দীর্ঘয়ী

দীর্ঘয়ী

আমি ওর মনের ক্যামেরায় বন্দী হয়েছিলাম অনেক আগেই। আমার সরল মন তা ঘূণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি। যেদিকেই যেতাম ওর দেখা মিলতো। ভাবতাম, ও এমন ঘুরেই বেড়ায়। পরে বুঝেছি ও আমাকে অনুসরণ করতো। আমার চোখে স্বপ্ন ছিলো না, তাই ওর চোখের ভাষা বুঝতাম না। বিহ্বলিত দৃষ্টিতে ও তাকিয়ে থাকলেও বুঝেছি ওর দৃষ্টিতে মায়া নেই, ত্রুটি আছে। ওর মোহনীয় রূপ আমার পিপাসু মনের তৃপ্তি দিলেও বড় ভয় হতো ওর চোখে নিজেকে খুঁজতে। 

তখন গোধূলির আলো লুফে নিচ্ছে দিনের আলোকে। বিদায়ী সূর্যের মোহনীয় রূপের মায়া মনকে নাড়া না দিয়ে পারলো না। চঞ্চল তরঙ্গ মালার উপর তখনও তীর্যক ভাবে সূর্য কিরণ দিয়ে মায়াবী রূপ সৃজন করে চলেছে। আমার সরস প্রাণে সবুজ উন্মাদনা। তখন আরো উত্তেজনা বেড়ে গেলো, যখন সামনে এসে দাঁড়ালো ও। অপূর্ব রূপের এক মায়াময়ী। স্বপ্নেও কল্পনা করা যায় না। বারবার দেখেছি, তারপরও নিত্য নতুন ভাবে দেখছি ওকে। আমি যে বরাবরই ভীত ও বুঝে নিয়েছিলো। তাই আগেই ও কথা বলে। ওর প্রথম কথা ছিলো, এ দেখা শেষ দেখা হবে না তো? প্রত্যেক দিন নদী পাড়ে আসবেন তো?

ওর চোখে ছিলো কামনার শিখা। ওর চোখে বেশিক্ষণ অপলক চেয়ে থাকতে পারিনি। সন্ধ্যার ঝিলিমিলি রাগে আকাশ বিদায়ী সূর্যের লালে লাল। একরাশ আলোর মালা জলে। মনে মনে বললাম, আর কি কখনো কবে এমন সন্ধ্যা জীবনে হবে?

মুখে বললাম, আমি তো কালই চলে যাবো।

ওকে ফেলে চলে আসতে আমার বুক একটুও কাঁপেনি। আমার বন্ধুর ছোট ভাই তমাল। ওর কাছ থেকে ওর সম্বন্ধে সব জেনেছিলাম। দেখার জন্য বাইরে পা বাড়িয়ে অতৃপ্তিই বেড়ে গেলো। কাঙ্ক্ষিত বস্তুই দেখা দিয়েছিলো। ধরা দিয়েছিলো, অথচ ধরিনি। তমাল কল করে বলেছিলো, ও এখনো স্টেশনে বসে। তখন আমি বাড়ি পৌঁছে গিয়েছি। বাড়ি পৌঁছাতে লাগে সাড়ে চার ঘণ্টা। ফেরার পথে ওর সাথে দুটো কথাও বলিনি। অথচ আমার প্রস্থানে মূহ্যমান হয়ে সারাদিন স্টেশনে বসেছিলো। ভুল করেছিলাম, বড় ভুল। ঐ প্রথম দেখা মেয়েটিকে আমার জীবনের দেবী না ভাবায় ছিলো সত্যই চরম ভুল।

বাসায় ফিরে থাকতে পারতাম না। ছটফট করতাম। সূর্য পশ্চিম আকাশে তার দিনের চিতা জ্বেলেছে। সে চিতা যেন আমার বুকেও জ্বলতো। যে আগুন দেখেছিলাম ওর চোখে সে আগুনের থেকে আমি রেহাই পাইনি। স্বপ্ন আর কল্পনায় ও থেকে যাবে কি অধরা মাধুরী হয়ে? বিন্দু বিন্দু চোখের জলে ভেসে যাবে কি সে একা?

ঠিক চারদিন পর আমি আমার বন্ধু হিমেলের বাড়ি ফিরে আসতে বাধ্য হই। ওর বোবা চোখের আকুতি গুমড়ে খেয়েছে। খোঁজ পেয়ে ও ছুটে এলো মেঘ বালিকার ন্যায়। ওর রুদ্ধশ্বাস দেখে বিচলিত হলাম। ভয়াল সৌন্দর্য দেখে আতঙ্কিত হলাম। চোখ দুটো নতুন পাতার মত মোহময়। কপালে বৃষ্টি বিন্দু চকমক করছে। আমার সামনে আমার হৃদয় সাথী আমার বিশ্বাস করতে একটুও কষ্ট হইনি। চৈতী হাওয়ায় ওর অবাধ্য চুলগুলো দুষ্টমি করছে ওর সাথে। চৈতালি মন আমার কেঁপে কেঁপে উঠছে ওর কাঁপাকণ্ঠের কথা শুনে, এবার যাওয়ার আগে অবশ্যই ঠিকানা দিয়ে যাবেন।

আমি ওর চোখে তাকালাম। ও চোখ নামিয়ে নিলো না। হরিণী নয়না। অধরা মাধুরী নয় ও। আমি একাই দেখছি ওকে, ও একাই দেখছে আমাকে। চোখের তৃপ্তি মেটে না। যেন দুই জন বিস্ময়কর আলোর উৎসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। বিস্ময় পুরাতন হয় না।

ও যত সহজে ধরা দিয়েছিলো তত সহজে ওকে আপন করে নিতে পারিনি। বাঁধা এসেছিলো, চরম বাঁধা। ওর প্রতি পূর্ণ অধিকার আমার, কোনো শক্তিই তাই ওকে আমার থেকে আলাদা করতে পারেনি। ও আমার হাত ছাড়বে না, ওর বাবা ওকে আমার হাতে তুলে দেবেন না। আমি কথা কম বলি, চাপের মুখে কথায় বলতে পারি না। সাহস কম। ও সাহস জোগালো। ও আমাকে চায়, ও ওর সব ত্যাগ করলো। 

সেই থেকে সে আমার, আমার জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য নাম। সৌন্দর্য দেখতে গিয়ে সৌন্দর্যের পাশে এক অত্যাশ্চর্যকে দেখতে পেয়েছিলাম, কিন্তু সে যে আমার হৃদয় মানসী হবে ভাবিনি। এ যেন তাজমহলের সমাধিতে ফুল দিতে গিয়ে বাঁধা পাওয়া সামনে জীবন্ত মমতাজকে দেখে।

আমার বাবা সোজা কথার মানুষ। ঠিক কথাটি বলতে উনার গলা কাঁপে না। মিথ্যা আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে আজীবন সোচ্চার। সত্যের সাথী। একটু রাগী। আমাকে বলেছেন, সব জিনিস তোমায় একবার কিনে দেবো।

ঘড়ি হারিয়ে ফেলাতে বাবা বলেছিলেন, এবার নিজে কিনে নাও। 

বাইরে থেকে লেখাপড়া করায় বাবা হাতে গুণে টাকা দিতেন, ঠিক যত খরচ হবে। 

ছেলের আজকের কাজ দেখে বাবার স্বপ্নে কুঠারাঘাত পড়লো। বাবা বললেন, শৈবাল, বাবা আমার, পড়া বাদ দিয়ে আমার সাথে রোজগার করো। 

মায়ের মনেও অবিশ্বাসের ধোঁয়া, বললেন, আমি জানতাম, এমন একটা কাণ্ড করবেই। বাইরে অভিভাবক না থাকলে যা হয়!

আমার মাথা ধরে এলো। ও শব্দহীন। অথচ ওর বুকে মহাধ্বনি বুঝতে পারছিলাম। ওর আঁচল ভরে গিয়েছে কটাক্ষাঘাতে। দুইগাল রক্তবর্ণ। স্ফূরিত অধর। ও আমার ঘরে বাবা মায়ের আশীর্বাদ পায়নি। তবে নিন্দ্রাদেবীর স্মরণ নেয়ার জন্য একটি রাত স্থান পেয়েছিলো। আমার এহেন সুকীর্তি দেখার জন্য পরদিন সারা গ্রামের লোক আমাদের বাড়ি ভীড় করলো। যে যা পারছিলো বলছিলো। একজন তো কেঁকিয়ে বলেই দিলো, খুব ভালো ছেলে নাকি, দেখো সবাই ভালো ছেলের কাণ্ড!

ওকে নিয়ে চলে গেলাম রাজশাহী। আমি ভেঙে পড়েছি, ও আশা দিয়েছে। ওর সান্ত্বনা শুনলে শরীর শীতল হয়। এখন জীবনের লক্ষ্য লজ্জা নিবারণের জন্য করুণ চেষ্টা যেন করতে না হয়। এক বেলা না খেয়ে যেন থাকতে না হয়, যেন ওর ঠোঁটে কোনো কৃত্রিম হাসি না আসে। আমি কর্মঠ ছেলে হয়ে উঠলাম তাও ওর কারণে।

বাসা ভাড়া করেছি, সারাক্ষণ ও একা থাকে৷ ও বলে, আমি একাকিত্ববোধ করি না, সারাটি ক্ষণ তোমায় ভাবি। তুমি সদায় সামনে বর্তমান। 

ও আমার পথ চেয়ে থাকে। ওর প্রতীক্ষা দীর্ঘ না হয় এ কারণে কাজে ছুটি পেলেই সোজা বাড়ি চলে আসি। সারাদিন পর ওকে দেখি। নতুন করে দেখি। এ যেন অদেখাকে দেখার বিস্ময়কর অনুভূতি। 

সন্ধ্যায় কয়েকটি মেয়েকে পড়াতাম। কিছু খরচ তাতে বের হতো। একদিন এক ছাত্রী হাসতে হাসতেই বললো, আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব আপনি।

আমি ওর চোখে সবুজ স্বপ্নের জাল দেখতে পেলাম। স্বচ্ছ চোখের ভাষা। উদাস মনে চেয়ে থাকতো। মিষ্টি হাসি ছিটিয়ে দিতো। সেই হাসির ঢেউ আমার হৃদয় সাগরের তট ছুঁয়ে যেতো। আমাকে নিয়ে ওর আবির মাখা ভাবনা। আমার মাঝে ভাবনার ঝড় বয়ে যেতে লাগলো। প্রথম দেখলেই ভালো লেগে যায়, এ দোষ কার? আমার? না, আমার চোখের? আবার ভাবলাম, আমি বাস্তবের মুখোমুখি, কল্পনা আর আমায় সাজে না। ওকে জানতে দেইনি যে, ওকে আমার ভালো লেগেছিলো। তারপর? তারপর আর পর নেই। ফিরে এসেছি সংসারে, আমার স্ত্রী আমার ঘামে ভরা মুখটা কোমল হাত দিয়ে মুছে দিয়েছে। আর যায় হোক দীর্ঘয়ীকে কষ্ট দেয়া যায় না।

সকালে ঘুম থেকে উঠতে দেরী হলে ও নানা ফন্দি করে আমার ঘুম ভাঙায়। কখনো মিষ্টি সুরে রাগ মিশিয়ে ডাকবে, আবার কখনো আকুল আবেদনে ডাকবে। গম্ভীর মুখে তড়িৎ উঠে ওকে দুই বাহুতে তুলে দুই ঠোঁটকে ব্যস্ত করে তুলি আর বলি, সকালে বারবার ডেকে বিরক্ত করবে?

ও আমার কাছে মোটেও লাজুক নয়, বললো, তুমি এমনটি করো আমি তো তাই-ই চাই। তোমার থেকে আদর পাওয়ার এ যে এক অমল কোমল কৌশল।

আজ ক্লাসে গেলাম। যেতে যেতে ভাবছিলাম, বয়স অনুপাতে কাজগুলো আমার পাকা হয় না, এ কারণে মাঝে মাঝে বিপথে চলে যাই। সেজন্যই ও বলে, এত ছেলেমানুষি যে কেনো করো! মা বলেছিলেন, বাইরে থেকে পড়াশোনা করি, বাইরে অভিভাবক না থাকলে ছেলে তো লাগামহীন হবেই। মায়ের শঙ্কা ঠিক। মায়ের ঐ কথাটি মনে পড়লেই আমার বিবেক ফেরে। আমি আর এগিয়ে যেতে পারি না। ধীরে ধীরে এখন সভ্য হয়ে উঠছি। মা, আজ আমি নিজের অভিভাবক নিজে, নিজের লাগাম নিজেই টানি। নিজেকে নিজেই সংবরণ করি। নিজেকে নিজেই শাসন করি। কাঁধে যে আমার জোয়াল, সংসার জোয়াল। পিছন থেকে তোমরা আর টাকা দাও না, আজ কেবল আমার পেটের চিন্তা নয়, আরো এক জনের পেটের চিন্তা আমাকে করতে হয়। মা, তোমার অবাধ্য ছেলে আজ বাইরে থাকলেও অন্য চিন্তা করে না। বাইরে থাকি তাতে কি বাইরের জগৎ আমার ছোট হয়ে গিয়েছে। মা, বাবা, তোমাদের আশীর্বাদ ছাড়া কি সুখী হতে পারবো?

দ্রুত বাসা ফিরে এলাম। ওকে কেমন বিমর্ষ দেখাচ্ছে। নির্বাক ও। চোখের পলক পড়ছে না। বললো, আমার জন্য তোমার আজ এত কষ্ট, মনে এত আক্ষেপ। তোমার ভবিষ্যৎটা আমি নষ্ট করে দিয়েছি।

ও এসব বলছে কেনো, সিরিয়াস হলাম। বললাম, এসব বলো কেনো, এসব বলে না।

ও বললো, এভাবে জীবন সাজানো যায় না। স্বপ্ন পূরণ হয় না এভাবে। দুই মুঠো খেয়ে বাঁচার নামই কি জীবন? চলো, ফিরে যাই যাদের সন্তান তাদের বুকে।

আমি যেন বুলেটবিদ্ধ হলাম। ও আজ বললো কি এ? আমার সীমাবদ্ধতা তবে ওকে ভাবিয়ে তুলেছে? ওর রঙিন স্বপ্নে তবে মরিচা ধরতে শুরু করেছে? এত সহজে ও এত বদলে গেলো?

বললাম, বলছো কি তুমি! তুমি না বলেছিলে আমার হাত ছেড়ে আর একা হাটবে না? তুমি খাওয়ার চিন্তায় করলে? এইটুকু অভাবে তুমি হাল ছেড়ে দিচ্ছো? পাগলরে, মনে সুখ থাকলে না খেয়ে থাকা যায়। হেরে যাওয়ার নাম জীবন নয়। যাদের সন্তান তাদের বুকে যাবোই যদি তবে আমাকে কেনো পথে নামিয়েছিলে? কেনো আশা দিয়েছিলে? কেনো বলেছিলে দুঃসময়ে যারা সহায় হয়নি, মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তাদের সন্নিকটে যাবে না? আমি বুঝতে পারছি, তোমার সুখের কথা মনে পড়েছে, এ সুখকে সুখ বোধ হবে কেনো? তোমার সিদ্ধান্ত নেয়া ভুল ছিলো অনেক পরে জানলে, তাই না?

আমার কথাগুলো শুধু শুনলো ও। চেয়ে চেয়ে দেখলো আমাকে। বারবার কি বলতে গিয়েছে, বলতে দেইনি। এবার বলতে গিয়ে ও বলতে পারলো না। চোখ দুটো ফেঁটে জল এলো। ও কান্না করলে সহ্য করতে পারি না। ও কান্না করে জেতে। ও কান্না করলে ওকে ইচ্ছাপূর্বক আমি জিতিয়ে দিই। বাবা মাকে ছেড়ে আমার যে কষ্ট হয়, ওরও তো কম হয় না। এই ভেবে ওর ছোটখাটো ভুল আমি দেখেও না দেখার ভান করি। ও কষ্ট পাবে এমন কাজ করি না। 

ও উঠে বাইরে চলে গেলো। আমিও ওর পাশে এলাম। ও একটু চেয়েও দেখলো না ওর পাশে যে আমি। আমি ওর কাঁধটা ধরলাম, তবুও ও ফিরলো না। জোর করে ওকে আমার দিকে ফেরালাম। ও ফিরলো, কিন্তু দৃষ্টি দিলো আকাশের দিকে। ওর চোখের জল যতটুকু সম্ভব মুছে দিলাম। ও রাগ বা অভিমান করে কান্না করলে অশ্রু মুছে দিতে গেলে হাত সরিয়ে দিতো। অথচ আজ ও হাত সরিয়ে দিচ্ছে না। দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁট কাটলো। বুঝলাম, ও রাগ করে অনুরাগের কারণে, অভিমান করে আদর প্রাপ্তির কারণে। আজ ও ব্যাপক কষ্ট পেয়েছে, যাতে মূহ্যমান। ও যেমন ফন্দি করে আমায় ভুলায়, তা তা করলাম। কোনো কিছুতেই কাজ হলো না।

নাহ, নড়ে না, স্টাচু। ও আকাশ দেখতেই রত। আকাশের মনটাও খারাপ। গোমড়া মুখে সেও চেয়ে। না পেরে বললাম, অর্থাৎ তুমি তোমার মতেই অনড়? তুমি বাবা মায়ের কাছে তবে ফিরেই যাবে?

ও এতক্ষণে নড়ে উঠলো, বিদ্যুৎবেগে আমার দিকে তাকালো। ওর চোখের ভাষায় দ্বৈততা মিশ্রিত। আশার দ্যুতি, না নিরাশার ঝাড়বাতি বোঝা দায়। 

তখন হিমেলের ফোন এলো, ও খু্ব বিষণ্ন মনে বললো, দীর্ঘয়ীর মা বাবা তো আমাকে, আমার পরিবারকে দুষছেন, আমাদের বাড়ি যদি বেড়াতে না আসতিস তবে তাঁদের মেয়ে তাঁদের মুখে চুনকালি দিতো না।

হিমেলকে কি বললো বুঝে পেলাম না। পরক্ষণে বললো, কাল তোর শ্বশুরমশায় আসবে, দেখ্ বাধ্য হয়েই ঠিকানাটা আমি দিয়েছি।

ও ফোন রেখে দিলো, দুশ্চিন্তা আমাকে গ্রাস করলো। দীর্ঘয়ীকে জানালাম না যে, কাল ওর বাবা আসবেন। জানালে সারারাত নানা পরিকল্পনা করবে। শুধু ওকে বোঝাতে চেষ্টা করলাম, ওর মুখের উপর চলে আসা এলোমেলো চুলোগুলো পিছনে ঠেলে দিলাম। আমি নিজেকে বুঝ দিতে থাকি, আর যায় হোক ও সম্পর্ক ছেদ করার মত কঠিন সিদ্ধান্ত নেয় কি করে? ও হয়ত হয়রানি দিয়ে আমায় পরীক্ষা নিচ্ছে। কান্নাও করছে না, কান্না করতে করতে হয়ত বুক হালকা হয়ে গিয়েছে। আমি বললাম, ঝড়ের কাছে তুমি তবে হেরেই গেলে? একটি বার কি ভাবো না তুমি চলে গেলে আমার কি হবে? একটি মানুষের দেহ থেকে যদি আত্মা চলে যায় তবে দেহ নিয়ে করবে কি সে?

দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমার দিকে তাকায় সে। কিন্তু পাষাণ হৃদয়া ভাল, মন্দ কিছু বললোই না। ও কেমন করে রাগকে এত দীর্ঘ সময় আয়ত্বে রাখতে পারে? হঠাৎ করে ওকে দূর সীমানার অচেনা লোকের মত বোধ হচ্ছে। এত দুর্বোধ্য মুহূর্তের রাগে কিভাবে হতে পারে ও। 

সকাল সকাল বাবা এসেছেন। বাবাকে পেয়ে যারপরনাই খুশী দীর্ঘয়ী। খুব প্রাণোচ্ছ্বল দেখাচ্ছে ওকে। আমি যত সম্ভব আমার শ্বশুরকে সম্মানিত আর আপ্যায়িত করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। শ্বশুর বাবার মুখে একটাই কথা, দীর্ঘয়ীকে নিয়ে চলে যাবেন, বাঁধা দিলে মামলা, মকদ্দমাতে যাবেন।

আমার ভয় বেড়ে গেলো। স্বস্তি পাচ্ছি না। বাবার সাথেই থাকছে আর বাড়ির গল্প শুনছে সে। আমি তাকে ডেকেও একান্তে পাচ্ছি না। কোনো এক ভাবে তাকে পাশে পড়ার রুমে ডেকে নিলাম। ও গর্জিয়ে শুনিয়ে দিলো, আমার প্রতি তোমার বিশ্বাসটা হালকা হয়ে গিয়েছে। বিশ্বাস শূন্যতায় থাকা যায়, বাঁচা যায় না।

দীর্ঘয়ী চলে গেলো। বুঝলাম না ওকে অবিশ্বাস করলাম কবে! আমি এমনিতেই আছি ও চলে যাবে সেই চিন্তায়। শ্বশুর বাবা এসে আধিপত্য বিস্তার করে বলতেই আছেন, গুছিয়ে নে মা, আমার সাথে যাবি।

কথাগুলো মস্তিষ্কে গিয়ে বিঁধলো। নিয়ে যাবেন মানে? আমি কি সদ্যোজাত? ভালোতে ভালোতে আরো একবার চেষ্টা করলাম। দীর্ঘয়ীকে পাশের রুমে ডাকলাম আর বললাম, আমি তোমার কোন বিশ্বাস ভেঙেছি বলো! আমার ঘরটা শূন্য করে দেবে কেনো? আমার দুঃখ কষ্টের কারণ হবে কেনো? আমায় ছেড়ে যাবে কেনো? তুমি যাবে না বাবার সাথে, আমি একা বাঁচবো না!

ও দৃঢ়কণ্ঠে বললো, যাদের সন্তান তাদের বুকে ফিরে যাওয়ার মানে কী বুঝেছো তুমি? আমি কি সম্পর্ক ভাঙার কথা বলেছিলাম! আমি যা কল্পনাও করতে পারি না, তুমি তাই ভাবো। একটু রাগলে তুমি বিচার করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলো। তুমি কি আজীবনই আমাদের চার বাবা মায়ের স্নেহাশিস থেকে দূরে থাকবে? আমি বাবা মাকে ভুলতে পারিনে, শুধু আমার চোখের সামনে তাদের ভেজা চোখ ভেসে উঠে। 

দীর্ঘয়ী আর কোনো কথা বললো না। বাবার কাছে চলে গেলো। আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। ও ওর বাবা মাকে কত স্মরণ করে! অথচ আমি আমার বাবা মায়ের প্রতি হিংসা করে আছি। ঠিকই তো, আমি তো ওকে ওর বাবা মায়ের বুক থেকে কেড়ে এনেছি। পছন্দের মানুষকে পাওয়ার জন্য কত জঘন্য হয়েছি আমি। 

ওকে হারানোর পূর্বের সে ভয়টা কমে এসেছে। কিন্তু বাবার সাথে যেয়ে যদি সুর পাল্টে নেয়! বাবা মা যদি তাকে নিজেদের মত করে বুঝিয়ে আর না আসতে দেন! ওকে অন্তত এ মুহূর্তে যেতে দেয়া ঠিক হবে না।

আমি আমার কয়েকটি বন্ধুকে ফোনে জানালাম ব্যাপারটা। ওরা বললো, তোর শ্বশুর তোর বৌকে নিয়ে যেতে চাইলে জানাবি, দল বল নিয়ে এসে প্রতিহত করবো।

বাবা থাকার ঘর, পড়ার ঘর ঘুরে ঘুরে দেখছেন। আর বাবাকে সঙ্গ দিচ্ছে দীর্ঘয়ী। দীর্ঘয়ীর বই-পুস্তক, আমার বই-পুস্তক দেখে দেখে সময় কাটাচ্ছেন বাবা। আমি তাদের অলক্ষ্যে তাদের অনুসরণ করছি। তাদের আলোচনা আমার বিরুদ্ধে গেলেই বন্ধুদের ডাকবো। দীর্ঘয়ী বাবাকে বললো, তিন দিন ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাসে যায়, আর তিনদিন পার্ট টাইম কাজ করে, বাবা। আমাকেও কলেজে ভর্তি করে দিয়েছে। সকালে দিয়ে আসবে, ক্লাস শেষে নিয়ে আসবে। আমাকে অনেক যত্ন করে ও, বাবা। অনেক কষ্ট করে ও, বাবা। তোমরা যদি ওকে একটু সহয়তা করতে, ও অনেক দূর যেতো, বাবা। 

বলেই দীর্ঘয়ী কান্না করতে লাগলো। ওর প্রতি আমার ধারণা মুহূর্তে পরিবর্তন হয়ে গেলো। কি ভূমিকা পালন করে চলেছে ও, আর আমি তাকে কি ভেবেছি! বাবা পূর্বাপেক্ষা শান্ত হয়ে গেলেন। 

বিকালেন বাসে বাবা বাড়ি চলে যাবেন। দেখলাম দীর্ঘয়ীকে নিয়ে যাওয়ার জন্য কোনো তাড়া নেই তাঁর। আমরা দুইজন তাঁকে পৌঁছে দিতে গিয়েছি। একবার আমার দিকে একবার দীর্ঘয়ীর দিকে তাকিয়ে বাবা বললেন, মেয়ের জন্য দুশ্চিন্তা করতাম। আজ অনেক নিশ্চিন্ত হলাম। আর দুশ্চিন্তা করবো না, এবার থেকে চিন্তা করবো, তবে শুধু দীর্ঘয়ীর জন্য নয়, তোমাদের দুই জনের জন্যই। তোমাদের জন্য আমার আশীর্বাদের দুয়ার অবারিত করে দিলাম। এমন সংগ্রামশীল আর দায়িত্ববান ছেলেই পারবে আমার মেয়ের যথাযথ দায়িত্ব নিতে।

বাবাকে বাসে উঠিয়ে দিয়ে দুইজন রিক্সা করে ফিরছি। ওর মুখে হাসি। সূর্য করোজ্জ্বল হাসি। যাকে হারানোর প্রবল ভয় জেগেছিলো সে তার ঘামগন্ধের সন্নিকটে রেখেছে আমাকে। খুব প্রাপ্তির স্বস্তিতে আছি। দীর্ঘয়ী বললো, দেখেছো, বাবা কত ভালো, শুধু আমি না বাবাও তোমায় পেয়ে সন্তুষ্ট। পার্থক্য এইটুকুই তোমাকে চিনতে আমার সময় কম লেগেছিলো, বাবার সময় লেগেছে বেশী। 

দুই জন বাড়ি এলাম। ওকে পড়াতে বসলাম। ওকে আর কি পড়াবো, ঐ-ই পড়ায়! বললো, তরকারি রান্না করতে পারি না, বকো না; পড়া পারি না, বকো। যা পারবো না, তাতেই বকতে হবে, নতুবা তোমার শাসন মানবো না।

বললাম, সব না পারাতেই যদি শাসন করি তবে তা অপশাসন হবে।

ও বললো, যে শাসনে শুদ্ধতা আসে, সে শাসন অপশাসন হয় কি করে!

আমি মুগ্ধ হয়ে ওর কথা শুনি। কি মিষ্টি করে কথা বলে ও! সময়ে শাসন করে, সময়ে শাসিত হওয়ার আকুলতা। 

পরের দিন দীর্ঘয়ীর মা দীর্ঘয়ীকে ফোন করেছেন। বললেন, তোর বাবার কাছ থেকে সব শুনেছি। তোরা ভালো আছিস জেনে আমারও খুব ভাল লাগছে। কিন্তু মা, তুই পড়ছিস পড়্, জামাইকে পুরোদমে কাজে লেগে যেতে বল্। 

দীর্ঘয়ী শুনে আশ্চর্য হয়ে বললো, তোমরা চাও আমার স্বামী শ্রমিক হোক, আমি চাই আমার স্বামী বড় অফিসার হবে। 

বলেই দীর্ঘয়ী ফোন কেটে দিলো। আমি বললাম, মায়ের মুখের উপর ওভাবে কেউ কথা বলে? বুঝিয়ে বললে তো বুঝবেন। 

ও বললো, দুর্দিনে আমাদের পাশে কেউ ছিলো না, আমরা আমাদের অসময় কাটিয়ে উঠেছি প্রায়, বাইরের কারো উপদেশ আমার কাছে গ্রাহ্য নয়। মায়ের চিন্তা সুন্দর না। তুমি অনেক বড় হবে, তোমার বড় হওয়ার পথে কেউ বাঁধা দিলে বাঁধা হয়ে দাঁড়াবোই।

বললাম, মা হয়ত বিস্তারিত জানেন না। মাকে বুঝিয়ে বলবে, তিনি যেন আমাদের নিয়ে কোনো অপরিষ্কার ধারণা মনে পুষে না রাখেন। একদিন দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে। আমরা পাবো স্বর্গের চেয়ে সুন্দর একটা জীবন।

বলেই ওর দিকে তাকালাম। ও নিষ্পলকে চেয়ে আছে। চোখে মুখে স্বস্তির একটা আভা। কাল সারাটা ক্ষণ, আমাকে শূলে চড়িয়ে খেলা দেখেছে, একটা সাজা না দিলে বড় ক্ষমাশীল হয়ে যাওয়া হবে। হঠাৎ অযথা রেগে উঠে বললাম, গতদিন তুমি অনেক সাজা দিয়েছো, আজ সুদে আসলে উঠিয়ে নেবো।

ও আমার ধীর কদমে আগমন দেখে লাজুক হেসে দুই হাত সামনে হ্যাঁ-বাচক ভঙ্গিতে নাচিয়ে বলতে লাগলো, ঠিক আছে, আসলে আসো। ভাগ বসানোর কেউ নেই, হিংস্র হয়ো না।

অন্যান্য দিন ওকে আদর দিতে আমার বেগ পেতে হলেও আজ তেমনটি হলো না। ও গাল পেতে দিলো, পাশাপাশি আমি কপাল-কপোলও কেড়ে নিলাম। আজ ঠোঁট দুটো বড় বেশী মাত্রা অতিক্রম করলো।

 যশোর

Share This
Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on telegram
Share on email
Share on linkedin
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
এই না হলে বস্তী! ভোরের কিঞ্চিৎ আলো উঁকি মারার পূর্বেই বড়রা কাজ সেরে মোটামুটি নিশ্চিন্ত। ছোটরা এবার ব্যস্ত। সারি দিয়ে ট্রেন রাস্তার পাশে বসে …
না থাকার মত দশটি ছেলে বন্ধুর চেয়ে একটি ভালো মেয়ে বন্ধু থাকা ভালো। দশটি ছেলে বন্ধুর সান্নিধ্যের চেয়ে একটি মেয়ে বন্ধুর সান্নিধ্য অনেক বেশী …
বেশ কয়েক মাস পরে ছবেদার বাবা মা ছবেদাকে দেখতে এসেছেন। বাবা মাকে পেয়ে মনের কষ্ট ছবেদা বলতে থাকলো। বললো, বাবা, আমি আর টাকওয়ালা জামাইয়ের …
সৌহার্দ্যকে মোটেও পছন্দ করে না সৌরিন্দ্রীয়া। কিন্তু সৌরিন্দ্রীয়ার মা সুতপা সৌহার্দ্যকেই নিজের মেয়ের যোগ্য মনে করেন। এ কারণে সৌরিন্দ্রীয়ার সাথে মায়ের বেশ অঘোষিত সম্পর্ক …
আমি যখন শিক্ষাজীবনের শেষলগ্নে তখন বাধ্য হয়ে একটি বাচ্চাকে পড়াতে গিয়েছিলাম। বাচ্চাটির বাবা মা দুজনই চাকরি করেন। বাচ্চাটি একা থাকতে থাকতে একরোখা আর বদমেজাজি …
Read More
এই না হলে বস্তী! ভোরের কিঞ্চিৎ আলো উঁকি মারার পূর্বেই বড়রা কাজ সেরে মোটামুটি নিশ্চিন্ত। ছোটরা এবার ব্যস্ত। সারি দিয়ে ট্রেন রাস্তার পাশে বসে …
না থাকার মত দশটি ছেলে বন্ধুর চেয়ে একটি ভালো মেয়ে বন্ধু থাকা ভালো। দশটি ছেলে বন্ধুর সান্নিধ্যের চেয়ে একটি মেয়ে বন্ধুর সান্নিধ্য অনেক বেশী …
বেশ কয়েক মাস পরে ছবেদার বাবা মা ছবেদাকে দেখতে এসেছেন। বাবা মাকে পেয়ে মনের কষ্ট ছবেদা বলতে থাকলো। বললো, বাবা, আমি আর টাকওয়ালা জামাইয়ের …
সৌহার্দ্যকে মোটেও পছন্দ করে না সৌরিন্দ্রীয়া। কিন্তু সৌরিন্দ্রীয়ার মা সুতপা সৌহার্দ্যকেই নিজের মেয়ের যোগ্য মনে করেন। এ কারণে সৌরিন্দ্রীয়ার সাথে মায়ের বেশ অঘোষিত সম্পর্ক …
আমি যখন শিক্ষাজীবনের শেষলগ্নে তখন বাধ্য হয়ে একটি বাচ্চাকে পড়াতে গিয়েছিলাম। বাচ্চাটির বাবা মা দুজনই চাকরি করেন। বাচ্চাটি একা থাকতে থাকতে একরোখা আর বদমেজাজি …

No connection