বিয়ে-পাগলের-পক্ষে-বিপক্ষে

বিয়ে পাগলের পক্ষে-বিপক্ষে

রমিজ আর লাভলু বসে আছে। রমিজের মনের মধ্যে রাজ্যের যত কষ্ট সব ভর করেছে। গোমড়া মুখে নিরীহ প্রাণীর মত লাভলুর দিকে চেয়ে বললো, আব্বা তো মনে হয় আমাকে বিয়ে দেবে না।

লাভলু উৎসুকের মত চেয়ে বললো, বিয়ে তোর অধিকার। তোর অধিকার তোর আব্বা খর্ব করতে পারেন না।

রমিজ নির্জীব চেয়ে বললো, মা বলে কাজ করিস না, বেকার। তোর বিয়ে হবে না। বিয়ে দেয়া সম্ভব না।

লাভলু আত্মবিশ্বাসের সাথে বললো, সম্ভব না মানে? অসম্ভব বলে কিছু নেই।

রমিজ ব্যর্থ মনোরথে বললো, আমরা তিন ভাই। দুই ভাই বিয়ে করেছে। আর আমি বিয়ের স্বপ্ন দেখতে পারবো না?

লাভলু কটাক্ষ করে বললো, আরে স্বপ্ন দেখতে মানা কিসের?

রমিজ দীর্ঘশ্বাস কেটে বললো, বাবা-মা বিরুদ্ধে গেলে কি বিয়ে হয়? বাবা বলেছে বিয়ে বিয়ে করে নাকি আমি পাগল হয়ে গেছি।

লাভলু বিজ্ঞের মত করে বললো, তোর বিয়ের ক্ষেত্রে তোর বাবা তো খুব বড় ধরনের বিরোধিতা করছেন। অর্থাৎ তোর বাবা তোর প্রতিপক্ষ। এটা অন্যায়। তোর মত সুস্থ, সুন্দর, সবল আর সাবালক ছেলেকে যদি বিয়ে না দেন এটা মেনে নেয়া যায় না। 

রমিজ লাভলুর মুখে চেয়ে বললো, এক এক করে সবার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। আর আমি পড়ে আছি। যে করে হোক আমার বিয়ের ব্যবস্থা কর্!

লাভলু বললো, এক এক করে সবার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে না। ছবেদ আলী, চান মিয়া বা মোকাব্বের খানের বয়স তোর চেয়ে বেশি। এবং ওরা কেউ বিয়ে করেনি।

রমিজ হায় নিঃশ্বাস কেটে বললো, ওরা তো শিক্ষিত। শিক্ষিতরা দেরি করেই বিয়ে করে। তাছাড়া তারা চাকরি খুঁজছে। চাকরি পেলেই বিয়ে করে ফেলবে। কিন্তু আমি তো অশিক্ষিত। আমি তো চাকরি খুঁজছি না যে, বিয়ে দেরি করে করতে হবে।

লাভলু অন্যভাবে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করলো, বললো, জোহর, মোহন বা বারেক ওরা তো অশিক্ষিত। ওরা তোর আব্বার বিয়ে পর্যন্ত খেয়েছে। ওরাও তো এখনো বিয়ে করেনি।

রমিজ পূর্বাপেক্ষা জোরে দীর্ঘশ্বাস কেটে বললো, ওরা তো গরীব। টাকা-পয়সা নেই। বিয়ে করবে কি করে? কিন্তু আমার আব্বার তো অনেক টাকা। আমার বিয়েতে দেরি হবে কেন?

রমিজ একথা বলেই লাভলুকে ছেড়ে চলে গেলো। রাস্তায় একসাথে ছবেদ আলী, চান মিয়া আর মোকাব্বের খানের সাথে দেখা। রমিজ আচ্ছা মত ধরলো। বললো, আচ্ছা, আপনারা বিয়ে করেন না কেনো? আমি বিয়ে করতে চাইলেই বাবা, মা, ভাই, ভাবী এমন কি বন্ধুরাও আপনাদের নাম বলে আর বলে ওরা এখনো বিয়ে করেনি, তুই বিয়ে করবি কেনো? আপনারা আমার বিয়ের পথে বাঁধা। 

ছবেদ আলী বললো, নিজ পায়ে না দাঁড়িয়ে বিয়ে করলে সংসারে অভাব, অনটন, কলহ লেগেই থাকবে।

রমিজ মুখে মুখে জবাব দিলো, বললো, নিজ পায়ে দাঁড়ালেও অভাব, অনটন বা কলহ যাবে না। অভাব জীবনের সঙ্গী। আপনারাও বিয়ে করেন, আমারও বিয়ের পথ উন্মুক্ত করেন।

চান মিয়া মনের কষ্ট খুলে বললো, বড় ভাইটা এখনো বিয়ে করেনি। শহরে চাকরি করে। তাই আমার বিয়েটাও হচ্ছে না।

রমিজ রেগে গিয়ে বললো, সিরিয়াল মেনে বিয়ে করলে আপনার আর বিয়েই করতেই হবে না। বড় ভাইয়ের বিয়ের পর বিয়ে করতে চাইলে বিয়ের অপেক্ষা অপেক্ষাই থেকে যাবে। বৌর মুখ আর দেখতে হবে না। বৌর মুখ না দেখেই মরতে হবে। আপনার চেয়েও যে বড়, মনে করেন কি তার আর বিয়ের শখ আছে? একুশ বছর বয়সে বিয়ে করার কথা, একত্রিশ হয়ে গেলো বিয়ের তৃষ্ণায় নেই। জীবন থেকে এত এত বছর যে চলে যাচ্ছে, কিভাবে এই ক্ষতি পোষাবেন? 

তারপর মোকাব্বের খানের দিকে তাকিয়ে বললো, আর আপনি বিয়ে করছেন না কেনো?

মোকাব্বের খান বললো, আজ করবো কাল করবো করতে করতে বিয়েটা করা হয়ে উঠেনি। তাছাড়া চাকরিটাও জোটাতে পারিনি। 

রমিজ ক্ষিপ্ত হয়ে বললো, চাকরি না পেলে বিয়ে করা যাবে না একথা কোথায় পড়েছেন? এই আপনারা শিক্ষিত মানুষ দেরিতে বিয়ে করে আমাদের মত সাধারণ মানুষদের বিয়ের পথ অবরুদ্ধ করে ফেলছেন।  না কাছের, না দূরের আত্মীয়, অথচ আপনাদের অবিবাহিত থাকা আমার বিয়ের পথে অন্তরায়। সহ্য করা যায়? মনের জোয়ারে কি ভাটা পড়েছে? একটা বিয়ে পর্যন্ত করতে পারলেন না? কিসের পুরুষ? চুড়ি পরেন। এক মাসের মধ্যে বিয়ে করবেন, না হয় গ্রাম ছেড়ে শহরে যাবেন।

রমিজ এবার জোহরের বাড়ি গেলো। জোহরকে পেয়েই বললো, চিরকুমার থাকার শখ? অন্য গ্রামে চলে যান।

জোহর অপ্রস্তুত হয়ে বললো, মানে? কি বলছো তুমি?

রমিজ উচ্চস্বরে বললো, আমার আব্বার বিয়ে পর্যন্ত আপনি খেয়েছেন, অথচ আজো বিয়ে করেননি কেনো?

জোহর এতক্ষণে বুঝলো, বললো, ও এই কথা? আসলে বিয়ের বয়সটা চলে গেছে। সিদ্ধান্ত নিয়েছি আর বিয়ে করবো না।

ভেংচি কেটে রমিজ বললো, আর বিয়ে করবো না! আমি বিয়ে করতে চাইলেই মানুষ বলে জোহর এখনো বিয়ে করেনি, তুই বিয়ে করবি কেন্? আপনার জন্য আমার বিয়ে হচ্ছে না। বিয়ে করেন, নতুবা গ্রাম ছাড়েন। 

এভাবে হুমকি দিয়ে রমিজ এবার মোহনের বাড়ি গেলো। মোহনের মাকে পেয়ে বললো, চাচী, আপনার ছেলে মোহনকে বিয়ে দেন না কেনো? বৌমা ঘরে এলে কি আপনার সম্পদ লুটে খেতো? কেমন মা আপনি?

মা কান্না শুরু করে বললেন, বাবারে, আমি কোনমতে মোহনকে রাজী করাতে পারি না। ওকে আমি বিয়ে দিতে ব্যর্থ হয়েছি। সবার ঘরে বৌমা, নাতি-নাতনি আছে। আমার ঘরে কেউ নেই। আমার বুকটা যে খা খা করে, বাবা।

রমিজের রাগ চলে গেলো। বললো, আপনি ছেলেকে বিয়ে দেয়ার জন্য কত চেষ্টা করছেন আর আমার বাবা মা আমাকে বিয়ে দেবে না বলে কত চেষ্টা করছে। আমার মা বাবা এমন কেনো?

রমিজ মন খারাপ করে বন্ধু লাভলুর কাছে ফিরে গেলো। রমিজ বললো, বাড়ি যেতে ইচ্ছে করে না। বাড়ির কেউ আমার ভালো চায় না। শুনেছি, বিয়ে করলে স্বাস্থ্য বাড়ে। আচ্ছা, বিয়ে করলে তো আমি আর হ্যাংলা-পাতলা থাকবো না, মা-বাবা এসব বোঝে না কেন্?

লাভলু কৌণিক চোখে চেয়ে বললো, চিন্তা করিস না। তোর বিয়ে তো এখন সময়ের দাবী।

রমিজ বললো, আস্তে আস্তে আমার বয়স বেড়ে যাচ্ছে। সেদিকটা কেউ দেখছে না। 

লাভলু হেসে বললো, আরে ধূর, তোর আর এমন বয়স হলো কই?

রমিজ হতাশার সুরে বললো, আমার জন্মের সাল-তারিখ আমার বাবা মা লিখে রাখেনি। তাই সঠিক বয়সটা বলতে পারছি না। আমি আমার মেজ ভাইয়ের চেয়ে চার বছরের ছোট। মেজ ভাই বিয়ে করেছে আজ চার বছর। ভেবে দেখ্ বিয়ের ক্ষেত্রে মেজ ভাইয়ের চেয়ে আমার দেরি হচ্ছে কিনা!

লাভলু সান্ত্বনা দেয়ার জন্য বললো, ওরে পাগল, পুরুষ মানুষ দেরি করেই বিয়ে করে। 

রমিজ হতাশার সুরে বললো, দেরি করে বিয়ে করলে রোগ-বালাই হয়, শুনেছি। শোন্, এখন আমি এক লাফে গাছের মগডালে উঠতে পারি, পাঁচ বছর পর কি উঠতে পারবো? তখনও তো পুরুষই থাকবো, শক্তি কি থাকবে? অক্ষম পুরুষ হবো।

মন্টু এসেই কথাটি শুনে বললো, জরুরি ভিত্তিতে তোর বিয়ের ব্যবস্থা করবো। তোর বিয়ে অনিবার্য।

সাজু এলো, ও বললো, তোর বিয়ে না হওয়ার কারণ শনির দশা। চল্, কবিরাজের কাছে যাই।

রমিজ চোখ গোলগোল করে বললো, আমি আবার এমন কি অন্যায় করেছি যে আমার বিয়েতে শনির দশা পড়লো? 

সাজু আত্মবিশ্বাসের সাথে বললো, অন্যের বিয়ে করা দেখলে স্থির থাকতে পারিস না। অন্যের বিয়ে খেতে গিয়ে নিজের বিয়ের কথা ভাবিস। অন্যের বৌকে দেখে ভাবিস, এমন একটা বৌ যেন আমার হয়। এমন এমন ভাবিস কিনা বল্? শনির দশা কি এমনিতেই পড়েছে?

রমিজ মুহ্যমান হয়ে বললো, আমি আর অন্যের বিয়ে করা দেখে অস্থির হবো না। অন্যের বিয়ে খেতে গিয়ে নিজের বিয়ের কথা ভাববো না। অন্যের বৌকে দেখেও আজেবাজে ভাববো না। এমন কি অন্যের মেয়ে দেখেও বাজে নজরে দেখবো না। তারপরও কি শনির দশা কাটবে না?

সাজু বললো, শনির দশা অত সহজে কি কাটবে? 

মন্টু সাজুর কথার সাথে একমত পোষণ করে বললো, কবিরাজের কাছে চল্, দেখি তোর শনির দশার কি অবস্থা? 

ওরা সবাই কবিরাজের কাছে গেলো। রমিজ কবিরাজের পা ধরে বসে বললো,বাবা, আমার বিয়ে হচ্ছে না। আমি একটা বিয়ে করবো। আমার একটা বিয়ে দরকার।

কবিরাজ বললেন, বিয়ে করবি ভালো কথা, বিয়ে করে না কে? তোর নানা, দাদা বিয়ে করেছে। তোর বাবা, তোর কাকা বিয়ে করেছে। তোরও বিয়ে হবে। কিন্তু… 

কবিরাজ কিন্তু বলে থেমে গেলেন। রমিজ উৎসাহী হয়ে বললো, কিন্তু কি বাবা? শনির দশা, নাকি গ্রহের অভিশাপ?

কবিরাজ বললেন, তুই বিয়ে করতে গেলে ঐ বাড়ি গণ্ডগোল হবে৷ আর তোর বিয়ে ভেঙে যাবে। 

রমিজ লাভলুর দিকে তাকিয়ে কেঁদে দিলো। লাভলু বললো, বিয়ে শুভ কাজ, ভাঙবে কেন?

কবিরাজ বললেন, শুভ কাজে বাঁধা বেশি।

রমিজ অস্থির হয়ে বললো, আমার বিয়েই এত ঝামেলা, আর ভালো লাগে না। মনে হয় মরে যাই।

কবিরাজ বললেন, ভেঙে পড়িস না। তোর কপালে সাত বিয়ে লেখা।

রমিজ এবার একটু হাসলো আর বললো, আপাতত আমার প্রথম বিয়ে হবে ক দিনের মধ্যে?

কবিরাজ বললেন, তোর প্রথম বিয়ে হবে এখন থেকে ঠিক সাত বছর পর, সোমবার।

রমিজের মুখটা আবার অন্ধকারে ভরে গেলো, বললো, বুঝেছি বাবা, বিয়ে আমার ভাগ্যে নেই। পাড়ার সবার বিয়ে হয়ে গেলো। পড়ে থাকলাম শুধু আমি। বোঝা শেষ, বিয়ে আমার কপালে নেই!

কবিরাজ তাঁর ঢঙে বললেন, বলেছি তো, তোর কপালে সাত বিয়ে। সাত বছর পর থেকে নিয়মিত বিরতি দিয়ে তুই বিয়ে করতে পারবি। সাত বছর অপেক্ষা এমন আর কি!

কবিরাজের কথা তাদের কারো ভালো লাগলো না৷ ব্যর্থ মনোরথে রমিজ বাড়ি ফিরে এলো। মেজ ভাবীর কাছে গেলো। বললো, ভাবী, আমার বিয়ের সময়ই কি পৃথিবীতে কন্যা সংকট পড়লো? কেউ বলে আমার বিয়ে হবে না। কেউ বলে আমার কপালে বৌ নেই। কেউ বলে বিয়ে হবে, তবে সাত বছর পর। আর আব্বা তো আমার মুখে আমার বিয়ের কথা সহ্যই করতে পারে না।

মেজ ভাবী জেবুন্নেসা বললো, আসলে আমিও বুঝতে পারছি না, আব্বা তোমার বিয়ের ব্যাপারে এত উদাসীন কেনো? তোমার এখনই বিয়ের উপযুক্ত সময়। বেশি বয়সে বিয়ে করলে বৌ কিন্তু বলবে, মিনশের মুরদ নেই আবার বিয়ে করেছে। গায়ে-গতরে শক্তিই কিন্তু শেষ না!

রমিজ ছটফট শুরু করলো আর বললো, বাবা রাজি না হওয়ার কারণ কি? কেউ কাজ করে দিতে রাজি না হলে তো ঘুষ দিতে হয়। বাবা কি শেষ পর্যন্ত আমার কাছ থেকে ঘুষ খাবে?

জেবুন্নেসা আরো দেবরকে লেলিয়ে দিলো, বললো, যত তাড়াতাড়ি বিয়ে করবে, তত তাড়াতাড়ি বাচ্চা হবে। তত তাড়াতাড়ি বাবা ডাক শুনবে। বাবা ডাক শুনলে প্রাণ জুড়িয়ে যাবে।

অত্যাশ্চর্য হয়ে কথাগুলো শুনলো রমিজ। তারপর ছটফট করতে করতে বাইরে চলে গেলো। জেবু্ন্নেসা তা দেখে হাসলো আর বললো, দুই ভাই খাটবে আর গোষ্ঠীশুদ্ধ খাবে, তাই না? তোমার বিয়েটা আগে দিয়ে নিই, তবে মজা বুঝাবো!

পরের দিনের ঘটনা। মন্টু বললো, চল্, আজ নান্টু ঘটকের কাছে যাই। ঘটকের কাজ কি কবিরাজ পারে?

ওরা সবাই নান্টু ঘটকের বাড়ি গেলো। কিন্তু নান্টু ঘটক বাড়ি নেই। রমিজ আশাহত হয়ে বললো, ঘটক বাড়ি থাকবে কেনো? আমার কপালটাই পোড়া।

সাজু বললো, এত অধৈর্য হলে কি হয়? বিয়ে তো একটাই করবি। 

রমিজ বললো, ধৈর্য ধরতে বলছিস? বুঝেছি, আমার বিয়ে দেয়া নিয়ে তোদের কারো ভাবনা নেই। তাড়া নেই।

রমিজ রাগ করে বাড়ি চলে এলো। বাড়ি এসেই খেজুর গাছের মাথায় উঠলো। বেশ কয়েকটা কাটা তার গায়ে-পায়ে-হাতে বিঁধলো। মাকে উদ্দেশ্য করে বললো, তোমার দুই ছেলের বিয়ে দিয়েছো। আর আমার বেলা পক্ষপাতিত্ব। আমাকে কবে বিয়ে দেবে, দিন দাও, তারিখ দাও, নতুবা মরবো।

মা রাহেলা দৌঁড়ে এলেন, বললেন, বাবা, নেমে আস্। পাগলামি করিস না। 

রমিজ চিৎকার করে বললো, তোমরা আমার বিয়ে নিয়ে তালবাহানা করছো কেনো? দুই ভাইয়ের বিয়ে শেষ। সবাই বলছে এবার আমার পালা। কিন্তু আমার পালা কবে? দিন-তারিখ সুনির্দিষ্ট করে প্রকাশ করো। পাড়া প্রতিবেশী স্বাক্ষী হবে।

বড় ভাবী নুরুন্নেসা ছুটে এলো, বললো, নেমে আসো ভাই। বাড়ির মান-সম্মান চলে যাবে। নেমে আসো, আমি মাংস রান্না করেছি। খাবে। নামো।

রমিজ দৃঢ়কণ্ঠে বললো, তোমরা সবাই আমাকে বিয়ে দেবে না বলে উঠে পড়ে লেগেছো। কবে বিয়ে দেবে তার লিখিত দাও। নতুবা আত্মহত্যা করবো।

রাহেলা বললেন, বাবা আমার, তোর বাবাকে আমি বুঝায়ে বলবো। নেমে আয়।

মায়ের কথাতে আশান্বিত হয়ে রমিজ নেমে এলো। কাঁটার খোচাতে রক্তাক্ত সে। সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। বড় ভাবী ধরে রান্না ঘরে নিয়ে খেতে দিলো আর বললো, বিয়ের জন্য এত পাগল হচ্ছো কেনো?

রমিজ বিস্ময় প্রকাশ করে বললো, তোমরা কি জানো না, সময়ের কাজ সময়ে করতে হয়? 

নুরুন্নেসা বললো, বিয়ের জন্য পাগল হলে মানুষজন নানা কথা বলাবলি করবে, হাসাহাসি করবে।

রমিজ বললো, বড় ভাই বিয়ে করলো কেউ হাসাহাসি করলো না, মেজ ভাই বিয়ে করলো কেউ হাসাহাসি করলো না। আর আমি বিয়ের কথা বললে মানুষজন হাসাহাসি, বলাবলি করবে কেনো? পাছে মানুষ কিছু বললেও আমার কিছু আসে যায় না। আচ্ছা ভাবী, আমাকে তোমরা বিয়ে দিচ্ছো না কেনো?

নুরুন্নেসা বললো, তুমি কি কোনো কাজ-কর্ম করো?

রমিজ এবার রেগে গেলো, বললো, আমার বিয়ের সাথে কাজ-কর্মের কি সম্পর্ক আছে আমি বুঝতে পারছি না। আমার আব্বা, দুটো বড় ভাই থাকতে আমি কাজ করবো কেনো?

নুরুন্নেসা বললো, কিন্তু তোমার বিয়ের বয়সটা হোক।

রমিজ ক্ষেপে গেলো, বললো, চামড়া বটলে, দাঁত পড়লে, চুলে পাক ধরলে কি আমার বিয়ের বয়স হবে? আমার চেয়ে ছোট ছোটরা বিয়ে করে দিব্যি সংসার করছে। কপাল পোড়া আমার।

রমিজ ভাত না খেয়ে উঠে গেলো। উঠানে রাখা কলসটা রাগে লাথি মেরে ভেঙে ফেললো। দেখলো সামনে বাবা রকমত সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি কর্কশকণ্ঠে বললেন, তোর সমস্যাটা কি বলতো?

রমিজ বললো, সমস্যা আমার না, তোমার। ঘরে বিয়ের উপযুক্ত ছেলে থাকতে তুমি আছো নিশ্চিন্তে।

রকমত সাহেব গম্ভীরকণ্ঠে বললেন, কি বললি? বিয়ের জন্য উতালা হয়েছিস, তোর কি লাজ-লজ্জা নেই?

রমিজ উত্তর দিলো তৎক্ষণাৎ, বললো, লাজ-লজ্জার ভয়ে চুপ থাকলে ছোট ছেলের যে বিয়ে দরকার সেটা তুমি ভুলেই যেতে।

রকমত সাহেব চোখ দুটো গোলগোল করে উচ্চস্বরে বললেন, তোর বিয়ে করার চিন্তা তোর না, তোর বিয়ে দেয়ার চিন্তা আমার। বিয়ে বিয়ে করলে বিয়ে হবে না, বন্ধুদের সাথে হৈ-হট্টগোল করে না বেড়িয়ে ভাইদের সাথে কাজে যা। কাজ শিখেনে। রোজগার শিখেনে।

রমিজ চলে যেতে যেতে বললো, এ কেমন বাবা? শুধু কাজ করতে বলে! ছোট ছেলে আমি, কাজই যদি করতে হবে, তবে তোমরা আছো কেনো? প্রত্যেক বাড়ির ছোট সন্তান কত আদর পায়!

কিছুক্ষণ এদিক ওদিক ঘুরে আবার বাড়ি এলো। সোজা বড় ঘরে চলে গেলো। ঘরের মধ্যে মা আর বড় ভাবী কাজ করছে। নুরুন্নেসা বললো, কি ভাই, মাথা থেকে কি বিয়ের ভূত গেলো?

রমিজ আশ্চর্য হয়ে বললো, মাথায় আমার বিয়ের ভূত থাকবে কেনো? সবাই বিয়ে করতে পারে আর আমি বিয়ের কথা বললেই মাথায় বিয়ের ভূত, তাই না? শোনো ভাবী, বিয়ে মানুষের জন্মদাবী। আর সেই বিয়ের পথে তোমরা যেভাবে হস্তক্ষেপ করছো, তা ঠিক না। জ্ঞানীরা বলেন, সহযোগিতার হাত বাড়াও। 

রাহেলা আর চুপ থাকতে পারলেন না, বললেন, শোন্ বাবা, বিয়ে বিয়ে করে মাথাটা নষ্ট করিস না। তোর বড় দুই ভাইকে বিয়ে দিয়ে টাকা-পয়সা আর হাতে নেই। 

রমিজ ক্ষুব্ধ হয়ে বললো, ও, সবার বিয়ের সময় টাকা থাকে, আর আমার বিয়ের সময় টাকা থাকে না, তাই না? বড় দুই ছেলের বিয়ের সময় অল্প অল্প খরচ করতে পারোনি? তোমাদের তো বোঝা উচিত ছিলো, আরো একটা ছেলে আছে, তার বিয়েতেও খরচ লাগবে। বুঝেছি, এক এক সময় এক এক কথা। এক সময় বলছো, আমার বিয়ের বয়স হোক, তবেই বিয়ে দেবে৷ আর এক সময় বলছো, হাতে টাকা নেই, টাকা হলে বিয়ে দেবে। এক মুখে নানা কথা। মূল কথা হলো, তোমরা আমাকে বিয়ে দেবে না। সবাই এক জোট হয়ে আমার সাথে শত্রুপনা করছো।

রমিজ হেটে সোজা বন্ধুদের কাছে চলে গেলো। মন্টু বললো, তোর বাবা মা কি রাজি হলেন?

রমিজ রেগে বললো, বাবা মা রাজি হলে তো আমার মুখে হাসি থাকতো। আমার মুখে কি হাসি আছে? কত কষ্টের ছায়া এই মুখে ভাসছে, দেখেও বুঝতে পারছিস না?

সাজু বললো, বিয়ের মত কাজে বাবা মার সাহায্য না পেলে কি হয়?

রমিজ বললো, কাজ-কর্ম না করলে নাকি আমার বিয়ে হবে না। আরে, বিয়ের পিঁড়িতে বসে বিয়ে করবো, এখানে কাজ-কর্মের কথা আসছে কেনো?

মন্টু হেসে বললো, আসলেই বিয়ের মত একটা দুঃসাহসিক কাজকে কত সহজভাবে দেখিস। তোর মনের মত করে যদি পৃথিবীর মানুষ চলতো তবে পৃথিবীতে কোনো অবিবাহিত মানুষ থাকতো না।

লাভলু এতক্ষণ চুপ ছিলো। সে এবার মুখ খুললো, বললো, জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। রোদের তেজ বেড়েছে, বৃষ্টির প্রকোপ বেড়েছে। শীতের ভয়াবহতাও বেড়েছে। রোজগার কঠিন হয়ে পড়েছে। মানুষ এখন বিয়েই করতে চাচ্ছে না। সেখানে তুই বিয়ের জন্য সদা প্রস্তুত। তুই জগতের ভীতু অবিবাহিত পুরুষদের কাছে এক অনুকরণীয় তেজস্বী যুবক।

রমিজ শুনে মিটিমিটি হাসলো আর বললো, এত প্রশংসা ভালো লাগে না। আমার বিয়েটা হোক, তোদের শত তিরস্কারও শুনবো। চল্, আজ দেখি ঘটক বাড়ি আছে কিনা!

ওরা সবাই নান্টু ঘটকের বাড়ি গেলো। ঘটক বসে আছেন। রমিজ দৌঁড়ে গেলো, ঘটক বাবা, আমি একটা বিয়ে করবো।

ঘটক বললেন, শান্ত হয়ে বস্।

লাভলু বললো, বাবা, ওর বিয়েটা হচ্ছে না। ও বিয়ে ছাড়া বাঁচবে না। ভাত ছাড়া বাঁচবে ও, বিয়ে ছাড়া বাঁচবে না। 

ঘটক বললেন, কেমন মেয়ে লাগবে বল্? মোটা, না চিকন? লম্বা, না খাটো? কালো, না ফর্সা?

রমিজ বললো, আমার কোনো পছন্দ নেই। আমার কোনো বাছ-বিচার নেই, বাবা। 

ঘটক বললেন, ও, তোর একটা হলেই হবে, তাই তো?

রমিজ বললো, আমার বিয়েই হচ্ছে না, আবার পছন্দের কথা? বাবা, মেয়ে আপনার কাছে আছে তো?

ঘটক বললেন, হ্যাঁ আছে। কিন্তু তোর বাবা মা কই? উনাদের ডেকে আন্। আজই বিয়ে হবে।

একথা শুনে রমিজ থমকে গেলো আর বললো, বিয়ে করবো আমি, এখানে বাবা মায়ের কি দরকার? আমার বাবা মা জানলে আমার বিয়ে হবেই না। বিয়ে করে বৌ নিয়ে গিয়ে বাবা মাকে আমি তাক লাগিয়ে দেবো।

ঘটক বললেন, চাকরি-বাকরি কিছু কি করিস?

রমিজ বললো, বাবা, বিয়ের সাথে চাকরির কি সম্পর্ক? বিয়ে করতে হলে কি চাকরি করতেই হবে?

ঘটক বললেন, বিয়ের পর বৌকে কি খেতে দিবি?

রমিজ বিরক্ত প্রকাশ করে বললো, বৌ প্রজাতি কি স্পেশাল কিছু খায়? আমাদের পরিবারে সাতজন আছে। আমরা সবাই ভাত, মাছ, ডাল খেতে পারলে আমার বৌ কি খেতে পারবে না?

ঘটক বললেন, বিয়ের পর তোর বাবা তোর বৌকে খেতে দেবেতো?

রমিজ হেসে বললো, আমার আব্বা এদিক দিয়ে খুব ভালো। আমাকে ডেকে ডেকে ভাত খেতে দেয়। আমার বৌকেও ডেকে ডেকে খেতে দেবে।

ঘটক বললেন, তা না হয় বুঝলাম, কিন্তু বেকার ছেলের হাতে কি কোনো বাবা তার মেয়েকে তুলে দেবে?

রমিজ বললো, বুঝেছি বাবা, আমার বিয়ে হোক আপনারা কেউ চান না।

রমিজ রাগ করে চলে গেলো। পিছন পিছন বন্ধুগুলোও চলে আসলো। তারপর একস্থানে বসে কথা বলা শুরু করলো। সাজু বললো, ভেঙে পড়িস না। আমি তো চাকরি করি না, তাই বলে কি আমি বিয়ে করিনি? আজ ছোট একটা চাকরির অভাবে তোর বিয়েটা হবে না, এতো আমি মানতেই পারছি না।

রমিজ নির্বাক চেয়ে বললো, আমার জন্মটাই বৃথা। আজ বাড়ি গিয়ে তুলকালাম করে ছাড়বো।

রমিজ বাড়ি এলো। মাকে বললো, মা, আব্বাকে কি আমার বিয়ের কথাটা বুঝিয়ে বলেছো?

রাহেলা বললেন, তোর মাথায় এই বিয়ের ব্যাপারটা কে ঢুকালো? সাজু, মন্টু, লাভলু ওরা?

রমিজ বললো, ওরাই আমার প্রকৃত বন্ধু। আমার বিয়ের ব্যাপারে দৌঁড়-ঝাঁপ করছে। কবিরাজের কাছে নিয়ে গিয়েছে। ঘটকের কাছে নিয়ে গিয়েছে। ছেলের বিয়ে নিয়ে তোমাদের কোনো ভাবনা-চিন্তা নেই। ছেলেটা কি তোমাদের আপন না?

রাহেলা সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, তুই তো এখনো ছোট, বাবা!

রমিজ বললো, শুধু বড়রাই বিয়ে করবে? ছোটরা বিয়ে করলে দোষটা কি? আর আমি ছোট কে বলেছে তোমাকে? তুমি আমার জন্ম-তারিখ লিখে রাখোনি বলে এমনটা বলছো!

রাহেলা বললেন, কাজ করিস না। বিয়ে করলে তোর বৌটাকে কি খেতে দিবি?

রমিজ বললো, বিয়ের পর আমার বৌ কি খাবে তা নিয়ে তোমাদের এত চিন্তা কেনো? বিয়ের পর আমি কি খাবো এই চিন্তা তোমাদের কারো নেই? আমাকে তো তোমরা পথে কুঁড়িয়ে পেয়েছো!

রমিজ বাইরে বের হয়ে এলো। উঠানে চেয়ারে বসা আব্বা। ক্রুদ্ধকণ্ঠে বললেন, বিয়ে বিয়ে যে করিস তোর কি যোগ্যতা আছে?

রমিজ বললো, বিয়ের জন্য যোগ্যতা লাগে না, আব্বা। শুধু তোমরা পাশে থাকলেই হয়ে যেত। আমি তো তোমাদের সন্তান না। সন্তান হলে তোমার বড় দুই ছেলের মত বিয়ে দিয়ে দিতে।

রকমত সাহেব বললেন, তোর বড় দুই ভাই কাজ করে, রোজগার করে। সংসার চালাচ্ছে। 

রমিজ বললো, কাজ না করলে বিয়ে দেবে না, এ তোমার নিষ্ঠুরতা, আব্বা। দেশের অধিকাংশ যুবকই তো বেকার। তাই বলে তারা বিয়ে করছে না? আমার বিয়েটা দিয়ে দাও, আব্বা। আর গড়িমসি করো না। বিয়ে করা, বিয়ে দেয়া পুণ্যের কাজ।

বাড়িতে আজ দুই ভাই উপস্থিত ছিলো। বড় ভাই রসিক রমিজের কথাগুলো শুনলো। তারপর তাকে একপাশে ডেকে নিয়ে গেলো। ধীরকণ্ঠে বললো, বিয়ে করিস না ভাই, বিয়ে ঝামেলা।

রমিজ বললো, বিয়ে ঝামেলা তাই বলে বিয়ে করবো না? অন্য কাজে ঝামেলা নেই? ঝামেলা জেনেও সবাই বিয়ে করে। ঝামেলা আমি সহ্য করবো। অনেক অনেক ঝামেলা মোকাবেলা করে করে আমি ঝামেলা সামলানো শিখে গেছি আগেই। ভাই, আমার বিয়েতে অমত দিস না।

রসিক আরো বোঝানোর চেষ্টা করলো, বৌ কিন্তু যন্ত্রণার মেশিন। সারাদিন জ্বালাবে। কান-মাথা ঝালাফালা করে দেবে।

রমিজ বললো, ভাই, ট্রেন রাস্তার পাশে বাসা ভাড়া নিলে প্রথম কয়েকদিন ট্রেন যাওয়ার শব্দে কান-মাথা ঝালাফালা হয়, পরে ওসব শব্দকে শব্দই মনে হয় না। সব যন্ত্রণার মেশিন একদিন মধুময় হয়ে যায়। 

রসিক আবারো বোঝালো, বললো, এ যন্ত্রণা সে যন্ত্রণা না। একেবারে অতিষ্ঠ হয়ে যাবি। বিবাহিত কোনো পুরুষকে জিজ্ঞেস করে দেখিস, কেউ তোকে বিয়ে করতে উদ্ধুদ্ধ করবে না। ভালো আছিস ভাই, যন্ত্রণার জীবন নিস না।

রমিজ বললো, সব যন্ত্রণার চেয়ে নাকি বৌ যে যন্ত্রণা দেয় সে যন্ত্রণা বেশি মধুর। ভাই, ভেবে দেখ্, বৌ যন্ত্রণা দিচ্ছে, জ্বালাতন করছে আর আমি তা উপভোগ করছি, কি দারুণই না হবে! তোরা এ সুখ থেকে আমাকে বঞ্চিত করিস না।

এক পা দুই পা করে ওদের মাঝে নুরুন্নেসা এলো আর বললো, ভাই, বিয়ে করো না। তোমার বড় ভাই তো বিয়ে করে বেকুব হয়ে গিয়েছে। প্রতি রাতে আমাকে কি বলে জানো? বলে, বিয়ে মানে এত দায়িত্ব আগে জানলে চিরকুমার থেকে যেতাম।

রমিজ কাঁদোকাঁদোকণ্ঠে বললো, ভাবী, বড় ভাই ভীরু, ভয় পেতে পারে, আমি না। বড় ভাই দায়িত্ব নিতে ভয় পেতে পারে, আমি না। আমার বিয়েটা দিয়ে দাও, আমি প্রমাণ করে দেবো, আমি নির্ভীক, আমি দায়িত্ববান।

রসিক বললো, বিয়ে যে করবি, তোর কি টাকা আছে?

রমিজ বললো, আমাদের বাজার কত দূর সেখানে যেতে আমার টাকা লাগে না, আমি যত ক্লাস পড়াশোনা করেছি টাকা লাগেনি, আমি মেধাবী ভাই! আমার বিয়ে করতে কোনো টাকা লাগবে না।

নুরুন্নেসা বললো, তুমি ভাই ব্যাপারটা বুঝতে পারছো না। তুমি অনেকটা বেসামাল হয়ে আছো। শীত গেলে শীতের পোশাকের চাহিদা শেষ। তোমার বর্তমান ঋতুটা যাক, বিয়ের ভূত কেটে যাবে। কয়েকটা দিন বোঝার জন্য সময় নাও। জীবনের অত বড় সিদ্ধান্তটা মুহূর্তের আবেগে নিও না।

রমিজ বড় নাছোড়বান্দা, বললো, ক্ষুধায় যদি খেতে না দাও, ক্ষুধা কেটে গেলে খাদ্যকে অখাদ্য লাগবে, তখন সুস্বাদু খাদ্য আমি কি করবো! খেলার বয়সে খেলা, ভাবী, খেলার বেলা গেলে খেলায় কারো মন বসে না। জোয়ারে ভাসতে হয়, ভাটাতে কেউ ভাসতে পারে না। চাহিদা যদি শেষ হয়ে যায়, দাম বেড়ে লাভ কি? 

রসিক আর নুরুন্নেসা পরস্পর পরস্পরের দিকে তাকালো। কোনো বুঝই রমিজ মানছে না। তাই দৃঢ়কণ্ঠে রসিক বললো, আমাকে চিনিস তো? তোর বড় ভাই আমি। দ্বিতীয় বার তোর মুখে যদি বিয়ের নাম শুনি তো পা ভেঙে পঙ্গু করে ঘরে ফেলে রাখবো।

রমিজ ভয় পেয়ে পিছিয়ে গেলো, বললো, হাতে হাতে কাজ করলে সব কাজই দ্রুত হয়ে যায়। তোমরা আমার বিয়ের ক্ষেত্রে কেউ হাত বাড়ালে না। যে যার বিয়ে সেরে নিয়েছে, এখন আমার বিয়ের ক্ষেত্রে বিরোধিতা করছে। 

রসিক হাতের কাছের লাঠিটা হাতে নিলো। তা দেখে রমিজ দৌঁড়ে আরো কিছুটা পিছিয়ে গেলো। বললো, এ বাড়ির সবাই জোট বেঁধেছে। সবার মুখে এক কথা, সবাই এক হয়েছে, আমার বিয়ে দেবে না। আমি কি ক্ষতি করেছি সবার? আমাকে বিয়ে দেবে না কেনো? ভাই, ভাবী সব হিংসুটে।

রমিজ বন্ধুমহলে চলে গেলো। সাজু তীর্যক চেয়ে বললো, বাড়ির কি খবর? কতটুকু রাজি করাতে পারলি?

রমিজ বললো, বিয়ের পর আমার বৌ কি খাবে, এই নিয়ে তাদের মহাচিন্তা। কি খাবে? ভাত! ডাল! মাছ!

সাজু বললো, তারমানে বাড়ির কেউ এখনো তোর বিয়ে দিতে রাজি হয়নি?

রমিজ বললো, বাড়ির সবাই জোট বেঁধেছে, আমার বিয়ে তারা রুখবেই রুখবে। প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে, বিয়ে দেবে না আমাকে। পরিবারের মানুষের এত অসহযোগিতা থাকলে বিয়ে কি আদৌ সম্ভব? কারো বিয়ের পথে কোনো বাঁধা নেই, আমার বিয়ের পথে দুনিয়ার যত বাঁধা এসে জমেছে। বিয়েটাকে আমি যত না ডাল-ভাত ভাবছি, বাড়ির লোকজন তত বেশি কঠিন ভাবছে। 

মন্টু বললো, বিয়ে কঠিন হবে কেনো, বিয়ে তো ডাল-ভাত! চল্, আজ কাজী অফিসে যাই।

যেই বলা সেই কাজ। সবাই কাজী অফিসে গেলো। কাজীকে রমিজ বললো, চাচা, আমি বিয়ে করতে চাই।

কাজী বললেন, মেয়ে কই?

রমিজ আশ্চর্য হয়ে বললো, চাচা, আপনার কাছে মেয়ে নেই?

কাজী বললেন, আমার কাজ বিয়ে দেয়া আর তালাকনামা লেখা। মেয়েদের খোঁজ রাখা আমার কাজ না।

রমিজ আশাহত হয়ে বললো, দেখেছিস সাজু, আমার বিয়ের ব্যাপারে সবাই দায়িত্বজ্ঞানহীন।

সাজু কাজীকে বললেন, আমাদের বন্ধুটা বৌহীন বড় কষ্টে জীবন পার করছে। যদি একটু আশার হাত বাড়াতেন আপনি…

কাজী বললেন, বিয়ের ফুল ফোঁটেনি এখনো ওর। না জ্বালাতন করে চলে যা।

রমিজ বললো, আমার বিয়ের ফুল ফোঁটেনি? কত ফুল ফুঁটে আছে পথে-ঘাটে। গোলাপ ফুল, শিউলি ফুল কত নানান ফুলের নাম শুনেছি। বিয়ের ফুলটা কি? বিয়ের ফুল দেখতে কেমন? নাম তো আগে শুনিনি! কোন্ বাগিচায় ফোঁটে?

কাজী বিরক্তির চোখে রমিজের দিকে তাকালেন, তারপর বললেন, বিয়ে বিয়ে করে পাগলপ্রায় তোর দশা। নিজের বিয়ে নিয়ে কেউ এমন ছাগলামি করে? নির্লজ্জ ছেলে।

রমিজ এবার বললো, ও, সবাই বিয়ে করছে দোষ নেই। বক্স বাজিয়ে, বাজি ফুঁটিয়ে বিয়ে করছে, কারো লজ্জা নেই। আর আমি আমার বিয়ের কথা বললেই নির্লজ্জ, নাকি?   

কাজী সাহেব রমিজকে দূর দূর করে ঘর থেকে বের করে দিলেন। পিছু পিছু বন্ধু তিনটেও বের হয়ে পড়লো। লাভলু বললো, আমরা তো অনেক চেষ্টা করলাম, তুই বিয়ের আশা ছেড়ে দে।

রমিজ বিমর্ষচিত্তে বললো, আমার বিয়ের পথে এত এত বাঁধা কেনো? সবাই বিয়ে করতে পারলে আমি পারছি না কেনো? আমি কি অন্যের চেয়ে বৌকে কম যত্ন করবো?

মন্টু বললো, মনে হয় মৌসুমটা বিয়ের না, তাই এত কোপা লেগেছে। বিয়ের মৌসুম এলে তোর বিয়ে হবেই হবে।

রমিজ হতাশায় মগ্ন হয়ে বললো, যে রোদ পড়ছে, সহসায় এই রোদ-গরমের মৌসুম শেষ হবে না। কবে এই রোদ-গরমের মৌসুম যাবে, আর আমার বিয়ের মৌসুম আসবে! আবহাওয়া পরিবর্তন হতে হতে আমার বিয়ের স্বাধ মরেই যাবে।

তারপর আনমনে কথা বলতে বলতে রমিজ বাড়ি এলো। মেজ ভাবীর সামনে পড়লো। মেজ ভাবী জেবুন্নেসা বললো, কি ভাই বড় বিমর্ষ যে! বুঝেছি বিয়ের চিন্তায় তোমার নাজেহাল অবস্থা। যে বয়সে যা চাহিদা না পেলে তো নাজেহাল হবেই। 

তারপর বাঁকা চোখে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে জেবুন্নেসা বললো, তোমার হাতে কাজ নেই, সার্বক্ষণিক বৌয়ের যত্ন নিতে পারবে। এটা কেউ বুঝতে চাচ্ছে না।

রমিজ বললো, কাজ না করলে, আয় না করলে বাবা বিয়ে দেবে না।

জেবুন্নেসা বললো, বিয়ের আগে কি কোনো ছেলে কাজ করে? সব উড়নচণ্ডী থাকে৷ ছেলেরা কাজ করে তো বিয়ের পরই। ইচ্ছে করেই তোমার বাবা, মা তোমার বিয়েটা দিচ্ছে না।

মেজ ভাবীর কথায় রমিজের কান খাড়া হয়ে গেলো, বললো, সবাই নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত। কেউ আমার বিয়েটা নিয়ে ভাবে না। একমাত্র তুমিই ভেবেছো, মেজ ভাবী। তুমি আমার লক্ষ্মী ভাবী। 

জেবুন্নেসা বললো, কারো বিয়ে হয় আগে, কারো বিয়ে হয় পরে। তোমার কপালেও বৌ আছে, ভাই। আমার মন বলছে, তোমার বৌভাগ্য ভালোই হবে।

খুশি হয়ে রমিজ বললো, সবার বৌ থাকলে দোষ নেই, আমার বৌ থাকলে হবে অন্যায়। কেউ বিয়ে দিতে চাচ্ছে না। দেখো ভাবী, আমাদের বাড়ি তিন জনের তিন বৌ।

জেবুন্নেসা আরো হাওয়া দিয়ে কথা বললো, তোমার মনের কষ্টটা আমি বুঝি, ভাই। এই বয়সে কি একা একা থাকা যায়? কত আবেগী তোমরা বর্তমানের ছেলেরা। কত কথা মনের মাঝে জমা। বৌ না থাকলে যে সব আবেগ বৃথা।

রমিজ উৎসুকের সাথে বললো, কি করা যায় বলো তো, ভাবী।

জেবুন্নেসা কৌণিক চোখে চেয়ে বললো, আবার খেজুর গাছে উঠো। খবরদার, ঝাঁপ দেবে না। ঝাঁপ দিয়ে হাত-পা ভাঙলে সুস্থ হতে হতে বিয়ের বয়স চলে যাবে। শুধু ভয় দেখাবে। এবার পাকা কথা নিয়েই তবে গাছ থেকে নামবে। গাছতলায় আমরা সবাই উপস্থিত থাকবো স্বাক্ষী হিসেবে, যাতে বাবা, মা, বড় ভাই কথা দিয়ে বরখেলাপ না করতে পারে।

রমিজ মাথা নিচু করে বললো, ভাবী, আমি গাছে উঠতে পারি না। খুব ভয় লাগে। ওদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে খুব কষ্টে উঠেছিলাম। শরীরে কয়েকটা কাটা ফুঁটেছিলো। কি ব্যথা! নামতে গিয়ে মনে হচ্ছিলো পড়েই গেলাম। আমি ওদিনই শপথ করেছি, আর কখনো গাছে উঠবো না।

জেবুন্নেসা অন্য বুদ্ধি দিলো, উঠানে রোদে বসে থাকবে। রোদের থেকে উঠবেই না, বিয়ের পাকা কথা না নিয়ে। এমনিতে বিয়ের দাবি এ বাড়ির কেউ মেনে নেবে না। 

রমিজ বললো, ভাবী, আমি তো রোদ সহ্য করতে পারি না। রোদে গেলেই মাথা ঘোরে। 

জেবুন্নেসা বললো, তবে খাওয়া বন্ধ করে দাও। অনশন ছাড়া তোমার বিয়ের দাবি এ বাড়ির কোনো সদস্য মানবে না।

রমিজ এবার বললো, ভাবী, না খেয়ে থাকার অভ্যাস তো আমার নেই। এক বেলা না খেলে আমি চোখে সর্ষেফুল দেখবো। না খেয়ে কোনক্রমেই থাকতে পারবো না।

জেবুন্নেসা বললো, তবে কয়েকদিন কোনো এক বন্ধুর বাড়ি চলে যাও। বাড়িতে খোঁজাখুঁজি শুরু করুক। আমি বলবো, বিয়ে দিলে ও বাড়ি আসবে হয়ত। যখন বাড়ির সবাই রাজি হবে, তখন আমি তোমাকে খুঁজে নিয়ে আসবো।

রমিজ বললো, আমার বন্ধুরা সব বিবাহিত। আমি বৌপাগল ওরা জানে। আমি ওদের বৌকে বিরক্ত করবো এই ভয়ে আমাকে ওদের ঘরে কেউ জায়গা দেবে না, ভাবী।

জেবুন্নেসা এবার বিরক্তি প্রকাশ করে বললো, এসব যদি না পারো তবে বিয়ে হবে? লাল টুকটুকে বৌ পাবে, সাথে নিয়ে ঘুরবে, তার হাতের রান্না খাবে, তোমার হাতের কাজ করে দেবে, চোখে চোখ রেখে কথা বলবে- এসব পাওয়া কি এতই সোজা? সাধনা না করলে বৌ পাবে না, ভাই।

রমিজ আফসোস করে বললো, ভাবী, তবে অন্য আর একটা বুদ্ধি দাও। যদি গলা পানিতে নেমে… 

কথাটি শেষ না করতেই মেজ ভাই রহিদ ঘরে এলো। এসেই বৌকে গরম দিয়ে বললো, আজ রান্না ঠিকঠাক করেছো তো? আজ যদি তরকারিতে লবণ বেশি দাও, মুখে ছুঁড়ে মারবো।

একথা শুনে রমিজ বললো, অ্যাঁ ভাই, বৌকে কেউ গরম দেয়? বৌ কত আদরের! কত সোহাগের!

জেবুন্নেসাও থেমে থাকলো না, রহিদের মুখের কাছে আঙুল উচিয়ে বললো, রান্না ভাত, তরকারি খেতে খুব ভালো লাগে? রান্না করে খাবে। ছোট ভাইকে বিয়ে দাও। আমি আর গাধার মত কাজ করতে পারবো না।

রহিদ বললো, অবিবেচকের মত কথা বলো না। রমিজকে বিয়ে দেবো কেনো? ওর বিয়ের কি বয়স হয়েছে? কাজের লোক রেখে দেবো প্রয়োজনে।

রমিজ এক হাত পিছিয়ে গেলো একথা শুনে। বললো, কাজের লোক রাখার কি দরকার! আমার বিয়েটা দিয়ে দাও। আমার বৌ সব কাজ করবে। ঘরের টাকা ঘরে থাকবে।

রহিদ রেগে বললো, বিয়ে মানে? এই, বিয়ে কি এখনো বুঝতে শিখেছিস?

রমিজকে কথা বলতে বাঁধা দিয়ে জেবুন্নেসা বললো, বিয়ে কি বুঝতে হবে না। ওসব কোনো ছেলেকে-মেয়েকেই শিখতে হয় না। ওর বিয়েটা দিয়ে দাও। তুমিও অল্প বয়সে বিয়ে করেছো, এখন সাধু সাজতে যেও না।

রহিদ বললো, তুমি কথা বলো না। বিয়ে দিতে অনেক টাকা লাগবে। অত টাকা আমার নেই।

রমিজ আক্ষেপ করে বললো, ও, আমার বিয়ের সময় টাকা থাকে না আর কাজের লোক রাখার সময় টাকা কোথা থেকে আসে?

রহিদ বললো, সময় হলে বিয়ে দেবো। এখন যা।

রমিজ বললো, আমার বিয়ের সময় হয়েছে কিনা তুই বুঝবি কি করে? আমি তো বুঝছি আমার এখনই দারুণ বিয়ের সময়। বয়স হয়নি বলে বিয়ে দিতে চাচ্ছিস না, বয়স বেড়ে গেলে তখন কেউ আমাকে বিয়ে করতে চাইবে না। আমি দু দিকে ধরা।

একথা বলতেই রহিদ রমিজকে এক থাপ্পড় মারলো। দেখে জেবুন্নেসা বললো, এভাবে শাসন করে ছোট ভাইয়ের মনের প্রত্যাশাকে দমিয়ে রেখো না। আমাকে রেখে এক রাত বাইরে থাকো না, ভাইটা বৌবিহীন থাকে কি করে, নিজের দিয়ে বোঝার চেষ্টা করো। 

একথা শোনামাত্রই রহিদ জেবুন্নেসাকেও এক থাপ্পড় মেরে বসলো। জেবুন্নেসাও রহিদের জামার কলার ধরে টানাটানি শুরু করে দিলো। তা দেখে রমিজ ঘর থেকে দৌঁড় মারলো আর বললো, ওরে বাবা, মেজ ভাবীর একি ভয়ংকর রূপ! বিয়ে বিয়ে করছি, এমন বৌ জুটলে ঘরে থাকা তো দায় হবে!

রমিজ দৌঁড়ে মায়ের কাছে গেলো। মাকে বললো, মেজ ভাবী ভীষণ রাগী, রহিদকে না জানি প্রত্যহ মারে কিনা!

রাহেলা বুদ্ধি খাটিয়ে বললেন, বিয়ে বিয়ে করছিস, তোর বৌরও তোকে এভাবে মারবে! আরো একটু বড় হ, তবে তোর বৌ তোকে আর মারতে পারবে না।

রমিজের কথাটি বিশ্বাস হলো, তাও বললো, মেজ ভাই মেজ ভাবীর হাতে মার খেয়ে হলেও তো সংসার করছে। প্রয়োজনে এভাবে বৌর হাতে মার খাবো, কতই বা তাদের হাতে জোর! তবুও আমাকে বিয়ে দাও।

রাহেলা রেগে গেলেন, বললেন, ছেলে তুই গোল্লায়ে গিয়েছিস। তোর বাবাকে বলে তোকে চার দেয়ালের মধ্যে বন্দি করে রাখবো।

রমিজ নত মস্তিষ্কে বললো, কত লোক বিয়ে করে বৌকে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, তুমি কি চাও না তোমার ছোট ছেলে বিয়ে করে বৌকে নিয়ে এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াক?

রাহেলা চিৎকার করে বললেন, হতচ্ছাড়া ছেলে, চুপ কর্। আমার সামনে থেকে দূর হ্।

রমিজ গোমড়া মুখে ঘরে গেলো। ঘরে গিয়ে সে কাঁদতে লাগলো। মা রাহেলাও অনুতপ্ত মনে ছেলের ঘরে গিয়ে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, বাবা, কান্না করছিস কেন্? তোকে কি আমরা বলেছি বিয়ে দেবো না?

রমিজ বললো, মা, আমি যদি না খেয়ে থেকে অসুস্থ হয়ে পড়ি তবে কি বাবা রাজি হয়ে আমাকে বিয়ে দেবে?

রাহেলা দীর্ঘশ্বাস কেটে বললো, পাগলামি করিস না। তোর বাবা, তোর বড় ভাই রেগে আছে, তাদের রাগটা আগে কমুক।

তখন জেবুন্নেসা ঘরে ঢুকেই বললো, রমিজকে বিয়ে দিয়ে দেন। আমি আর এত মানুষের রান্না করে পারছি না।

রাহেলা আশ্চর্যান্বিত হয়ে বললো, কি বলছো বৌমা, এই ছোট্ট ছেলেকে আমি বিয়ে দেবো? ওর জীবনটা তো শেষ হয়ে যাবে।

রমিজ চিৎকার করে বললো, মা, তুমি কেমন মা? আমাকে এখনো ছোট্ট ছেলে বানিয়ে রেখে বিয়ে দেবে না বলছো? এই বাড়িতে মেজ ভাবীই আমার একান্ত আপনজন। আমার মনের কথা বোঝে।

বড় ভাবী নুরুন্নেসা এলো। বললো, বিয়ের জন্য তিনটি গুণ দরকার। মানসিক, শারীরিক ও আর্থিক। তুমি মানসিক ও শারীরিক ভাবে প্রস্তুত কিন্তু আর্থিক ভাবে পিছিয়ে।

রমিজ বললো, তিনটি গুণের মধ্যে আমার দুটি গুণই আছে। তাও বিয়ে দেব না? এ কেমন অবিচার? 

রাহেলা বললেন, বড় বৌমা, ছেলেটাকে বোঝাও। ওর বন্ধুরা ওকে বিয়ে করার জন্য লেলিয়ে দিয়েছে।

রমিজ বললো, বন্ধুরাই ভালো। ওরাই আমার ভালো চায়। ওরা না থাকলে তোমরা আমার বিয়ের কথা ভুলেই যেতে। 

দুপদাপ পা ফেলে ঘরে রকমত সাহেব এসে বললেন, বিয়ের কথা মুখে আর নিবি তো হাত পা বেঁধে পানিতে ফেলে দেবো।

রমিজ এবার বললো, আমাকে বিয়ে দিলে টাকা খরচ হবে আর তাই কত নাটক! কি কৃপণের কৃপণ!

রকমত সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন, পথে পথে ঘুরিস, ছেলেমি গেলো না, বিয়ের নাম মুখে নিস্! একদম ঘরে আটকে পঁচিয়ে মারবো!

রমিজ এবার বললো, পথে পথে সবাই ঘোরে। পথ ছাড়া হাটতে বলছো? আচ্ছা, ঠিক আছে, পথ দিয়ে হাটতে মানা করছো, হাটবো না। ঘরে থাকবো, ঘরকুনো হয়ে, তবুও আমার বিয়েটা দাও।

রকমত সাহেব রাহেলাকে বললেন, এ অথর্বকে তুমি জন্ম দিয়েছো? কি বলছে ও! বিয়ের ভূতে ওর বিবেক গেছে! ওকে থামাও।

রকমত সাহেব বাইরে চলে গেলেন। রাহেলা বললেন, তোর বন্ধুরা সংসার করছে, আর অবসর পেলে তোকে নেড়ে মজা নেয়!

রমিজ জোরে জোরে কান্না জুড়ে দিলো আর বললো, তুমি চুপ থাকো৷ ওদের ছেলে-মেয়েগুলো দৌঁড়ে এসে আমার পেটে ঘুষি মারে আর বলে, কেমন আছো কাকু, পাঁচটা টাকা দাও। তখন আমার কেমন লাগে তুমিই বলো? বুকটা ফেঁটে যায়। 

রমিজের কান্নাযুক্ত চিৎকার শুনে রকমত সাহেব বড় ছেলে রসিককে সাথে নিয়ে আবার ঘরে ঢুকলো। দুজনের হাতে দুটো লাঠি। তা দেখে রমিজ বললো, মেরো না, মারিস না। আমি বিয়ে করবো না।

রকমত সাহবে ছেলেকে ভয়-ভীতি দেখিয়ে রসিকসহ বাইরে চলে গেলেন। রমিজ ততোধিক জোরে কান্না করে বললো, দেখেছো মা, দেখেছো ভাবী, আমার জীবনে আমার আব্বা আর ভাইয়ের কি ভূমিকা? আমাকে বিয়ে দেবে না কেনো? ওরা বেঁচে থাকলে আমার কপালে বিয়ে নেই। বিয়ে বাদেই আমাকে মরতে হবে। পোড়া কপাল আমার এই বাড়ি জন্মেছি। বিয়ে যদি না হয় তবে জন্মগ্রহণ করে আমার কি লাভ হলো?

বাইরে থেকে ঠকঠক শব্দ শুনতে পেয়ে সে চুপ হয়ে গেলো।

5 1 vote
Writing Rating
Share This
Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on telegram
Share on email
Share on linkedin
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
আমি যখন শিক্ষাজীবনের শেষলগ্নে তখন বাধ্য হয়ে একটি বাচ্চাকে পড়াতে গিয়েছিলাম। বাচ্চাটির বাবা মা দুজনই চাকরি করেন। বাচ্চাটি একা থাকতে থাকতে একরোখা আর বদমেজাজি …
ঘরে-বাইরে বাজনার মা বাতাসী কাজ করছেন। বাজনা নাকে কেঁদে কেঁদে বললো, মা, আমাকে কি আর বিয়ে দেবে না? মা বাতাসী বললেন, তোর বিয়ে দিতে …
হেকমত আর করিম দুই বন্ধু গল্প করছে। হেকমতকে মহাখুশি দেখে কারণ জানতে চাইলো করিম। হেকমত অতি আনন্দের সাথে বললো, মিয়া ভাইয়ের বিয়ে শেষ। এবার …
পঁচানন্দ মাংস খায় না মাংস মাংস গন্ধ করে বলে, মাছ খায় না মাছ মাছ গন্ধ করে বলে, ডিম খায় না ডিম ডিম গন্ধ করে …
সে অনেক কাল আগের কথা। ভজন ভট্টাচার্য নামে একজন গুণী শিক্ষক ছিলেন। আজ সেই ভজন স্যারের কথা আর তাঁর ছাত্রদের কথা শোনাবো।  ছাত্ররা তাঁকে …
নীলকান্ত বড্ড বোকা মানুষ। যার তার সাথে করে ফেলে বোকামি কাণ্ডকলাপ। একদিন তো বৌর উপর রাগ করে ঘরে না ঘুমিয়ে উঠানে ঘুমিয়েই রাত কাটিয়ে …
Read More
আমি যখন শিক্ষাজীবনের শেষলগ্নে তখন বাধ্য হয়ে একটি বাচ্চাকে পড়াতে গিয়েছিলাম। বাচ্চাটির বাবা মা দুজনই চাকরি করেন। বাচ্চাটি একা থাকতে থাকতে একরোখা আর বদমেজাজি …
ঘরে-বাইরে বাজনার মা বাতাসী কাজ করছেন। বাজনা নাকে কেঁদে কেঁদে বললো, মা, আমাকে কি আর বিয়ে দেবে না? মা বাতাসী বললেন, তোর বিয়ে দিতে …
হেকমত আর করিম দুই বন্ধু গল্প করছে। হেকমতকে মহাখুশি দেখে কারণ জানতে চাইলো করিম। হেকমত অতি আনন্দের সাথে বললো, মিয়া ভাইয়ের বিয়ে শেষ। এবার …
পঁচানন্দ মাংস খায় না মাংস মাংস গন্ধ করে বলে, মাছ খায় না মাছ মাছ গন্ধ করে বলে, ডিম খায় না ডিম ডিম গন্ধ করে …
সে অনেক কাল আগের কথা। ভজন ভট্টাচার্য নামে একজন গুণী শিক্ষক ছিলেন। আজ সেই ভজন স্যারের কথা আর তাঁর ছাত্রদের কথা শোনাবো।  ছাত্ররা তাঁকে …
নীলকান্ত বড্ড বোকা মানুষ। যার তার সাথে করে ফেলে বোকামি কাণ্ডকলাপ। একদিন তো বৌর উপর রাগ করে ঘরে না ঘুমিয়ে উঠানে ঘুমিয়েই রাত কাটিয়ে …