বিয়ে-পাগলের-ভোঁ-দৌঁড়

বিয়ে পাগলের ভোঁ-দৌঁড়

ঘরে-বাইরে বাজনার মা বাতাসী কাজ করছেন। বাজনা নাকে কেঁদে কেঁদে বললো, মা, আমাকে কি আর বিয়ে দেবে না?

মা বাতাসী বললেন, তোর বিয়ে দিতে দিতে তোর বাবা নিঃস্ব হয়ে গেলো। তোকে আর বিয়ে দেবো না।

বাজনা রেগে গেলো। বললো, বিয়ে দেবে না মানে? আমার বিয়ে না দেয়ার কারণ কি? যতদিন না আমার বিয়ে টিকছে ততদিন তোমরা আমাকে বিয়ে দেবে। আর আমি ততবার বৌ সাজবো। দুটো আম গাছ বিক্রি করলেই তো আর একটা বিয়ের খরচ বের হয়ে যাবে।

বাতাসী রেগে বললেন, তোর বাবা শপথ করেছে আর তোকে বিয়ে দেবে না। পারলে নিজে নিজে বিয়ে কর্।

বাজনা গলা বাজিয়ে বললো, বাবা বিয়ে দেবে না মানে? তোমরা দুই জন কি রাতভর শলাপরামর্শ করো আমার বিয়ে দেবে না বলে? আসুক বাবা বাড়ি। বাবার একদিন কি আমার একদিন।

বলতে বলতেই গিরিশ বাবু বাড়ি এলেন। বাজনা প্রথমে নরমকণ্ঠে বললো, বাবা, তৃতীয় স্বামীর ঘর থেকে ফিরে এলাম তাও এক বছর হলো। আবার একটু প্রিপারেশন নাও, আমার চতুর্থ বিয়ে দেবার জন্য।

গিরিশ বাবু রেগে বললেন, বিয়ে কি ছেলেখেলা? স্বামীর ঘরে যাস আর ঘর ভেঙে চলে আসিস!

বাজনা বললো, বাবা, আমার সাবেক তিন স্বামীর ঘরই ছিলো পাকা। পাকা ঘর কি ভাঙা যায়? আমি কোনো স্বামীর ঘর ভাঙিনি। তাদের কারো সাথে মেলেনি বলেই তো চলে এসেছি। স্বামীর ঘরে যাবো আর ফিরে আসবো। এই করতে করতে দেখবে বাবা কোনো এক ঘর আমার পছন্দ হয়ে যাবে। 

গিরিশ বাবু বললেন, গ্রামের মানুষের কাছে আমি ছোট হয়ে গেছি, আর তোকে বিয়ে দেবো না।

বাজনা রেগে বললো, স্বামীর ঘরে আমার থাকা টেকে না। তাই বলে বাবা মা হয়ে তোমরা চেষ্টা বন্ধ করে দেবে? এ কেমন অবিচার? একটা মেয়ের স্বামীর ঘরই তো আসল ঘর!

বাতাসীও রেগে গেলেন, বললেন, সহ্যশক্তি নেই তোর। আছে শুধু বাহুশক্তি। স্বামীর গায়ে হাত তুললে তোর ঘর টিকবে কখনো? আছে শুধু কথাশক্তি। মুখে যা আসে তাই বললে তোর ঘর টিকবে?

বাজনা নরমকণ্ঠে বললো, মা, বাবা, এটাই হবে আমার শেষ বিয়ে। এবার আমি সংসারী হবো। আমার আর কোনো শখ নেই। আমার শেষ শখটা তোমরা পূরণ করে দাও।

এদিকে দিনে দিনে গণেশের বয়স বেড়ে গেছে। তার বিয়ে করার শখ থাকলেও তাকে বিয়ে দেয়ার কেউ নেই বা তাকে বিয়ে দেয়ার ভাবনা কারো নেই। পথে-ঘাটে বের হলে নানা জনে নানা কথা পিছনেও বলে, সামনে শুনিয়েও বলে। এই তো সেদিন গোবিন্দ তাকে পথে দেখতে পেয়ে বললো, লবণবিহীন ভাত আর বৌবিহীন জীবন দুটোই বিরসের। তুই হচ্ছিস কাপুরুষ। আমাকে দেখ্, আমি আমার তিন কাকাকে ডিঙিয়ে বিয়ে করে সংসার করছি। আমার বড় কাকা যে মেয়েকে বিয়ের জন্য দেখতে গিয়েছিলেন সেই মেয়েকে আমি বিয়ে করে কাকাকে লজ্জা দিয়েছি। কাকা, বোন বা পিসির বিয়ে দিয়ে বিয়ে করতে হবে এমন কথা সমাজ মানলেও আমি মানি না। অন্যদের বিয়ে দিতে গিয়ে নিজের বিয়ে পিছাবো কেনো?

গণেশ হায় নিঃশ্বাস কেটে বললো, আমার বড় পোড়া কপালরে, বন্ধু। আমার জন্য জোড়া হয়ত ঈশ্বর সৃষ্টি করতে ভুলে গিয়েছেন। নতুবা আমার বিয়ে হবে না কেনো? কার্তিকের মত আইবুড়ো থেকে গেলাম। সেই দিনের ছেলেপেলেগুলোও বিয়ে করে ফেলছে আর আমি তাদের বিয়ে খেতে নিমন্ত্রণ পাই। অন্যের বিয়ে খেতে খেতে আর দেখতে দেখতে কি আমাকে মরতে হবে?

গোবিন্দ গণেশের কাঁধে হাত চাপড়ে সান্ত্বনা দিয়ে বললো, বৌ বৌ করলে বৌ পাবি না। বিয়ে বিয়ে করলে বিয়ে হবে না। জলে না নেমে স্নান হয় না। কাপড় না ভিজিয়েও স্নান হয় না। আমরাও মনে প্রাণে চাই তোর একটা বৌ হোক। বৌয়ের হাতের রান্না আর মার দুটোই ঠিকঠাক খা তাও মনে প্রাণে চাই।

গণেশ কান্না কান্না কণ্ঠে বললো, সেদিন গোকুল বললো, আমার মাথার চুল পড়ে গেছে, তাই বিয়ে নাকি হবেই না। কন্যা দেখতে গেলে বুড়ো বলে নাকি তাড়িয়ে দেবে? দেখতে বুড়ো হলেই কি কেউ বুড়ো হয়? বিশ্বাস কর্, আমি বুড়ো না। দেখিস তো, রোদে-জলে কাজ করতে পারি।

গোবিন্দ আবারও আশ্বস্ত করলো, বললো, চুল পড়া লোকের বিয়ের ক্ষেত্রে বাঁধা একটু আসবে স্বাভাবিক। আচ্ছা, কারো চুল পড়লো না, তোর মাথার চুল এভাবে পড়ে গেলো কেনো?

গণেশ বললো, আমি কি করে বলবো? দেখতে দেখতে মাথার চুলগুলো পড়ে গেলো। বিশ্বাস কর্, চুল পড়ার ব্যাপারে আমার কোনো হাত নেই। আমি তো পুষ্টিকর খাবারই খাই। তেল-জল-স্যাম্পু সব ঠিকঠাক চুলে দিয়েছি, তাও যদি চুল গেলে কি করবো বল্?

গোবিন্দ বললো, তুই কি জীবনে কখনো চুরি করেছিলি?

গণেশ হ্যাঁ-সূচক মাথা ঝাঁকালো। গোবিন্দ বললো, ঐ চুরি করা মালামাল নিশ্চয় তুই মাথায় করে নিয়ে এসেছিলি?

গণেশ এবারও হ্যাঁ-সূচক মাথা ঝাঁকালো। গোবিন্দ বললো, ঐ তো ভুল করেছিলি। চুরির জিনিস মাথায় নিয়েছিস বলেই মাথার চুলগুলো পড়েছে।

কথাগুলো শুনে গণেশ আশ্চর্য হলো। আর শুধু আফসোস করতে থাকলো। বললো, আচ্ছা, পৃথিবীতে কত মানুষই তো টাক। তাদের কি কারো বিয়ে হয়নি?

এমন সময় ওদের মাঝে গোকুল এলো। বললো, গোবিন্দ, নিশ্চয় গণেশের বিয়ের ব্যাপারে কথা বলছিস? গণেশের বিয়ে হওয়ার সম্ভাবনা নেই। ও বৌবিহীনই মরবে। বৌর হাত, গাল, চুল ছোঁয়ার ভাগ্য ওর নেই। 

গণেশ একথা শুনে রেগে গেলো। বললো, করবো না বিয়ে। সবাই তো বিয়ে করে, আমি বিয়ে না করে রেকর্ড করবো।

গোবিন্দ বললো, পাড়ার লোক তোকে দেখে হাসবে, টিটকিরি কাটবে, বাজে কথা শোনাবে, তখন ভালো লাগবে? যারা বিয়ে করে সমাজ তাদের শ্রদ্ধার চোখে দেখে, দুশ্চরিত্রও হয় না, ইভটিজারও হয় না। বিবাহিত পুরুষ যদি একটি মেয়ের দিকে তাকায় তবে সমাজ খারাপ ভাবে নেবে না। আর অবিবাহিত পুরুষ যদি কোনো মেয়ের দিকে তাকায় তবে সমাজ তাকে সাজা দেয়। বিয়ে না করবি তো মরবি। তারচেয়ে বিয়ে করে মরায় ভালো।

গণেশ ভয় পেয়ে কাঁপাকণ্ঠে বললো, না, না, আমি বিয়ে করবো।

গোকুল বললো, বিয়ে যে করবি, তোকে তো কোনো বাবা তার মেয়েকে দেবে না। বয়স গেছে বেড়ে। বুড়ো লোকের কাছে কেউ বিয়ে বসবে না। হয়েছিস যখন বুড়ো, বিয়ে বিয়ে করে ফ্যানা তুলিস না।

এই বলে গোকুল গোবিন্দকে নিয়ে হাসতে হাসতে চলে গেলো। গণেশ বাড়ি এলো। বাবাকে বললো, বাবা, বিয়ে দেবে বিয়ে দেবে বলে বলে আমাকে আর বিয়েই দিলে না। বাবা, এবার আমাকে বিয়েটা দিয়ে দাও। বিয়ের উপযুক্ত সন্তান ঘরে রেখে তুমি নিশ্চিন্তে ঘুমাও কি করে?

বাবা বললেন, এবার ক্ষেত থেকে পাট উঠুক, টাকা হাতে পেলে তোর বিয়ে দিয়ে দেবো। শোন্, পুরুষ মানুষের বিয়ে দেরিতেই করতে হয়। হাত, পা আর বুদ্ধি একটু পাকুক।

গণেশ ক্ষেপে গিয়ে বললো, এ ফসল উঠুক ও ফসল উঠুক এই সব কথা বলতে বলতে আমার বিয়েটা পিছনে ঠেলতে ঠেলতে আমাকে বুড়ো বানিয়ে ফেলেছো। পাট বিক্রি করে আমাকে বিয়ে দিতে হবে না, পাটশাক বিক্রি করে আমাকে বিয়ে দাও। পাট উঠার আগেই আমার বিয়ের বয়স তিন মাস হয়ে যাবে।

বাবা একথা শুনে এমন কর্কশচোখে তাকালেন তা দেখে গণেশ ভয়ে ঘরে চলে গেলো। পিছন পিছন মা এলেন। আর ছেলেকে কাছে ডেকে বললেন, আমার কচি ছেলেটাকে আহ্ লোকটা কি গরমই না দিলো!

একথা শুনে গণেশ দাঁত ভেঙচি কেটে বললো, আমি কচি ছেলে? 

মা বললেন, বাবা মায়ের কাছে কোনো সন্তানই বড় হয় না, বাবা।

গণেশ রেগে গেলো, বললো, আমি তো তোমাদের চোখে বড় হয়নি, গ্রামের মানুষ তো আমাকে বুড়ো বলে বলে  ক্ষেপাচ্ছে। আমার বিয়েটা দিয়ে দাও। 

মা হেসে বললো, এমন বিয়ে বিয়ে করে না, বাবা। মানুষের কাছে হালকা হয়ে যেতে হয়। তাছাড়া আমি তো সংসারের সব কাজ করতেই পারছি।

গণেশ আরো রেগে গেলো, বললো, তোমার বৌমা দরকার নাও হতে পারে, কিন্তু আমার বৌ দরকার।

মা সান্ত্বনা দিয়ে বললো, ছি বাবা, মানুষ শুনলে পাগল বলবে। নিজের বিয়ের কথা এভাবে নিজে কেউ বলে?

গণেশ ক্ষেপে গিয়ে বললো, আমার বিয়ের কথা শুনলেই তোমরা দুইজন আর আমার কথায় কান দাও না। শোনো, আমার বিয়েতে যে খরচ হবে সব আমি জোগাড় করবো, তবুও আমার বিয়ে দাও। খরচের ভয়ে তোমরা তোমাদের ছেলেকে বিয়ে দিতে ভয় পেলেও খরচকে আমি ডরাই না। গোকুলের কাছে আর গোবিন্দর কাছে কিছু টাকা জমা করেছি আমি। তাছাড়া মাটির ব্যাংকে আমার অনেক টাকা আছে।

মা বললেন, এত অল্প টাকাতে তুই সংসার সাজাবি কি করে?

গণেশ বললো, মা, দুটি মনে মিল থাকলে সংসারের খরচ কখনো বেশী হয় না।

মা বললেন, তুই তো ঠিকমত কাজ-কর্মও করিস না।

গণেশ বিরক্ত হয়ে বললো, দুটি মনে মিল থাকলে সংসারের খরচ যেখানে কম হবে সেখানে কাজ-কর্ম করার বিষয় আসছে কেনো?

মা বললেন, বুঝেছি, মাথা ঠাণ্ডা কর্। ঘরে যেয়ে ঘুমা। ঘুম থেকে উঠলে মাথা ঠাণ্ডা হলে মাথা থেকে বিয়ের ভূত যাবে।

গণেশ একথা শুনে রাগ করে বাড়ি থেকে চলে গেলো। পথে হরিপদের সাথে দেখা। হরিপদ বললো, কিরে, রেগে আছিস যে, কার উপর রাগ করলি? বৌ নেই যার তার আবার কিসের রাগ! বৌ নেই যার তার আবার কার উপর রাগ?

গণেশ রেগে বললো, তোদের বৌ আছে বলে মনে হয় মহাপুরুষ হয়ে গিয়েছিস? শোন্, আমার সব আছে, যেটা নেই সেটাও হবে। তোরও কিন্তু এক সময় বৌ ছিলো না। তুইও একদিন অবিবাহিত ছিলি। অবিবাহিতদের জ্বালা তুই ভালো করেই জানিস। কাঁটা ঘায়ে আর লবণের ছিটা দিস না। বৌ নেই বিয়ে করছি না বলে। বিয়ে করলেই বৌ হবে। বিয়ে করে ফেলবো, মনে রাখবি, বৌশূন্যতা নিয়ে চিরকাল থাকবো না।

হরিপদ একগাল হেসে বললো, কবে আর বিয়ে করবি? কোনো বাবা মা তোর জন্য মেয়ে পালন করে রাখেনি। আমি ভোর রাতের স্বপ্নে দেখেছি, তোর কপালে বিয়ে নেই। ভোর রাতের স্বপ্ন সত্য হয়।

গণেশ কাঁদোকণ্ঠে বললো, একটা ভালো স্বপ্ন তাও দেখতে পারলি না। মদনও সেদিন বললো, দুপুরে ভাত খেয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখেছে যে, আমার বিয়ে হবে না। ভাতঘুমও নাকি সত্য হয়। দেখতো, আমার বিয়েতে এত বাঁধা কেন্? লোকজন দিন তারিখ ঠিক করছে আর টপাটপ বিয়ে করছে।

এমন সময় মদন এলো ওদের মাঝে। আর বললো, গণেশের জন্য খুব মায়া হয়। বৌ নেই যার তার আবার কিসের জীবন? এই দেখ্, সকালে বৌ রান্না করে দিয়েছে খেয়ে ঘুরতে এলাম। ঘুরে আবার বাড়ি যাবো, দেখবো, বৌ রান্না করে গরম ভাতে বাতাস দিচ্ছে। এই যে জীবন, এর কি বুঝবি গণেশ?

হরিপদ বললো, বৌ পথে পড়ে থাকে না যে, গণেশ দেখবে আর কুঁড়িয়ে নেবে। বৌ তো বাজারে বিক্রিও হয় না যে, বস্তা ভরে টাকা নিয়ে যাবে আর দর-দাম করে কিনে আনবে। বৌ যা তা নয়। সবার বৌ আছে, তোর বৌ নেই। তুই একা, তুই বোকা। তুই ছন্নচ্ছাড়া।

গণেশ বললো, তোরা আমার প্রিয় বন্ধু। তোরা আমার বিয়ের ব্যাপারে একটু সাহায্য করলি না। শোন্, দুই হাত এক করে দেয়া পুণ্যের কাজ। তোরা যে করে হোক আমার বিয়েটা দিয়ে দে। কথা দিলাম, আমার বৌয়ের হাতের রান্না আজীবন তোদের জন্য ফ্রি।

মদন হেসে বললো, অন্যের বৌয়ের হাতের রান্না সব সময় সুস্বাদু হয় খেতে। আচ্ছা, দেখি কি করা যায়, চল্ হরি।

মদন কথা দিয়ে চলে গেলো ঠিকই কিন্তু মদনের খোঁজ নেই। বিয়ের চিন্তায় গণেশের মাথার বাকি চুলগুলোও পড়ে গেলো। এবার সে ক্যাপ পরা ধরেছে। ঘুরতে ঘুরতে বটতলা গিয়ে পাঁচ বন্ধুকে একসাথে পেলো। আজ নানা কথা বলে পাঁচ বন্ধুকে রাজি করালো। আজ তারা মেয়ে দেখতে যাবে।

পাঁচ বন্ধুকে নিয়ে গণেশ কনে দেখার উদ্দেশ্যে বের হলো। গোপাল মদনের কানে কানে বললো, গর্দভটাকে যে বিয়ে দেয়ার জন্য নিয়ে যাচ্ছি, আমাদের মান-সম্মান থাকবে তো?

মদন বললো, অত বেশি ইয়ার্কি-তামাশা করা ঠিক হইনি। নাছোড়বান্দা যেভাবে ধরেছে ছাড়বে না তো আর। নেমেছি যেহেতু রাজপথে, ওর বিয়ে দিয়েই সংগ্রাম শেষ করবো।

ভ্যানগাড়িতে করে যাচ্ছে ওরা। গণেশ বলে উঠলো, মেয়ে যেমনই হোক দয়া করে তোরা কেউ অপছন্দ করবি না। থাক্, কানের কাছে নাক আর নাকের কাছে কান। থাক্, চোখে কেতর বা নাকে শ্লেষ্মা।

মদন বললো, অপছন্দ করার মত কারণ থাকলে অপছন্দ করবো না কেন্?

গণেশ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, বুঝেছি, আমার বিয়েটা হোক তোরা কেউ তা চাস্ না।

গোকুল বললো, মন খারাপ করিস না গণেশ। গোমড়া মুখে থাকলে কন্যাপক্ষ যদি তোকে অপছন্দ করে? প্রফুল্ল মেজাজে থাক্, খুশি খুশি মেজাজে থাক্। ঠোঁটে হাসি রাখ্।

গণেশ রেগে ব্যঙ্গ করে বললো, তা তোরা একটা হাসির কথা বল্ যেন আমার মুখে হাসি ফোঁটে, কন্যাপক্ষ চোখ বুঝেই আমাকে পছন্দ করেছে বলে দেবে!

গোপাল বললো, তুই হচ্ছিস ছেলে, বিয়ের ছেলে, চুপ থাকবি, মাথা ঠাণ্ডা রাখবি, রাগলে হবে? ছটফট করলে কন্যাপক্ষ রেগে যেতে পারে। বিয়ের ছেলে বিয়ের ছেলের মত লজ্জা লজ্জা ভাব নিয়ে থাক্।

গণেশ বললো, আমার এই বয়স, তাও আমাকে ছেলে বলছিস? কত ভাবে আরও মজা নিবি বল্?

হরিপদ বললো, বয়স বেশি না হয় হয়েছে, তাই বলে কি তুই দুর্বল হয়ে গিয়েছিস? পুরুষ সব বয়সেই উৎপাদনশীল। মনে বল রাখ্, মুখে হাসি রাখ্, আর চঞ্চলতা দেখা যেন তুই ফুরিয়ে যাসনি।

গোবিন্দ বলে উঠলো, এই তো কন্যার বাড়ি চলে এসেছি।

মদন বললো, নতুন বাড়ি, নতুন মেয়ে দেখবো কি যে খুশী খুশী লাগছে!

গোবিন্দ বললো, কিসের নতুন বাড়ি, ইঁদুর আর তেলাপোকায় ঘর ভরা। কিসের নতুন মেয়ে, তিন স্বামীর ঘর করেছে সে ইতিপূর্বে।

ওরা সবাই কন্যার বাসায় প্রবেশ করলো। গিরিশ বাবু বাঁধা দিয়ে বললেন, কি জন্য বাসায় প্রবেশ করছেন? সন্ত্রাস নাকি?

গোবিন্দ বললো, আঙ্কেল, আমি গোবিন্দ, নকুলের ছেলে। নকুল! যুগল মাস্টারের ছেলে নকুল! 

গিরিশ বাবু নকুল, যুগল মাস্টার বা গোবিন্দ কাউকেই চিনলেন না। বললেন, তা কি জন্য এসেছো? ভোট চাইতে? ভোটের তো সিজনই আসেনি।

গোবিন্দ বললো, না, না, আমরা ভোট চাইতে আসিনি। আপনি যা ভাবছেন তেমনটি না।

গিরিশের উচ্চবাক্য শুনে বাতাসীও এলেন। বললেন, এত অপরিচিত মুখ! ডাকাত! ডাকাত! তুমি ঘরে চলে এসো!

গোপাল বললো, আপনারা অস্থির হবেন না। আমরা আপনাদের মেয়েকে দেখতে এসেছি।

গিরিশ বাবু বললেন, আমাদের মেয়েকে কি দেখার আছে? আশ্চর্য প্রাণী নাকি? না, আমার মেয়ের মাথায় শিং গজিয়েছে? ওদিকে একটা পার্ক আছে, পার্ক দেখতে যাও।

মদন বললো, আরে, আপনার মেয়েকে দেখতে আসা মানে বোঝেন না? 

গিরিশ বাবু বললেন, মানে কি? অসুস্থ মানুষকে মানুষ হাসপাতালে দেখতে যায়। আর আমার মেয়ে তো অসুস্থ না যে, দেখতে আসবে। তাছাড়া আমার বাড়িটা হাসপাতালও না।

হরিপদ একগাল হেসে বললেন, গণেশ, ভালো করে বোঝ্, রামপাগলের বাড়ি এসেছি!

গিরিশ বাবু বললেন, তোমরা রাম পাগলের বাড়ি এসেছো? শুনতে মনে হয় ভুল করেছো। রাম পাগল নেই গ্রামে। আছে বামারাম পাগল। বামারামকে অনেকে রামও ডাকতে পারেন। ঐ যে ঐ বাড়িটা, ওটা বামারাম পাগলের বাড়ি।

গোবিন্দ বললো, আঙ্কেল, আমরা আপনার বাড়িই এসেছি। আপনার মেয়ে বাজনার জন্য আমরা সম্বন্ধ এনেছি। আমরা পাত্রপক্ষ। 

গিরিশ বাবু বললেন, সে আমি অনেক আগেই বুঝেছি৷ আমি মেয়েকে বিয়ে দেবো না। আমি চাই না, নতুন কারো সংসার সে নষ্ট করুক।

গোকুল বললো, আপনার মেয়ে সংসার নষ্ট করে নাকি? আমি তো জানি মানুষ খাতা, কলম, পোশাক-আশাক নষ্ট করে! 

গোবিন্দ গোকুলকে থামিয়ে দিলো। গিরিশ বাবুকে বললো, আমি আপনার মেয়ে সম্বন্ধে জ্ঞাত। আর তা জেনেই সম্বন্ধ এনেছি। আপনারা আপনাদের মেয়েকে প্রস্তুত করেন। পছন্দ হলেই আমরা শুভ কাজটা আজ সেরে ফেলবো।

ওরা সবাই ঘরে প্রবেশ করলো। নানা প্রকার খাদ্য খাবার, ফলমূল সামনে আসতে থাকলো। গোকুল বললো, বাহ্, এমন পুষ্টিকর খাবার নিয়মিত খেতে পারলে মোটাতাজা হয়ে যাবো।

হরিপদ বললো, আর সেজন্য অনেক অনেক মেয়ে দেখার প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। 

গণেশ শুনতে পেয়ে বললো, তোরা মেয়ে অপছন্দ করবি তা তোদের কথাবার্তায় স্পষ্ট। তোদের উদ্দেশ্য অন্য। আমি আর কোনো মেয়ে দেখবো না, এটাই প্রথম এটাই শেষ। 

গোপাল বললো, তুই ছেলে। নিজেকে হালকা করে উপস্থাপন করলে হবে? শান্ত থাক্, শক্ত থাক্। বিয়ে বিয়ে করছিস, কন্যাপক্ষ শুনলে উল্টো তোর কাছে যৌতুক চেয়ে বসবে।

গণেশ চোখ চড়ক গাছ করে বললো, তোরা কি যৌতুক নেয়ার প্লান করছিস? 

গোবিন্দ সবাইকে থামালো। একটু পরে কন্যাকে সাজিয়ে গুছিয়ে ওদের সামনে আনা হলো। মদন বললো, লিপিস্টিক তো চারিদিকে লেগে গেছে।

বাজনা কর্কশ গলায় বললো, লিপিস্টিক ঠোঁটের চারদিকে লাগেনি। আমি চারদিকে লাগিয়েছি। এটা ঠোঁটে লিপিস্টিক দেয়ার আধুনিক মেয়েদের নতুন স্টাইল। আধুনিক ছেলে আপনারা, আধুনিক বৌ চান না?

গোকুল বললো, চোখে যে কাজল দিয়েছেন তা তো নাকে এসেও লেগেছে। আপনি কি আয়না বাদেই সেজেছেন?

বাজনা গম্ভীর গলায় বললো, হ্যাঁ, আমি আয়না বাদেই সাজতে পারি। সাজবো আবার আয়নার সামনে বসবো? আমি যে আয়না বাদে সাজতে পারি এ তার প্রমাণ। তাছাড়া আয়নার সামনে বসার অত সময় নেই আমার।

মদন গণেশের কানের কাছে ফিসফিস করে বললো, গণেশ, তোর কপাল মন্দ না৷ আয়না বা ড্রেসিং টেবিল কিনা লাগবে না।

বাজনা মদনের দিকে শকুনদৃষ্টি নিক্ষেপ করলো আর গোকুলের কথার প্রেক্ষিতে বললো, আয়না তাদের লাগে সাজতে, যারা আনাড়ি। আমি তো আর আনাড়ি না।

গোপাল গণেশের কানের কাছে এসে ক্ষীণকণ্ঠে বললো, এ মেয়েকে কি করে পছন্দ করবি? দাঁত তো না, কোদাল। চল্, চলে যাই।

গণেশ উত্তরে মৃদুকণ্ঠে বললো, নিজেরা তো টপাটপ বিয়ে করে ফেলেছিস। আর আমার বিয়ে না দেয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছিস। তোদের চেয়ে শত্রুও ভালো। দাঁত নিয়ে প্রশ্ন কেনো? দাঁত দিয়ে আমি কি করবো? দাঁত তো থাকবে ঠোঁটের নিচে।

বাজনা গোপাল আর গণেশের কানাকানি কিছুটা শুনতে পেয়েছে। দাঁত শব্দটা সে খুব পরিষ্কার শুনেছে। তাই বললো, আমার দাঁত তো খুব পরিষ্কার। আমি তো সাবান টুকরো ব্যবহার করি দাঁত মাজার জন্য। সারা শরীর পরিষ্কার করতে সাবান ব্যবহার করলে দাঁত পরিষ্কার করতে কেনো পেস্ট ব্যবহার করবো?

বাজনার এমন কথা শুনে হরিপদ মিনমিন করে গণেশকে বললো, তোর বয়স হয়েছে। তাই বলে কি তোকে বুড়ো লাগে? আর তাছাড়া তোর বিয়ের বয়স তো চলে যায়নি। বিয়ের ক্ষেত্রে ছেলেদের বয়স বলে কিছু নেই। এমন একটা মেয়েকে বিয়ে করিস না। আর যেই মোটা মোটা হাত, যদি কোনদিন গালে থাপ্পড় মারে তবে একমাস ঐ গালে কিছু খেতে পারবি বলে মনে হয় না।

গণেশ বললো, মোটা হাত ভালো তো। তুই মহান স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষের দেহ নিয়ে আজেবাজে বলছিস কেন্? 

বাজনা হরিপদ আর গণেশের কানাঘুষা কান খাড়া করে শোনার চেষ্টা করেও শুনতে পারলো না। গণেশ খুসখুস করে হরিপদকে বললো, আমার বিয়ে ভাঙায় কি তোর কাজ? তোর কথা শুনতে গেলে আমার মন ভেঙে যাবে। আমার বিয়েই হবে না। ঘর করবো আমি, আমার পছন্দই শেষ কথা। তুই বা তোরা যদি পাশে না থাকিস তবে আমি একা থেকেই বিয়ে করবো। বৌয়ের মোটা হাতের থাপ্পড় খাবো তো আমি! তবে তোদের সমস্যা কোথায়? থাপ্পড় মারলে মারবে তো ঘরের ভেতর। কেউ কি দেখবে?

এরা সবাই যে কানাকানি কানাঘুষা করে কি সব বলছে তা কিছুটা বুঝতে পেরেছে বাজনা। দাঁড়িয়ে বিকট আওয়াজ করে বললো, জানি, আমি মোটা এবং কালো। আমার ঈশ্বর আমাকে এভাবেই গড়েছেন। তাই বলে ডায়েট এবং ঘষামাজা কোনটাই আমি করতে পারবো না।

গণেশ দ্রুত দাঁড়িয়ে বললো, আপনার কিচ্ছু করতে হবে না। মোটা এবং কালো মেয়েই আমি বেশী পছন্দ করি। বডি শেমিং করে যারা আমি তাদের ঘৃণা করি।

গোবিন্দ গণেশের হাত টেনে বসালো। গিরিশ বাবু বললেন, আমাদের মেয়েকে তোমাদের কেমন লাগলো?  একটু একটু করে মানিয়ে নিতে হবে ওকে! রাগ বেশী, জল ঢালতে জানলে ওর থেকে ভালো মেয়ে আর হবে না। 

বাতাসী বললেন, যা বলবে শুনতে হবে। তবেই দেখবে ঝঞ্জাট বাড়বে না। যখন যা ভাঙবে ভাঙতে দিলেই হবে। বাঁধা দিলে লয় করে ছাড়বে। কোথাও যেতে চাইলে যেতে দেবে, নতুবা গেলে কিন্তু আর আসবে না। খেতে চাইলে কিছু খেতে দেবে, নতুবা খেয়ে ফেলবে।

গোবিন্দ এতক্ষণ ধৈর্য ধরে ছিলো, ভাবগতি বেগতিক দেখে নিজেই পিছিয়ে যেতে চাইলো, গণেশের কানে কানে বললো, বড় আশা করে তোকে নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু কেনো জানি মেয়েটাকে ভালো লাগলো না। এ মেয়ের যে চারিত্রিক গুণাবলি মেনে নিয়ে সংসার করতে পারবি?

গণেশ বললো, পারবো। আমি সব পারাদের দলের লোক। পারবো না বলে কোনো শব্দ নেই আমার কাছে।

গোবিন্দ আবারও ফিসফিসিয়ে বললো, আরও একটা মেয়ে না হয় দেখি! মেয়ের তো আকাল পড়েনি। 

গণেশ গোবিন্দর কানের কাছে মুখ রেখে আত্মবিশ্বাসের সাথে বললো, যতই চেষ্টা করিস, আমার মনোবল ভাঙতে পারবি না। তোদের শত বাঁধা উপেক্ষা করে এ বিয়ে আমি করবোই। এবং মানুষকে দেখিয়ে দেবো ইচ্ছা থাকলে বিয়ে করা যায়। ইচ্ছা থাকলে বন্ধুদের শত বাঁধা ছিন্ন করেও বিয়ে করা যায়।

হরিপদ গণেশের কানের কাছে মুখ রেখে বললো, কন্যা সাজগোজের চেষ্টা কিন্তু কম করেনি। আমাদের মন জয় করার চেষ্টা কিন্তু অনেক করেছে। তবে সাজগোজে যে রূপ ফুঁটেছে ভয় না পেয়ে উপায় নেই।

গণেশ ধীরকণ্ঠে উত্তর দিলো, বিয়েটা ভাঙার জন্য আর কত কারণ খুঁজবি? দেখার চোখে দেখ্, দেখ্ না কত কিছু দেখার আছে। তোরা কি চাস্ তোদের বৌদের চেহারা জানালার ফাঁক দিয়ে দেখে দেখে আমার মৃত্যু হোক?

এমন মিনমিন গুঞ্জণ দেখে বাজনা দুপ করে দাঁড়িয়ে গেলো আর কর্কশকণ্ঠে বললো, আমাকে অপছন্দ করলে সবগুলোর কাঁধ ধরে ধরে জলের মধ্যে গরু চুবানো চুবাবো।

একথা শুনে পাঁচ বন্ধু ভয় পেয়ে গেলেও গণেশ ভয় পেলো না। দাঁড়িয়ে বললো, আমরা তো কেউ আপনাকে অপছন্দ করিনি। আপনি বলিষ্ঠ কণ্ঠের অধিকারী। আপনার রক্ত কোনো মিনমিনানী, গুণগুণানী, ফিসফিসানী, কানকানানী সহ্য করতে জানে না।

বাজনা দৃঢ়কণ্ঠে বললো, আমি বুঝেছি আপনি ছাড়া বাকীরা কেউ আমাকে পছন্দ করেননি। আমি সমতাতে বিশ্বাসী। সবগুলোকে মারবো, সাথে আপনাকেও, সমান হারে। 

হরিপদ চোখ গোলগোল করে বললো, আমাদের মারবেন? আমরা সবাই সম্মানিত মানুষ।

গণেশ বললো, আপনি ঠাণ্ডা হন। নানা জনে নানা কথা বলবে। রাগলে হবে? বিয়ে তো আমি করবো। আর আমি তো হাঁসের মত একপায়ে খাড়া। 

বাজনা বললো, উল্টা-পাল্টা করলে মার একটাও মাটিতে পড়বে না। আমার বাবা মা আমাকে বিয়েই দেবে না। আপনারা সেধে বিয়ের সম্বন্ধ এনেছেন। এই সুযোগ আমি ছাড়বো নাকি? 

পাঁচ বন্ধু ভয় পেয়ে বুকে থুথু ছুঁড়লো। গোবিন্দ বললো, তবে বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করে ফেলি।

গণেশ বললো, কিসের দিন তারিখ ঠিক করা! বিয়ে আজই করবো।

বাজনা লজ্জার হাসি হেসে বললো, আমি কিন্তু বিয়ের পরপরই তোমার সাথে তোমার ঘরে গিয়ে উঠবো।

বাতাসী বললেন, না, বিয়ের পর তোদের বিয়ে যাতে টেকে এজন্য এবার আর তোকে শ্বশুরবাড়ি পাঠাবো না। বিয়ে টিকলে তবেই স্বামীর ঘরে যাবি।

গণেশ বললো, আগে বিয়ে তারপর তো ঘরজামাই থাকার প্রশ্ন। 

বাজনা বাঁধা দিয়ে বললো, ঘরজামাই থাকলে জামাই পথে প্রান্তরে অপমানিত হয়। আমি চাই না, আমার স্বামী যার তার দ্বারা লজ্জিত হোক।

মেয়ের কথাতে রাজী না হয়ে গিরিশ বাবু বললেন, তোমরা হয়ত জেনেছো আমার মেয়ের এর আগে তিন বিয়ে হয়েছে। স্বামীর ঘরে ওর থাকা হয় না। তাই ভেবেছি, তোমাকে রেখেই দেবো। আমার ঘরেই থাকো জামাই আদর কম পাবে না। 

হরিপদ গণেশের কানের কাছে এসে বললো, তিন স্বামীর ঘর করে এসেছে যে মেয়ে সে মেয়ে মারাত্মক সংসারজ্ঞানসম্পন্ন। এক কথায় বলে অভিজ্ঞ সংসারী। 

হরিপদের প্রতি বিরক্ত প্রকাশ করে গণেশ হবু শ্বশুরকে  বললো, আমার এসব বাক্য সহ্য হচ্ছে না। বিয়ের ব্যবস্থা কেনো করছেন না? 

মদন বললো, ঘর, বৌ একসাথে পেয়ে বিগলিত হোসনে। ঘরজামাই থাকিস না। শ্বশুরবাড়ি মধুর হাড়ি, সে আদর দিনেক চারি, তারপর ঝাটার বাড়ি।

শুনে গণেশ বিরক্ত হয়ে বললো, বিয়ের পর আমার বৌকে কোথায় নিয়ে যাবো সেটা আমার ব্যাপার।

বাতাসী একথা শুনে বললেন, বিয়ের পর আমার মেয়েকে কি নিরুদ্দেশে নিয়ে যাবে, বাবা? তোমরা নারী পাচারকারী নও তো?

গণেশ আশ্চর্য হয়ে বললো, কি কথা বলেন, মা! বিয়ের পর আমার বৌকে আমি আমার ঘরেই নিয়ে যাবো। আমার ঘর সে পরিষ্কার করবে, আমার জামা-কাপড় ধুয়ে দেবে। রান্না করে খাওয়াবে।

বাজনা কর্কশকণ্ঠে বললো, নতুন বৌ থাকাকালীন আমি কোনো কাজ করতে পারবো না। শুধু হাত ধৌত করবো আর ভাত খাবো।

গণেশ বললো, নতুন বর থাকাকালীন আমিও কোনো কাজ করবো না। এমনকি প্লেটটা ধুয়েও খাবো না। লুঙ্গি দিয়ে প্লেট মুছে খেতে বসে যাবো।

বাজনাদের বাড়ি এত মানুষ কেনো, উচ্চবাক্য কেনো, কি হচ্ছে না হচ্ছে দেখতে প্রতিবেশিরা এলো। বিমলার মা বললেন, বাজনাকে দেখতে এসেছে নাকি, বাজনার মা?

বাজনার মা হ্যাঁ-সূচক মাথা ঝাঁকাতেই বিমলার মা বললেন, মেয়ের বিয়ে আবার দেবে? জানে তো পাত্রপক্ষ তোমার মেয়ের পূর্বের বিয়ের কথা?

গণেশ দাঁড়িয়ে বললো, সব জেনেছি। বিয়ে ভাঙতে আসতে হবে না। বটগাছ ভাঙবে, তালগাছ ভাঙবে এই গণেশ ভাঙবে না। গণেশের মনোবল ভাঙবে না।

রচনার দিদা বললেন, মেয়ের কি আকাল পড়েছে? রুচি এত নিচে নামে কেন্? 

গণেশ শুনে বললো, মেয়ের আকালই এখন। আপনাদের মত এখন কেউ দুই হালি করে বাচ্চা নেয় না। রুচি আমার যথেষ্ঠ উঁচুতেই। আমি অভাগা, আমি একটা অভাগা মেয়ের স্বপ্ন দেখাতে চাই। মানুষের বিয়ে ভাঙতে আসবেন না। বিয়ে ভাঙা সহজ সবার ক্ষেত্রে, আমার বিয়ে ভাঙা অত সহজ না। আমার দাঁত ভাঙবে কিন্তু আমার বিয়ে ভাঙবে না।

নাক ভেংচি কেটে রচনার দিদা চলে গেলেন। তিতলি এসে বললো, আপনারা তো আমার দিদিকে পছন্দ করেছেন, ছেলেকে আমার একটু দেখার আছে।

গণেশ রেগে দাঁড়ালো আর বললো, কি দেখবে? কি? বডি? জামা খুলবো?

তিতলি হাসি হাত দিয়ে চেপে বললো, জামার নিচে গেঞ্জি থাকে, আপনার জামার নিচে জামা কেনো? গরমকালেও দুটো জামা পরেছেন কেনো?

গণেশ বললো, আমার আছে তাই পরেছি।

বলে সে মাথার ক্যাপটি খুলে ফেললো, তিতলি অট্টহাসি হেসে বললো, টেকো টেকো পূর্ণটেকো, বাজনা ভালো করে দেখ্।

বাজনা বললো, টাক তাতে কি? ছেলে ছেলেই। স্বর্ণের টুকরোর মূল্যই অনেক। বাবা, আমি আমার হবু স্বামীকে একাধিক ক্যাপ কিনে দেবো। কখনো তার টাকের অযত্ন করবো না।

গিরিশ বাবু বললেন, ঠিক আছে। আমি তবে বিয়ের ব্যবস্থা করতে শুরু করে দিলাম।

বাজনা খুশি হয়ে বললো, আচ্ছা।

মদন গোবিন্দকে বললো, গণেশ গ্রামের শ্রেষ্ঠ বৌটাই পেতে যাচ্ছে। 

গোবিন্দ কিছু বললো না। হরিপদ বললো, গণেশের বাড়ি এবার ছোট-খাটো জাদুঘর হতে যাচ্ছে। মানুষের ঢল নামবে ওর বাড়ি বৌ দেখার জন্য। 

গোকুল বললো, গণেশ টিকিট সিস্টেম করতে পারিস। টিকিট না কেটে কেউ যেন তোর বৌকে দেখতে না পারে।

গোপাল বললো, সত্যি তোর বিয়েটা গ্রামে আলোড়ন তুলবে।

হরিপদ বললো, গণেশ, গোবিন্দকে একটা পুরস্কার দিস্। তোর বিয়েতে তার অবিস্মরণীয় ভূমিকা কখনো যেন ভুলে যাসনে।

গোবিন্দ বললো, ভুল করছিরে। গণেশকে বিয়ে দিতে গিয়ে না তাকে বিপদে ফেলছি। আমার না ভয় করছে। মেয়ে তো সুবিধার না।

হরিপদ বললো, আয়-রোজগার করে না। আজ বিয়ে করলে কাল থেকেই ও বিপদে পড়বে।

বাজনা সবাইকে চিন্তিত দেখে বললো, চিন্তা করছেন কেনো সবাই? তুমি তাদের চিন্তা করতে মানা করে দাও। আমি খুব ভালো। আমি সব খাবার খেতে পারি। কোনো খাদ্যে আমার এলার্জি নেই, না ইলিশ, না চিংড়ি। অরুচিও নেই, সেদ্ধ বা আধা সেদ্ধ যায় হোক। তবে রান্না করতে পারবো না। এই একটি কাজ কিন্তু মৃত্যুবধি তোমাদের বন্ধুকেই করতে হবে।

গণেশ হাত তুলে দাঁড়িয়ে বললো, আমিই রান্না করবো। আমি রান্না করতে পটু। পৃথিবীর বড় বড় রাধুনী তো সব পুরুষই। হোটেল রেস্তোরাঁয় পুরুষই তো রান্না করে। 

খুব খুশি হয়ে বাজনা বললো, এমন স্বামী হলে আমি আর স্বামী বদলাবো না। 

গণেশ বললো, বাহ্ বাহ্।

বাজনা বললো, তবে আমাকে ডাকাডাকি করবে না। আমি সকাল দশটা পর্যন্ত ঘুমাই। আমার স্নান করতে তিন ঘণ্টা লাগে। আর টিভি দেখতে বসলে বিদ্যুৎ চলে না যাওয়া পর্যন্ত আমি টিভি দেখা বন্ধ করি না। আমাকে টিভি আর খাবার দিয়ে বসিয়ে রাখবে, আমি কখনো কাউকে বিরক্ত করবো না।

তা শুনে তিতলি বললো, বৌ পালা আর হাতি পালা এক কথা, হবু দাদাবাবু। 

গণেশ বললো, তবে তো ভালোই হবে, চাল ডাল কেনা লাগবে না। কলাগাছ কিনবো, কলাগাছ কেটে সামনে দিয়ে বলবো, খাও খাও।

তিতলি বললো, এটা কি বললেন?

গণেশ বললো, মানুষকে হাতির সাথে তুলনা করা অমানবিকতা, মানুষকে হেয় করে কথাবার্তা বলা ঠিক না। এসব হীনমনস্ক কথা কখনো বলবে না।

বাজনা বললো, আমি আমার স্বামীর রোজগারে চলবো তাতে তিতলি তোর কি? প্রতি মাসে শাড়ি কিনবো তাতে তোর কি? প্রতিদিন মাংস খাবো তাতে তোর কি? আমি আমার স্বামীর খাবার কেড়ে খাবো তাতে তোর কি? আমি আমার স্বামীর ঘাড়ে চড়বো তাতে তোর কি? বড় বড় নখ দিয়ে তাকে রক্তাক্ত করবো তাতে তোর কি?

মদন এসব কথা শুনে গণেশকে কানে কানে বললো, গণেশ, বিয়েটা তুই করিস না।

বাজনা সারাক্ষণ লক্ষ্য করেছে গণেশের পাঁচ বন্ধু গণেশকে নানা বুদ্ধি দিয়ে প্রলুব্ধ করছে যেন বিয়ে না করে। তাই সে তাদেরকে ঘরের মধ্যে রেখে তালা মেরে দিলো। গণেশ বাইরে থেকে বললো, এটা কি করছেন? আমার বন্ধুদের বন্দি করলেন কেনো?

বাজনা বললো, নানা কুবুদ্ধি দিচ্ছিলো তারা তোকে। আমার স্বরূপ দেখেছিস, রূপ দেখেছিস, গুণ দেখিসনি। পূর্বের তিন স্বামীর পরিবারের সদস্যদের মেরে আমি ভর্তা করেছিলাম। কিন্তু স্বামীগুলোর কাউকেই মারিনি। আমি খুব স্বামী ভক্ত ছিলাম। স্বামী ভক্তিই তো একজন আদর্শ নারীর আসল কাজ।

গণেশ এতক্ষণে ভয় পেলো। বাজনা বললো, ভয় পাচ্ছিস কেন্? কোনো স্বামীকে মারিনি মানে এই না যে, তোকে মারবো না। 

গণেশ ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে বললো, হাত দিয়ে মারবেন, না বুদ্ধি দিয়ে!

বাজনা বললো, হাতের কাছে যা পাবো তা দিয়েই মারবো। প্রয়োজনে ধরবো গলা আর মারবো আছাড়। বিয়ে শেষ হলে তোর বন্ধুরা ছাড় পাবে। তোকে জামাই আদর দিচ্ছি বলে তোকে বন্দি করছি না। 

গণেশ চারিদিকে উৎসুকের চোখে তাকিয়ে বললো, না, না, এমন মারপেটা বৌই আমার দরকার। আমার সহ্য ক্ষমতা বাড়বে, পাশাপাশি বাড়বে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা। আপনি আমার জন্য যথাপোযুক্ত পাত্র।

আশেপাশে আর একবার তাকিয়ে গণেশ জুতো হাতে নিয়ে দৌঁড় দিলো। ঠিক আধা ঘণ্টা পিছনের দিকে না তাকিয়ে দৌঁড়ালো সে। তারপর একটা গাছ ধরে হাঁপাতে হাঁপাতে নিজ মনেই বলতে থাকলো, নিজে তো বেঁচেছি। মরে মরুক ওরা। যেই ভয় পেয়েছি, আগামী এক মাস আর বিয়ের কথা মুখেই নেবো না।

যশোর, বাংলাদেশ

0 0 votes
Writing Rating
Share This
Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on telegram
Share on email
Share on linkedin
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
আমি যখন শিক্ষাজীবনের শেষলগ্নে তখন বাধ্য হয়ে একটি বাচ্চাকে পড়াতে গিয়েছিলাম। বাচ্চাটির বাবা মা দুজনই চাকরি করেন। বাচ্চাটি একা থাকতে থাকতে একরোখা আর বদমেজাজি …
রমিজ আর লাভলু বসে আছে। রমিজের মনের মধ্যে রাজ্যের যত কষ্ট সব ভর করেছে। গোমড়া মুখে নিরীহ প্রাণীর মত লাভলুর দিকে চেয়ে বললো, আব্বা …
হেকমত আর করিম দুই বন্ধু গল্প করছে। হেকমতকে মহাখুশি দেখে কারণ জানতে চাইলো করিম। হেকমত অতি আনন্দের সাথে বললো, মিয়া ভাইয়ের বিয়ে শেষ। এবার …
পঁচানন্দ মাংস খায় না মাংস মাংস গন্ধ করে বলে, মাছ খায় না মাছ মাছ গন্ধ করে বলে, ডিম খায় না ডিম ডিম গন্ধ করে …
সে অনেক কাল আগের কথা। ভজন ভট্টাচার্য নামে একজন গুণী শিক্ষক ছিলেন। আজ সেই ভজন স্যারের কথা আর তাঁর ছাত্রদের কথা শোনাবো।  ছাত্ররা তাঁকে …
নীলকান্ত বড্ড বোকা মানুষ। যার তার সাথে করে ফেলে বোকামি কাণ্ডকলাপ। একদিন তো বৌর উপর রাগ করে ঘরে না ঘুমিয়ে উঠানে ঘুমিয়েই রাত কাটিয়ে …
Read More
আমি যখন শিক্ষাজীবনের শেষলগ্নে তখন বাধ্য হয়ে একটি বাচ্চাকে পড়াতে গিয়েছিলাম। বাচ্চাটির বাবা মা দুজনই চাকরি করেন। বাচ্চাটি একা থাকতে থাকতে একরোখা আর বদমেজাজি …
রমিজ আর লাভলু বসে আছে। রমিজের মনের মধ্যে রাজ্যের যত কষ্ট সব ভর করেছে। গোমড়া মুখে নিরীহ প্রাণীর মত লাভলুর দিকে চেয়ে বললো, আব্বা …
হেকমত আর করিম দুই বন্ধু গল্প করছে। হেকমতকে মহাখুশি দেখে কারণ জানতে চাইলো করিম। হেকমত অতি আনন্দের সাথে বললো, মিয়া ভাইয়ের বিয়ে শেষ। এবার …
পঁচানন্দ মাংস খায় না মাংস মাংস গন্ধ করে বলে, মাছ খায় না মাছ মাছ গন্ধ করে বলে, ডিম খায় না ডিম ডিম গন্ধ করে …
সে অনেক কাল আগের কথা। ভজন ভট্টাচার্য নামে একজন গুণী শিক্ষক ছিলেন। আজ সেই ভজন স্যারের কথা আর তাঁর ছাত্রদের কথা শোনাবো।  ছাত্ররা তাঁকে …
নীলকান্ত বড্ড বোকা মানুষ। যার তার সাথে করে ফেলে বোকামি কাণ্ডকলাপ। একদিন তো বৌর উপর রাগ করে ঘরে না ঘুমিয়ে উঠানে ঘুমিয়েই রাত কাটিয়ে …