616ed629940f2

বাণী বসুর উজান যাত্রা

এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্রের নাম যাত্রা। না, যাত্রা কোনো ব্যক্তি বিশেষ নয়, অথচ যাত্রাই হয়ে ওঠে উপন্যাসের প্রধান বিষয় বস্তু। এবারে প্রশ্ন ওঠে কার যাত্রা? কিসের যাত্রা? উপন্যাসের মুখ্য চরিত্র গুলি সকলেই যাত্রী, কারোর যাত্রা তার অতীতে, কেউ খুঁজে চলেছে তার প্রেম, কেউ আবার তার প্রান্তিকতার ইতিহাসের যাত্রী। উপন্যাসের প্রধান চরিত্র কস্তুরী মেহতা ওরফে কিকি গুজরাট থেকে পুরুলিয়ার অভ্যন্তরে এসেছেন তাঁর স্বাধীনতা সংগ্রামী মায়ের খোঁজে, তাঁর মা কি সত্যিই বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে লিপ্ত? সুধী কাকা কি সতিই তাঁর বাবা নরেন্দ্র মেহতার সাথে এত বড় অন্যায় করেছেন? এই যাত্রায় তাঁর সঙ্গী, কাজল সিং মুন্ডা। ট্রাইবাল হিস্ট্রি নিয়ে গবেষণারত এক যুবক যার প্রধান গর্ব হলো সে মুন্ডা। ভাবতে অবাক লাগে এঁরা দুজনেই শেকড় খুঁজে চলেছেন, একজন গবেষণার মাঠে, অন্য জন সরেজমিনে। তাই বুঝি কাজল বলে, আমার টা প্যাশন আর ওনার টা মিশন। আরো দুই যাত্রা সঙ্গী, মিঠু ও শিখরিনী। শিখরিনী উচ্চ বংশীয় শহুরে মানসিকতার প্রতীক, যে তার প্রেম খুঁজে চলেছে কাজলের মধ্যে। যদিও এই প্রেম তার অপূর্ণই থাকে, কারণ সে আদিবাসী জাতিকে শ্রদ্ধা করতে শেখে না, তার স্বপ্ন কাজলের সাথে লন্ডনে সংসার পাতানো এবং কাজলের পরিচয় মুন্ডা থেকে শুধুই সিং করে ফেলা। এখানেই উচ্চ বংশীয় মানসিকতা শেকড়ের টান অনুভব করতে অক্ষম, এই টানকে কিকি খুব সহজেই ব্যাখ্যা করেন, বলেন “ছুট বেলাই সোব বেলা”। এখানে বলা বাহুল্য, কাজল ট্রাইবাল স্টাডিজ নিয়ে বিলেত থেকে বহু স্কলারশিপ পেয়ে ও কোনো অজ্ঞাত কারণে দেশ ছাড়া হতে পারেনি, সেই অজ্ঞাত কারণ শুধুই শেকড়ের টান হয়ত? মিঠু অন্যদিকে কাজলের অল্টার ইগো। কাজলের সমস্ত নিষ্ঠুরতা, সামাজিকতা থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখা এসে হারিয়ে যায় এই মিঠু নামক এক প্রাণোচ্ছল ঝর্না ধারায়। এঁদের এই যাত্রা পাঠককে সংস্কৃতির কাউন্টার ন্যারেটিভের সামনে এনে দাঁড় করায়। এই ন্যারেটিভ হুদুড়- দুর্গার উপাখ্যান, যেখানে মহিষাসুরমর্দিনী একজন মায়াবিনী। মিঠুর আপাত সরল প্রশ্ন কানে বাজতে থাকে, আমরা কোন দিকের? অভয়া বরদা না হুদুড়- দুর্গা? হাড়ম- আয়োর ন্যারেটিভ ও অ্যাডাম- ইভের ন্যারেটিভ এত খানি সমান্তরাল? এঁদের ছেলে মেয়েরা হলেন মুর্মু, কিস্কু, হাঁসদা এবং এদের খারাপ হয়ে যাওয়ার পর ঠাকুরের সাতদিন সাত রাত্রি আগুন জল বর্ষা করা গ্রেট দেলিউজের সমান্তরাল? নোয়ার তৈরি নৌকা এখানে হারাত পর্বত? যদি মিথের এতই মিল, তাহলে কিসের উচ্চ সংস্কৃতি? আর কিসের নিম্ন সংস্কৃতি? কী দরকার পড়েছিল আদিবাসী সংস্কৃতিতে মিশনারী অধিগ্রহণের? কেনই বা আর্য অনার্য নিয়ে এত হিংসে এবং নিষ্ঠুরতা? এই কারণে বোধ করি রামানুজন তার থ্রি হান্ড্রেড রামায়ানাস প্রচ্ছদে ভার্সনের বদলে রি- টেলিং ব্যবহার করেন? যাতে UR বা অরজিনাল টেক্ট ও তার মেটাফিজিকস থেকে বেরিয়ে আসা যায়? এই অজানা, নষ্ট করে ফেলা মিথের পুনরুদ্ধার কি হিস্টরিকাল রাপচারিং? এসব নিয়েই গড়ে তোলা এই উপন্যাস, পাঠকের জন্যও এক অনন্য যাত্রা, এক উজান যাত্রা।

Share This
Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on telegram
Share on email
Share on linkedin
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
Read More

No connection