সিদ্ধান্তের বাঁক

সিদ্ধান্তের বাঁক

না থাকার মত দশটি ছেলে বন্ধুর চেয়ে একটি ভালো মেয়ে বন্ধু থাকা ভালো। দশটি ছেলে বন্ধুর সান্নিধ্যের চেয়ে একটি মেয়ে বন্ধুর সান্নিধ্য অনেক বেশী অনুকূল ফলাফল দেয়। বন্ধুত্ব হয় ভালো লাগা থেকে, দুটি মনের মাঝে মিলের ভারসাম্য না থাকলে বন্ধুত্ব স্থায়ী হয় না। আর বন্ধুত্বের আড়াল দিয়ে ভালোবাসা উঁকি মারে। অর্থাৎ বন্ধুত্বের শেষ পরিণতি ভালোবাসায় রূপান্তর। গভীর বন্ধুত্ব থাকলে তা ভালোবাসায় রূপান্তর পথে অন্তরায় হয়। শুধু বন্ধুত্বের মধ্যে গাঢ়তা থাকার কারণে কত অন্তর্নিহিত ভালোবাসা যে আলোর মুখ দেখে না তার ঠিক নেই। বন্ধুত্বের মধ্যের যে ভালোবাসা তার সংগা ভিন্ন। কোনো দাবি থাকে না, কিন্তু আবদার পূরণ হয়ে যায়। ধরা ছোঁয়ার অধিকার থাকে না, কিন্তু সান্নিধ্যে থাকার আকুলতাও কমে না। বন্দীত্বের বন্ধনে কেউ থাকে না, কিন্তু কেউ কাউকে না দেখলে বুক পিঞ্জরে ঝড় বয়ে যায়। 

আইরিন আর রাতুলের মাঝের বন্ধুত্ব এত বেশী প্রগাঢ় যে, অন্যরা দেখে ঈর্ষান্বিত হয়। পড়াশোনাতে অপেক্ষাকৃত আইরিন দুর্বল হওয়াতে রাতুলের সহয়তা পেতে পেতে ওদের মধ্যে এই বন্ধুত্বের সৃষ্টি। মেধাবী এবং মানুষ ভালো হওয়ার কারণে রাতুল আইরিনের খুব প্রিয়। মেয়েরা মেধাবী আর ভদ্র বন্ধুদের সাথে খুব কম মেশে। মেশে উড়নচণ্ডী, বেহিসেবী আর বাচালদের সাথে। আইরিনের ক্ষেত্রে ভিন্ন। থাকে একসাথে, ঘোরে একসাথে। মানুষ ভাবে ওরা প্রেম করে, কিন্তু ওরা প্রেম করে না, প্রেমের গল্পও করে না। দুইজনে মিলেমিশে পড়াশোনা করে। দুইজনই দুইজনের প্রতিযোগী, আবার সহযোগী। আর সবার কাছে অজেয়, অপ্রতিরোধ্য। 

আইরিন অনুপস্থিত থাকলে অ্যাটেন্ড্যান্স শীটে রাতুল স্বাক্ষর করে দেয়। স্যারেরা অ্যাসাইনমেন্ট দিলে লিখে দেয়। প্রশংসা করে আইরিন বলে, আমার দেখা সুন্দর ও করিৎকর্মা পুরুষ তুই। তোর মত একনিষ্ঠ আর উপকারী বন্ধু কারো নেই। 

এ যেন রাতুলের জন্য অনেক বেশী প্রাপ্তি। এটা সত্য, সাহায্য করে দিলে প্রশংসা, আর না করে দিলে তিরস্কার মোটেও বন্ধুত্বের মাঝে ভালো লক্ষণ নয়। বন্ধুত্বের বন্ধনে কোনো বাসনা থাকে না, কামনাও থাকে না। আইরিন যখন ডাকবে হাজার কাজ থাকলেও ফেলে চলে আসবে রাতুল। বন্ধুরা তখন বলে, চিত্র নায়িকা শাবনুর জীবনে কি নাচ নেচেছে, আইরিন তার থেকে বেশী রাতুলকে নাচাচ্ছে। ও বুঝেও বোঝে না।

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে থাকে আইরিন। ডাক পেয়ে সাইকেল চালিয়ে চলে গেলো রাতুল। আইরিন বলে, আমার ডাকে সাড়া দিয়ে নোট-পত্তর নিয়ে এত দ্রুতই যে চলে আসবি, কল্পনাও করিনি। 

রাতুল আনন্দে ফুঁসে ওঠে আইরিনকে অবাক করে দিতে পেরে। 

রাতে পড়তে বসে সমস্যায় পড়লে আইরিন রাতুলকে স্মরণ করে। অভিজ্ঞ শিক্ষকের মত বোঝাতে পারে রাতুল। মুগ্ধ হয়ে শোনে আইরিন। জানার অগভীরতা থাকলে প্রশ্নও জাগে না মনে। রাতুল নিজেই প্রশ্ন তোলে, নিজেই বোঝায়ে বোঝায়ে উত্তর দেয়। যেহেতু আইরিন তার সাহায্যপ্রার্থী হয়-ই, তাই সব পড়া আগে আগে পড়ে আত্মস্থ করে রাখে রাতুল। পড়া শুনতে শুনতে আইরিন ঘুমিয়ে যায়। রাতুল বুঝতে পেরে কল কেটে দিয়ে আবার কল দেয়, রিং বাজার শব্দে আইরিনের ঘুম ভাঙে, কিন্তু পাগল বন্ধুর পাগলামীতে তিলকণাও বিরক্তি প্রকাশ করে না।

জেরিন ম্যাম বাসাতে পিঠা বানাবেন। তাই তিনি কয়েকজন ছাত্রীকে বাসায় ডেকে নিয়েছেন। আইরিনও গিয়েছে। তখন বাকি নোটগুলো দেয়ার জন্য রাতুল ফোন দেয়। আইরিন বলে সে জেরিন ম্যামের বাসাতে। এখনই আসলে বাইরে দাঁড়াতে হবে। আইরিন দাঁড়িয়ে থাকতে বলেছে, ও দাঁড়িয়েই থাকলো। ছেলেরা এমনই বেবোধ, মেয়েরা যা বলে মন দিয়ে শোনে, আপ্রাণ পালনের চেষ্টা করে। মেয়েরা যদি ইশারায় ডাকে তো ছেলেদের জ্বর চলে যায়। অপ্রস্তুত থেকে প্রস্তুত হয়ে উদগ্রীব হয় সাহায্যের জন্য। আর ছেলেরা যদি ছেলেদের ডাকে, কত কাজের অজুহাত বের হয়। প্রায় তিন ঘণ্টা পর জেরিন ম্যামের বাসা থেকে আইরিন বাইরে বের হয়ে দেখে রাতুল সাইকেলসহ দাঁড়িয়ে। আইরিন রিক্সা ডেকে রিক্সাতে উঠে চলে যেতে লাগলে রাতুল দৌঁড়ে এলো। আইরিন বললো, যাইরে, খুব ক্লান্ত।

আইরিন চলে গেলো। ম্যামের বাড়ির সামনের দোকানদার রাতুলকে বললো, এই এক মিনিট কথা বলবে বলে তিন ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা?

রাতুল বিব্রত হয়ে চলে গেলো। আর মনে মনে ভাবলো, আরো দুই ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে পারতাম এই এক মিনিট কথা বলার জন্য।

রাতে জিসান ফোন দিলো। আর বললো, আমরা এবার চার লক্ষ চাকরীপ্রার্থী পরীক্ষা দিয়েছিলাম। সরকার আমাকে মেধাবী হিসেবে বাছাই করেছেন।

আইরিন বিরক্তি প্রকাশ করে বললো, আপনি যে মেধাবী আপনার কথা শুনলেই বোঝা যায়। 

গলার স্বর বাড়িয়ে জিসান বললো, আমার অনেক বেতন।

নাক সিটকিয়ে আইরিন বললো, কথার টোন শুনেই বোঝা যাচ্ছে! টাকার উত্তাপ পেলে মানুষের ভয়েসই চেঞ্জ হয়ে যায়।

জিসান নরম সুরে বললো, এরপরও যদি আমাকে পাত্তা না দাও, খালাকে বলে বিয়ে ভেঙে দেবো। আমার বিয়ের পথে আর কোনো বাঁধা নেই। চাকরি পেয়েছি, কত মেয়ে পাবো!

আইরিন দৃঢ়কণ্ঠে বললো, লজ্জা থাকলে আপনি আমার সাথে যোগাযোগই রাখতেন না। আপনার মত দম্ভধারীকে জীবনে কখনোই জীবন-পুরুষ ভাবিনি।

জিসান বললো, তোমাকে ভালো লাগে, তোমার বিষ বেশী তাই। প্রচণ্ড ঝাল মরিচেই আমার আকর্ষণ বেশী। হালিম খাবো, যদি দুই চোখ দিয়ে পানিই না বের হয়, ও হালিম না খাওয়ায় ভালো। তোমার বিষদাঁতে কত বিষ দেখবো তো!

আইরিন কল কেটে দিলো। ভীষণ মন খারাপ হয়ে গেলো ওর। মানুষের সাথে কথা বলার পর যদি মানুষের মন খারাপ হয় তবে কথায় কি পরিমাণ গরল থাকে বোঝা সহজ। অপছন্দের মানুষ থেকে অমৃত শুনলেও তো ভালো লাগে না। পছন্দের মানুষের কত দুষ্টমি আর ভাঁড়ামি কথাও তো দারুণ লাগে। ও রাতুলকে ফোন দিলো, বললো, তখন তোকে সময় দিতে পারিনি বলে কিছু মনে করিসনি তো?

রাতুল বললো, বন্ধুর আচরণে মন খারাপ করলে হয়? বন্ধুরা তো মারে, সেকি মার? বন্ধুরা তো গালি দেয়, সেকি গালি? 

আইরিন বললো, কাল সারাদিন আমরা ঘুরবো। শহর না, গাঁয়ে। তোর কাজ হলো আমার মন ভালো রাখা, পারবি তো?

রাতুল বললো, তোর সাথে থাকলে আমার সময় রেঙে থাকে। আমার সঙ্গ যদি তোকে রাঙায়, অবশ্যই তোকে সময় দেবো। আমার সময় সব তোর জন্য ব্যয়, অপব্যয়, অপচয় করবো, কোনো দ্বিধা নেই। 

তখন জিসান আবার ফোন দিলো। বিরক্ত হয়ে রাতুলকে রাখতে বলে জিসানের কল ধরলো। কল ধরতেই জিসান বললো, তোমার নাম্বার এত ব্যস্ত থাকে কেনো?

আইরিন বললো, আপনি সর্বোচ্চ শিক্ষাতে শিক্ষিত। নাম্বার ব্যস্ত থাকতেই পারে, এখানে প্রশ্ন আসে কেনো? হৃদয়বিকাশধারীদের তো মন সন্দেহপ্রবণ হয় না!

জিসান বললো, তুমি এখন আমাকে সময় দাও না।

আইরিন বললো, আপনাকে আমি কখনোই সময় দিইনি। আমি যতটুকু সময় আপনার সাথে কথা বলি বিনাগ্রহে, বিতৃষ্ণায়।

জিসান বললো, এমন তো রেগে আগে কথা বলতে না!

আইরিন বললো, যদি প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হতেন তবে সব বুঝতেন। রাগ, ক্ষোভ, ঘৃণা কোনো কিছুই তো বোঝেন না!

আইরিন কল কেটে রাতুলকে ফোন দিয়ে বললো, সারারাত আমার ফোন নাম্বারটাকে ব্যস্ত রাখতে পারবি?

রাতুল বললো, তুই যদি কথা বলিস সারারাত কথা বলতে আমার আপত্তি নেই।

আইরিন বললো, না, আমি কথা বলবো না। আমি ঘুমাবো। তুই আমার সেটে ফোন দিয়ে রেখে দে।

রাতুলের মন ভেঙে গেলো। এমন একটা অনুরোধ পেলো সে না পারলো প্রত্যাখ্যান করতে, না পারলো গ্রহণ করতে।

পরদিন ওরা গ্রাম ঘুরতে বের হয়ে পড়লো। একটা নাম অজানা গাছের শীর্ষে ফুল ফুঁটেছে দেখে আইরিন বললো, দেখ্ দেখ্ কী দারুণ ফুল!

রাতুল শার্ট খুলে গাছে উঠে ফুল নিয়ে নামলো। বুকের কয়েক স্থানে ডাল-বাকলের আঁচড় লেগে রক্তাক্ত হয়ে গেছে। দেখে আইরিন বললো, তোকে ফুল পাড়তে বলেছি? ওহ, দেখ্ কত কেটেছে, রক্তও ঝরছে।

রুমাল দিয়ে রক্ত মুছে রাতুল শার্ট গায়ে দিলো। বললো, চল্। তুই একটা ফুল। তোর হাতে ফুল। এক ফুলে তাই বাঁচি না! পুষ্পে পুষ্পে আমার সম্মুখ পুষ্পাচ্ছন্ন।

বলে রাতুল একটা ছবি তুললো আইরিনের। সামনে যেতেই একটা ডোবা পুকুর। তাতে ফুঁটেছে শাপলা। দেখে চমকিত হয়ে আইরিন বললো, আরে কি দারুণ শাপলা। কত নাম শুনেছি, কখনো দেখিনি।

পাশেই কৃষক কাজ করছিলেন। তাঁর মাথার গামছা নিয়ে, ওটা পরে পুকুরে নেমে গেলো রাতুল। আইরিন বললো, আরে মজা পুকুর। সাপ থাকতে পারে। 

রাতুল বললো, পানির সাপে বিষ থাকে না। 

আইরিন বললো, আরে, শরীর চুলকাবে তো!

রাতুল বললো, চুলকাবে না। আমি গাঁয়ের ছেলে। মজা-পঁচা ডোবাতেই গোসল করে বড় হয়েছি।

শাপলা এনে আইরিনকে দিলো। আইরিন বললো, তোর মত পাগল বন্ধু থাকলে জীবনে দুঃখ, হতাশা, কষ্ট, ক্ষোভ, মলিনতা কিছুই থাকবে না।

রাতুল আর আইরিন হেঁটে চলেছে। চায়ের দোকানে চা-বিস্কুট খেতে গেলো। দোকানদার চা-বিস্কুট দিচ্ছেন আর আইরিনের দিকে বাঁকা চোখে তাকাচ্ছেন। নজরের মধ্যে বিকৃত আভাষ। রাতুল বুঝতে পেরে বললো, চাচা, চাচী কি মারা গিয়েছেন?

সম্বিত ফিরে পেয়ে চা বিক্রেতা বললেন, না!

রাতুল বললো, চাচী বয়স্ক হয়েছেন বলে মনে হয় আর ভালো লাগে না, তাই না?

চা বিক্রেতা বললেন, না, না, তা নয়।

রাতুল এবার বললো, চাচীকে দোকানে রাখলে তো পারেন। দেখতেও পারবেন, ধরতেও পারবেন।

চা বিক্রেতা চুপ হয়ে গেলেন। দোকানের শেষ প্রান্ত থেকে সশব্দে একজন বললো, কপালটা যেমন, কপোল দুটোও তেমন। আর ঠোঁট দুটো যেন ভূমিকা চাওলার মত।

রাতুল শুনে দৌঁড়ে গিয়ে লোকটির জামার কলার ধরলো। দুই চারটে থাপ্পড়ও মেরে দিলো। দোকানে একটা হট্টগোল বেঁধে গেলো। সব শুনে অন্যান্যরা রাতুলের পক্ষেই কথা বললো। তারপর ওখান থেকে ওরা দ্রুত হেঁটে চলে গেলো। আইরিন বললো, আরে, তুই কত রাগী ছেলে! বখাটে এবং আমি দুইজনই খুব ভয় পেয়েছি। 

রাতুল বললো, তোকে অসম্মান করে কথা বলবে কেনো? তোকে না, কোনো নারীকেই তো অসম্মান করা পুরুষের উচিত নয়। রোম্যান্টিক ইমেজধারী টিজিংকারীদের রোম্যান্টিকতার পর্দার আড়ালের নেতিবাচক পরিণতি কেউ লক্ষ্য করি না।

ওরা হাটতে লাগলো। রাতুল বললো, একদিন লিয়াজোকে মেরেছিলাম, ও নিয়মিত বোর্ডে অশ্লীল কথা লিখতো। অধীরকেও মেরেছিলাম, ও রাথরুমের দেয়ালে বাজে বাজে ছড়া লিখতো, অশ্লীল ছবি আঁকতো, টাকায় মেয়েদের মোবাইল নম্বর লিখতো।

আইরিন বললো, এতদিনে বুঝলাম ঐ দুটোর সাথে কেনো মিশিস না। তোর মতো ছেলে যদি ঘরে ঘরে থাকতো, পৃথিবীটা আলোকিত হতো।

শহরে ফিরবে বলে বাসে উঠলো। একটি সিট খালি আছে৷ আইরিনকে বসতে বলে আইরিনের পাশেই দাঁড়িয়ে থাকলো রাতুল। আইরিনের পাশের সিটে যে ভদ্রলোকটি বসেছেন তিনি সিগারেট ধরালেন। আইরিনের ব্যাপক অস্বস্তি লাগছে। সবাই দেখছেন কেউ প্রতিবাদ করছেন না। রাতুল লোকটির জামার কলার ধরে গেটে এনে বাস থামিয়ে গলা ধাক্কা দিয়ে বাস থেকে বের করে দিলো। বাসের সবাই বাহবা দিলো। অথচ এই বাহবাটা নিজে নিতে কেউ চায় না, শরীর বাঁচিয়ে চলে। আইরিন বললো, প্রতিবাদ ভালো৷ এতে কিন্তু শত্রু বাড়ে। 

বাস থেকে নামার পরপরই একটা বাজে শব্দ রাতুলের কানে এলো। কুটিল শব্দ উচ্চারণকারীর সম্মুখে যেয়ে ভীষণ রেগে রাতুল বললো, কী বললি? হাউ নাইস?

আইরিন রাতুলের হাত ধরে টেনে এনে বললো, তোকে নিয়ে বাইরে বের হলে বিপদের আশঙ্কা। 

রাতুল একদমে বললো, আমি পুরুষ না? আমাকে প্রতিবাদ করতে দিবি না?

আইরিন বললো, পথে-ঘাটে উঠলে এমন একটু উত্যক্ততা, কটাক্ষতা, অশালীন অঙ্গভঙ্গি মেয়েদের সহ্য করতে হয়।

রাতুল বললো, যতক্ষণ তুই আমার সাথে থাকবি, তোর রক্ষার দায়িত্ব আমার কাঁধে বর্তায়।

কথাগুলো খুব ভালো লাগলো আইরিনের। ও মুখ তুলে একবার ভালো করে রাতুলকে দেখলো, তারপর বললো, তুই অনেক ভালো, কিন্তু তোকে নিয়ে আমার ভাবতে ভালো লাগে না। 

রাতুল বললো, ভাবতে হবে না আমাকে নিয়ে। আমি তোর ভাবনাতেই থাকি। চল্।

রাতে আইরিন ফোন দিলো। আর বললো, কিরে, তোর বুকে জ্বালাপোড়া করছে?

রাতুল আশ্চর্য হয়ে বললো, আমি তো কোনো প্রেম করি না যে, প্রেমিকা পীড়া দেবে, আর বুক জ্বালাপোড়া করবে!

আইরিন বললো, আরে ধূর! বলছিলাম গাছে উঠে যে বুক ছিলে ফেলেছিলি তার কী অবস্থা?

রাতুল বুঝতে পেরে বললো, আরে তাই তো! আমি তো ভুলেই গিয়েছি আমার বুক ছিলে-কেটে গেছে!

আইরিন অবাক হয়ে বললো, বুঝেছি, তুই শক্ত-সমত্থ পুরুষ। জানিস, তোকে দেখে আজ আমার ভীষণ লজ্জা লেগেছিলো। 

রাতুল আশ্চর্য হয়ে বললো, আমি তো আজ বোতামওয়ালা প্যান্ট পরেছিলাম। প্যান্টের চেন খুলে থাকার প্রশ্নই আসে না।

আইরিন বিরক্ত হয়ে বললো, আরে ধূর! যখন শার্ট খুলে গাছে উঠেছিলি, পুকুরে নেমেছিলি তখন তোর বডি দেখে লজ্জা লেগেছিলো। বুক ভর্তি পশম। তোর বৌ তোকে খুব আদর করবে!

এমন সময় আইরিনকে জিসান ফোন দিলো। রাখি বলে আইরিন ফোন কেটে দিয়ে জিসানের ফোন ধরলো। রাতুল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বুকের পশম দেখতে লাগলো। যে পশমের প্রতি কখনো তার নজর পড়েনি, সেই বুকের পশমে কেউ মুগ্ধ হয়েছে জেনে ও আপ্লুত হলো।

ওদিকে জিসানের উদ্ভট প্রশ্নে আইরিন বিরক্ত হচ্ছে। বললো, আপনাকে মোটেও আমার ভালো লাগে না। না আপনি ব্যবহারে মার্জিত, না আপনি চরিত্রে শিষ্ট। আপনি ব্যাংকে চাকরি পেয়েছিলেন কী করে?

জিসান বললো, ম্যাথ ভালো পারতাম।

আইরিন বললো, প্লাসে প্লাসে কি হয়? 

জিসান স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললো, প্লাস!

আইরিন পরক্ষণে প্রশ্ন করলো, দ্বন্দ্বে দ্বন্দ্বে? 

এমন প্রশ্নে জিসান চুপ হলো। আইরিন বললো, মহাদ্বন্দ্ব। আপনাকে আমি নিতে পারি না। খুব মনোদ্বন্দ্বে ভূগী। 

জিসান বললো, তোমাকে আমি বুঝি না। তোমার চোখে কান্নাও দেখি না, হাসিও দেখি না৷ আমাকে তিরস্কারের কোনো কারণই পাই না। আমি কোন দিকে কম?

আইরিন বললো, আপনার এই অহমটাও কম না। 

জিসান বললো, তোমাকে নিয়ে আমার ভয় হয়!

আইরিন বললো, আমাকে নিয়ে ভয় করারও দরকার নেই, নির্ভয়ে থাকারও দরকার নেই। 

জিসান রেগে বললো, তুমি অন্য কারো সাথে রাতে কথা বলবে না। আমার খুব খারাপ লাগে।

আইরিন রেগে বললো, আমি কার সাথে কথা বলবো, না বলবো, একান্তই আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার।

কল কেটে দিয়ে আইরিন ফুলের পাপড়িগুলো বইয়ের ভাজে ভাজে রাখলো। আর মনে মনে বলছে, পাগলটা খুব কষ্ট করে ফুলগুলো এনে আমাকে দিয়েছে।

পরদিন খালাকে ফোন দিলো জিসান। বললো, খালা, আইরিন তো আমাকে সহ্যই করে না। দুর্ব্যবহার করে।

খালা বললেন, ঠিক আছে, আমি আইরিনকে দেখছি।

আইরিনের মা আইরিনকে ধরলেন, জিসানের সাথে দুর্ব্যবহার করিস কেনো? ও একটা প্রতিষ্ঠিত ছেলে।

আইরিন রেগে বললো, প্রতিষ্ঠিত বলতে তোমরা কী বোঝ বুঝি না। সংসারে সবাই যুদ্ধ করছে, আর যুদ্ধ করে যাওয়ায় জীবন। আয় করছে, খাচ্ছে, ঘুমাচ্ছে, জীবন যাচ্ছে। এক অর্থে সবাই প্রতিষ্ঠিত, অন্য অর্থে কেউ প্রতিষ্ঠিত না।

মা বললেন, বেশী বুঝিস না। জিসান মেধাবী। সরকারি চাকরি করে। টাকা-পয়সা আছে।

আইরিন বললো, মা, সুখের মাপকাঠি টাকা নয়। জিসানের আচার-ব্যবহার আমার কাছে সু্বিধার মনে হয় না।

মা দৃঢ়কণ্ঠে বললেন, জিসান ও তার মাকে আমি কথা দিয়েছি। কাল শুক্রবার। জিসানের সাথে দেখা করতে যাবি।

আইরিন বললো, কোনো বাবা-মা কাপুরুষের হাতে সন্তানকে তুলে দেয় না।

পরদিন আইরিন জিসানের সাথে দেখা করতে যেতে বাধ্য হলো। মা জোর করে শাড়ি পরিয়ে দিয়েছেন। জিসানের সাথে দেখা হতেই জিসান চোখের কোণ দিয়ে চেয়ে বললো, শাড়ি পরে এসেছো? শাড়িতেই নারী সুন্দরী। শাড়িতেই নারীর সৌন্দর্য ফোঁটে। শাড়িতেই নারীর সৌন্দর্য বিকশিত হয়।

আইরিন বললো, লোলুপ চোখে তাকালে সৌন্দর্য চোখে পড়ে না। চোখের যৌনতা যত কমাবেন, ততই সৌন্দর্য চোখে পড়বে।

জিসান নির্লজ্জের মত বললো, চারিদিকে এত পানি অথচ পান করতে পারছি না। এই দেখো, তুমি কত কাছে, অথচ হাহাকার গেলো না। 

আইরিন বললো, তৃষিতের তৃষ্ণার জলে তৃষ্ণা কমে। কিন্তু আপনার মতো আহম্মকের অজস্র প্রাপ্তিতেও আহম্মকী কমবে না।

জিসান আবারও বললো, আজ বাঘ হতে পারলে হরিণীর ঘাড় মটকাতে পারতাম। বাঘের অবশ্য ভোগের জন্য  চার দেয়ালের আবদ্ধতা লাগে না।

আইরিন তীব্র জবাব দিলো, সামনে মেয়ে মানুষ থাকলে ঠিক থাকা যায় না, তাই না? মেয়ে মানুষের শরীর দেখলে যে পুরুষের শক্তি জাগে সে পুরুষ পুরুষ না, গরু, ছাগল।

জিসান জিহ্বা কেটে বললো, আমি গরু, ছাগল?

আইরিন বললো, তাছাড়া কি? শিকারী বিড়ালের গোঁফ দেখলে চেনা যায়। আমি দুই পয়সার মোয়া নই, গাছের ফলও নই, যে হাত বাড়ালেই পাওয়া যাবে।

জিসানও ব্যঙ্গ করে বললো, তোমার মত গান্ধীপোকার গন্ধ নিচ্ছি, এটাই তোমার কপাল। পরী তো নও, তুমি উঁইপোকা। পরীর ডানা আর উঁইপোকার ডানা এক নয়। যা বলছো শুনে ভুলে যাচ্ছি, এটা তোমার কপাল।

আইরিন খুব রেগে গেলো। দেখে জিসান বললো, মেয়ে মানুষ রাগলে খুব বাজে লাগে। মেয়ে মানুষকে ক্ষেপতে নেই। সাজবে। নতুন নতুন শাড়ি পরবে। নারীকে রাগতে নেই, রগচটা নারী কখনো কারো কামনার হয় না। রাগী নারী, বদ নারী সুন্দরী হলেও পরিত্যাজ্য। পুরুষ কখনো তাদের বাসনা দিয়ে উষ্ণ করবে না।

আইরিন গুরুগম্ভীরকণ্ঠে বললো, যে পুরুষ নারীকে সম্মান দিতে জানে না, সে পুরুষও কারো বাসনার হতে পারে না, পরিত্যাজ্য।

জিসান কঠিন থেকে তরল হয়ে বললো, তোমাকে অপহরণ করবো না, তোমার হৃদয় অপহরণ করবো।

আইরিন বললো, দুষ্কৃতকারীরাই হরণ-অপহরণই করে। তারা হৃদয়ের মর্ম বোঝে না। 

জিসান বললো, তুমি এমন ঘা মেরে কথা বললে একটা সফল প্রণয়ের সফল পরিণতি হবে কিভাবে?

আইরিন হতবাক হয়ে বললো, প্রণয় মানে? জোর করছেন আপনি। রশি দিয়ে গরু বেঁধে রাখা যায়, ছাগল বেঁধে রাখা যায়, মানুষ না। মানুষকে বাঁধতে মায়া লাগে।

জিসান বললো, স্রোতের শেওলার মত আর কত ঘুরবে? উদ্দেশ্যহীন ভাবে চলা তো জীবন নয়। তোমাকে নিয়ে আমার অনেক উদ্দেশ্য।

আইরিন রেগে বললো, আপনি বুঝেও না বোঝার ভান করেন। অন্যের মতের কোনো দাম নেই আপনার কাছে। আপনি কি বোঝেন না আমি কি বলতে চাই?

জিসান বললো, শুনেছি, তোমরা ভালোবাসলে লতার আঁকড়ির মত জড়িয়ে ধরো, আর ছাড়ো না। আমাকে কি ভালোবাসতে পারো না? 

আইরিন বললো, আপনার যশ-খ্যাতি আছে, আপনি কেনো আমার ঘাটে তৃষ্ণার জলের জন্য ছটফট করেন?

জিসান বললো, তোমাকে দেখতে দেখতে তোমার প্রতি দুর্বলতা বেড়েছে। তোমার আমার বিয়ে ঠিক হওয়ার পর থেকে তোমার প্রতি ভাবনা বেড়েছে, কেনো বোঝ না? পুরুষ ভেসে বেড়াতে পারে, তোমাদের ভেসে বেড়ালে চলে না, একটা স্থায়ী ঠাঁই চায়। আপন সংসার না পেলে মেয়েরা কি বাঁচে? কথা দিচ্ছি সুখ দেবো, শান্তি দেবো, নিরাপত্তা দেবো, মায়াও দেবো, আদরও দেবো। চন্দ্র, সূর্য কক্ষপথ থেকে সরে গেলেও আমি তোমার পাশ থেকে সরবো না। বিশ্বাস করো, তোমাকে অনেক ভালোবাসি, তোমাকে অদেয় আমার আর কিছু নেই। তুমি পাশ থেকে সরে গেলে পায়ের তল থেকে আমার মাটি সরে যাবে। তোমার কারণে মনে ভাব বেড়েছে, তার ঢেউ কমছে না। তোমার কারণে মনে রং লেগেছে। মনের বসন্ত বনের বসন্তের মত চলে যাচ্ছে না। আজ তুমি সর্বস্ব আমার আমিত্ব। 

বলেই জিসান আইরিনের হাত দুটি ধরলো। আইরিন হাত সরিয়ে নিলো। জিসান বললো, আমি কি তোমার দুর্লভ ভালোবাসার ছিটেফোঁটাও পাবো না?

আইরিন নরম সুরে বললো, আমি বাড়ি যাবো।

পাশেই একটা সুন্দর পার্ক আছে। জিসান জোর করে আইরিনকে পার্কে যেতে রাজি করালো। যেতে যেতে আইরিন দেখলো রাস্তার ঠিক নিচেই ক্ষেতের বেড়াতে ফুল ফুঁটে আছে। ফুল দেখলে ও বাচ্চা হয়ে যায়, আহ্লাদি হয়ে পড়ে। জিসানকে বললো, ফুলগুলো দারুণ!

জিসান বললো, আমি এনে দিতে পারবো না। কিসের কি ফুল! বিষাক্তও হতে পারে! ধরলে হাত চুলকাতে পারে। ঘ্রাণ নিলে এলার্জিও হতে পারে!

আইরিন জিসানের কথা না শুনে নিজেই নেমে ফুল নিয়ে এলো। তারপর আবার হাটতে লাগলো। হঠাৎ আইরিন বললো, আমার বন্ধু রাতুল, ওকে যদি বলতাম জঙ্গল থেকে জংলীফুল এনে দিতে, ও তাও এনে দিতো।

জিসান নাক সিটকায়ে বললো, ওসব সস্তা বন্ধুদের বাদ দাও। বুনোফুল, জংলীফুল নিয়ে পড়ে আছে!  চলো, বাজার থেকে দামী ফুল কিনে দেবো।

আইরিন হেসে বললো, ফুল কেনার টাকাটুকুও কি আমার নেই? আপনার কেনা ফুল আমি নেবো কেনো? আপনার হাতের দামী ফুলে কি হবে যদি সে ফুলে মনই না ভরে!

ওরা পার্কে গেলো। অনেক মানুষ ঘুরে ঘুরে দেখছে। তিন চারটে ছেলের মধ্য থেকে কে যেন বললো, ফুল কাননে এ ফুল কোথা থেকে এলো? এত সুন্দর ফুল! অলিও তো সাথে আছে!

জিসান আইরিনকে টেনে নিয়ে অন্য দিকে চলে গেলো। আইরিন বললো, ওরা আমাকে বাজে কথা শোনালো, আপনি প্রতিবাদ করলেন না কেনো?

জিসান বললো, ওরা বখাটে। কোনো বিবেক নেই। কথা বললেই ঝামেলা বাড়তো।

আরো একটু সামনে যেতেই দেখলো বেশ কয়েকটা ছেলে বসে আড্ডা দিচ্ছে। আইরিনকে দেখে কেউ শীস দিলো, কেউ চোখ টিপ দিলো, কেউ অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করলো।

জিসান আইরিনকে নিয়ে দ্রুত পার্ক থেকে বের হয়ে গেলো। আইরিন বললো, আপনি তো ভীতুর ডিম। গা বাঁচিয়ে চলা মানুষ। গা বাঁচিয়ে কত দিন বাঁচা যায়? আপনি তো আপনার জীবন সঙ্গীর নিরাপত্তা দিতে পারবেন না!

জিসান বললো, ওরা খুব বিপদজনক। শোনো, যারা সহ্য করে তারা টিকে থাকে।  

বখাটে ছেলেগুলো পিছন পিছন এলো। একজন বললো, দুইজনই পরিষ্কার, বাচ্চাও পরিষ্কার হবে।

ইঙ্গিতপূর্ণ কথাটি বুঝতে পেরে জিসান দ্রুত রিক্সা ঠিক করে নিলো। দুইজন রিক্সাতে যেতে লাগলো। আইরিন বললো, ছি! মানুষ এত নীচ! আপনার সাথে এসে আজ এত অসম্মানিত হলাম। 

জিসান বললো, বিকৃত মন-মানসিকতার মানুষ বিকৃত বিনোদন গ্রহণ করে।

আইরিন চুপ করে থাকলো। পথে-প্রান্তরে নারীদের হেনস্তা একটি স্বাভাবিক বিষয় হয়ে গেছে। যে নারী যত দ্রুত এসব বিষয়কে মানিয়ে নিতে শিখেছে তার পথ চলাতে তত দ্রুত স্বাচ্ছন্দ্য ফিরেছে। কোনো এক বখাটে বখাটেপনা কথা বলতেই পারে। তাতে মন খারাপ করে ঘরে থাকলে জীবন থেমে যাবে। প্রতিবাদ করা যেখানে বিপত্তির কারণ, সেখানে সহ্য করা শিখতে হবে। কে কী বললো আমি শুনলাম না, কে কী ইশারা-ইঙ্গিত করলো আমি দেখলাম না, লজ্জা পেলাম না, তবেই তো হলো। প্রতিবাদ করা ভালো, সবাই প্রতিবাদ পারে না, কোনো কালে পারবেও না। কিন্তু সহ্য করতে সবাই পারে, সহ্য করা শিখতে পারে। কোনো বখাটেই শেষ জীবন পর্যন্ত বখাটে থাকে না। পুরুষ যতই ভদ্র আর নম্র হোক না কেনো, জীবদ্দশায় অবশ্যই বখাটেপনা করেছে। মানুষ ভালো হয়ে গেলে অতীত নিয়ে খুব আক্ষেপ করে। প্রতিটি খারাপ কাজ করার জন্য অনুতপ্ত হয়, অনুতাপানলে পোড়ে, প্রায়শ্চিত্ত করতে চায়। যেকোনো ছেলে বা পুরুষ কোনো মেয়ে বা নারীকে উত্যক্ত করে থাকুক না কেনো, কোনো এক পর্যায়ে ঐ ছেলে বা পুরুষ যদি ঐ মেয়ে বা নারীর সম্মুখে পড়ে কখনো মুখ তুলে তাকাতে পারবে না। এ সাজার চেয়ে বড় আর কী সাজা আছে?

জিসান অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর বললো, তুমি চুপ কেনো? গম্ভীর কেনো? খারাপ পরিস্থিতির কথা ভুলে যেতে হয়।

আইরিন উত্তর করলো না। হঠাৎ জিসান বিহায়সকে দেখলো। ছোটবেলার বন্ধু। রিক্সাওয়ালাকে থামায়ে ওরা নামলো। বিহায়সের সাথে আইরিনের পরিচয় করিয়ে দিলো। আইরিনকে রেখে ওরা দুই বন্ধু দূরে গিয়ে সিগারেট ধরালো। বিহায়স বললো, বিয়ে সেরে ফেল। অনুকূল বাতাসে নৌকা চলছে বলে বুঝতে পারছিস না, বাতাস প্রতিকূলে ধাবিত হলে লণ্ডভণ্ড হয়ে যাবি।

জিসান নিশ্চিন্তের সুরে বললো, বাতাস প্রতিকূলে ধাবিত হবে না। খালাতো বোন। খালা আমাকে ছাড়া কিছু বোঝেন না।

বিহায়স বললো, তোর খালাতো বোন তো তোকে পছন্দ করে না আগেই বলেছিলি। ঘুড়ি যদি কেটে যায় লাটাই নিয়ে আফসোস করা লাগবে।

জিসান বললো, ওর অনার্স শেষ হলেই বিয়ে করবো।

বিহায়স বললো, অনেক পাকলে ফল আর ফল থাকে না। রংও থাকে না। অনার্স পাস করাতে হবে না।

জিসান বললো, আরে উপভোগ কী কম করছি!

বিহায়স বললো, দিন দুপুরে তাকে নিয়ে ঘুরে বেড়ানোতে আর কী উপভোগ হচ্ছে? উপভোগ তো চার দেয়ালের মাঝে! উপভোগ থেকে ভোগ ভালো, ভোগ থেকে তো সম্ভোগ শ্রেষ্ঠ। দুর্ভোগ আর না। বিয়ে করে ফেল।

কিছু কিছু কথা আইরিনের কানে এসেছে। সে বুঝলো, বিকৃত মানুষের বন্ধুও বিকৃত হয়। জিসান সিগারেট টানতে টানতে এসে বললো, আমি বিহায়সের সাথে আড্ডা দেবো। তুমি বাড়ি চলে যাও।

আইরিন ভীষণ অবাক হলো একটা মেয়েকে জিসান বাসাতে পৌঁছে না দিয়ে তাকে একাই চলে যেতে বললো কী করে তা ভেবে।

দিন শেষে বাড়ি এসে জিসান মাকে খুব করে বোঝালো যে অনার্স পাশ করার পর না, এখনই সে আইরিনকে বিয়ে করবে। প্রয়োজনে অনার্স পাশের পর বৌ ঘরে তুলে নেবে৷ জিসানের মা আইরিনের মাকে ফোন দিলেন। আইরিনের মা জিসানের মায়ের কথাতে সম্মত হলেন। মা আইরিনকে বললেন, পরশু শুক্রবার তোর বিয়ে। ছেলেপক্ষ কখনো এত আগ্রহ করে আসে না। কোনো ধুমধাম হবে না। অনুষ্ঠান পরে করবো।

আইরিন গাছ থেকে পড়ে বললো, মা, হৃদয় কৃষক জানে কিভাবে সম্পর্কের চাষ করতে হয়। মন-মননে কী বুনতে হয় বাবলার কাঁটা, ঘৃণার আগাছা; না গোলাপ, না রজনীগন্ধা! জিসান স্বেচ্ছাচারী, ও তোমার মেয়েকে কোনো কালে গুরুত্ব দেবে না।

মা বললেন, বিয়ের পর সব ঠিক হয়ে যাবে। সংসারে গেলে সব মানুষ সংসারী হয়। 

আইরিন বললো, মা, মানুষ ভুল নিমেষ নয়নেই করে ফেলে, মাশুল দেয় গোটা জীবন।

মা বললেন, পুরুষ মানুষ তেজস্বীই ভালো৷ তোর মন গবেষণা না করে করুক, ঐ সময়ে সে আয়-রোজগার করবে। তোর বাবাও কখনো তোর মায়ের আঁচল ধরে হাটা পুরুষ ছিলো না। 

আইরিন বললো, তরকারী, লবণের নিশ্চয়তা আছে বলেই মা তুমি আমাকে অবিবেচকের ঘরে পাঠাবে?

মা বিরক্ত হয়ে চলে গেলেন। এভাবে কথা বললে কথা বাড়তেই থাকবে। এখন তার কথা না শোনা, তাকে কথা না বলতে দেয়া আর বাইরে যেতে না দেয়া সবচেয়ে কার্যকর কাজ।

বৃহস্পতিবার রাতে আইরিন রাতুলকে ফোন দিলো। বললো, কী করছিস?

রাতুল বললো, ইমেজ ওপেন করে তোর ছবি দেখছি।

আইরিন বললো, আর আমার ছবি দেখে কী হবে? মাধুরী দীক্ষিতের ছবি দেখ্।

রাতুল বললো, মাধুরী দীক্ষিত দূর আকাশের মায়াময়ী চাঁদ, প্রহেলিকা। আর তুই তো…

রাতুলের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে আইরিন বললো, আমাকে তোর ভালো লাগে?

রাতুল হেসে বললো, তুই কী ভালো না লাগার মত কোনো মেয়ে? দেখ্, আমার সেটে তোর অনেক ছবি। যেগুলো ভালো উঠেনি ভাবছি কেটে দেবো। শত চেষ্টা করেও একটা ছবি কাটতে পারছি না।

আইরিন বললো, আমার কী ভালো লাগে তোর? কথা? রূপ? হাসি? মান-মানসিকতা?

রাতুল বললো, তোর হাসি ভালো লাগে, তাই নানা মজার কথা বলে বলে তোকে হাসতে বাধ্য করি। তোর চিন্তিত মুখ দেখতে ভালো লাগে, তাই কঠিন কঠিন প্রশ্ন করে তোকে চিন্তায় ফেলে দিই। তোর চোখের মণি দেখতে ভালো লাগে, তাই দূর আকাশের বলাকা উড়া তোকে দেখতে বলি। তুই দূর আকাশে তাকালে আমি তোর চোখের মণি দেখি।

আইরিন বললো, সেদিন বলেছিলি তুই আমার ভাবনাতেই থাকিস। আসলেই তুই আমার ভাবনাতেই থাকিস। তোকে ভাবনা থেকে সরাতে পারি না। আমি যতই তোকে অন্যের সাথে তুলনা করি, তুই জিতে যাস। তোর ভেতর অনেক ভালো লাগার বিষয় আছে।

রাতুল বললো, আজ আমাকে অনেক গুরুত্ব দিচ্ছিস! তোর কি মন খারাপ?

আইরিন বললো, মন খুব খারাপ, কিন্তু তোকে বলবো না। তোরও মন খারাপ হয়ে যাবে। আমি জানি, আমার প্রভাবে তুই প্রভাবিত। আচ্ছা, তুই এত ভালো একটা ছেলে, কিন্তু তোকে আমি ভালোবাসিনি কেনো?

রাতুল বললো, অবশ্যই আমাকে ভালোবাসিস। সব সময় সাথে থাকি তো এজন্য ওটা প্রকাশ হয় না। আমার অনুপস্থিতিতে দেখবি তোর কতটা জুড়ে আমি!

আইরিন আর কথা বলতে পারলো না, ওর মাথা ধরে আসলো রাতুলের কথা শুনে। 

পরিস্থিতি মানুষকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যায় একটা কাপুরুষকেও জীবনের সঙ্গী করতে বাধ্য হতে হয়। বাস্তবতা এত সত্য হয়ে দাঁড়ায় জীবনের শ্রেষ্ঠ হওয়ার যোগ্য যে তাকেও ত্যাগ করতে হয়। মনের বিরুদ্ধে থাকা মানুষকে গ্রহণ করা যখন একান্ত বাধ্যবাধকতা হয়ে দাঁড়ায় তখন জীবনের প্রতি খুব বিতৃষ্ণা জন্মে। ধিক্কার দিতে ইচ্ছে হয় নিজেকে, নিজের ভাগ্যকে, না বুঝতে চাওয়া মানুষগুলোকে। আর তাই বিবেকসম্পন্ন, প্রতিবাদী, পাশাপাশি নিরাপত্তা দানে আগুয়ান মানুষকে মনের কোল থেকে ছুঁড়ে ফেলে অনাগ্রহের প্রতি তাকাতে হয়, তার হাতে হাত রাখতে প্রস্তুত হতে হয়, মিথ্যে হেসে বুকের কষ্ট লুকাতে হয়।

শুক্রবার সকালে সৌপ্তিক আইরিনকে ফোন করে বললো, লিয়াজো আর অধীর মিলে রাতুলকে মেরেছে। ও এখন মেডিকেলে ভর্তি। যাবি দেখতে আমাদের সাথে?

না উচ্চারণ করে আইরিন ফোন রেখে দিলো। চোখ ফেঁটে পানি অঝোরে ঝরতে লাগলো। যে বিপদে-আপদে, সুখে-দুখে, বিরূপ পরিস্থিতিতে পাশে থেকেছে, বিকৃত রুচিধারীদের দাঁতভাঙা জবাব দিয়েছে, সর্বক্ষণ সাহায্য করেছে, সঙ্গ দিয়েছে এমন একটা উপযুক্ত, দরকারী, সৎ, সাহসী বন্ধুর বিপদে পাশে না থাকতে পেরে একটা নিকৃষ্ঠ, উচ্চাভিলাষী, দম্ভধারী,  ভীরু কাপুরুষ, নপুংশককে বিবাহ করবে বলে ও বৌ সেজে বসে আছে।

একটু পরে বরপক্ষ গাড়ি নিয়ে হাজির হলো। বাড়িতে আনন্দ, হৈ-হুল্লোড় শুরু হয়ে গেলো। শুধু একটি প্রাণে নেই কোনো স্পন্দন…

Share This
Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on telegram
Share on email
Share on linkedin
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
এই না হলে বস্তী! ভোরের কিঞ্চিৎ আলো উঁকি মারার পূর্বেই বড়রা কাজ সেরে মোটামুটি নিশ্চিন্ত। ছোটরা এবার ব্যস্ত। সারি দিয়ে ট্রেন রাস্তার পাশে বসে …
বেশ কয়েক মাস পরে ছবেদার বাবা মা ছবেদাকে দেখতে এসেছেন। বাবা মাকে পেয়ে মনের কষ্ট ছবেদা বলতে থাকলো। বললো, বাবা, আমি আর টাকওয়ালা জামাইয়ের …
আমি ওর মনের ক্যামেরায় বন্দী হয়েছিলাম অনেক আগেই। আমার সরল মন তা ঘূণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি। যেদিকেই যেতাম ওর দেখা মিলতো। ভাবতাম, ও এমন ঘুরেই …
সৌহার্দ্যকে মোটেও পছন্দ করে না সৌরিন্দ্রীয়া। কিন্তু সৌরিন্দ্রীয়ার মা সুতপা সৌহার্দ্যকেই নিজের মেয়ের যোগ্য মনে করেন। এ কারণে সৌরিন্দ্রীয়ার সাথে মায়ের বেশ অঘোষিত সম্পর্ক …
আমি যখন শিক্ষাজীবনের শেষলগ্নে তখন বাধ্য হয়ে একটি বাচ্চাকে পড়াতে গিয়েছিলাম। বাচ্চাটির বাবা মা দুজনই চাকরি করেন। বাচ্চাটি একা থাকতে থাকতে একরোখা আর বদমেজাজি …
Read More
এই না হলে বস্তী! ভোরের কিঞ্চিৎ আলো উঁকি মারার পূর্বেই বড়রা কাজ সেরে মোটামুটি নিশ্চিন্ত। ছোটরা এবার ব্যস্ত। সারি দিয়ে ট্রেন রাস্তার পাশে বসে …
বেশ কয়েক মাস পরে ছবেদার বাবা মা ছবেদাকে দেখতে এসেছেন। বাবা মাকে পেয়ে মনের কষ্ট ছবেদা বলতে থাকলো। বললো, বাবা, আমি আর টাকওয়ালা জামাইয়ের …
আমি ওর মনের ক্যামেরায় বন্দী হয়েছিলাম অনেক আগেই। আমার সরল মন তা ঘূণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি। যেদিকেই যেতাম ওর দেখা মিলতো। ভাবতাম, ও এমন ঘুরেই …
সৌহার্দ্যকে মোটেও পছন্দ করে না সৌরিন্দ্রীয়া। কিন্তু সৌরিন্দ্রীয়ার মা সুতপা সৌহার্দ্যকেই নিজের মেয়ের যোগ্য মনে করেন। এ কারণে সৌরিন্দ্রীয়ার সাথে মায়ের বেশ অঘোষিত সম্পর্ক …
আমি যখন শিক্ষাজীবনের শেষলগ্নে তখন বাধ্য হয়ে একটি বাচ্চাকে পড়াতে গিয়েছিলাম। বাচ্চাটির বাবা মা দুজনই চাকরি করেন। বাচ্চাটি একা থাকতে থাকতে একরোখা আর বদমেজাজি …

No connection