পুরুষ-কেন-পতিত-নয়

পুরুষ কেন পতিত নয়

—বলি শুনছো, কইগো রূপকের বাবা। সকাল হয়ে গেছে পাঁচটা বেজে গেল। এবার তো ঘুম থেকে ওঠো।

—সত্যি, তুমি যে সকাল সকাল কানের কাছে চেঁচামেচি করো না। কি বলবো আর তোমাকে… 

—বলি চেঁচামেচি করি কি আর সাধে,কাজে তো বেরোতে হবে নাকি। ঠান্ডার দিন সকাল সকাল না গেলে বাবু আবার রাগে খান খান হয়ে যাবেন।

—আচ্ছা শশী তুমি বাবুর খেয়াল রাখো। আর আমার খেয়াল…

রূপকের বাবা কিছু না বলে থেমে যায়। আর সুন্দরী বউ শশীর দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকে। যেন সুপ্রভাতের এই শুরুতে আলিঙ্গনের বৃষ্টিতে চাতক পিপাশা মিটাতে চায়। 

—তুমি যখন আমায় শশী বলে ডাকো মনে যতটা তৃপ্তি পাই ঠিক ততটাই বিষাক্ত লাগে বাবুর সেই ডাক ‘সেক্সি’।

শশী শুধু নামে শশী নয়। কাজেও শশী। অন্ধকারে চাঁদের আলো দেখে যেমন মানুষ মুন্ধ হয়ে যায়, চাঁদের গায়ে কলঙ্ক আছে জেনেও। তেমনি শশীর আছে অপূর্ব দুটি নজর কাঁড়া চোখ, সুগঠিত গঠনে দুধে আলতায় বাদামি দেহের রঙ। ওষ্ঠে তার উষসী বেলার গোলাপ ফুলের পাপড়ির উপরে আঁলতো শিশিরে ভেঁজা রসালো আভাস দেখে। তার প্রেম আলিঙ্গনের নেশায় পর পুরুষও আসক্ত হয়, সে বিবাহিতা জেনেও। তাদের কথোপকথনের মাঝখানে একটু সজোরে দরজার কড়া নাড়ার শব্দ শোনা গেল। 

—সুবলদা আমি এসেছি গো রাকেশ। দরজাটা খোলো একটু।

—ওহ! রাকেশ যে, যাও শশী দরজাটা খুলে দাও।

দরজা খুলতেই কিসব জিনিসের থলে হাতে করে রাকেশ ঢুকল। 

—আচ্ছা রাকেশ হাতে এসব কি ? শশী তুমি মাদুরটা পেতে বসতে দাও না।

—না সুবলদা বসবো না গো। অনেক কাজ পড়ে আছে। একটু দেরি হলেই ম্যাডাম আবার চিৎকার চেঁচামেচি করবেন। আচ্ছা এই নাও তোমার ওষুধ আর মলম। ও হ্যাঁ রূপক আর খুশি কে দেখছি নাতো, খেলতে গেছে বুঝি? 

—না ভাই। ছেলে মেয়ে দুটোকে হোস্টেলে রেখেছি। এখন থেকে ওরা হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করবে। বাড়িতে রাখবো কোন মুখে!

—ওহ! আচ্ছা তাই ভালো গো তাই ভালো। আমি এখন আসি। আর ম্যাডাম তোমাকে দিনের বেলায় ছুটি দিয়েছেন কিন্তু রাত আটটায় মিলনসভায় উপস্থিত থাকতে বলেছেন।

রাকেশ চলে গেল। শশী দরজা আটকিয়ে সুবলের পাশে গিয়ে বসলো। আর সুবলের মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে আনমোনা হয়ে ছেলে মেয়ে দুটোর ছবিটির দিকে তাকিয়ে থাকল। 

—কি ভাবছো শশী ? ওদের খুব মনে পড়ছে তাই না।

—না গো। শুধু মনে পড়ছে  তা নয়। ভাবছি আমাদের এই লোক সমাজে ঘৃণ্য জীবনযাপনের আঁচ যেন তাদের জীবনে না পড়ে।

—আমিও তো, তাই ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি।

—হ্যাঁ গো তোমার শশীরটা তো রাতেও ঠিক হবে না। কি করে কাজে যাবে। খুব লেগেছে না তোমার! 

—হ্যাঁ। খুব লেগেছে। আসলে কাল সারাদিন অনেক কাষ্টমার ছিল। খুব ক্লান্ত হয়ে গেছিলাম। তারপর আবার রাত এগারোটায় ঠিক বাড়ি ফেরার সময় আরেক বিদেশিনী কাষ্টমার এসে হাজির। ম্যাডাম আমাকে আর বাড়ি আসতে দিলেন না। আবার বিদেশিনীর সাথে রুমে ঢুকিয়ে দিলেন।

—কিন্তু তোমাকে এমন ভাবে মারল কেন ?

—আসলে রাত এগারোটার সময় তো ডাক্তারের দোকান খোলা থাকে না। তাই ওই বিদেশিনী নিজেকে সুরক্ষিত রাখার জিনিস নিয়ে আসেননি। আর আমিও ক্লান্ত শরীরে সামলাতে না পেরে…

সুবলের কথা বলা শেষ না হতে না হতেই শশী বলে উঠল। 

—ওহ! বুঝলাম।

—হ্যাঁ শশী। সাথে সাথে বিদেশিনী আমার গালে তিন-চারটে চড় কষালেন। আর বাইরে তার গার্ডকে ডেকে আরও মার খাওয়ালেন। ম্যাডাম এসব দেখে শুনে আমার দিন মজুরি কেঁড়ে নিলেন। আর আমিও খালি হাতে বাড়ি চলে এলাম।

—ওহ! তাই হয়তো এতো সকাল সকাল ওষুধ আর মলম পাঠালেন। জানেন তো ওই রোজগারে আমাদের সংসার চলে। আর ওষুধ কেনার…

শশীর কথা শেষ হতে না হতেই সুবল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো। 

—হ্যাঁ। হয়তো তাই ভেবে পাঠালেন।

 সুবল হলো প্রায় সাতাশ-আঠাস বছরের এক যুবক। তবুও দেখে মনে হয় যেন সবে কালবৈশাখীর ঝড় পেরিয়ে বসন্তের মিষ্টি মিলনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। তার কথা বলতে বলতে আড়চোখে তাকানো চোখ আর লজ্জাবিহীন কৌতুহলী হাসি যেন ইশারায় কাছে ডাকে। তার  সুগঠিত গঠনে উপযুক্ত বাহুবল আর শ্যামবর্ণ চেহারা দেখে। প্রেম আলিঙ্গনে তৃষ্ণাত যে কোন নারী যেন নিশী রাতে তার সাথে সময় কাটাতে চায়। 

—আচ্ছা শোনো। তুমি ওষুধ আর মলম লাগিয়ে একটু আরাম করো। আমি যাই বাবুঘরে। মাঝরাতে এক বাবু এই রাস্তা দিয়ে বাড়ি যাচ্ছিলেন আর তোমার অসুবিধার কথা শুনে বাবু বাড়ি আসতে দিয়েছেন। সকাল সাতটার আগে বাবু বিছানা ছেড়ে উঠতে দেন না। আমি কথা দিয়েছি খুব সকালে যাবো।

—ওহ ! তুমি যাও তাহলে। তোমার বাবুকে অফিস পাঠিয়ে একটু তাড়িতাড়ি এসো। আজকে তুমি অন্য কোনো বাবুর সাথে সময় কাটাতে পারবে না। তোমার বাবুকে বলে দিও।

—আচ্ছা বলে দেবো ক্ষণ, আর চলেও আসবো।

দুপুর হয়ে গেল। সুবল এই কনকনে ঠান্ডার দিনে অসুস্থ শরীরে রৌদ্র তাপাতে আঙিনায় বসে আছে। এমন সময় পাড়ার কয়েকজন বয়স্কমানুষ বাইরে বেড়ার দরজা ঠেলে বাড়িতে ঢুকল। সুবল সবাইকে পাটার বোনা ছেঁড়া কেদারায় বসতে দিল। 

—বাবা সুবল কেমন আছো ? শুনলাম তোমার নাকি শরীর অসুস্থ।

—হ্যাঁ স্বপনকাকা। আছি কোনোরকম।

—রাস্তায় শশীর মুখে শুনলাম। তাই দেখতে এলাম আরকি। কি বলবো বাবা তোমার বউয়ের নাম নিতেও আমার রুচিতে বাঁধে।

—কেন কাকা ? এভাবে কেন বলছেন !

 —আরে তুমি তো জানোই সে কত পুরুষের সাথে মেশে। ওই বাবুর বাড়ি গিয়ে। তারপর… 

 বয়স্ক ‌মানুষ স্বপনবাবুর  সাথে আরেকজন তালে তাল মিলিয়ে বললো।

—হ্যাঁ তারপর আবার রাত বেরাতেও কত না বড়ো বড়ো সাহেবের সঙ্গে ডিস্কোতে যায়। রঙমঞ্চে, পার্টিতে যায়।

সুবল মাথানীচু করে মৃদুস্বরে বললো। 

—ওহ! দেখেছেন বুঝি ?

—হ্যাঁ দেখেছি বইকি, কাল তো নিজের চোখে দেখলাম একটা গাড়ি এসে রাত বারোটার সময় বাড়ি পৌঁছে দিয়ে গেল।

 সুবল স্বপনবাবু কে ইঙ্গিত করে বললো। 

—আচ্ছা আমিও তো দিনরাত বাইরে অনেক জনের সাথে মিশি। আর বাড়িতে থাকিনা। তখন তো…. 

সুবলকে থামিয়ে স্বপনবাবু বললেন।

—না না আমরা তো জানি তুমি তোমার অভাবের সংসারের ভরন পোষণের  জন্য ওই রকম কাজ করে রোজগার করো। আর তাছাড়া তুমি হলে পুরুষ মানুষ। এতে কোনো ক্ষতি নেই। কিন্তু তোমার বউয়ের কি দরকার বাপু ওভাবে পর পুরুষের সাথে মেশার। শুধু কটা টাকার জন্য । আসলে সেটা অভাব ঘুচাতে নয়। ওটা ওর স্বভাব। আর সে তো পতিতায় পরিণত হয়েছে। তুমি কি করে ওর সাথে আছো। ছি‌ঃ ছিঃ ভাবলেও ঘৃণা হয়।

—আচ্ছা কাকা আমিও তো শশীর মতো সেই একই কাজে যাই। কই কোনোদিন তো আপনি আমাকে দেখে ছিঃ ছিঃ করেননি। আর আমাকে কোনোদিন পতিতও বলেননি। আর আমরা দুজনে আমাদের এই অভাবের সংসাররে জন্য ওই রকম কাজে যুক্ত হতে বাধ্য হয়েছি। দুজনে রোজগার করি নিজের আত্মসম্মান লজ্জা বিক্রি করে। তাহলে সেই কেন পতিতা আমি কেন পতিত নয়?

—অত শত বুঝি না বাপু। পুরুষ কোনোদিন পতিত হয় না।

এইভাবে বলে রাগ করে সবাই উঠে চলে গেল। আর সুবল তার প্রিয়তমা শশীর অপেক্ষায় বসে থাকল আঙ্গিনাতেই। এবং মনে মনে ভাবতে লাগল।

—একই কাজের জন্য শুধু নারী কেন পতিতা হয়। পুরুষ কেন পতিত নয় !

0 0 votes
Writing Rating
Share This
Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on telegram
Share on email
Share on linkedin
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
ভেবোনা তুমি দূরে আমি,তোমার আমি আমার তুমি।হয়তো এটা আমি ভাবি,করোনি তুমি তেমন দাবি।ভুল বুঝে চলে গেছো,আশা করি ভালো আছো।ভালো থেকো তুমি সবসময়,আজও ভালোবাসে আমার …
গ্রীষ্মের এই দুপুর বেলায়,হাট বসেছে বটতলায়।গ্রীষ্মের এই তপ্ত দুপুরে,সাঁতার কাটছে ছেলেরা পুকুরে। সবাই খেতে চায় জল,পেতে চায় স্বত্বির ফল।আম কাঁঠালে ভরেছে সুবাস,তবুও মনে অস্বত্বির …
আমি এক ভিখারী ভাইরেভিক্ষা করে খাইঝড় বৃষ্টি তপ্ত রোদেও অন্যের দরজায় যাইদিন আনি দিন খাই অসুস্থ গিন্নিকে নিয়েছয় জন মেয়ের বিয়ে দিয়েছি জমি বিকিয়েপণ …
পুরুষ তুমি এমন কেন জানতে পারি কি  আমায় ছুঁলেই শান্তি পাও নইলে নয় কি  ভোর বেলায় শিশিরের ভার পারিনা আমি সইতে  দুপুরে অহংকারী সূর্য …
ওগো মম প্রিয়তমা, অভিমানী মোরে করো ক্ষমা। প্রেম ছোঁয়ায় তুমি ছুঁয়েছো মোরে যত, কটু কথায় করিয়াছি তব অন্তর ক্ষতবিক্ষত। পড়িয়াছিলাম ভুল প্রেমেতে, আসল সোনা পারিনি চিনিতে। তব কোমল অঙ্গে দিয়াছি …
Read More
ভেবোনা তুমি দূরে আমি,তোমার আমি আমার তুমি।হয়তো এটা আমি ভাবি,করোনি তুমি তেমন দাবি।ভুল বুঝে চলে গেছো,আশা করি ভালো আছো।ভালো থেকো তুমি সবসময়,আজও ভালোবাসে আমার …
গ্রীষ্মের এই দুপুর বেলায়,হাট বসেছে বটতলায়।গ্রীষ্মের এই তপ্ত দুপুরে,সাঁতার কাটছে ছেলেরা পুকুরে। সবাই খেতে চায় জল,পেতে চায় স্বত্বির ফল।আম কাঁঠালে ভরেছে সুবাস,তবুও মনে অস্বত্বির …
আমি এক ভিখারী ভাইরেভিক্ষা করে খাইঝড় বৃষ্টি তপ্ত রোদেও অন্যের দরজায় যাইদিন আনি দিন খাই অসুস্থ গিন্নিকে নিয়েছয় জন মেয়ের বিয়ে দিয়েছি জমি বিকিয়েপণ …
পুরুষ তুমি এমন কেন জানতে পারি কি  আমায় ছুঁলেই শান্তি পাও নইলে নয় কি  ভোর বেলায় শিশিরের ভার পারিনা আমি সইতে  দুপুরে অহংকারী সূর্য …
ওগো মম প্রিয়তমা, অভিমানী মোরে করো ক্ষমা। প্রেম ছোঁয়ায় তুমি ছুঁয়েছো মোরে যত, কটু কথায় করিয়াছি তব অন্তর ক্ষতবিক্ষত। পড়িয়াছিলাম ভুল প্রেমেতে, আসল সোনা পারিনি চিনিতে। তব কোমল অঙ্গে দিয়াছি …