পজিটিভ-1

পজিটিভ

আমি এক সাধারণ স্কুল শিক্ষকের সন্তান৷ নিম্ন মধ্যবর্তি পরিবার৷ মা-বাবা, চার ভাই, এক বোনসহ ৭ জনের একটা বড় সংসারে মানুষ৷ চাকরি ছাড়া বাবার আর কোন উপার্জনের পথ নেই৷ নেই কোন কৃষি জমি৷ তাই বাবা প্রাইভেট পড়িয়ে যতটা সম্ভব সংসারের চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করতেন৷ যদিও তিনি কখনোই তা পারেননি৷ কেননা আমরা পাঁচ ভাই-বোনই লেখাপড়ার সাথে যুক্ত৷ বিশাল ব্যয়৷

সকলেই শিক্ষার উন্নয়নের জন্য বড় বড় বক্তব্য রাখেন৷ গবেষণা-প্রবন্ধ, সেমিনার, ওয়ার্কশপ কত কী? কিন্ত দিনশেষে এদেশে শিক্ষা ব্যবস্থাটাই জটিল এবং ব্যয়বহুল৷ কিছু করার নেই৷ জনগণের উপর চাপিয়ে দেয়া সিস্টেমই আমাদের মানতে হয়৷ কেননা এখানে জনতার কথা শোনবার কেউ নেই৷ এছাড়াও দীর্ঘকাল ধরে শিক্ষাক্ষেত্রে চলমান রয়েছে বৈষম্য৷ নারী শিক্ষা উন্নয়নের নামে শিল্পপতির কন্যা পেয়ে যায় শিক্ষা উপবৃত্তি৷ আর শুধুমাত্র পুত্র হওয়ার কারণে দরিদ্র পিতার মেধাবী ছেলে বঞ্চিত হচ্ছে৷ আমার একমাত্র বোন সরকারী উপবৃত্তির টাকাটা পায়৷ তাই বাবার খরচে একটু চাপ কমে৷ কিন্ত আমরা চার ভাই বেশ বুঝতে পারি কিছু একটা করতে হবে৷ নাহলে বেশি পরিশ্রমের ফলে বাবার শারীরিক ক্ষতি হতে পারে৷ বাবা কিছুটা আঁচ করতে পেরেই বোধ হয় নির্দেশ জারী করেছেন৷ লেখাপড়া ছাড়া তোমরা কেউ অন্য ধান্ধা করবে না৷ খরচ আছে৷ আমি আছি৷ তোমরা শুধু মনযোগ দিয়ে লেখাপড়া কর৷ বড় কিছু হতেই হবে৷ কিন্ত উনি বললেইতো চলবে না৷ বড় হয়েছি৷ কলেজে পড়ি৷ তাই গোপনে কিছু টিউশনি চালিয়ে যেতে থাকলাম৷ যেটা আমার পড়ার খরচের পাশাপাশি সংসারের খরচেও সাহায্য করলো৷ 

বেশ কিছুদিন পর বাবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন৷ বেশি চাপ সম্ভবত শরীর পারমিট করলো না৷ চিকিৎসা করা হলো৷ বেশ কিছুদিন ভোগার পর সুস্থ হলেন৷ ধীরে ধীরে পুনরায় স্কুলে যাওয়া শুরু করলেন৷ কিন্ত প্রাইভেট পড়ানোটা একেবারে ছেড়ে দিতে হলো৷ এই সময়টাতে বাধ্য হয়ে আমাকে সংসারের হাল ধরতে হলো৷ টিউশনি বাড়িয়ে দিতে হলো৷ রোজগার করতে হবে৷ সংসার চালাতে হবে৷ অন্য ভাইয়েরা উদাসীন৷ ফুলবাবু হয়ে ঘুরে বেড়ান৷ যদিও তারা বড় ভাই৷ কিন্ত কিছু বলতে পারি না৷ বাবা সব সময়েই একজন এনার্জিটিক মানুষ৷ জীবন সম্পর্কে তাঁর ধারণা পজিটিভ৷ তাই সব সময় আমাদেরকে উপদেশ দিতেন “Be Positive”. জীবনকে পজিটিভ ভাবে দেখতে হবে৷ আমরাও শত দারিদ্র্য, শত প্রতিকূলতার মধ্যেও জীবনকে পজিটিভ ভাবে দেখতে চেষ্টা করি৷ 

সমাজ বিজ্ঞানে মাস্টার্স কমপ্লিট করে আরো বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়লাম৷ BCSএর জন্য প্রস্ততি৷ টিউশনি৷ অন্যান্য চাকরির চেষ্টা৷ যেভাবেই হোক যে কোন একটা চাকরি যোগাড় করতে হবে৷ পরিবারের জন্য৷ নিজের জন্য৷ এমন সময় একটি NGOতে চাকরি পেয়ে গেলাম৷ বাবা কোনভাবেই এই চাকরি করতে দেবে না৷ “বড় কিছু স্বপ্ন দেখ৷ বড় কিছু হতে হবে” এটা আমার স্বপ্ন৷ কিন্ত তাঁকে কী করে বোঝাই এদেশে টাকা, মামা-চাচা কিংবা দলীয় প্রভাব ছাড়া বড় কিছু হওয়া যায় না৷ তাছাড়া প্যারালাইসিস হয়ে পড়ে থাকা বাবার চিকিৎসার জন্য হলেও আমাকে চাকরিটা করতে হবে৷ তাঁকে বোঝালাম এটা শুধু অভিজ্ঞতার জন্য করবো৷ তাছাড়া BCSএর প্রচেষ্টা অব্যহত থাকবে৷ তুমি কোন চিন্তা কোরো না৷ Be positive. অসুস্থ, স্ট্রোকে শরীরের অর্ধেক নিস্তেজ হওয়া শীর্ণকায় শরীর৷ আর বেঁকে যাওয়া ঠোঁটে এক চিলতে হেসে বললো আমার কথা আমাকেই ফিরিয়ে দিচ্ছিস৷ কোন কথা? উনি বললেন Be positive. দু’হাতে বাবাকে জড়িয়ে ধরে কান্না জড়ানো কন্ঠে শুধু বললাম৷ বাবা তোমাকে বড্ড ভালবাসি৷ Be positive. তারপর দু’জনে হাসলাম বেশ সময় ধরে৷ কিন্ত তখন কেউই জানতাম না৷ এটাই হবে আমাদের শেষ আলিঙ্গন৷

সময় গড়িয়ে গেল৷ BCS তো দূরের কথা সরকারী কোন চাকরিই জুটলো না৷ ভাগ্যিস জেদ করে NGOর চাকরিটা শুরু করেছিলাম৷ যদিও এ চাকরিতে কোন স্থায়িত্ব নেই৷ কর্ম এলাকার ঠিক নেই৷ ম্যানেজমেন্ট একটা বড় চ্যালেঞ্জ৷ ওনারা যা বুঝবেন৷ সেটাই ঠিক৷ একই রিপোর্ট হাজারবার দেয়ার পরেও বলবে রিপোর্টটা পাঠানতো৷ যদি বলি পাঠিয়েছি৷ তাহলে বলবে ওটা কিছুই হয়নি৷ নতুন করে পাঠান৷ এনারা নিজেদের সময়ের ব্যাপারে উদাসীন৷ কিন্ত সাব অর্ডিনেটের সময়ের ব্যাপারে সজাগ৷ উপায় নেই৷ তাই ইচ্ছের বিরুদ্ধে এবং অবশ্যই যথাযথ দায়িত্বের সাথে চাকরি করে যাচ্ছি৷ 

প্রকল্প শেষ তো নতুন চাকরি খোঁজ৷ 

সংগঠণের নীতি বহির্ভূত কাজ, দূর্নীতি এগুলো দেখলে ঘেন্না লাগে৷ সেখানে আর চাকরি করতে মন চায় না৷ কেননা সবসময় বাবার উপদেশ মেনে চলার চেষ্টা করেছি৷ পজিটিভ থাকতে হবে৷ এসব কারণে বিভিন্ন NGOতে চাকরি করার অভিজ্ঞতা হয়েছে৷ 

বছর দু’য়েক আমি শরিয়তপুরের একটি NGOতে Project Coordinator কাজ করেছি৷ প্রকল্পটি দূর্যোগ কবলিত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবন মান উন্নয়ন ও প্রতিবন্ধি ব্যক্তির অধিকার নিশ্চিত করণে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে সম্পর্কোন্নয়নে কাজ করতো৷ রংপুর থেকে শরিয়তপুরের দূরত্ব অনেক৷ সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থাও নেই৷ তাই স্বাভাবিকভাবেই দূরত্বের কারণে মাসে-দু’মাসে একবার বাড়িতে আসার সুযোগ হয়৷ তাও দু’একদিনের জন্য৷ আসার দিন ভাল লাগলেও যাওয়ার দিন খুব খারাপ লাগতো৷ ভীষণ কান্না পেত৷ বিশেষ করে বাচ্চা দুটোর জন্য৷ প্রতিবার যাওয়ার সময় ওরা আর যেতে দিতে চাইতো না৷ 

আমি বলি চাকরি না করলে খাবো কী?

শুধু পানি৷

স্কুলের বেতন?

স্যারকে বলে মাফ করে নেবো৷ তবু তুমি যেওনা বাবা৷ 

জান আমাদের বন্ধুদের বাবারা মাঝে মাঝে ওদেরকে স্কুলে নিয়ে আসে৷ কত মজা করে৷ আমাদেরকে দেখিয়ে বলে তোদের বাবা পচা৷ তোদের খোঁজ নেয় না৷ ছোট্ট মেয়েটি তখন কাঁদতে কাঁদতে বলে আমার বাবা পচা নয়৷ ভাল৷

বুকটা মুচড়ে উঠে৷ রাগ লাগে৷ কান্না পায়৷ নিজের অসহায়ত্ব আর দৈন্যতার জন্য৷ কিছু করার নেই৷

মাস দু”এক পর যথারীতি বাড়িতে আসলাম৷ বাচ্চারা খুশি৷ সকলে খুশি৷ বৈবাহিক জীবনের কিছু চাহিদা থাকে৷ যা অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই৷ এটাই দাম্পত্য জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ দিকও বটে৷ কিন্ত এবার টাইমিংটা ব্যাটে-বলে হলোনা৷ রেল লাইনের কাজ চলছে৷ লাল পতাকা উড্ডায়মান৷ পরবর্তি নির্দেশনা ছাড়া যোগাযোগ সাময়িকভাবে বন্ধ৷ বাস্তবতা মানতেই হবে৷ ব্যথিত হৃদয়ে ফিরতি পথ ধরলাম৷ কর্মস্থল যেতে হবে৷ BRTCতে করে সারারাত বিশ্রি রকম ভেঙ্গে ভেঙ্গে জার্ণি৷ রংপুর থেকে মোস্তফাপুর৷ সেখান থেকে মাদারিপুর৷ তারপর শরিয়তপুর৷ সেখান থেকে গোসাইহাট৷ আমার কর্মস্থল৷ প্রজেক্ট অফিস৷

ইদানিং বাসের মধ্যে প্রচন্ড বিরক্তিকর ও বিব্রতকর পরিস্থিতি হচ্ছে লিঙ্গ প্রতিবন্ধী তথা হিজড়াদের আক্রমন৷ নাছোড় বান্দা৷ কোন ছাড় নেই৷ ওদের ডিম্যান্ড পূরণ করতেই হবে৷ নাহলে অপদস্থ করবে৷ ওদের মুখে কোন কিছুই আটকায় না৷ সেন্সর বোর্ডও বোধ হয় পালাবে ওদের কথা শুনলে৷ অথচ কত সুন্দর মেক-আপ আর উগ্র সাজে সজ্জিত হয়ে থাকে যে প্রায়শ:ই মনে হয় এরা কি আসলে হিজড়া? অনেকেতো এতই সুন্দর যে অনেক দেশি নায়িকা এদের কাছে নস্যি৷ কিন্ত সব প্রতিবন্ধীকে চেক করার সুযোগ থাকলেও এদেরকেতো তা করা যায় না৷ এদের চাহিদাও আবার কম নয়৷ ব্যক্তি বিশেষে বখশিস নির্ধারণ করে৷ বাঁচবার উপায় নেই৷ গাড়ির পেছনের যাত্রি থেকে বখশিস উত্তোলন শুরু করেছে৷ আমি চিন্তা করছি আমার কাছে পৌঁছাবার পূর্বেই শরিয়তপুরে নেমে যেতে পারবো৷ সে আশার গুরে বালি৷ যথা সময়ে আমার কাছে এসে দুই হাতে তালি দিয়ে বললো, “হায় আল্লাহ্! তুইতো খুব সেক্সিরে? যাবি নাকি আমার সাথে?” সকল যাত্রি একযোগে হো হো করে হেসে উঠলো৷ লজ্জা আর রাগে চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করছে৷ বিব্রতকর অবস্থা৷ ওদের একজন বললো, “যা তুই পাঁচশত টাকা দে৷” আমি পঞ্চাশ টাকার বেশি একটি পয়সাও দেবো না৷ নিলে নাও৷ নাহলে নিয়ো না৷ অবশেষে টাকাটা নিয়ে ওরা চলে যাচ্ছিল৷ 

আমি ডাকলাম৷

ওদের নেতা এবং দেখলে যাকে হিজড়া মনেই হয় না৷ যেন অপ্সরী৷ ডাক শুনে সে কাছে আসলো৷ একটা ভিজিটিং কার্ড দিলাম৷ বললাম যদি কোন প্রয়োজন হয়৷ এই ঠিকানায় যোগাযোগ করতে৷ কেননা আমাদের প্রকল্প তাদের উন্নয়ন ও পুনর্বাসনের কাজ করে৷ ওরা চলে গেল৷ আমি নেমে পড়লাম৷ আর একটা বাস ধরে গোসাইহাট যেতে হবে৷ সেখানেই প্রজেক্ট অফিস এবং আমার বাসা৷ আমার একটা বদ অভ্যাস আছে৷ সেটা হলো আমি কখনো মেসে থাকি না৷ একাই একটা ফ্ল্যাট নিয়ে থাকি৷ খাওয়া-দাওয়া হোটেলেই করি৷ কেননা রান্না করতে পারি না৷ চেষ্টা করেছিলাম৷ তাই একদিন বার্ণার, কুকার, হাড়ি-পাতিলসহ মালামাল কিনে আনলাম৷ মোবাইলে স্ত্রী’র কাছে পরামর্শ করে রান্নাও করলাম৷ কিন্ত পরামর্শ মোতাবেক মসলাপাতি যথাযথভাবে দিতে না পারায় আধা কেজি গরুর মাংস ফেলে দিতে হলো৷ বুঝলাম এটা আমার দিয়ে হবে না৷ তাই হোটেলই গতি৷

আমার পাশের ফ্ল্যাটে স্বপরিবারে ভাড়া থাকে আমার ফাইন্যান্স অফিসার৷ ওরা মাঝে মাঝে দাওয়াত করে খাওয়ায়৷ এটাই বাহিরের জগৎ৷ হয় মেনে নাও৷ কিংবা ছেড়ে দাও৷

একদিন অফিস আওয়ার শেষ৷ প্রায় সন্ধ্যে হয়ে গেছে৷ সকলে চলে গেছে৷ ডোনারকে জরুরী একটা ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্ট দিতে হবে বলে আমরা রিপোর্টিং করছি৷ আমি আর ফাইন্যান্স অফিসার৷ আর যেহেতু আমি কাজ করছি তাই অফিস সহকারিকেও থাকতে হচ্ছে৷

হঠাৎ সেদিন একজন সুন্দরী নারী অফিসে হাজির৷ আমরা চিনি না৷ বললাম আপনি কার কাছে এসেছেন? 

আপনাদের কাছে৷

আমাদের কাছে কেন? তাছাড়া অফিস ছুটি হয়ে গেছে৷ কোন প্রয়োজন থাকলে আগামীকাল আসুন৷

মেয়েটি একটি ভিজিটিং কার্ড বের করে দেখাল৷ বললো আপনি বলেছিলেন কোন প্রয়োজন হলে দেখা করতে৷ আপনারা নাকি হিজড়াদের উন্নয়নের জন্য কাজ করেন৷ তাই চলে এলাম৷ আমি চিনতে পারলাম৷ ঘটনাটা ফাইন্যান্স অফিসারকে খুলে বললাম৷ 

ফাইন্যান্স অফিসার বললো আজ বাসা চলে যান৷ রাত হয়ে গেছে৷ কালকে একটা ব্যবস্থা হবে৷

আমিতো যেতে পারবো না৷

মানে?

আমাদের থাকার কোন জায়গা নেই৷ পথই ঠিকানা?

ফাইন্যান্স অফিসার একটু রাগ হয়ে বললো তাহলে আজকে পথেই থাকেন৷ কাল কথা হবে৷

অফিসেই রাত কাটার একটু জায়গা দেন৷

অসম্ভব! আমাদের পারমিশন নেই৷

তাহলে আমি নড়ছি না৷

ভয়ঙ্কর ঝামেলায় পড়তে যাচ্ছি৷ ও চিৎকার করে কথা বলছে৷ মানুষ জানাজানি হলে খুব বাজে অবস্থা হবে৷

দেখি কী করা যায় বলে আমি ফাইন্যান্স অফিসারকে সাথে নিয়ে ওর বাসায় আসলাম৷ কেমন করে এর সমাধান করা যায় চিন্তা করতে থাকলাম৷ ভাবীকেও (ফাইন্যান্স অফিসারের স্ত্রী) বললাম৷ পরিশেষে ভাবী বললো উনিতো হিজড়া৷ আপনার খালি তিনটা রুমের যে কোন একটাতে থাকতে দেন৷ আর হিজড়া হওয়ার কারণে কেউ কিছু বলবে না৷ বিকল্প না থাকায় অনিচ্ছা সত্তেও মেনে নিলাম৷ কিন্ত অস্বস্তি থেকেই গেল৷ রাতে ভাবীই খাওয়ালো৷

নিজের ফ্ল্যাটে আসলাম৷ সাথে “সিন্দাবাদের ভূত” হয়ে চেপে বসা সেই হিজড়া৷ পাশের রুমে থাকতে বললাম৷ বিছানার চাদর আর বালিশ এনে দিলাম৷ নিজের রুমে এসে দরজা বন্ধ করে দিলাম৷ কিছুক্ষণ পর নক করার আওয়াজ পেয়ে দরজা খুলে দেখি বৃহন্নলা দাঁড়িয়ে৷ কী ব্যাপার? জানতে চাইলে বললো এই শীতে লেপ-কম্বল ছাড়া কীভাবে থাকবো? বলে কাঁপতে থাকলো৷ মায়া লাগলো৷ মানবিকতাকে আটকাতে পারলাম না৷ ভাবলাম কী হয় হোক৷ তবু একজন মানুষের সাথে এতটা নির্মম হতে পারবো না৷ সবকিছুকে পজিটিভ ভাভে দেখা উচিৎ৷ বললাম চাদর-বালিশ নিয়ে আসুন৷ একসঙ্গে থাকবো৷ 

আমি একটা সিঙ্গেল খাটে থাকি৷ দু’জন মানুষ থাকা খুবই কষ্টকর৷ এর মধ্যে সে কোন পুরুষ হলে তবুও কথা ছিল৷ কিন্ত আমাকে থাকতে হবে এক বৃহন্নলার সাথে জড়াজড়ি করে৷ ভাবতেই ঘেন্না লাগছে৷ কিন্ত বিকল্প নেই৷ শুয়ে পড়লাম৷ ইতিমধ্যে অনেক রাত হয়েছে৷ সকালে অফিস করতে হবে৷ আর এ আপদকে সরাতে হবে৷ 

প্রায় মাঝরাতে আমার অতিথি নিজেকে উম্মোচিত করলো৷ নিজের ভয়ংকর রুপে৷ আসলে সে কোন হিজড়া নয়৷ একজন নারী৷ প্রতারক৷ বেশ্যা৷ ক্ষুদার্ত মন৷ শীতের উষ্ণ বিছানা৷ পাশে এক সুন্দরী নারী৷ কী করবো? আমি মহামানব বা বৃহৎমনা কিংবা বৃহন্নলা কোনটাই নই৷ তাই সামলাতে পারিনা নিজেকে৷ এক অনিরাপদ শারীরিক কর্মে লিপ্ত হয়ে গেলাম৷ মূলত ট্র্যাপে ফেলে সে আমাকে ধর্ষণ করলো৷ তারপর আমার টাকা, দু”টো এন্ড্রয়েড মোবাইল, অন্যান্য দামি জিনিষসহ আমার প্রিয় ২২ ক্যারেট সোনার রিস্ট ওয়াচ যেটা বিয়ের সময় আমার স্ত্রীর প্রবাসী বড় ভাই উপহার দিয়েছিল সব কেড়ে নিল৷ আমি নির্বিকার৷ ভোর বেলা সে সবকিছু নিয়ে চলে গেল৷ হুমকি দিল বেশি ফাল পারলে সেই আমার বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নিবে৷ ভয় পেয়ে তাই চুপ থাকলাম৷

সকালে অফিসে আসামাত্র ফাইন্যান্স অফিসার হিজড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বললাম ওকে খুব প্রয়োজনীয় কাজে যেতে হয়েছে৷ দু’একদিনের মধ্যেই আবার আসবে৷ পকেটে কোন টাকা নেই তাই ওর কাছে পাঁচশত ধার নিয়ে বললাম আমার গত মাসের টিএ/ডিএ বিলটা রেডি করুন৷ আমি নাস্তা করে আসছি৷ সে মাসটা ঐ বিলের টাকা দিয়েই চললাম কষ্ট করে৷ তবে ভাল কথা হলো বিষয়টা কেউ জানতে পারলো না৷ 

সে ঘটনার প্রায় দশ বছর কেটে গেছে৷ এর মধ্যে আরো দু’টি প্রকল্পে কাজ করলাম৷ এখন আমি দিনাজপুরে কাজ করছি৷ ভালই হয়েছে৷ বাড়ির কাছাকাছি থাকছি৷ যে কোন সময় পরিবারের সাথে মিলিত হতে পারি৷ 

কিন্ত কিছুদিন ধরে লক্ষ করছি৷ শরীরটা খুব দূর্বল লাগে৷ জ্বর-কাশ-সর্দি লেগেই থাকে৷ সহজে সারতে চায় না৷ রুচি নেই৷ খেতে পারি না৷ শরীর শুকিয়ে যাচ্ছে৷

হঠাৎ সেদিন প্রচন্ড জ্বর এলো৷ সাথে হাঁচি-কাশি৷ দু’দিন গেল৷ কিছুতেই কমছে না৷ এদিকে দেশে করোনার ভয়ে সন্তান মা-বাবাকে পর্যন্ত জঙ্গলে ফেলে আসছে৷ প্রতিবেশিরা একঘরে রাখছে৷ এমনি অস্বাভাবিক একটা সময়ে আমার অসুখটাকে করোনা ভেবে হাসপাতালে ভর্তি করালো৷ আমার জন্য বরাদ্দ হলো ১৮ নম্বর বেড৷ কিন্ত অবস্থার উন্নতি হচ্ছে না৷ স্ত্রী, সন্তানরা হাসপাতালে আসে না৷ এমনকি মা, ভাই-বোন, বন্ধুরাও নয়৷ আমি এক লাওয়ারিশ মানুষ৷ একা-বড্ড একা৷ ধরেই নিয়েছি৷ আমি বাঁচবো না৷ তাই পরিবারের স্বার্থপরতার কথা ভেবে মন খারাপ করা যাবে না৷ মরার আগেই মরবো না৷ তাই এটাকেও পজিটিভ ভাবে নিলাম৷ শরীরের অনেক টেস্ট করা হলো৷ ধীরে ধীরে রিপোর্ট আসতে থাকলো৷ বেশি ভাগ রিপোর্টেই ভাল৷ কদিন আগে করোনার রিপোর্ট দিয়েছে৷ নেগেটিভ৷ ডাক্তার-নার্সরা খুশি৷ আমিও খুশি৷ কিন্ত এখন কোন কিছুতেই কেন জানি আর আগ্রহ নেই৷ জীবন-মৃত্যুর মাঝামাঝি বসে আছি৷ এখন প্রতিদিন ঘুমে কিংবা জাগ্রত অবস্থায় বাবা দেখা দেয়৷ কথা বলেন৷ জীবনকে পজিটিভ ভাবে দেখতে বলেন৷ এখন আমাকে তার কাছে ডাকেন৷ তার সাথে নিয়ে যেতে চান৷ আমি ভয় পাই৷ যেতে চাই না৷ চিৎকার করে বলি তুমি চলে যাও৷

কিন্ত আজ বাবার কাছে যেতে ভয় পাচ্ছি না৷ বরং তার কথায় রোমাঞ্চ অনুভব করছি৷ একদিনতো যেতেই হবে সকলকে৷ একটু আগে গেলে কী-ইবা ক্ষতি? 

আমার হাতে শক্ত করে ধরা একটা মেডিকেল রিপোর্ট৷ কিছুক্ষণ আগে ডাক্তার-নার্স এসে দিয়েছে৷ স্বজনরা পাশে থাকলে হয়তো আমাকে দিতোনা৷ কিন্ত আমিতো বেওয়ারিশ৷ তাই আমাকেই দিয়েছে৷ রিপোর্টটা পড়ে আমি কিছুই বুঝিনা৷ বুঝবার কথাও নয়৷ তাই সময় কাটানোর জন্য অবসরে যাওয়া চাকুরিজীবি একই পেপার যেমন বারবার পড়ে৷ আমিও রিপোর্টটা পড়তে থাকি৷ হঠাৎ একটা জায়গায় চোখ আটকে যায়৷ মেরুদন্ড বেয়ে একটা শীতল স্রোত সাপের মতো বয়ে যায়৷ কেননা শুধু মার্ক করা একটা ইংরেজী বাক্য বুঝতে পারি৷ যেখানে লেখা আছে HIV Positive.

5 1 vote
Writing Rating
Share This
Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on telegram
Share on email
Share on linkedin
Subscribe
Notify of
guest
1 Comment
Newest
Oldest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
রাহাত সাহেব এক মধ্যবর্তি পরিবার থেকে উঠে আসা এক সাধারণ মানুষ৷ জীবনে অনেক স্বপ্ন দেখেছিলেন৷ বাস্তবে একজন ছা’পোষা মানুষ ছাড়া কিছুই হতে পারেননি৷ এজন্য …
আমাদের বাড়ির পাশেই এ শহরের এক নামজাদা ব্যক্তির বাড়ি৷ এক অতি সাধারণ তথা নিম্ন মধ্যবর্তি পরিবারে তাঁর জন্ম৷ আর্থিক সংকটের কারণে দশ ভাই-বোনদের কেউই …
শহরের জিরো পয়েন্টের চৌরাস্তার মোড়গ্রীস্মের রোদ্র ঝলসানো, উত্তপ্ত দুপুরের ন্যায়আলোকিত চারিদিক৷সুঁচ খুঁজে পাওয়ার মত ঝলমলেশহরের জন্য গর্ব করি নিত্য৷আজ এখানেই আমি আটকে আছি৷এক্সকিউজ মি, …
প্রতিটি রাতেকিংবা প্রাতেথাকি শুধু আশায়হৃদয়ের টানেকাহারো পানেনীরব ভালবাসায়যদি সে আসেবসে মোর পাশেদেয় বাণী অর্চনাপাগল এই মনপেলে যে সুজনভূলে যাবে বঞ্চনা৷বলো তুমি শেষেহোক একপেশেহাত দু’টি …
রাজা মিয়া৷ এক দিন মজুর পরিবারের প্রথম প্রজন্মের শিক্ষা গ্রহণকারী মানুষ৷ লেখাপড়ার প্রতি উৎসাহ আর মেধাবী হওয়ার কারণে তার বাবা অনেক কষ্ট করে তাকে …
Read More
রাহাত সাহেব এক মধ্যবর্তি পরিবার থেকে উঠে আসা এক সাধারণ মানুষ৷ জীবনে অনেক স্বপ্ন দেখেছিলেন৷ বাস্তবে একজন ছা’পোষা মানুষ ছাড়া কিছুই হতে পারেননি৷ এজন্য …
আমাদের বাড়ির পাশেই এ শহরের এক নামজাদা ব্যক্তির বাড়ি৷ এক অতি সাধারণ তথা নিম্ন মধ্যবর্তি পরিবারে তাঁর জন্ম৷ আর্থিক সংকটের কারণে দশ ভাই-বোনদের কেউই …
শহরের জিরো পয়েন্টের চৌরাস্তার মোড়গ্রীস্মের রোদ্র ঝলসানো, উত্তপ্ত দুপুরের ন্যায়আলোকিত চারিদিক৷সুঁচ খুঁজে পাওয়ার মত ঝলমলেশহরের জন্য গর্ব করি নিত্য৷আজ এখানেই আমি আটকে আছি৷এক্সকিউজ মি, …
প্রতিটি রাতেকিংবা প্রাতেথাকি শুধু আশায়হৃদয়ের টানেকাহারো পানেনীরব ভালবাসায়যদি সে আসেবসে মোর পাশেদেয় বাণী অর্চনাপাগল এই মনপেলে যে সুজনভূলে যাবে বঞ্চনা৷বলো তুমি শেষেহোক একপেশেহাত দু’টি …
রাজা মিয়া৷ এক দিন মজুর পরিবারের প্রথম প্রজন্মের শিক্ষা গ্রহণকারী মানুষ৷ লেখাপড়ার প্রতি উৎসাহ আর মেধাবী হওয়ার কারণে তার বাবা অনেক কষ্ট করে তাকে …