16th-issue-Bangla, Lipi Magazine, Bangla magazine

শনিবারের লিপি – ১৬ তম সংখ্যা – সপ্তাহিক প্রত্রিকা

লেখক

শ্যামাপ্রসাদ সরকার <img class="alignnone wp-image-6202" src="https://www.lipimagazine.com/lipicontent/uploads/2021/07/Verification-Badge-4.svg" alt="" width="17" height="17" />

শ্যামাপ্রসাদ সরকার

কলকাতা

অতীত মন্হন (গল্প)

(১)
প্রফেসার সোম সেদিনের আড্ডায় বেশ খোশমেজাজেই ছিলেন। কয়েকদিন আগেই একটা সরকারী এক্সক্যাভেশন অভিযান সেরে এই সপ্তাহান্তের ছুটিতে আমাদের কাছে এসেছেন।
ওনার স্টকে সেই পুরনোদিনের গল্পের ওপর আমাদের বেজায় লোভ। সুযোগ পেলেই আমরা ওঁকে একরকম চেপে ধরে গল্পের আসর বসাই। মধ্যবয়সী প্রফেসর যদিও কিছুমাত্র আপত্তি টাপত্তি না করে আমাদের সবিস্তারে ওঁর অভিযানের সমস্তটা বলেন বলে আমরাও সর্বদা সেসব শোনবার জন্য উৎকর্ণ থাকি। আমাদের মধ্যে মহিম চাকলাদার আবার আজকাল লিটল ম্যাগাজিনের দলে খুব ভিড়েছে। এই বইমেলায় ওদের কাগজে একখানা ঐতিহাসিক গল্প যে এবার না হলেই নয় সেটা আবার প্রফেসরকে ও শেষে থাকতে না পেরে নিজেই বলেই বসল।
গরম কফি আর পকোড়া সহযোগে প্রফেসার সোমকে আগেই সম্বর্ধনা দেওয়ার কাজটা আমি সেরে রেখেছিলাম। আজ কেন জানিনা মনেই হচ্ছিল যে ওনার ঝোলাতে একটা বিশেষ গল্পের জমায়েত হয়েছে। আর সেটা আমাদেরকে স্নেহবশতঃ সেটা বলতে পারলে তিনিও আনন্দিত হবেন।
প্রফেসার নিজের পকেট থেকে একটি ম্যাপ বের করে আমাদের সামনে খুলে ধরতেই আমরা হুমড়ি খেয়ে তার ওপর চোখ বোলাতে লাগলাম। দিবানাথ সোম নামের এই মধ্যবয়সী প্রফেসারটি বিলেতে এককালে ইতিহাসের অধ্যাপনা করতেন। এখন সম্প্রতি নতুন উদ্যমে দেশে ফিরে বাংলার ইতিহাসের ওপর অচিরাচরিত সূত্র থেকে প্রাপ্ত প্রমাণগুলির সত্যতা যাচাই করে আর্কিওলজিকাল সার্ভেতে গেস্ট সিনিয়ার সার্ভে হেডের পদ অলংকৃত করে আছেন। এমনকি কলেজস্ট্রীটে বইএর দোকানেও ভারতীয় পুরাতত্ত্বের ওপর ওনার লেখা বিভিন্ন বইও পাওয়া যায়। মোটের ওপর ভদ্রলোক একজন সত্যিকারের জ্ঞানী আর মেধাবী মানুষ যদিও সেটা একটু মিশলে বোঝাই যায়।
আর ওনার বিশেষত্ব হল এই যে আমাদের মত অল্পবয়সীদের সঙ্গ ওনাকে কখনো বিরক্ত করেনা। বরং আমাদের কাছেই একটু নিজের অভিজ্ঞতার কথা যা হাসিমুখে শেয়ার করেন।
প্রফেসার ম্যাপটায় আঙুল বুলিয়ে এক জায়গাকে দেখিয়ে গম্ভীর গলায় বলতে শুরু করলেন,
” তখন আমরা কিছুদিন হল দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার জয়নগরের কাছে এতদিনে টলেমির বর্ণিত তিলোগ্রামাম বন্দর-নগর কে প্রমাণ সহ শনাক্ত করেছি ।এর প্রামাণ্য একটা ফলক অবিশ্যি সেবারে উৎখননে নিকটবর্তী ‘ধোষা’ বলে একটা জায়গা থেকে আগেই পাওয়া গিয়েছিল। সেটা আবার সেযুগের পোড়ামাটির নবান্ন উৎসবের একটি চালচিত্র । ওটা এখন সংরক্ষিত রয়েছে বেহালায় নতুন খোলা ওই রাজ্য সরকারের মিউজিয়ামে । এখন আমরাই হলফ করে বলতে এই পুরাতাত্ত্বিক খনন সফল হলে ‘গঙ্গারিডি’ তথা ‘প্রাচীন বঙ্গ ‘ থেকেই বাঙালি তার অতীতের সত্তাকে ঠিক একদিন খুঁজে পাবে । তখন ইতিহাসবিমুখতার দায় আর তাকে নিতে হবেনা ! “

এতদূর বলার পর প্রফেসার একটু জলের গ্লাসটা একটু হাত বাড়িয়ে চেয়ে নিলেন। আমরা প্রবল ঔৎসুক্য প্রকাশ করে ততোক্ষণে ওঁকে ঘিরে ধরেছি। জল খেয়ে তিনি আবার বলতে শুরু করলেন,
“দেখ, আজকে যদিও অনেকেই ভুলে গেছে যে ভারতবর্ষে এমনকি আলেকজান্ডারের আগমনের আগে পূর্ব থেকে পূর্বভারতে এক পরাক্রান্ত জাতি ও তাদের রাষ্ট্রের অবস্থানের কথা। গ্রিক ও রোমান সূত্রে জানা যায় তাঁরা এই রাষ্ট্রকেই গঙ্গারিদৈ বা গঙ্গারিডি নামে অভিহিত করেছে ! আলেকজান্ডারের সাথে আগত টলেমি ল্যাগাস তাঁর রচিত ‘লাইফ অব দি আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট’ নামক গ্রন্থে সর্বপ্রথম গঙ্গারিডি জাতির কথা উল্লেখ করেন । এমনকি এটার ব্যাপারে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের রাজত্বকালে আগত গ্রিক পর্যটক মেগাস্থিনিসের বিবরণ থেকেও জানা যায়।
কাজেই কিছু বইপত্র আর জনশ্রুতিকে নির্ভর করে আমরা চারজন ইতিহাস পিপাসু আর জনা দশেক কুলি নিয়ে জয়নগরের কাছে কিছু জায়গায় আবার নতুন উদ্যমে এক্সপিডিশন শুরু করলাম।
দিল্লীর মানবসম্পদ মন্ত্রালয় থেকে আমাদের এসব কাজের জন্য যাবতীয় এপ্রুভাল আর ফান্ড এ দুটোই তার আগে এসে গেছিল আর সঙ্গে তিনজন উৎসাহী সহকারীও। সত্যকাম রায়, ঘনশ্যাম বাগড়ী আর সেলিম খান এদের বিশেষ সহকারী হিসাবে পেয়ে আমিও খুব খুশি। ওরা তিনজনেই নালন্দা আর দেবগিরির কাজে সেবার যথেষ্ট মুন্সীয়ানা দেখিয়েছিল। ঘনশ্যাম আর সেলিম তো এর কিছুদিন আগে মধ্যপ্রদেশের বিদিশায় ছিল বলে একটা তৃতীয় শতকের বৌদ্ধদের ব্যবহৃত গুহাও ওরা এর আগে এক্সক্যাভেট করে অনেক কিছু আবিষ্কার করে এনেছিল। ওদের মধ্যে কেবল সত্যকাম এখনো কোন এক্সপিডিশন করেনি যদিও, তবে ওর কাজটাও আলাদা আর তা হল প্রাচীন লিপিগুলোর পাঠোদ্ধারে আমাকে সাহায্য করা।”

(২)
এখনো যদিও এর আসল গল্পটাই শুরু করেননি ভদ্রলোক তাও আমরা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে ওনার কথাগুলো একরকম গিলছিলাম বলা যায়। বাংলাদেশের ইতিহাসেও যে প্রাচীন ব্যাপারটা আছে তা কেউই এর আগে তেমন খেয়াল করেনি বলে এই ইতিহাসবিমুখতাকে বাঙালী অক্লেশে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে।
একটু থেমে একটুআগের সেই চেনা ছন্দে ওনার গল্পটা আবার শুরু হল,
” খনন করতে করতে একটা অদ্ভূত জিনিস পেলাম। ঠিক চিরাচরিত শিব লিঙ্গমূর্তি নয় বরং তাকে ঘিরে বসে আছে মাতৃকা মূর্তির মত কিছু নারীমূর্তি আর তারা সবাই উপাসনারত ভঙ্গিতে বসে আছে। তার নিচে বিচিত্র কিছু লিপি খোদাই করা আছে। এই হরফগুলো আগে দেখিনি। প্রাচীন গ্রীক আর সংস্কৃতের একটা গোঁজামিল ধাঁচ ওতে যে আছে সেটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে সন্দেহ নেই। ততোদিনে প্রাচীন বঙ্গের প্রত্নবস্তু কিছু অনুশীলন করে তখনকার আর্থসামাজিক অবস্থা, নৌবাণিজ্য, জীবনচর্চা, অবসর বিনোদন ও ধর্মীয় প্রকৃতির সংকেত চিনতে শিখে গেছি । বুঝলাম এই অগণিত বিচিত্র মাতৃকাকে এখানে যক্ষিনী নামে অভিহিত করা হলেও ক্ষতি নেই। এর থেকে যতটুকু বোঝা যায় তা হল এর ধর্ম জীবনের যে নির্যাসটাই। ওই যে লিঙ্গ মোটিফ , আর তার গাত্রদেশে উৎকীর্ণ সুবেশী সম্ভ্রান্ত নারী ও তার পাঁচজন সখী যাদের গোপনাঙ্গ স্বচ্ছ পোষাকের মধ্য থেকে প্রকাশিত তা বোধহয় সেকালের ধর্মীয় উপাচারের অঙ্গ বলেই মনে হল।আসলে তাদের ওই হাত ধরে নিত্য ভঙ্গিমায় থাকাটাই শৈব ও শাক্ত কাল্টের তন্ত্র ভাবনা এখানে উদ্ভাসিত বলেই মনে হচ্ছে।
এমনকি আমার সহযোগী ওই তরুণ ইতিহাসবিদরাও আমার সেই চিন্তাকে সমর্থন করে দু চারটে সহযোগী টেক্সট আর প্রত্নবস্তুর ছবি ওদের ট্যাব খুলে আমায় দেখালো। ওগুলো নাকি বিদ্যাধরী নদীর কাছে পাওয়া গেছিল মাস ছয়েক আগে। আমি ক্যাম্পের ঘরে গিয়ে আপাতত লিপিটাকে নিয়ে পড়ার চেষ্টা করলাম। সত্যকামও যে তার বিদ্যার মূল চর্চার রসদ পাওয়ায় আমার সাথেই ক্যাম্পে ফিরে এখন মগ্নই থাকবে।

এটাই যে সেদিনের সেরা আবিষ্কার তা সহজেই অনুমেয়। লিপিটা আমার সাথে সাথে ওদেরকেও একইভাবে বেশ উত্তেজিত করে তুলেছে।”

মহিম চাকলাদার এর মধ্যে আবার শর্টহ্যান্ড জানে বলে প্রফেসারের মুখ নিঃসৃত কথা শুনতে শুনতে ও বসে এতক্ষণে সবটাই নোট করে নিচ্ছিল। আর আমরা বাকীরা ওই আশ্চর্য ঘটনার বর্ণনায় মোহিত হয়ে একেবারে চুপ করে শুনছি। আবার এক রাউন্ড কফি আর তেলেভাজা ওঁর জন্য কালুদার চা -কফির দোকান থেকে হাজির করে আনলাম। আজ একটা অলৌকিক ঘোরের মধ্যে যেন আমরাও হাজার বছর আগে পিছিয়ে গেছি। শুনতে থাকলাম মন্ত্রমুগ্ধের আবেশে।

(৩)
উনি কফি আর একটা আলুর চপ তুলে আমাদের দিকে বাকীটা বাড়িয়ে দিলেন। আমরাও আমাদের জন্য মাটীর ভাঁড়ে চা আর ওই বাদবাকী চপে তৃপ্তির কামড় বসালাম। প্রফেসার তারপর কফিতে চুমুক দিতে দিতে আবার শুরু করলেন।

” সেদিনের মত ক্যাম্পে ফিরে এসে ব্যাটারীর আলো জ্বালিয়ে ওটাকে আর একবার ভালো করে দেখার সুযোগ হল। সত্যকাম অন্য দুজনের সাথে বরং ওদের ক্যাম্পে গিয়ে একটু শুয়ে বিশ্রাম নিয়ে একেবারে ডিনারের একটু আগে আসবে বলে চলে গেল। বুঝলাম অন্য দুজন মানে ঘনশ্যাম আর সেলিমেরও একটু রেস্ট নেওয়া দরকার। এ কাজে যথেষ্ট ধকল হয় তাছাড়া সবসময় কুলিদের কাজেও তদারকিও করতে হয়। তাই আমি ইচ্ছা করেই ওদের তিনজনকে ক্যাম্পে ফেরৎ যেতে বলে এবারে নিজেই লিপিটা নিয়ে একবার দেখতে বসলাম।এরকম আজব মূর্তি আর লিপি আগে একসাথে পাইনি বলে আমার নিজেরও একটু অবাক লাগছিল ঠিকই সেটা আর কাউকে বললাম না। আমার কাছে লন্ডনে থাকাকালীন উপহার পাওয়া সম্রাট আলেকজান্ডারের সময়কার গ্রীক লিপির অর্থ আর নমুনার ওপর একটা বই ছিল। ওটা আমার ওখানকারই এক বন্ধু মার্কিনী বংশোদ্ভূত পন্ডিত রজার জেরেমি সেলার্সের লেখা। এই কাজে নেমে এখন সেটাকেও পাশে এনে কোনো রেফেরেন্সের সুবিধার জন্য খুলে রাখলাম।

বাইরে তখন একটু ঠান্ডা ঠান্ডা জোলো হাওয়ার হঠাৎ আমদানী হচ্ছে। অথচ আকাশে মেঘ টেঘ নেই বললেই চলে। কাজেই সব কিছু ছেড়ে ম্যাগনিফায়িং গ্লাসের নীচে লেখাটাকে দেখতে লাগলাম। হঠাৎ দূরে শুনতে পেলাম একটা সম্মিলিত অস্পষ্ট আওয়াজ। সঙ্গে সঙ্গে বাইরে এসে যা দেখলাম তাকে এক কথায় অকল্পনীয় বলা যায়।”

প্রফেসার আবার একটু থামলেন। বুঝলাম উনি সেদিন এমন কিছু দেখেছিলেন যেটা ওঁকে আজও একইরকমভাবে আবিষ্ট করে রেখেছে। একটু পরে এর বাকীটা আবার আরম্ভ করলেন। আমরা যেন ততোক্ষণে ওঁর সাথে ওখানেই চলে গেছি !
এটা যেন নিছক গল্প নয়!আজগুবি কোন গল্প হতে পারেনা!

আবার প্রফেসার সোম উদ্যম নিয়ে বলতে শুরু করলেন, ” আসলে এই কয়েকদিনের খননে আমরা অনেক পটারি, স্প্রিংলার, মেষ-হাতি-ঘোড়া -মানুষ এসব বাহিত খেলনা গাড়ি , নীতিগল্প সমন্বিত পোড়ামাটির ফলক ,প্রেমালাপ সমন্বিত ফলক, বিশেষ বেশ ভুষায় নারী ও পুরুষ মূর্তি, হাতির দাঁত ও হাড়ের শিল্পবস্তু সহ অপরিমিত বিচিত্র প্রত্নবস্তু অনেককিছুই পেয়েছিলাম। কিন্তু এইটার মতো কোনওটাই যেন দূর্বোধ্যের হদিশ নিয়ে সামনে আসেনি। এই বস্তুটাই যেন বোধের ওপারে এক অলীক জগতের কথা বলছিল। এর লিপিটাও ঠিক গ্রীক বা সংস্কৃত নয়।
হঠাৎ গোলমাল কানে আসতে তো বাইরে এলাম। কি আশ্চর্য! বাইরেটা কোন জাদুতে হঠাৎ বদলে গেছে যেন। এমনকি পাশে ওদের ক্যাম্পটাও হাওয়া!
একটা নদীর ধারে অগুন্তি নানাবয়সী লোক আমি তাদের আমি চিনিনা মোটেও! দেখি ঢাক ঢোলের মত কিছু বাদ্য সজোরে বাজাচ্ছে। এরপর দেখলাম কয়েকজন মিলে একটা বছর বারোর বাচ্চা মেয়েকে ডুলিতে চাপিয়ে সবাই ধরে আনছে। এদিকে আবার বিশাল বড় ঢেঁকীর মত জিনিসকে কাপড় পড়িয়ে দেবতার মতো করে পূজো করছে পাঁচজন অর্ধনগ্ন মহিলা। তারা এই মেয়েটাকে ওখানে ধরে নিয়ে গেল। তারপর দেখলাম ওর কাছেই বোধহয় চিতার মতো কিছু একটা জ্বলছিল। আর মেয়েটাকে ওই আগুনে জোর করে ফেলে দেওয়া হল। সে যন্ত্রণায় বিকট চিৎকার করে কাঁদতে লাগল। বাকী ওই মহিলারা হাতার মত একটা হাড়ের তৈরী চামচে করে ঘি ঢেলে আগুনটাকে বাড়িয়ে দিচ্ছিল। চতুর্দিকে প্রবল শোরগোল আর নারীপুরুষের জটলা। তারমধ্যেই ওরা মেয়েটাকে ওই আগুনে একেবারে পুড়িয়ে ফেলল। তারপর সেই দেহাবশেষের ভস্মমেখে বাকী মহিলারা ওই কাপড়জড়ানো ঢেঁকীটাকে বারবার প্রণাম করতে লাগল আর তার সাথে লাল রঙের একটা তরলে চুমুক দিতে লাগল।
ততোক্ষণে আমার গলা শুকিয়ে একেবারে কাঠ হয়ে গেছে। এমনকি বাকী ছেলেগুলোকেও ডাকার ক্ষমতা হারিয়ে আমি মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার আগে শুনতে পেলাম ওই মেয়েগুলো ওদের গলায় সমস্বরে শুদ্ধ সংস্কৃতে গানের মত সুর করে গাইছে,
‘ ন মৃত্যুর্ন শঙ্কা ন মে জাতিভেদঃ
পিতা নৈব মে নৈব মাতা ন জন্ম।
ন বন্ধু্র্ন মিত্রং গুরুর্নৈব শিষ্য-শ্চিদানন্দরূপঃ শিবোহং শিবোহম্।
অহং নির্বিকল্পো নিরাকাররূপো
বিভুত্বাচ্চ সর্বত্র সর্বেন্দ্রিয়াণাম্।
ন চাসঙ্গতং নৈব মুক্তির্ন মেয়-শ্চিদানন্দরূপঃ
শিবোহং শিবোহম্ ।।’

তারপর ওই দৃশ্য দেখতে দেখতে আমার নিজের চোখে সব যেন আস্তে আস্তে অন্ধকার হয়ে আসছিল। আর কিছুই মনে নেই তারপর।
তার অনেক পরে কি আশ্চর্য ! চোখ খুলে দেখি ডিনারের প্লেট হাতে করে নিয়ে সেলিম, ঘনশ্যাম আর সত্যকাম আমায় অনেকক্ষণ থেকে ডাকছে। আর আমি আমার ক্যাম্প খাটেই কখন যেন শুয়ে পড়েছি। কি করে যে এখানে এলাম তাও জানিনা। আমি তো বাইরে বেড়িয়েছিলাম সেটা স্পষ্টই মনে আছে।

টেবিলের ওপর আমার বইটা দেখছি এখনো খোলা খালি ওই মূর্তিটাই নেই। তার বদলে একগোছা টাটকা জবাফুল বইটার ওপরে কে যেন রেখে গেছে।

সত্যকাম পরে স্টাডি করবে বলে ওই মূর্তিটা আর লিপিটার একটা ছবি ট্যাবলেটে তুলে রেখেছিল। এমনকি সেটাও কে যেন এসে হঠাৎ মুছে দিয়েছে। কেবল ওর জায়গায় প্রাকৃত ভাষায় যে কথাটা স্পষ্ট লেখা সে লিপি আমরা সবাই চিনি। ওখানে গোটাগোটা অক্ষরে লেখা আছে ‘ ইতি – নির্বাণ তন্ত্রম ‘ ! “
*********************

বিশেষ কৃতজ্ঞতা স্বীকার –
১। দেবীশঙ্কর মিদ্যা রচিত “গঙ্গারিডি রাষ্ট্রের সন্ধানে” প্রবন্ধ।
২। বন্ধুপ্রতীম মাননীয়া অস্মিতা রায় ও রূপদক্ষ গ্রুপের সভ্যবৃন্দ সকলে।

সৌমেন দেবনাথ <img class="alignnone wp-image-6202" src="https://www.lipimagazine.com/lipicontent/uploads/2021/07/Verification-Badge-4.svg" alt="" width="17" height="17" />

সৌমেন দেবনাথ

বাংলাদেশ

বরফ না গলা নদী (ছোটোগল্প)

সত্য ভালোবাসাগুলো কেনো জানি এক তরফা হয়। একপাশ থেকে একজন ভালোবেসে যায়। অন্যজন টের পেলেও গ্রাহ্য করে না। রক্তিম চোখের কোণ বেয়ে নোনা জল ঝরে তুলির৷ তা দেখে তেঁতে উঠে তমাল। বললো, আমি তোমায় কোন সাগরে ফেলেছি যে তোমার চোখে এত পানি আসে! আমি তোমায় কোন আগুনে ফেলেছি যে এত জ্বলে জ্বলে অঙ্গার হচ্ছো!

এভাবে আরো কিছু কটাক্ষ কথা বলে তমাল বাজারে চলে গেলো। তিন্নী কল করলে তুলি তার বর্তমান অবস্থা বললো। শুনে তিন্নি বললো, বিপরীত মেরুর মানুষের সাথে মিলন হয় না। ভুল মানুষকে ভালোবাসার চেয়ে স্বাধীন থাকা শান্তিকর।

তুলি বললো, আমার সময় কাটে না। বেঁচে থাকাটা আমার জন্য বিষ হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

তিন্নি বললো, প্রেমে পড়লে হাজার বছর বাঁচতে ইচ্ছে হয় আর প্রেমে ব্যর্থ হলে এক মুহূর্তও বাঁচতে ইচ্ছে করে না। মনের মানুষকে দূরের মনে হলে মনে শান্তি থাকে না। ধৈর্য আর সহ্য এই দুইটা একটু করে দেখ্।

এভাবে ওদের দুই বান্ধবীর মধ্যে কথা হতে থাকে। পৃথিবীতে কেউ কেউ এত ভাগ্যবান যে ভালোবাসার মানুষকে কষ্ট দিয়েও ভালোবাসা পায় আর কেউ কেউ এতটা হতভাগা যে প্রবল ভালোবাসা দিয়েও কেবল কষ্ট পায়।

তাহেরা বানু বৌমার নিষ্প্রভতা লক্ষ্য করেন। একদিন বললেন, গোমড়ামুখো বৌ ঘরে এনেছি। এমন মুখপোড়া বৌ ঘরে থাকলে আয় বরকত কী থাকে? 

তালেব সাহেব বললেন, সৌভাগ্যশশীর দেখা কৃষ্ণকালো কপালে কখনো জোটে না।

ঘরের দরজা দিয়ে চোখের জলের বাঁধ ছেড়ে দেয় তুলি। প্রেম করে বিয়ে করেছে। বাবা মায়ের সায় ছিলো না। সময়ের সাথে মানুষের মন এত পরিবর্তন হয় তুলি জানতো না। ঘরে তমাল নিজের মত ব্যস্ত। তুলি বললো, আমি অনেক স্বপ্ন দেখতাম, ভেঙেও যেত। কষ্ট পেতাম না। কিন্তু তুমি যে স্বপ্ন দেখিয়েছো তা ভেঙে গেলে আমি বাঁচবো না। আশা আকাঙ্ক্ষায় ক্ষত চিহ্ন এঁকে দিও না।

তমাল ফুটন্ত খইয়ের মত লাফিয়ে উঠে বললো, সুউচ্চ স্বপ্ন না দেখা ভালো। সুউচ্চ স্বপ্ন ফিকে হয়ে যায়। কানের কাছে এত ঘ্যানর ঘ্যানর ভালো লাগে না। নিজে বাঁচি না নিজের জ্বালায়, ঘরে জ্বালা, বাইরে জ্বালা, এত জ্বালা ভালো লাগে না।

তুলি ভাবলো, ওর মনে হয় অসময় যাচ্ছে। কাছে সরে এসে বললো, তোমার কি হয়েছে বলো। আমরা তো শফথ করেছিলাম, সুখ দুঃখ ভাগাভাগি করে নিয়ে বসবাস করবো।

তমাল কেঁকিয়ে বললো, সুখ দুঃখ ভাগ করে নেবে? সুখের কি বোঝ! দুঃখই তো বাড়াতে জানো। ঘরময় একটা অস্বস্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি করে আছো। ব্যবসায়ে ধরা খেয়েছি। আমার টাকা দরকার।

তুলির মুখটা শুকিয়ে গেলো। বাবা মা বিবাহ মেনে নেয়নি। বিবাহের পর একদিনও বাবা মায়ের মুখও দেখতে পারেনি। কোন মুখে সে বাবা মার কাছে যাবে টাকা আনতে, কিভাবে যাবে?

অনেক সাহস করে মাকে কল দিলো তুলি। মা তৃষ্ণা বানু মেয়ের কল পেয়ে বেজায় খুশি। তুলি তমালের সম্বন্ধে বললো, মা শুনলেন। তমাল তাঁর মেয়েকে যে যত্নে রাখবে ভেবেছিলেন সে যত্নে রাখেনি। মা তবুও মেয়েকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, ছেলে মানুষ এমনি। মেয়েদের নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত গুরুত্ব দেয়। তোর বাবা তো ডাকাত ছিলো। আমাকে উঠিয়ে এনে বিয়ে করেছিলো। সব জানিস। তাই বলে কী আমি তোর বাবার সংসার করিনি? মাটি কামড়ে থাক। একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।

তুলি মাকে টাকার কথা বলতে পারলো না। ঘরে চুপ করে বসে থাকলো। তাহেরা বানু এসে বললেন, কাজ কী কিছু জানো? না, কাজ করতে কষ্ট হয়? ঘরের বৌয়ের কাজ কী বলো তো?

তুলি কাজে গেলো। কাজে ওর মন বসে না। মনে শান্তি না থাকলে কাজে কী মন বসে? ঘরে এসে অতীত দিনের ছবিগুলো ও দেখতে লাগলো, বললো, তুমি আছো আয়ত্ত দূরে, তুমি আমার আয়ত্তের মধ্যে নেই।

তমালের বন্ধু তরুণ তমাল তুলির প্রেমে অনেক সাহায্য করতো। আজ দেখতে এসেছে, তুলি বললো, আপনার বন্ধু সময়ের সাথে সাথে চেঞ্জ হয়ে গেছে। এখন সে আমায় নাস্তানাবুদ করে সুখ পায়। আমাকে কাঁদিয়ে আনন্দের নৈবেদ্য খায়। আমার অন্তরের চিৎকার ধ্বনি ও শুনতে পায় না। আমার আর্তস্বরে ওর হৃদয় বিদীর্ণ হয় না। ওর পাষণ্ডতার কারণে ও পৃথিবীতে কীর্তিমান হবে। 

তরুণ বললো, ভাবী, আমি অধমটাকে বোঝাবো।

তরুণ তমালকে ধরলো, বললো, হৃদয়ের কাছাকাছির মানুষগুলোকে ভুলতে নেই, ভুলে থাকার চেষ্টা করতে নেই। ভুল বুঝতে নেই, কষ্ট দিতে নেই।

তমাল বললো, কোনটা ভালো কোনটা মন্দ সে সংগা তোর কাছ থেকে শিখতে হবে?

তরুণ বললো, তোর হৃদয়টা অনেক বড় ছিলো। আমি জানতাম না তোর হৃদয় একটা লোহা, দু দিনেই মরীচা ধরবে।

তমাল বললো, জ্ঞান দিতে চাস তো বিদ্যাপীঠে যা। জ্ঞানের কথা অজ্ঞানদের বল্। জ্ঞানবৃক্ষের ফল খেতে খেতে এখন আমার বিষবমি হয়।

তরুণ বললো, ভাবীর চোখে পানি। এক ফোঁটা চোখের জল হৃদয় ফেঁটে বের হয়। যাকে একটা সুন্দর জীবন দিতে পারবি না, তাকে তোর স্বপ্ন দেখানো উচিত হয়নি।

তমাল প্রচণ্ড রেগে তরুণের সাথে সম্পর্ক নষ্ট করে বাড়ি এলো, তুলিকে ধরলো, তোমায় উকিল ধরতে বলেছে কে?

তুলি স্বামীর ক্রোধাগ্নি দেখে কিছুক্ষণ চুপ থেকে পরে বললো, তরুণ ভাই কল করে বললেন তুমি তাঁকে নাকি কষ্ট দিয়েছো? নতুন নতুন বন্ধু করো, ভালো। কিন্তু পুরাতনকেও রেখো। নতুন হলো সীসা আর পুরাতন হলো সোনা।

তমাল বললো, কোনো কথা বলবে না এ বিষয়ে। এত জ্ঞানগর্ভ কথা বাদ দিয়ে সামনে থেকে যাও। জ্ঞানের কথা শুনলে বমি আসে। বাস্তবতা খুব কঠিন। আমাকে একা থাকতে দাও।

তুলি চুপ থাকে আর আশ্চর্য হয়। যে মানুষটা তাকে এত ভালোবাসতো, এত স্বপ্ন দেখাতো, এত আশা জাগাতো সেই মানুষটি এখন কত বদলে গেছে। মানবিক বৃত্তিগুলো সময়ের বিবর্তনে পাশবিক বৃত্তি হয়ে গেছে। নির্বাক চিত্তে স্বামীর দিকে চেয়ে থাকে। যার চেতনা চৈতন্যের গভীরে যে ছিলো তাকে আজ সহ্যই হয় না।

পরদিন তিন্নিকে ফোন দিলো, তিন্নি, বাবা মাকে কষ্ট দিয়ে নিজের মত-পছন্দকে আমার প্রাধান্য দেয়া ঠিক হয়নি। আমি তাদের মনে আঘাত করেছি। 

তিন্নি বললো, বাবা মাকে কষ্ট দিয়ে পৃথিবীতে কেউ কোনো দিন সুখী হতে পারেনি, সুখী হতে পারে না।

তুলি বললো, তমালের ব্যবসায়ে ক্ষতি   হয়েছে। আমায় কিছু টাকা দিবি? আমায় সাহায্য করার কেউ নেইরে।

তিন্নি বললো, সম্পর্কের মধ্যে টাকা চলে এলে সেটা আর সম্পর্ক থাকে না। আর টাকা দিয়ে সম্পর্ক কখনো টিকিয়ে রাখা যায় না। টাকা দিয়ে অট্টালিকা করা যায়, হৃদয় জয় করা যায় না।

তিন্নি কিছু টাকা দিতে সম্মত হলো। এরপর সে তুষিকে ফোন দিলো, বললো, দুর্ভোগে আছি, দুর্দিন যাচ্ছে। আমায় কিছু টাকা দিবি বন্ধু? দুর্যোগ থেকে বাঁচা!

তুষি বললো, তোর লোভী আর জ্ঞানপাপী স্বামীর কথা তিন্নির কাছ থেকে শুনেছি। আসলে বড়দের আশীর্বাদ ধন্য না হয়ে কাজ করলে ফল কখনো অনুকূলে আসে ন। তোর স্বামী স্বার্থাণ্বেষী, সভ্য শয়তান।

তুষিও কিছু টাকা দিতে রাজী হলো। দুই বান্ধবীর কাছ থেকে টাকা এনে তমালকে দিলো। তমাল টাকা দেখে থমকে গেলো। তুলির চোখের দিকে বেশক্ষণ চেয়ে থাকলো। তারপর স্বভাব সুলভ ভঙ্গিতে বললো, সাংঘাতিক সৌন্দর্য দিয়ে নজর ভরে, পকেট ভরে না। ভালোবাসায় মন ভোলে, ভাগ্য বদলাতে চায় টাকা। ভালোবাসা ভালোবাসা করো, ভালোবাসায় ভাসো, কিন্তু টাকায় সব। টাকা থাকলে ভালোবাসা থাকে, টাকা থাকলে অদৃষ্ট বদলায়।

তুলি বললো, অদৃষ্ট টাকাতে বদলায় না, অদৃষ্ট বদলাতে আশীর্বাদ লাগে, ভালোবাসা লাগে। আর অধিক সম্পদের লোভে যারা হন্যে হয়ে ছোটে তারা মানসিক রোগী হয়। অল্পতে তৃপ্ত অল্পজনই থাকতে জানে।

তমাল তুলির এসব কথা শুনে ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলো। তা দেখে তুলি বললো, অন্তঃপুরেই তোমার কেবল আধিপত্য। আর বাইরের জগতে লেজ গুটানো কুকুর। মানুষ নামের কলঙ্ক। মুখোশ আটা শয়তান। আমার দু কূল ডুবিয়ে, আমায় নিয়ে ছিনিমিনি খেলে বীরত্ব দেখায়। সুখ, স্বপ্ন, সাধনার সাথে পুরুষত্ব দেখানো কাপুরুষতা। প্রতিটি পাপী প্রাণ পৃথিবীতে পাপের পরিপূর্ণ দণ্ড পাবে।

তমাল ওদিন তুলিকে মারতে উদ্যত হলেও থেমে যায়। তুলি কাঁদতে চেয়েও কাঁদলো না। ঊষর ভূমে কান্না করে লাভ কী! ও কাঁদতে ভুলে গেছে। ও জেনে গেছে চোখের জলের মূল্য অনেকে দিতে জানে না। ওদিন রাতে তমাল বাড়ি আসেনি। তুলি তমালের শার্ট প্যান্ট লুঙ্গি বুকে জড়িয়ে রাত জেগে কাটিয়ে দিলো। এতে যে ও তমালের শরীরের গন্ধ পায়, তমালের অস্তিত্ব অনুভব করে।

তারেক তমাল তুলির সব কথা জানে।  তরুণও তারেককে সব বলেছে। একসাথে বড় হয়েছে। একের দুর্দিনে অন্যজন তাই ছুটে আসে। সব ঋতুর কোকিল যারা তারা বসন্তের কোকিল হয় না। প্রকৃত বন্ধুজন দুর্দিনেও দু হাত বাড়িয়ে দেয়। তমালকে বললো, হাজার হাজার টাকা, সোনার গহনা, জামা-কাপড়, বিলাস সামগ্রী দিয়েও বর্তমান সমাজে স্বামী সমাজ একটু ভালোবাসা পায় না। সময় সুযোগ পেলেই পরপুরুষকে সময় দেয়। আর তুলি ভাবীর মত নির্ভেজাল, নিষ্পাপ, নির্লোভী ভালোবাসার মানুষটাকে কষ্ট দিস? ও ভালোবাসা ছাড়া তোর কাছে আর কিছু কী চেয়েছে?

তমাল বললো, আমি যে ওকে কষ্ট দিই তোকে বলে কে? আমার কাজ নেই? বিয়ে কর বুঝবি জীবন কী! সারাদিন ওর আঁচল ধরে বসে থাকবো? ও চায় ওর সাথে সারাদিন খুঁনসুটি করি, বসে বসে প্রেমালাপ করি, ওকে নিয়ে এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াই। ও বাস্তবতা  মানতে চায় না। ওকে সময় দেয়ার সময়টুকু আমার নেই। দশটা টাকা যারা ইনকাম করে প্রেমালাপ তারা ভুলে যায়। ও ওর সব বন্ধুদের, আমার সব বন্ধুদের মাঝে আমার সম্বন্ধে দুর্নাম ছড়াচ্ছে। ওকি সত্যিই আমায় ভালোবাসে, না আমার কাছ থেকে ও চলে যেতে চায়? আমি তো প্যান্ট-শার্ট পরে ওর সাথে দেখা করতে যেতাম, এখন বাসায় লুঙ্গি পরে থাকি, আমাকে কী ওর আর ভালো লাগে?

তমালের কথায় তারেক আশ্চর্য হয়। তমাল বাড়ি চলে এলো। তুলি ঘরে বসে আছে। তমাল বললো, তুমি সংসার করার তাগিদে বিবাহ করেছো? না, বিনোদনের জন্য বিবাহ করেছো? সংসারের কোন কাজটা তুমি করো?

তুলিও কম বলে না, বললো,  আমার সংসারের কাজ আমি করবো, আমার সংসারকে স্বর্গ করে তুলবো সে স্বপ্ন আমার ছিলো। আমার কথা হলো রাজরানী করবে বলে যাকে কথা দিয়েছিলে সে আজ তোমার কাছে  দাসী অপেক্ষা অছ্যুৎ কেনো? ভালোবাসার উল্টো পিঠে ঘৃণা থাকে। প্রবল ঘৃণা। তুমি ঘৃণা প্রাপ্তিরও যোগ্য না। বাঁকা সমবেদনা পেলে সোজা হয়, সোজা আঘাতে বাঁকলে সোজা হয় না।

পাড়া প্রতিবেশীরাও ওদের আদায় কাঁচকলায় সম্পর্ক প্রত্যক্ষ করেন। তুরাবের মা বললেন, খালি আঁচলে গিরা আটে? লক্ষ লক্ষ টাকা যৌতুক দিয়ে তাই শ্বশুর-শাশুড়ীর মন পাওয়া যায় না।

তৌহিদের মা বললেন, শিক্ষিতা বৌমা, চাকরিজীবী তো না। পায়ের উপর পা তুলে সাজগোজ করে। বাড়ির কুটো কেটে দুটো করে না। তাহেরা ভাবীর কপালে এই জঞ্জাল ছিলো? হুরপরী দিয়ে কী হবে অকর্মের হলে! কাজের হলে কালো চলে; সুন্দরী যদি কুলক্ষণে হয় সেই সুন্দরী দিয়ে কী হয়?

এমন গুঞ্জণ সারা গ্রামে রটে গেলো। তুলি কান ঢেকে থাকে, চোখ বুঝে থাকে। তিন্নিকে কল দিলো, তিন্নি বললো, নারীর কোনো নিজের ঘর নেই। অন্যরা যদি আপন করে নেয় তবেই সে মাথা গোজার ঠাঁই পায়। যাওয়ার কোনো জায়গা না থাকলে আমার কাছে চলে আয়। আমার সাথে কাজ করবি। তোর অন্নের অভাব হবে না। তমালের আশায় ঘর ছেড়েছিলি, ঘর পাসনি। আমার কথায় ঘর ছাড়, তোর ঘর হবে, টাকা হবে। স্বয়ংসম্পূর্ণা হবি। স্বয়ংসম্পূর্ণা হলে অন্যের আশায় চেয়ে থাকতে হবে না। অর্থহীন জীবন অর্থহীন। 

তুলি তিন্নির কথাগুলো মন দিয়ে শুনলো। কিন্তু ওর মন সায় দিলো না। বেশ রাতে তমাল এলো। তুলি বললো, রাত-বিরাত বাইরে থাকো কেনো? বিপদ-আপদ বলে আসে না। খবরদার রাতে বাইরে থাকবে না।

তমাল বললো, আমি কারো খবরদারী পরোয়া করি না। আমার ভালো-মন্দে নাক না গলালে খুশি হবো। অনর্থক গাল বাড়ায়ে দিলে চড় খাবে। অনধিকার চর্চা আমি পছন্দ করি না। সহ্য করি না।

তুলি আশ্চর্য হয়। কোনো কথা বাড়ালো না ও। 

ঘুম থেকে উঠে তমাল দেখলো তুলি নেই। তমালের ভয় ধরে গেলো, গেলো কোথায় ও! মাকে বিষয়টি বললো, তাহেরা বানু শুনে বললেন, হতভাগা যাবে আর কই? যাওয়ার কোনো জায়গা আছে কী ওর?

তালেব সাহেব বললেন, পাপ বিদায় নিয়েছে। পথের পতঙ্গ পথে ফিরে গেছে। পথের উচ্ছিষ্ট কুঁড়িয়ে খাওয়া পতঙ্গ সংসারে মন বসাতে পারে না।

তমাল চিন্তিত হলো। ভাবলো, ওর স্বপ্নগুলোকে ছিনতাই করে ওকে বাঁচার আশা শেষ করে দিয়েছি। যার যাওয়ার কোনো গন্তব্য নেই সে গেলো কোথায়? আমার তুলি পথে পথে পাগলের মত ঘুরবে?

তমাল পরিচিত সবার কাছে কল দিলো। কোথাও সে যায়নি। তাশদিদের মা বললেন, দেখ্ আবার কার হাত ধরে পালালো? এমন রূপবানের কী রহিমের অভাব হয়?

তমাল বললো, কাকী, টিপ্পনি কাটা আপনার কাজ না। আপনি আমার শ্রদ্ধেয়জন।

তপুর মা বললেন, বিষ খেলো, না নদীতে ঝাঁপ দিলো দেখ্।

তমাল তুলির খোঁজে বের হয়ে গেলো। তালহা যাচ্ছিলো। তার কাছে জিজ্ঞাসা করতেই সে বললো, বৌ ঘর থেকে পালায়! কেমন পুরুষরে তুই?

তমাল তালহার কথায় কর্ণপাত না করে তিন্নিকে কল দিলো। তিন্নি বললো, কাউকে জীবন দিতে না পারলে স্বপ্ন দেখাতে নেই। মনের মাঝে প্রতারণার বীজ থাকলে সে পশু বৈ কিছু নয়। এমন একটা মানুষ যে কেবল ভালোবাসার ভিখারিনী ছিলো। তাকে যেমন ইচ্ছা তেমন করে কষ্ট দিয়েছেন। একটা নারী কখন তার স্বর্গ সংসার ছাড়ে? মানবিক বৃত্তি মনের মাঝে না থাকলে সে ব্যক্তি মানুষ না, অমানুষ। অমানুষ সবার ঘৃণার পাত্র। মনের মধ্যে ব্যাধির বাস, স্বপ্নচাষ তারা জানে না।

তমাল তুষিকে কল দিলো, তুষি বললো, মরিচা ধরা মনটাকে ঘষামাজা করেন। ভালোবাসা ঠুনকো নয়। ভালোবাসা নেহাতই তাসের ঘর নয়। আত্মার বন্ধন কেবল কল্পনাবিলাস নয়। এবার তো আপনি পরিপূর্ণ পরিতৃপ্তি পাচ্ছেন! তাপিত তৃষ্ণার্ত হৃদয় তৃপ্ত হলো! পথের কাটা সরে গেছে, আবার বিবাহ করেন। স্বপ্ন ভাঙায় যাদের কাজ তাদের আবার হৃদয়! স্বপ্নবতী মানুষটার স্বপ্ন ভেঙে চুরে শেষ করে দিয়েছেন। রূপবতী অনেক পাবেন, তুলির মত হৃদয়বতী আর পাবেন না। জুহুরীর চোখ না থাকলে সোনাকে সবাই তামা জ্ঞান করে ফেলে দেয়। আর শেষে আফসোসই সম্বল হয়।

তমাল আশাহত হলো। তরুণ আর তারেককে জানালো না। তুহিনকে বললো। বাসস্টান্ডে ওদের বাসা। যেতে দেখেছে কিনা তাই জিজ্ঞাসা করলো। তুহিন মশকরা করলো। বললো, রিক্সাওয়ালাদের বৌ ঘর ছাড়ে না, তোর বৌ ঘর ছাড়ে কেন? সাজগোজ পোশাক আশাকে কী বাজখাই তৃষ্ণা মেটে?

তমাল তুহিনের কল কেটে দিলো। বাবা মায়ের কাছে গেলো না তো! শ্বশুর-শাশুড়ী এমনিতেই রেগে আছেন। আর এই মুহূর্তে গেলে ওর তো ঠ্যাং ভেঙে দেবেন। একটি বার তুলি কল রিসিভ করছে না। অনেকগুলো মেসেজ লিখলো। কোনো উত্তর এলো না।

এভাবে বেশ কদিন চলে গেলো। তরুণ আর তারেকও জেনে গেলো। ওরা দুজন তুলিদের বাড়ি গেলো। তুলির বাবা তাসকিন সাহেব তরুণ আর তারেককে ভেতরে যেতে দিলেন না। বললেন, তোমরা সবাই মিলে আমার মেয়ের জীবনটাকে শেষ করে দিলে। আমার স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করেছো। তোমাদের পুলিশে দেবো।

তরুণ বললো, প্রথম ভুলটা ভুল ছিলো। কিন্তু পরের ভুলগুলো ভুল নয়। আপনি বিবাহটা মেনে নিলে ঘটনা এত দূর গড়াতো না। পারিবারিক মতভেদ ওদের সম্পর্কে প্রভাব ফেলেছে।

তাসকিন সাহেব রেগে গেলেন। তরুণ আর তারেক সেখানে আর থাকতে পারলো না। তমালকে কল দিলো, তোর বৌ তোর শ্বশুরবাড়ি।

তমাল এতক্ষণে স্বস্তিশ্বাস ফেললো। আর ভাবলো, দু দিন গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে। রাগ চলে গেলে চলে আসবে।

তমাল নির্ভার হয়ে বাজারে গেলো। কিন্তু সব সময় তুলিকে অনুভব করে। দু দশ মিনিট পরপর কল দিতো। এখন আর প্রিয় নম্বরটি থেকে কল আসে না। ওর জন্য অপেক্ষা করতো, এখন কেউ অপেক্ষা করে না। ঘরটাও কেমন শূন্য শূন্য লাগে। অস্থিরতা কাজ করে। ঘর-বাড়ি, উঠোন-বারান্দা সবখানে তার অস্তিত্ব অনুভব করে। কল করলে কল রিসিভ হয় না। কাছে থাকতে কদর করেনি, দূরে গেলে এত দরদ ওর প্রতি কোথা থেকে এলো?

তমাল তুলিকে আনতে যাবে। তালেব সাহেব বাঁধা দিলেন, দরকার নেই যাবার। আপদ গেছে। ও মেয়ের সংসার করার কোনো জ্ঞানই নেই। স্বামী, সংসার, আমরা তার কাছে তুচ্ছ।

তমাল কিছু বললো না। তাহেরা বানু এসে বললেন, যে থাকতে চায় না তাকে আনার দরকার নেই। এ ক মাসে তো বৌমার রূপ চিনেছি। যে তার পথ চিনে নিতে জানে তাকে আর ফিরিয়ে লাভ নেই।

তমাল নিজে নিজে মূর্ছা যায়। এ পরিবারে তিনটা মানুষের আনুকল্য তুলি পায়নি। নিজেই নিজেকে অপরাধী করতে থাকে। তাহেরা বানু কর্কশ আওয়াজে বললেন, দোকানে যা, ব্যবসায়ে মনোনিবেশ দে।

তমাল বাইরের উদ্দেশ্যে বের হলো। কিন্তু যে ব্যবসায় তার কাছে মূখ্য ছিলো, তা তার কাছে গৌণ বোধ হচ্ছে। আর যাকে গৌণ জ্ঞানে ফেলে রেখেছিলো তাকেই বারবার মনে পড়ছে। সে সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেললো শ্বশুরালয়ে যাবে।

তমালকে দেখামাত্রই তুলি মায়ের বুকে মুখ লুকালো। তাসকিন সাহেব তমালকে দেখামাত্রই দু গালে দু থাপ্পড় মেরে দূর হয়ে যেতে বললেন। তমালের নজর শ্বশুরের দিকে না যেয়ে তুলির দিকেই পড়ে আছে। তুলি  ফুপিয়ে কেঁদে বললো, লোকটিকে চলে যেতে বলো মা, খুব হিংস্র ও, ওকে দেখলেই আমি ভয় পাচ্ছি৷ দৃশ্যত ওকে চেনা যায় না, ও মুখোশ আটা। 

তমাল অপরাধের সুরে বললো, আমি তোমাকে নিতে আসিনি, আমি তোমাকে দেখতে এসেছি। তোমার প্রতি দাবি নেই আবার, তোমার প্রতি অধিকার হারিয়ে ফেলেছি আমি। আমি নিজেকে নির্দোষ দাবি করিনি, আমি তোমার চোখে না সবার চোখেই  অপরাধী। তুমি ছাড়া প্রিয় কেউ নেই তবুও তোমাকেই অসহায়ের মত করে রেখেছিলাম। কিন্তু আমার ব্যস্ততা, তোমার প্রতি আমার উদাসীনতা, আমার পরিবারের অবহেলা তোমার সংসার ছাড়ার কারণ হবে কেনো? তোমার ব্যর্থতা তোমার সহ্য ছিলো না, তোমার ব্যর্থতা তোমার ধৈর্য ছিলো না, তোমার ব্যর্থতা তোমার মহাশ্বৈর্য দিয়ে সবাইকে আগলে নাওনি।

তুলি মুখ তুলে চেয়ে বললো, প্রহার সহ্য করা যায়, অগণ্যতা সহ্য করা যায় না, অপেক্ষা সহ্য করা যায়, অবমূল্যায়ন সহ্য করা যায় না, অভিমান সহ্য করা যায়, অবহেলা সহ্য করা যায় না, ব্যস্ততায় সৃষ্ট শূন্যতা সহ্য করা যায়, উদাসীনতা সহ্য করা যায় না। তোমাকে ভরসার অন্য নাম ভেবেছিলাম কিন্তু হয়েছো দুরাশার অন্য নাম।

তাসকিন সাহেব গর্জে উঠে বললেন, যাবি হারামি?

এ কথা বলেই তিনি পুলিশে খবর দিলেন। তৃষ্ণা তমালকে অনুরোধ করে বললেন, বাবা, তুমি চলে যাও। পুলিশ এলে ধরে নিয়ে যাবে।

তমাল তবুও গেলো না। জলচোখে বললো, মা, তুলিকে বিয়ে করার পর আমি জলন্ত লাভার মাঝে পড়ি। দিনরাত পরিশ্রম করি। আমাকে সাহায্য করার একটা মানুষও ছিলো না। আমাকে পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করবে এমনও কেউ পাশে ছিলো না। আমি ব্যবসায়ে ধরা খেয়েছি। তুলি আমার জন্য ধার-দেনা করেছে। আমি ভাবতেই পারিনি সেই তুলি আমার পাশ থেকে সরে যাবে।

পুলিশ এসে তমালকে ধরলেন। বড় অফিসার দাঁত সিটকিয়ে বললেন, নারী নির্যাতন? চল্।

পুলিশ তমালকে টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছে। তমাল কোনো এক আশায় পিছে চেয়ে আছে, আর ভেবেছে হয়ত তার ভালোবাসার মানুষটা সব ভুলে বাঁধা দেবে। কিন্তু তুলি তা করলো না। শুধু শাশুড়ি মা তমালের চরম পরিণতি দেখে দু ফুঁটা চোখের জল ফেললেন।

বদরুদ্দোজা শেখু <img class="alignnone wp-image-6202" src="https://www.lipimagazine.com/lipicontent/uploads/2021/07/Verification-Badge-4.svg" alt="" width="17" height="17" />

বদরুদ্দোজা শেখু

বহরমপুর, মুর্শিদাবাদ

কোনো কোনো কবিতার জন্ম

ঘরে ফিরি। কর্মক্লান্ত অবসন্ন দেহ, ভগ্ন-মনোরথ—
দিনের কর্মের ফর্দ অসম্পূর্ণ থেকে যায় প্রতিদিন
আর অবিন্যস্ত ঘুরপাক খায় প্রতীক্ষার আবিষ্ট মগজে।
পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ হয়তো নিদেনপক্ষে খুঁজে’ পেতে চায়
মাথা গুঁজবার মতো একখণ্ড নিজস্ব আস্তানা
দৈনন্দিন রুজি-রোজগারের নাস্তানাবুদ-করা উপদ্রব শেষে;
তার চেয়েও অধম ইচ্ছায় আর অবুঝ নিষ্ঠায়
আমি তো কোনোরকম দাঁড়াবার মতো
পায়ের তলায় মাটি খুঁজি
হৃদয়-বৃত্তির শব্দের সভায়, নগর-কেন্দ্রিক
বহুল-প্রচার প্রেসের ভাগাড়ে; গণ্ডগ্রাম উৎসারিত
সবুজের পরিচিত প্রাসঙ্গিক রূপকল্প আর বালিরঙ
মাঠের ধূলোর মতো বৈচিত্রহীন সরল অনাড়ম্বর জীবন
শহরতলির নগর-পালিশ-প্রাপ্ত ঝঞ্ঝাট-মুখর
বস্তির অস্থি-র সাথে অনুষঙ্গ গ’ড়ে তোলে
জনারণ্যে উপেক্ষার মর্চে-পড়া অস্তিত্বের কোনোরকম অক্ষম প্রয়াসে
সময়ের সাথে নিজেকে টিকিয়ে রাখার আশায়।
নিজের ভবিষ্যৎ সাহিত্যিক প্রতিমা
এখন কেবল কোজাগরী পূর্ণিমার রাতে
বয়োবৃদ্ধ কোনো বটের তলার মায়াময় ছায়ার মতোই মনে হয়
বাস্তবের বাণিজ্যিক চোখে, তবু
হৃদয়ের অনিবার্য টানে
কোনোক্রমে দিনান্তের কর্মকাণ্ড গোগ্রাস চুকিয়ে
লন্ঠনের স্তিমিত আলোয়
শুয়ে শুয়ে পেন্সিলের আঁকিবুকি টানি দুর্মূল্য কাগজে,
ফুটো পাত্র হাতে শহরের ফুটপাতে ব’সে
ভিক্ষে করতে করতে অসাড়ে ঘুমিয়ে-পড়া
ভিখারীর মতো কখন্ ঘুমিয়ে পড়ি
ভোরের আযান শুনে ধড়ফড় ঝেড়েঝুড়ে উঠি
ব্যর্থ মনোরথ। জাগতেই
হয়তো-বা কোনো কোনোদিন রৌদ্রোজ্জ্বল পৌষালির
কিশোরীর গায়ে কস্তাপেড়ে উৎফুল্ল শাড়ির মতো
নেচে নেচে ওঠে রাজেন্দ্র শব্দের মূদ্রা
কাব্যের অনাথ এই ভিখারীর তরে।।

চর্যাপদ

সঞ্জীব সেন

চর্যায় ছুঁয়ে আছে মন কবিতায় নেই মন
হরীণের মাংসে সেই স্বাদ নেই আছে চর্যাতে

চর্যায় চর্চিত হয়ে আছি,যত পড়ি তত পুড়ে যাই
কি রূপ দেখিলাম শবরী তবু ডোমনীতে হারাই।

তিনরাত্রি ঘুমাইনি, চোখে ঘুম নেই কবিতা আসেনি
করতলে রেখেছি জল, পদ্মপাতায় জল টলমল

ডোমনীর কাছে যত আসি, অর্ধদগ্ধ গাছ দেখি
কানু তুই কবি যেমন ভাবিস তেমন দেখিস ।

শবরী কেমন রূপ দেখাইলি এমন রাতে
ভাঙা ভাঙা মেঘে ভিতরে মন হারালো চাঁদে

এবার এই মন নিয়ে কোথায় যাই
এই মন শুধু কেন ডোমনীতে হারাই ।

রবীন জাকারিয়া <img class="alignnone wp-image-6202" src="https://www.lipimagazine.com/lipicontent/uploads/2021/07/Verification-Badge-4.svg" alt="" width="17" height="17" />

রবীন জাকারিয়া

রংপুর, বাংলাদেশ

ছন্দ খুঁজি

হুট করে এক খেয়াল হলো
লিখতে হবে ছড়া
কী লিখবো এই ভাবনায়
চোখ যে ছানাবড়া
সবাই বলে লিখতে ছড়া
খুবই নাকি সোজা
তাইতো বুঝি রাত্রীবেলা
শব্দগুলো খোঁজা
শব্দের ‘পর শব্দ সাজাই
মিলছে নাকো জোড়া
আসলে ভাই এ পেশাতে
আমি যে আনকোড়া
লিখতে হলে ছড়া-টড়া
ছন্দের জ্ঞান চাই
তোমরা বলো এসব আমি
কোথাত্ থেকে পাই?
দুই বন্ধু অনীক-সেলিম
মোর মিনতি শোনো
শেখাও যদি ছন্দ কিছু
নেইতো ক্ষতি কোনো
নিঠুর ওরা, বড্ড পাষাণ
ভাবছে কী হামবরা?
পণ করিলাম এরপরেও
লিখবো একটি ছড়া৷

নিরূদ্দেশ

শুভজিৎ দাস

“নির্ভেজাল সন্ধের শুকনো মাঠ,
আকাশপথে মায়া মরিচের যাওয়া আসা
নিরাকার আঁধারে।
পোড়া মৃদু গন্ধের ব্যাপন
সেও নির্ভেজালে বন্টিত হচ্ছে কল্পিত অঞ্চলে জুড়ে,
পোড়া কাঠের দেহ
ইপ্সিত লোহিত সাগরে।

একাকী কৃষ্ণগহ্বরের একাকীত্বের পাশে আছি
আমরা সবাই আছি,
পরস্পর ভাবে,
জানি সে সঙ্গমের জঙ্গায় পোড় খাওয়া জীবন্ত লাশ।

অজান্তে
কেউ হেঁটে যায় সংকুচিত ধ্বনি তুলে
অযান্ত্রিক পথে
একাকী!”

সমাপ্ত
  1. লেখা নেওয়া হবে প্রত্যেক রবিবার থেকে শুক্রবার বিকেল ৫ টার মধ্যে। 
  2. লেখা প্রকাশ হবে প্রত্যেক শনিবার সকাল ৯ টায়।  
  3. লেখা পাঠাতে পারেন –
    1. কবিতা
    2. গদ্য
    3. ছোটগল্প
    4. প্রবন্ধ
  4. মেইলে টাইপ করে অথবা MS Word ফাইলের লেখা নেওয়া হবে। 
  5. আপনি কিভাবে লেখা পাঠাবেন তার কিছু নমুনা দেওয়া হলো। – Download 
  6. লেখা পাঠাতে আমাদের এই মেইলটি ব্যবহার করুন – bangla@lipimagazine.com
  7. লেখার সাথে আপনার লেখক পরিচিতি, প্রথম পুরুষে, ৬০ থেকে ১০০ শব্দের মধ্যে, এবং আপনার ছবি পাঠান। 
  8. সপ্তাহে একজন একটি বিভাগে লেখা পাঠাবেন। 
  9. লেখা বাছাইয়ের মধ্যে দিয়ে নির্বাচিত করা হবে। 
  10. আবেদনকারীর সমস্ত লেখা নিজের হতে হবে, যেটি অন্য কোথাও প্রকাশিত হয়নি।
  11. লেখার মধ্যে কোনো ব্যাকরণগত ভুল থাকবে না, থাকলে সেটিকে বাতিল করা হবে।
  12. আবেদনকারীকে ফোন নম্বর অবশ্যই দিতে হবে মেইলের সাথে।
  13. পিডিএফ ও পিকচার এর মাধ্যমে পাঠানো লেখা গ্রহণ করা হবে না।
  14. লিপি ম্যাগাজিন ওয়েবসাইটে একাউন্ট তৈরির সময় আপনার লেখক পরিচিতি, ঠিকানা, এবং ছবি আপলোড করতে হবে।
  15. প্রত্যেক মাসে Amazon Kindle প্লাটফর্মে এবং পিডিএফ প্রকাশ করা হবে (মাসের সমস্ত লেখা)
  16. তিনমাস অন্তর সমস্ত লেখা পিডিএফ এবং Google Book or Amazon Kindle with ISBN Number সাথে প্রকাশ করা হবে।   

Share This

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on telegram
Share on email

Editorial Board 

  • Reviewed, Designed & Published by Akshay Kumar Roy (Editor)

For More Information, Click Here

For any type of Suggestion, Question, or Help, please contact us at this mail – contact@lipimagazine.com

Follow Us

Related Articles

শনিবারের লিপি – ১৭ তম সংখ্যা – সপ্তাহিক প্রত্রিকা

২০৫০ সালের বইমেলা (গল্প),
আমারে দেব না ভুলিতে,
আমি অবোধ কবি,
আপডেট,

শনিবারের লিপি – দশম সংখ্যা – সপ্তাহিক প্রত্রিকা

ইতি মাতৃমঙ্গলেষু, পাওয়ার বিড়ম্বনা, আয়াতের তেলওয়াতে আয়াত, রামধনু, ইটভাঁটা, পিতৃঋণ, ফেকু প্রেম

ছোটগল্প | Saturday Lipi | Bangla | 1st Week

Post Views: 508 সূচীপত্র ছোটগল্প ইলিশ লিখেছেন – সৈকত সাহা   ‘ও রুপার মা, মাইয়াটাকে আর একখান ইলিশ দিয়া যা, বেটি আমার ইলিশ খেতে বড়

Saturday Lipi | Bangla | May, 1st Week

ফাঁপা লেখক, সাঁকো, যোগ- বিয়োগ, নুন, কালচক্র, যে গল্পের শেষ হলো না, মঁচশিল্প, ভোলার নয় সখি সেই দিনের কথা.., ঠিকানা, মা জননী, শিশু মন, মনের ডায়েরি, মায়ের স্নেহ

Saturday Lipi | Bangla | May, 5th Week

আমার সাধ না মিটিল, যাজ্ঞসেনী আর পাঁচজন, যোগসূত্র, সেই জানলাটা আজও বন্ধ, ছয় পুরুষ , তরুণ সন্ন্যাসী, একজোড়া ফুলকপি ও শীতকালীন বনভোজন, মোহনার চরিত্র, কলরব, করি খুশির ঈদ, অহংকারী

Responses

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Comments

Please use '@' before Author/Writer name (e.g @John Mark)

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on telegram
Share on whatsapp
Share on email

Submission (English & Bangla)

Please read the guidelines – English & Bangla