17th-issue-Bangla

শনিবারের লিপি – ১৭ তম সংখ্যা

লেখক

রবীন জাকারিয়া <img class="alignnone wp-image-6202" src='https://sp-ao.shortpixel.ai/client/q_lqip,ret_wait/https://www.lipimagazine.com/lipicontent/uploads/2021/06/-জাকারিয়া-e1624635468598-286x300.jpg' data-src="https://www.lipimagazine.com/lipicontent/uploads/2021/07/Verification-Badge-4.svg" alt="" width="17" height="17" />

রবীন জাকারিয়া

রংপুর, বাংলাদেশ

২০৫০ সালের বইমেলা (গল্প)

২০৫০ সালের জানুয়ারী মাস৷ সামনে একুশে বই মেলা৷ সকল প্রকাশক, লেখক ও বইপ্রেমীরা ব্যস্ত৷ নতুন লেখা৷ নতুন বই প্রকাশ করতে হবে৷ হাতে বেশি সময়ও নেই৷ কম্পিউটারে নতুন লেখা টাইপ হচ্ছে৷ কোথাও প্রুফ রিডার ব্যস্ত৷ ছাপাখানা সারাদিন শুধু গ-ড়-ড় শব্দে চলমান৷ প্রকাশক টেনশনে৷ মেশিনটা না বিগড়ে যায়৷ প্রচুর ইনভেস্টমেন্ট৷ এবার কি লাভের মুখ দেখবো? না-কি প্রতিবারের মত সব শেষ হয়ে যাবে!

পুরাতন ও জনপ্রিয় লেখকরা যারা এক সময় দম্ড দেখাতো৷ অসংখ্য প্রকাশকের কাছ থেকে পরবর্তি লেখার সম্মানী আগাম নিয়েও কথা রাখতো না৷ তারা এখন নিজের বইয়ের জন্য নিজেই বিজ্ঞাপনে নেমেছে৷ ফেসবুক, ট্যুইটার, ইন্সট্রাগ্রামসহ সকল সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখার চুম্বক অংশ প্রকাশের মাধ্যমে৷ কিংবা অটোগ্রাফ, যুগল ছবি তোলার অফার দিচ্ছে৷ কেউবা আবার ঘোষণা করছে বই বিক্রির সমস্ত অর্থ ব্যয় করবে মহামারির ফলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সকল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য৷ 

নতুন লেখকদের মধ্যে কোন টেনশন লক্ষ করা যাচ্ছে না৷ তারা বেশ উপভোগ করছে৷ কেননা তারা লাভ লোকসানের মধ্যে নেই৷ নিজের লেখা বই আকারে প্রকাশের জন্য কষ্টার্জিত অর্থ জলে ডুবানোর প্রতিজ্ঞাই করেছে৷ যদিও বলা হয় প্রকাশকরা নতুন নতুন লেখক তৈরি করেন৷ আসলে ভূয়া কথা৷ ৪ ফর্মার একটি বই প্রকাশ করতে প্রকাশকরা ক্ষেত্রবিশেষে ২৫০০০/- থেকে ৩০০০০/- টাকা নিংয়ে থাকেন৷ তারপর নিজের কাছে কিছু রেখে বাকি সব বই লেখককে দিয়ে দেয়া হয়৷ কোন রয়্যালটি নেই৷ প্রকাশকের কোন বিনিয়োগ নেই৷ আছে শুধু মুনাফা৷ তাই অনেক নতুন লেখক মনে করেন নিজের টাকায় যদি বই প্রকাশ করে বাড়ির স্টোর রুমেই রাখতে হয়৷ তাহলে মুনাফাখোর প্রকাশকের ব্র্যান্ড বা লোগো দেয়ার দরকারটা কী?

সত্যি বলতে কী! এখন বই তেমন একটা কেউ পড়েনা৷ নতুন জেনারেশনের ছেলে-মেয়েরা সারাদিন সোশ্যাল মিডিয়া, কম্পিউটার আর মোবাইল গেমস নিয়ে ব্যস্ত৷ Blue whale, Free fire গেমস খেলতে খেলতে আত্মহত্যা করে৷ একদা  গৃহিনীরা অন্তত শরৎবাবু কিংবা হুমায়ুন আহমেদ’র বই পড়তো৷ তারা এখন পার্লার, জি বাংলা কিংবা স্টার জলসা নিয়ে মজে আছে৷ অবশ্য একথাও অনস্বীকার্য যে সন্তানের লেখাপড়ার প্রতি তাদের অবদান সবচেয়ে বেশী৷ 

যাহোক বইমেলাটা এখন আর নিয়মিত হয় না৷ দিনের পর দিন বাংলা একাডেমীর প্রধানের দায়িত্বটা কেন যেন সাহিত্য-সংস্কৃতি জ্ঞানহীন, অথর্ব ব্যক্তিরাই দখল করে আছে৷ গত বছর ২০৪৯ সালের জুলাই মাসে যিনি এ পদে অলঙ্কৃত করেছেন৷ তিনি একজন Transgender. সুবিধা বঞ্চিত ও অবহেলিত জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়নের জন্য সরকার এখন বেশ সজাগ৷ এখানে একটা বিষয় লক্ষনীয় যে সকল New experiment গুলো সরকার শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে আসছেন দীর্ঘকাল ধরে৷ ভোটার তালিকা হবে? বন্যা হয়েছে? সমস্যা নেই স্কুল বন্ধ রাখ৷ শিক্ষকদের কাজে লাগাও৷ আজ থেকে প্রায় তিরিশ বছর আগে করোনা’র প্রাদূর্ভাব দেখা দিলে হাট-বাজার, শপিং মল, অফিস-আদালত সবই চলেছে৷ শুধু বন্ধ ছিল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান৷ সব আমলের সব সরকারেরই সম্ভবত চক্ষুশূল ছিল শিক্ষা৷ অবশ্য কারণও ছিল৷ জাতি শিক্ষিত হলে তাদের ভাওতাবাজি ধরতে পারবে! এই ভয় সব সময় কাজ করে৷

এখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে লাইব্রেরী গুড়িয়ে দিয়ে মসজিদ নির্মাণ করা হয়৷ ইসলামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চেয়ে কি মসজিদের গুরুত্ব বেশী? কোরআনের প্রথম আয়াত “ইকরা বা পড়”৷ আবার হাদিসে বর্ণনা আছে “প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্য জ্ঞানার্জন ফরজ”৷ অথচ অতি রক্ষণশীল গ্রুপের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের সরকার একযোগে শত শত মসজিদ তৈরি করে জনগণের কাছে প্রমাণ করতে চান তারা কত ধর্মীয়মনা সরকার৷ এমনো ঘটেছে যে চারিদিকে কয়েকটা মসজিদ থাকার পরেও লাগোয়া মসজিদ তৈরি হয়েছে৷ আর কিছুদিনের মধ্যে হয়তো আমরা মিশরের রেকর্ড ভেঙ্গে ফেলবো আশা করি৷ মসজিদের শহর কায়রো এর স্থলে হবে মসজিদের দেশ বাংলাদেশ৷ আহ্! কী সুন্দর৷ যেমন বেশ কয়েক বছর আগে আমরা অনেক টাকা খরচ করে একটা রেকর্ড গড়েছি৷ সবচেয়ে বড় মানব পতাকা৷

এরপরেও কিছু সমাজ সংস্কারক, প্রকৃত ধর্মীয়মনা সৃজনশীল ব্যক্তি জনগণকে শিক্ষা ও জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করার মহান ব্রত নিয়ে কাজ করে যায়৷ উপমাস্বরুপ মৌলভী খেরাজ আলি 

১৯৩৩ সালের ২৫ অক্টোবর মুনসীপাড়া কেরামতিয়া স্কুলে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন “খাতুনিয়া সার্কুলেটিং লাইব্রেরী”। ঘরে ঘরে পৌঁছিয়ে দিতেন বই৷ অথচ স্কুল কর্তৃপক্ষ লাইব্রেরীটাকে গুড়িয়ে দেয়৷ অথচ পরবর্তিতে মসজিদ তৈরি করা হয় সম্মিলিতভাবে৷

এভাবেই চলছে সমাজ৷ বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক একেক সময় একেক কথা বলছেন৷ একবার বলছেন এবারে বই মেলা সীমিত আকারে করবেন৷ আবার বলছেন ২০৫০ সালের বই মেলা হবে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ৷ লেখক, পাঠক, প্রকাশকরা চিন্তিত তবুও প্রকাশনার কাজ চলছে অবিরাম৷ 

এরপর হঠাৎই সরকার থেকে ঘোষণা করা হলো নাশকতামূলক কর্মকান্ডের আশংকায় ২০৫০ সালে বই মেলা আয়োজন করা সম্ভব নয়৷ জাতি হতবাক৷ প্রকাশক, লেখক, পাঠক বিশ্মিত!

কিন্ত শত প্রতিকূলতার মাঝেও কিছু সৃজনশীল আর শিক্ষানুরাগী মানুষ সমাজের কল্যাণে কাজ করে যায় অবিরত৷ তাই প্রকাশিত বইগুলো দিয়ে লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল৷ কিন্ত এ সমাজে এখন লাইব্রেরি স্থাপনের জায়গা নেই৷ অবিচল এই মানুষগুলো তাই শত বছরের পুরোনো পদ্ধতি অনুসরণ করলো৷ কাঁধে বই নিয়ে ভ্রাম্যমান পদ্ধতিতে ঘরে ঘরে পৌঁছিয়ে দিতে থাকলো জ্ঞানের আলো৷ সেই বই৷ 

হঠাৎ কোন একটা মধুর শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল৷ শুনলাম ফজরের নামাজের পবিত্র আজান৷ ভয় পেলাম৷ সবাই বলে ভোরের স্বপ্ন নাকি ফলে যায়৷ অযু করলাম৷ প্রতি ওয়াক্তের ন্যায় ফজরের নামাজ আদায় করলাম৷ আল্লাহ্’র কাছে প্রার্থণা করলাম এমন স্বপ্ন যেন ফলে না যায়৷

কেননা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সত্য হলো মানুষ একদিন জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত হয়৷ পরিশেষে জয় হয় জনতার৷

শ্যামাপ্রসাদ সরকার <img class="alignnone wp-image-6202" src='https://sp-ao.shortpixel.ai/client/q_lqip,ret_wait/https://www.lipimagazine.com/lipicontent/uploads/2021/06/শ্যামাপ্রসাদের-224x300.jpg' data-src="https://www.lipimagazine.com/lipicontent/uploads/2021/07/Verification-Badge-4.svg" alt="" width="17" height="17" />

শ্যামাপ্রসাদ সরকার

কলকাতা

আমারে দেব না ভুলিতে

ম‍্যাডান থিয়েটার থেকে বের হয়ে আজ মনটা খুব খুশিতে ভরে গেছে। পানের ডিবেটা বোধহয় আজ নিয়ে বের হতে ভুলে গেছিলেন।

দিলশাদকে হাতের ইশারায় ডাকলেন কাজীসাহেব। এখানে ওনাকে অনেকেই কাজীদা বলে ডাকে। এমনকি গারস্টিন প্লেসের রেডিও অফিসে সবাই কাজীদাই বলে তাই নিজেও অবশ‍্য এখন এই নামটাই পছন্দ করেন। দিলশাদ তক্ষুণি দৌড়ে গিয়ে একটা ভালো জর্দা আর কিমাম ঠাসা পান এনে দিল ওঁকে। পানটা গালে পুরতেই মনটা উড়ু উড়ু হয়ে গেল। আজ যে পকেট একেবারে গরম।

**********

প্রযোজক পিরোজ ম্যাডান নামের এক পার্সী ব‍্যবসায়ী সম্প্রতি কলকাতায় পায়োনিয়ার ফিল্মস কোম্পানি নামে একটি চলচ্চিত্র প্রযোজনা সংস্থা খুলেছে। শিগগিরই তাদের ব‍্যানার থেকে ‘ধ্রুব’ নামে একটি পৌরাণিক ছবি (গিরিশচন্দ্র ঘোষের লেখা ‘ধ্রুব চরিত’ অবলম্বনে) করছে। তারা আজই কাজী নজরুলকে সেই ছবির গান লেখার সাথে সংগীত পরিচালনার জন‍্য চুক্তিপত্রে সই করিয়ে দেড় হাজার টাকা আগাম দিয়েছে। সত‍্যেন দে’ র খুব ইচ্ছে ছবিতে যে দেবর্ষি নারদের চরিত্রটি আছে তাতে যদি কাজীদা নিজে অভিনয় করেন এবং একটি গানে কণ্ঠ দেন তাহলে আরও বাড়তি পাঁচশো টাকা দেবেন ওঁকে।

*********

টাকাটা সংসার চালাতে যে খুব দরকার সেটা বোঝেন নিজেও। কিন্তু তাই বলে নিজেকে বিকিয়ে দিতে মন চায়না। একটা গানের কলি হঠাৎ মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে থেকে থেকেই।
ট‍্যাক্সিতে বসে আপনমনে সুর ভাঁজতে লাগতে লাগলেন –

“আমার আপনার চেয়ে আপন যে জন
খুঁজি তারে আমি আপনায়
আমি শুনি যেন তার চরণের ধ্বনি
আমারি পিয়াসী বাসনায়।”

প্রেমের গান রচনায় নজরুল চিরদিনই অসাধারণ। আবেগ-বৈচিত্র্যে ভরপুর, লোক আঙ্গিকের গান, গজল গান, উচ্চাঙ্গ গান এবং কীর্তন আঙ্গিকের গান এমনকি শ‍্যামা সঙ্গীতও তাঁর বড় প্রিয়। বিষয় অনুসারে তাঁর মুন্সীয়ানা গানগুলির অনুপম শব্দ নির্বাচনে যেমন গজলে আরবি, ফার্সি ও উর্দু শব্দের ব্যবহার আবার কীর্তন আঙ্গিকের গানে তৎসম সংস্কৃত শব্দের প্রাধান্য। রাগরূপের সঙ্গে নজরুলের পরিচয় এত গভীর যে তিনি অনায়াসে মিশ্রিত রাগে বা রাগ ভেঙে গান রচনা করাটা তাঁর অবসরের একরকমের খেলাই বলা চলে। কয়েকটি তান বন্দিশ যেমন নির্ঝরিণী, সন্ধ্যামালতী, বনকুন্তলা, দোলন চাঁপা, মীনাক্ষী, এগুলো যেন তাঁর খেয়ালী জীবনের একটা অন‍্য দিক। যদিও অনেকে দোষারোপ করে যে তিনি নাকি রাগরাগিনী নিয়ে খেলা করতে গিয়ে গানের কথায় দৌর্বল‍্যকে প্রশ্রয় দিয়েছেন বেশী। এসবের প্রতিবাদ করেননি কখনো। হা হা করে প্রাণখোলা হাসিটি তাঁর সর্বক্ষণের সাথী। তিনি মানুষটি যে একাধারে প্রেমিক ও কবি। এই বাউন্ডুলে মানুষটি যদি স্ত্রী প্রমীলার কাছে বাঁধা না থাকতেন তবে এ সহজকঠিন সংসারটাও বোধহয় টিকতো না।

আজ একবার ইন্দুবালার কাছে যেতে ইচ্ছে করছে। ইন্দুর গলায় গানটা পাখির মত সহজাত। একটা গান তুলিয়ে দেবার জন‍্য অনেকদিনই বলেছিল ওঁকে। কিন্তু সাতরকম ঝামেলায় হয়ে উঠছিল না। যাবার আগে চাচার হোটেলের কাটলেট কিনে নিয়ে যেতে হবে। ইন্দু কাটলেট খেতে ভালবাসে। মসজিদবাড়ি স্ট্রিটে না ঢুকে গাড়িটাকে সোজা চালাতে বললেন নজরুল।

*********

বহুবার স্বপ্ন ভেঙে ভেঙে মাঝেমাঝে নিজেকে বড় নিঃস্ব লাগে আজকাল। সিনেমায় গান টান লিখে তেমন রোজকার বা স্বীকৃতি কোনওটাই হলনা। মাঝেমাঝে মনে হয় সহজসরল মানুষ পেয়ে সবাই বুঝি তাঁর প্রতিভাকে শুধু দোহন করেই নিল। ১৯৩৭ সালের আলোচিত চলচ্চিত্র ‘বিদ্যাপতি’। কবি বিদ্যাপতির জীবনীভিত্তিক এ ছবির মূল গল্প লিখে দিয়েছিলেন নিজেই।
এমনকি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস অবলম্বনে ১৯৩৮ সালে নির্মিত হয় চলচ্চিত্র ‘গোরা’। ছবিটির সংগীত পরিচালক হিসাবে তাঁর উপস্থিতি বিশ্বভারতীও মানতে পারেনি সেদিন। তারা আপত্তি করে যে ছবিটিতে সঠিকভাবে রবীন্দ্রসংগীত গাওয়া হচ্ছে না।

রবীন্দ্রনাথ কিন্তু সেদিন তাঁকে ফিরিয়ে দেন নি। বরং নজরুলকেই সমর্থন করেন এবং বিশ্বভারতীর সমালোচনা করে বলেন, ‘আমার গান কীভাবে গাইতে হবে, সেটা কি তোমার চেয়ে ওরা ভালো বুঝবে?’ তিনি তাঁর গান ছবিতে নিজের খুশি মতো গাওয়ার ও ব্যবহারের অনুমতিপত্র দিয়ে দেন। এর আগেও গুরুদেব যখন বসন্ত নাটকটি যখন নজরুলকে উৎসর্গ করেছিলেন অনেক লোক তাতে ওনাকে এ নিয়ে ব‍্যঙ্গ করেছিল। নজরুল কষ্ট পেতেন ভিতরে ভিতরে এসবের জন‍্য কিন্তু গুরুদেবের স্নেহকরচ্ছায়াটা মাথার ওপর আছে জেনে পরক্ষণে নিশ্চিন্ত হতেন।

*********

ক্রমশ এক অলীক শূন‍্যতায় ভরে যাচ্ছে নজরুলের জীবন। সেটার শুরু সেই বুলবুলের চলে যাওয়া থেকেই। অরিন্দম খালেদের বয়স তখন চার বছরের মতো। সবাই তাকে বুলবুল নামে ডাকে। বাবার মতোই তার চোখেমুখে প্রতিভার দীপ্তি। বাবার মতোই চঞ্চল, অশান্ত। হারমোনিয়াম নিয়ে নজরুল বসলে, সে–ও বসে যায় পাশে। পুরোনো গান হলে সুর মেলায় বাবার সঙ্গে। নতুন গান হলে একবার শুনেই বলতে পারে। সবাই বলে, ‘গানে বাবাকে হার মানাবে বুলবুল!’ একমনে লিখছিলেন সেদিন তারপর ধমক দিলেন বুলবুলকে। বললেন, ‘দুষ্টু ছেলে, যাও এখান থেকে, বের হও!’

ছোট শিশু নিজের ভুল বুঝল। পিতার রাগ বুঝল। মুখ কাঁচুমাচু করে মাথা নিচু করে ধীরে ধীরে ঘর থেকে বের হয়ে গেল। এর কদিন পর থেকেই বুলবুল জ্বরে পড়ল।

ওপরের একটা ঘরে আলাদা করে বুলবুলকে শুইয়ে রাখা হয়েছে। ডাক্তার দেখে বললেন বুলবুলের বসন্ত হয়েছে। বসন্তের গুটি সারা গায়ে ছড়িয়ে পড়েছে। এমনকি চোখেও গুটি দেখা দিয়েছে। তীব্র অর্থকষ্টের মধ‍্যে চিকিৎসার চেষ্টা করতে সে এক নাজেহাল অবস্থা। কিন্তু দিন দিন বুলবুল নিস্তেজ হয়ে পড়তে লাগল। রোগযন্ত্রণায় সে তার পিতাকে একটুও কাছছাড়া হতে দেয়নি। নজরুলের মনে পড়ে তার শিয়রের কাছে বসে অনুবাদ করেছিলেন হাফিজের কবিতাগুলো।

তাঁকে শূন‍্যতার শরিক করে দিয়ে বুলবুল পাখির মত চলে গেল যেদিন পকেটে শুধু দশটা টাকা মাত্র পরে আছে। এক প্রকাশকের কাছে তিনটি কবিতা জমা দিয়ে দুশো টাকা চেয়ে এনেছিলেন।
বুলবুল ‘ভোঁ-গাড়ি’ চড়তে চাইত। নজরুল তাই বুলবুলকে সেদিন গোরস্থানে নিয়ে গিয়েছিলেন মোটরগাড়িতে করে দাফন করতে।

***********

সময় যেন ধেয়ে আসছে ক্রমশ বিপর্যয় বুকে নিয়ে। এরমধ‍্যে প্রমীলা হঠাৎ পক্ষাঘাতে পঙ্গু হয়ে গেলেন। সঙ্গী সেই অর্থকষ্ট। আজীবনের সমস্ত গানের স্বত্ব চারশো টাকায় গ্রামোফোন কোম্পানিকে বিকিয়ে এলেন। স্ত্রীকে তো অন্তত বাঁচাবেনই এবার।

বন্ধুবর ফজলুল হক একটা কাগজ বের করছেন ‘নবযুগ’ নাম দিয়ে। সেই কাগজের অফিসে সম্পাদকের চাকরিটা দিয়ে আপাতত প্রিয় বন্ধুকে দুঃসময়ের দিনে রক্ষা করলেন হক সাহেব।

আজকাল আবার একটা নতুন উপসর্গ শুরু হয়েছে নিজের। বিকেলের পর প্রায়সই মাথায় খুব যন্ত্রণা হয়। চতুর্দিক কেমন ঘোলাটে হয়ে আসে তারপর। ঝিমুনির মধ‍্যে নজরুল টের পান ফুরিয়ে আসছেন দ্রুত।

*********

এরমধ‍্যে হঠাৎ ইন্দ্রপতন। বাইশে শ্রাবণ গুরুদেব পাড়ি দিলেন গানের ওপারে। নজরুল প্রমাদ গুনলেন। এ যেন অশনি সংকেত। ছুটলেন রেডিও অফিসে। প্রেমাঙ্কূর আতর্থীর ঘরে বসেই খসখস করে একখানি কবিতা তখুনি লিখে ফেললেন। ‘রবিহারা’ স্বকন্ঠে রেডিওতে পড়ে শোনালেন তিনি সেদিন। অবসন্ন শরীর আর বিধ্বস্ত মনে ভেঙে যাচ্ছেন টুকরো টুকরো হয়ে।

এদিকে স্ত্রী প্রমীলা দেবীরও সুস্থতার কোন লক্ষণ নেই। এবারে তারমধ্যে এবার শাশুড়িমা গিরিবালাদেবীও শয‍্যা নিলেন।

*********

আজকাল আর কথাও বলতে পারেননা তিনি। হারিয়েছেন মানসিক ভারসাম‍্যও। দীর্ঘ কুড়িটা বছর ধরে জড়ত্বই আজ তাঁর সঙ্গী। বড়ো বড়ো চোখদুটোতে কি উদাস শূন‍্য দৃষ্টি তাঁর। প্রাণের শতদলটির একটি একটি করে পাপড়ি যেন বন্ধ হয়ে আসছে। গলায় বেলফুলের মালা পড়িয়ে দিয়েছে পুত্রবধু কল‍্যাণী।

বউমাই যত্কন করে পড়িয়ে দিয়েছে তাঁর কপালে চন্দনসাজ। আজ যে জন্মদিন! কত লোক এসেছে টালাপার্কের বাড়িতে। ফুলের জলসায় আজ মূখর কবিই শুধু মূক।

কল‍্যাণী একটা চামচে করে বৃদ্ধ শ্বশুরের মুখে পায়েস তুলে দিচ্ছেন মাতৃস্নেহে। কবির দু চোখে অশ্রু ঝলোমলো হয়ে আছে। ঘরের মধ‍্যে ফিরোজাও আজ উপস্থিত। সকলেই ওঁর স্নেহধন‍্য। কিন্তু কাউকেই নজরুল আর মনে করতে আর পারেন না। সকলে তাঁকে এসে প্রণাম করে যাচ্ছে একবার করে। ফিরোজার দু চোখে মুক্তদানা। সে কোনওমতে নিজেকে সামলে নিয়ে ওঁর পা দুটো একবার মাথায় নিয়ে ছুঁয়েই নিজেই অস্ফূটভাবে গেয়ে উঠল-

“আমি চিরতরে দূরে চলে যাব তবু আমারে দেব না ভুলিতে /আমি বাতাস হইয়া জড়াইব কেশ বেণী যাবে যবে খুলিতে।”

আমি অবোধ কবি

সঞ্জীব সেন​

এতদিন প্রকাশ্যে বলিনি
অনাবশ্যক ছিল তাই
আজ বলছি, ঘরের পাশেই নদী
ভাঙনের সব শব্দ চিনি
ঘর ভাঙার শব্দ হয়না
শুধু উড়ে যায় যতেক পাখি
পাশের বাড়ির মাধবিলতা
পাঁচিল টপকে চলে আসে
আর তাতেই ভাঙে সংসার

আজ নিঃসঙ্কোচে জানতে চাই
চাঁদ দেখার পালা সাঙ্গ হয়েছে
ছলা কলা বুঝি না দেখি না কোনো তিথি
যতই বলো আমি তো জানি
আমি এক অবোধ কবি
তুমি বললে কবিরা সব এমনই স্বার্থপর
তবে কেন কবিকেই জ্বালাতে আসো স্বপ্নে।

আপডেট

দীপঙ্কর সরকার

নিজেকে সাফ সুতরো করি আপডেট করি
কবিতা যাপন। আমার না-লেখা কথা অচেনা
ভার্চুয়াল মেলে ধরি। নিজস্ব ঢঙে লিখে যাই
প্রচলিত শব্দ কথন, বিস্ময়ে বেবাক মানে
আমার পাঠক।

ইতোপূর্বে দ্যাখনি তো এতাদৃশ রক্ত ক্ষরণ, হৃদয়ে হৃদয় রেখে তুলে ধরি যাপিত জীবন। কখনো কোনো
দিন উচ্চারণ করিনি অনৃত শব্দ ভাষণ। যা দেখেছি যা ছুঁয়েছি লিখে গেছি অভিঞ্জতার মামুলি ফসল।

নিজেকে ঠকাইনি কখনো বঞ্চিত করিনি কাহাকেও কবিতার কাছে সতত সৎ থাকার প্রয়াস পেয়েছি
তঞ্চকতা শিখিনি এযাবৎ।

Share This

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on telegram
Share on email
0 0 votes
Writing Rating

Related Articles

Saturday Lipi | Bangla | April, 2nd Week

নইমুদ্দিন আনসারী | সঞ্জীব সেন | সৈকত চক্রবর্তী | রবীন জাকারিয়া | সৌমেন দেবনাথ | বনমালী নন্দী | ইলিয়াস খাঁ | গোবিন্দ বর্মন | বদরুদ্দোজা শেখু | তীর্থঙ্কর সুমিত | রূপো বর্মন

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments