এখন টাউনশীপের জন্য দরকার হলে বলপূর্বক অনেকটাই এখন ভাঙতে হবে।
এখানে সেই অতীতের কন্ঠস্বর মাঝেমাঝে ফুকরে ফিরলেও মানুষজন বলতে শুধু রয়ে গেছে গিরিধারী একাই।
……….
তার বাপ -দাদা’রা একশো বছর আগেও এবাড়ির খিদমত্গারী খেটেছে। অবশ্য এখন আর সেসব নেই। বর্তমান মালিক বৃদ্ধ রসিক মল্লিক তাঁর ছেলের পরিবারের সাথে থাকেন বিদেশে। তাও সেই প্রায় নয় নয় করে বিশ পঁচিশ বছর আগে ওঁরাও এসব ছেড়ে চলে গেছেন। তবে যাওয়ার আগে ঘর দোরের দেখভাল করতে গিরিধারীর হাতে চাবির গোছা আর থাকার অনুমতিটা দিয়ে গেছিলেন বলে এই বয়সে এসে আর উদ্বাস্তু হতে হয়নি। ওর একটাই মেয়ে তারও পাঁচবছর আগে বিয়ে হয়ে গেছে কাটোয়ায়। বউ মারা যাবার পরে নিজের বলতে আর কিছুই নেই। শুধু আছে বৃদ্ধ অস্থি-পঞ্জর আর এই দুটি দু -মহলা ঢাউস বাড়ি আর বসবাসযাপনের স্মৃতিটুকুই। আজও গভীর রাতে ঘুম না এলে এই বাড়িদুটো ওকে যেন এখনো সঙ্গ দিতে আসে। ওরা নিজেদের ভাষায় ফিসফিসিয়ে ফেলে আসা অন্দরমহলের গল্প বলে এখনো ওকে ঘুম পাড়িয়ে দেয়।
…………

হাত বাড়িয়ে টর্চটা খুঁজতে গিয়েও পাওয়া গেল না। রাতচরা পাখির ডাক আর জোয়ার আসার কলকলানিতেও এটুকু বোঝাই যায় রাত এখন বেশ গভীর। বিদ্যূতের লাইন টাইন ওরা সব আজ কেটে দিয়ে গেছে। গিরিধারী যাতে অগত্যা উঠেই যায় তাই এই ব্যবস্হা। টাউনশীপটা হওয়াটাই জরুরী এখন।

ফস্ করে দেশলাই জ্বালিয়ে গিরিধারী বুঝল ঘড়িটাও কে এ ঘর থেকে যেন নিয়ে গেছে। আর আসবাবগুলোও যেন কেমন কেমন আদ্যিকালের। এরকম বাহারী চৌকি এ ঘরে আবার কবে ছিল?
………..
হঠাৎ নাচমহলের পাশে ভেসে এল ঘুঙুর পড়া পায়ের আওয়াজ। কোনওমতে ঠাহর করে ও ওদিকটায় গিয়ে দেখল একজন গয়নাগাটি পড়া মেয়েমানুষ একজন মোটা গোঁফ ওলা লোকের পা ধরে কাঁদছে। আর লোকটা বলছে,

“ওরে হারামজাদী! কুলটা! সর্বনাশী ! নষ্ট মেয়ে মানুষ কোথাকার…ভাবছিস আমি তোর আর পরিচয় দেব মেয়ে বলে! এ বাড়ির মেয়ে লক্ষীমণি ওলাউঠোয় মরেচে! সেটাই সকলে জানে! হতভাগী! দূর হয়ে যা…শিবেনের সাথে আশনাই করার বেলায় মনে ছিল না? ওটাকে তো মেরে গুমঘরে পুঁতে দিইচি! তোকে মেয়েছেলে বলে মারতে পারিনিকো! কাল ভোর হতেই পেটের শত্তুর আর তুই দুজনেই ঘাটে নৌকা চেপে দেগঙ্গা বা কুলতলি চলে যাবি! মরতেও পারিস্ অবশ্য! তবে এই প্যারীভিলায় তোর জায়গা হবেনেকো! আমার মেয়ে মরে গেচে! হ্যাঁ হ্যাঁ সে আর নেইকো!” এই বলে লোকটা রাগ দেখিয়ে গটমট করে ভেতর মহলে মিলিয়ে গেল।

গিরিধারী দেখতে লাগল মেয়েছেলেটা এবার হাপুস নয়নে কাঁদতে কাঁদতে একটা পুঁটুলি কুড়িয়ে নিল। এবারে ওর থেকে বাচ্চার কান্না ভেসে এল যেন। সদ্যোজাতই বটে, দুই কি তিনমাস হবে। বোধহয় দুধ খাবে। ঠোঁটদুটো ছুঁচলো করে চকচক আওয়াজ করছে।

কিন্তু এরা সব কারা? মেয়েটা এত রাতে এবাড়িতেই বা কি করছে?
………..
একটু পরে দেখতে পেল যে ওই মেয়েটা গলার আর হাতের গয়নাগুলো খুলে একটা কাপড়ে বেঁধে রেখে দিল। বোধহয় বাচ্চাকে দুধ খাওয়াবে! কিন্তু না! বাচ্চাটাকে নিল ঠিকই কিন্তু এক পা -দু পা করে ঘাটের সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে একেবারে মাঝগঙ্গায় চলে গেল। একী! সাঁতার টাঁতার আবার না জানলে যে দূর্ঘটনা ঘটবে এক্ষুণি।তাছাড়া এত রাত্তিরে…….

গিরিধারী হঠাৎ দেখল ভোজবাজির মত সব এবারে উবে গেছে। কেউ আর কোথাও নেই। খানিক আন্দাজে আন্দাজে ও মেয়েটাকে খুঁজল আর ওই কর্তাগোছের লোকটাকেও! কিন্তু নাহ্! ফাঁকা বাড়িটার নিস্তব্ধতা ফুকরে ফুকরে উঠল কেবল। কেউ তো নেই এখানে। গঙ্গার ঘাট থেকে এটুকরো হাওয়া এসে নিধুকুঞ্জ আর প্যারী ভিলার গায়ে খালি যেন শিরেশিরে হাতটা বুলিয়ে দিয়ে চলে গেল। আর শুনতে পেল একটা প্যাঁচা তারস্বরে কোটরের ভিতরে বসে খালি ডেকে যাচ্ছে।
………..
ঘরে এসে দেখল আবার সেই তার দড়ির ক্যাম্পখাটটাই তো ওখানে রয়েছে। কিন্তু তার কাছে একটা পুঁটলিতে অনেককালের পুরনো কাপড়ে জড়ানো একটা মান্তাসা আর মকরমুখী বালা কে যেন হঠাৎ এসে এখানে রেখে দিয়ে উধাও হয়ে গেছে।

ওগুলোই তো এর একটু আগে ওই মেয়েটা গায়ে পড়ে ছিল না?
………..

গিরিধারী গরীব হলেও চোর নয়। সে এক পা দু’পা করে ঘাটের দিকে এগিয়ে যায়। ওর মেয়ে নয়নতারার বয়সী ওই লক্ষ্মীমণি বলে মল্লিকদের মরা মেয়েটার জন্য বড় মনখারাপ আর কষ্টবোধ জমাট হয়ে আসছে সেটা বুঝতে পারছিল।
ও এবার ঠিক করল কালই কাটোয়া গিয়ে মেয়ে আর নাতিটাকে একবার চোখের দেখা দেখে আসবে।
……..
যখন গিরিধারী ওর হাতে ধরা ওই পুঁটুলির ভিতরের গয়নাগুলো নিয়ে ঝুপ্ করে মাঝগঙ্গায় ফেলে দিতে দিতে যাচ্ছিল তখন একটা অজানা মনকেমন এসে ওর বুকের ভেতরটাকে হু হু করে মুচড়ে দিচ্ছিল আর অযথাই কেমন যেন সবকিছু নিশি শেষের গাঁথা মালার ব্যর্থতার মত বয়ে এসে ওর সত্তর বছরের ভেতরমহলের চেনা অচেনা অব্যক্ত কষ্টগুলোকে এখন গলার কাছটায় এনে কেবল দলা পাকিয়ে তুলছিল।

এর কি আদৌ কোন সুরাহা হবে কি?

অশ্রুর ধারা এসে গাল বেয়ে নামতে নামতে ও বুঝতে পারছিল সবার সবকিছু যে একজন্মে শেষ হয়েও হতে চায় না……!

লেখক পরিচিতি : শ্যামাপ্রসাদের জন্ম কলকাতায়। পাঠভবন, সেন্ট লরেন্স ও সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের প্রাক্তনী ছোটবেলা থেকেই সাহিত্যসৃজনে উৎসাহ। প্রথম লেখা “ঝালাপালা” পত্রিকায় মাত্র ন'বছর বয়সে। এরপর বয়সের সাথে সাথে ডিজিটাল ও প্রিন্ট উভয় মাধ্যমের জনপ্রিয় লেখক। “নিঠুর দরদী” প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস। বর্তমানে প্রবাসী ও বেসরকারি ব্যাঙ্কে চাকুরীরত। “রাই এর জন্য একাকী”, “উত্তরধারা”, “এবং ধানসিঁড়ি” ও “ফেলুদা ফ্যান ফিকশন” ইত্যাদি জনপ্রিয় গ্রন্হের লেখক। বিভিন্ন ছোট ও বড় পত্রিকার জনপ্রিয় লেখক হিসাবে পাঠক মহলে আদৃত। বিগত ২০১৯-২০২০ সালে গল্প ও কবিতার জন্য ইতিমধ্যেই পেয়েছেন “বিবর্তন কবিতা পুরষ্কার”, “মণিরত্নম পুরষ্কার” ও “সবুজ স্বপ্ন সাহিত্য সম্মাননা পুরষ্কার” ও “কচিপাতা- শ্রেষ্ঠ গল্পকার” ও “নীলাঞ্জনা প্রকাশনী-রবীন্দ্র পুরষ্কার ২০২১”।

লিপি
রবীন জাকারিয়া

রবীন জাকারিয়া

রংপুর, বাংলাদেশ

সমগ্র লেখা

আসমানিরা

রসুলপুরে এখনো কিন্ত আসমানিরা থাকে
কেউতো কভু দেয়না সাড়া অনাহারির ডাকে
রইমুদ্দির মারা যাওয়ার অনেক বছর হলো
এ সময়ে আসমানির খোঁজ কে নিয়েছে বলো?
বৃষ্টি পড়ার ফুঁটোগুলো সাক্ষি বাড়ির ছাদে
সব কিছুই যে আগের মতো কান্নাটুকু বাদে
বাড়িটা আর নেইতো তাদের আছে ছোট্ট ঘর
বাকী অংশ বেচে দিয়ে মেয়ে করেছে পর
হাড়গুলো যে যায় না গোনা, মোটা গরনখানি
কিডনী রোগীর শরীরটাতো ভরা দিয়ে পানি
সবদিকে যে লাগছে এখন উন্নয়নের ছোঁয়া
ভোট এলে’পর নেতারা সব নিচ্ছে গিয়ে দোয়া
জীবনটাকে বদলে দেবার কত অঙ্গীকার
এসব নেতা অদ্যাবথি থাকেন সঙ্গী কার?
দেখতে আসেন কত মানুষ “সাহেব-গোলাম-বিবি”
সেলফি তোলার আগে বলেন “মিষ্টি হাসি দিবি”
সাংবাদিকরাও যায় না বাদ তোলেন কত ছবি
আসমানিরাও বলতে জানেন “মানুষ কবে হবি”?

কবি পরিচিতি: রবীন জাকারিয়া, বাসা নং-৩২, রোড নং-১/১, মাদ্রাসা রোড, রংপুর সিটি কর্পোরেশন, ওয়ার্ড-১৮, মুনসীপাড়া, রংপুর, পোস্ট কোড-৫৪০০৷ বাংলাদেশ৷ কারমাইকেল কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স ও রংপুর আইন কলেজের প্রাক্তন ছাত্র৷ খেলাধুলা, নাট্য চর্চা ও লেখালেখির পাশাপাশি দীর্ঘদিন যাবৎ উন্নয়ন কর্মি হিসেবে কাজ করছি৷

লিপি

চরিত্র অমনিবাস

সঞ্জীব সেন

 

মদ খেলে চরিত্র খারাপ হয় না,
উপন্যাস পড়লেও চরিত্র খারাপ হবে না,,,
চরিত্র ডার্ক চকলেট না, ফয়েলে মোড়া=
মুখে দিলেই গলে যাবে!
আশির দশকে প্রেমে পড়েছে যারা তার জন্য উত্তম সূচিত্রা দায়ী নয় কখনও!
ডি এইজ লরেন্স থেকে সমরেস বসু
জেমস জয়েস থেকে বুদ্ধদেব বসু
জেন অস্টেন থেকে সুনীল গাঙ্গুলী
পড়তে পড়তে কেউ যদি বলে এইসব এইসব,,,
এইসব কারণে গোল্লায় যাবে সব একদিন,,,
এইসব প্রলাপগুলোকে কোথায় রাখবো!
আমি তো জেনেছি যৌনতা হল প্রতিরোধ না পেরে ঝরে পরা ফুল, ফুলদানিতে রাখব না বুকপকেটে রাখব, আমারই ব্যাপার,
প্রেম তো আর বেরেলির বাজার থেকে কিনে দেওয়া চুড়ি নয়,,
ত্যাৎক্ষণিক মুগ্ধ হই তাই বন্দী করি সেলফি,
অনন্ত কতটুকুই জানি,
শুধু জানি, এইসব না থাকলে বুঝে নিতে হবে
এইশহরে কোথাও কোন সানাই বাদক নেই আর।

লিপি
বদরুদ্দোজা শেখু

বদরুদ্দোজা শেখু

বহরমপুর, মুর্শিদাবাদ

সমগ্র লেখা

অভাজন আত্মার

পিছনে ছাড়িয়ে আধা-শহর গোছের
ওস্তাগার-অধ্যুষিত গ্রাম, ইট-সুরকির বিকৃত রাস্তার দু’পাশের
আকন্দ-গোত্রীয় আগাছার ঝোপঝাড়,
কসাইখানার বিরক্ত দুর্গন্ধ, পথপার্শ্বে পতিত ডাঙার
খানাখন্দে মানুষের মলত্যাগ-দূষিত অজীর্ণ বাতাস, গর্হিত
উপকন্ঠে তার নেড়ী কুত্তা লোচ্চা মেয়ে পাঁড়-মাতাল-জনিত
কালোয়াতি বেসাতির উপদ্রব ইত্যাকার আরো কিছু ছাড়িয়ে পিছনে
কিছুটা মুক্ত মাঠের সন্নিকটে আনমনে
সাঁঝের বাতাসে নিঃসঙ্গ বেড়াচ্ছি ঘুরে
কোনোরকম গন্তব্যহীন।
গোধূলির স্তিমিত আলোয় নাতিদূরে
দেখা যায় শহরতলির সংলগ্ন জলার ধার বরাবর
এক দিকে ইটখোলা, ইতস্ততঃ ভাঙাচোরা ঘরবাড়ি, কালচে ধূসর
চিমনির ধোঁয়া, বৈদ্যুতিক তারবাহী স্তম্ভের উচ্চ মিনার,
অন্যদিকে রেলপথ, সিগ্ন্যালের লালবাতি আর
তার পাশে রেলের খালাসিদের অস্থায়ী শিবির। শুনতে পাচ্ছি কোথাও নিকট-বস্তির
দু’একটা ঘরমুখো ছাগলের ডাক, সাঁওতালী
মাদলের একঘেয়ে বোল কিংবা কোনো বেয়াড়া
খেয়ালী
ছেলের দঙ্গল যায় হৈ হৈ ক’রে। বসন্তের আসন্ন আঁধারে
শিকার-সন্ধানী শেয়ালের মতো ইচ্ছার আবিষ্ট ঝোপঝাড়ে
বিচ্ছিন্ন চিন্তার শ্রেণী পথ খুঁজে দৈনন্দিন একঘেয়েমির ক্লীবতায়
বৈচিত্র্য পাওয়ার আশায়,এবং অযথা পশ্চিমেব
অস্তরাগ-রাঙা মেঘমালা-প্রায়
দ্রুততালে বদলায় রঙ মায়াবী উদাস; অকস্মাৎ
আনমনে গেয়ে উঠে অভাজন আত্মার রবীন্দ্রনাথ ।।

কবি পরিচিতি: বদরুদ্দোজা শেখু -র জন্ম মুর্শিদাবাদ জেলার ঠাকুরপাড়া গ্রামে। ক্ষুদ্রচাষী সাইফুদ্দীন সেখ ও গৃহবধূ ফজরেতুন্নেশা বিবির সন্তান। দারিদ্র্যের মধ্যেই গণিতশাস্ত্রে স্নাতকোত্তর। পেশায় অবসরপ্রাপ্ত আধিকারিক। নেশায় কবিতা লেখালেখি। তার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ অলৌকিক আত্মঘাত, দুঃস্বপ্নের নগরে নিভৃত নগ্ন, শব্দ ভেঙে সংলাপ, আরো থোড়া দূর,এবং পরী ও পেয়ালা। তাঁর কবিতা অদলবদল, সপ্তাহ, দৌড়, কবিতীর্থ ,শব্দনগর, ঋতুযান, একুশে বর্ণমালা প্রভৃতি পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত। বিভিন্ন পত্রিকাগোষ্ঠী থেকে একাধিক সম্মাননা পেয়েছেন।- - - এছাড়া কবি “পদাতিক কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় স্মৃতি পুরষ্কার ২০২০” - অন্যতম বিশেষ সেরা সম্মাননা পেয়েছেন।

লিপি

পরিনাম

প্রতাপ ঘোষ

আবদ্ধ অনুভূতি বিক্ষিপ্ত আজ শোকে।
ভাষা-দের নাম নেই আর বুকে,
উদাসীনতা! ফেটে বেরো’য় ভূমিকম্পে।

নির্বাক নিলয় তলিয়ে যায় শান্ত সমুদ্রে,
ভ্রাম্যমাণ শব্দরা টোকা দিয়েছিল, অযাচিত সময়ে..।

ভিতর থেকে আওয়াজ আসে, তোমার বই খালি হয়েছে, তোমারই আড়ালে।

সমাপ্ত
  1. লেখা নেওয়া হবে প্রত্যেক রবিবার থেকে শুক্রবার বিকেল ৫ টার মধ্যে। 
  2. লেখা প্রকাশ হবে প্রত্যেক শনিবার সকাল ৯ টায়।  
  3. লেখা পাঠাতে পারেন –
    1. কবিতা
    2. গদ্য
    3. ছোটগল্প
    4. প্রবন্ধ
  4. মেইলে টাইপ করে অথবা MS Word ফাইলের লেখা নেওয়া হবে। 
  5. আপনি কিভাবে লেখা পাঠাবেন তার কিছু নমুনা দেওয়া হলো। – Download 
  6. লেখা পাঠাতে আমাদের এই মেইলটি ব্যবহার করুন – bangla@lipimagazine.com
  7. লেখার সাথে আপনার লেখক পরিচিতি, প্রথম পুরুষে, ৬০ থেকে ১০০ শব্দের মধ্যে, এবং আপনার ছবি পাঠান। 
  8. সপ্তাহে একজন একটি বিভাগে লেখা পাঠাবেন। 
  9. লেখা বাছাইয়ের মধ্যে দিয়ে নির্বাচিত করা হবে। 
  10. আবেদনকারীর সমস্ত লেখা নিজের হতে হবে, যেটি অন্য কোথাও প্রকাশিত হয়নি।
  11. লেখার মধ্যে কোনো ব্যাকরণগত ভুল থাকবে না, থাকলে সেটিকে বাতিল করা হবে।
  12. আবেদনকারীকে ফোন নম্বর অবশ্যই দিতে হবে মেইলের সাথে।
  13. পিডিএফ ও পিকচার এর মাধ্যমে পাঠানো লেখা গ্রহণ করা হবে না।
  14. লিপি ম্যাগাজিন ওয়েবসাইটে একাউন্ট তৈরির সময় আপনার লেখক পরিচিতি, ঠিকানা, এবং ছবি আপলোড করতে হবে।
  15. প্রত্যেক মাসে Amazon Kindle প্লাটফর্মে এবং পিডিএফ প্রকাশ করা হবে (মাসের সমস্ত লেখা)
  16. তিনমাস অন্তর সমস্ত লেখা পিডিএফ এবং Google Book or Amazon Kindle with ISBN Number সাথে প্রকাশ করা হবে।   

Share This

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on telegram
Share on email

Editorial Board 

  • Reviewed, Designed & Published by Akshay Kumar Roy (Editor)

For More Information, Click Here

For any type of Suggestion, Question, or Help, please contact us at this mail – contact@lipimagazine.com

Follow Us

Related Articles

শনিবারের লিপি – ১৭ তম সংখ্যা – সপ্তাহিক প্রত্রিকা

২০৫০ সালের বইমেলা (গল্প),
আমারে দেব না ভুলিতে,
আমি অবোধ কবি,
আপডেট,

শনিবারের লিপি – একাদশ সংখ্যা – সপ্তাহিক প্রত্রিকা

ফিনিক্স, অসমজ্ঞের জন্য, হৈমন্তীর মন, রাষ্ট্র, বাপজানের শরীরের ঘ্রাণ, চন্দ্রাহত কবির কবিতা, গাঙুরের জলে

শনিবারের লিপি – ১৬ তম সংখ্যা – সপ্তাহিক প্রত্রিকা

Post Views: 453 লেখক <h2>অতীত মন্হন (গল্প)</h2> (১)<br />প্রফেসার সোম সেদিনের আড্ডায় বেশ খোশমেজাজেই ছিলেন। কয়েকদিন আগেই একটা সরকারী এক্সক্যাভেশন অভিযান সেরে এই সপ্তাহান্তের ছুটিতে

শনিবারের লিপি – ১৫ তম সংখ্যা – সপ্তাহিক প্রত্রিকা

মানবজমিন
চিঠি (অণুগল্প)
দারিদ্র্যের কাঠগড়ায়
পত্রিকার খোঁজে
নদী
সাদা কালো সিনেমার মত
মানুষ ও প্রকৃতি
দায়বদ্ধ জীবন

Responses

Your email address will not be published. Required fields are marked *

  1. কৃতজ্ঞতা ও ভালবাসা

Submission (English & Bangla)

Please read the guidelines – English & Bangla