রসকলি

রসকলি

ছোট টিনের ঘর খানা। একদিকে একটু ঘেরা জায়গা স্নানের জন্য। আর একদিকে রান্নার জায়গা। ওদের ভাষায় সেবা। ঘরের মধ্যে ছোট্ট একটি তাকে রাধাগোবিন্দের পট। এর পাশটিতে একখানি সস্তার আয়না। রসিকা তিলকসেবা করার সময় তার মুখ দেখে। গোঁসাইটি তার জন্মান্ধ। সঙ্গিনী হয়েও তার বুকে লুকনো মায়ের স্নেহে সে যত্ন করে সুগায়কটিকে। তিলকসেবা থেকে অঙ্গরাগ সবই তার হাতের ছোঁয়ায় পূর্ণ। 

গোঁসাই কখনো রেলস্টেশন বা বাজারের সামনে ভিক্ষে করে। আবার স্হানীয় সংস্কৃতি মঞ্চে বাউল গায়।। তার গলাটি ভরাট সুরে বাজে। একখানি খমক আর একতারা বহুকষ্টে তার সাধন সঞ্চিত। সে গায় খোলা গলায়, নাভীমূল থেকে যেন শব্দব্রহ্ম ওঠে তার। অক্ষরজ্ঞান তার হয়নি ঠিকই, গুরুর পরম্পরায় তার মুখে আখর বুলি এমনিই ফোটে।

রসিকা শিক্ষিতা। উচ্চমাধ্যমিক পাশ। ট্রেনে করে টিউশন করতে আসত এখানে। গরীবের ঘরে তার জন্ম, মা হারা সে শৈশবেই, অন্নচিন্তা সেখানেও যে চমৎকারা।  সেদিন ছিল খুব বৃষ্টির দিন। অন্ধ গোঁসাই থই পাচ্ছে না বৃষ্টি থেকে বাঁচতে। এর আগে কয়েকদিন  ওর গান শুনেছে রসিকা আসা যাওয়ার পথে। কানে এসেছে সে হৃদয়ে আসার সময় তখনো আসেনি। কিন্তু সেইদিনটি ছিল পূর্বরাগের মেঘবর্ষা। রসিকা  হাতটি ধরে শেডের তলায় এনে দাঁড় করায় মানুষটাকে। বৃষ্টির জলে চুপ্পুড় ভিজে সে। ঠকঠক করে কাঁপছে ঠান্ডায়। রসিকার হাত দুটি তাকে সেই যে ধরল, আর ছাড়লো না। 

সকলে বলবে, এ কেমন ধারা গল্প। একটা অন্ধ ভিখিরীর হাত ধরে বৃষ্টি থেকে বাঁচালেই প্রেম? এ তো অসম্ভব ! 

তাহলে দুটো কথা বাড়তি বলতেই হয়। উপনিষদে বলছে ‘অন্তরতর যদয়ামাত্মা’, প্রকৃত বাউলও তাকেই বলে ‘মনের মানুষ’। কায়াসাধনের গুঢ়তত্ত্ব। তাই তো গোঁসাই ভাবালু গলায় গেয়ে ওঠে –

‘বসত তাদের শুনি ভান্ডের মাঝেতে

দুই দেশেতে  তারা দুইজন বসত করে-

কী প্রকারে দেখা রাস্তার মাঝারে।’

এরপর নিয়মিত দেখা। রসিকার ভাল লাগে গোঁসাইএর সহজিয়া ভাবটি। ভিক্ষান্নেই তার জঠর তৃপ্ত।রসিকা মাঝে মধ্যে হালুয়া ভোগের সেবা দেয়  রাধামাধবটিকে। মানুষটি একা তায় বাইরের চোখের দৃষ্টিটুকুও নেই। কিন্তু দয়াল দিয়েছেন ভেতরের আলো দেখবার জন্য। মানুষরতন চেনবার এক অলীক ক্ষমতা। 

টিনের ঘরটির ভিতরে হাত দিয়ে দিয়ে রসিকাকে বাইরে বাইরে ছুঁয়ে দেখে গোঁসাই। ভিতরমানিককে সে খোঁজে তারপর।অন্দরমহলে যেখানে গমন সিদ্ধ, বাইরের আরশিমহলের মায়াকাজলে তার আর কাজ নেই। 

রসিকা একদিন বাড়ি ছেড়ে পালায়। এসে ওঠে গোঁসাইএর ঠেকে। বাড়ির মুখ পুড়িয়েছে সে কলঙ্কিনী। বাপ আর দাদা এসে শাসিয়ে যায়। মনে যার দোসর ঠিক করা আছে, সে কি ডরায় এত সহজে। কন্ঠীবদল করতে সে দ্বিধা করে কই? রসিকা ঠোঙা বানায়, লক্ষ্মীপূজোর সময় পট এঁকে বিক্রি করে এমনকি সেই দুটো টিউশনিও সে ছাড়েনি। কটা টাকা এসে যায় তাদের আসমানদারির সংসারে। 

গোঁসাইও ভাবের ঘরে চুরি করে নি কখনো। শম দমের সাধনায় সে ভিড়িয়েছে রসিকাকেও। বাউলরা হল পথবৈরাগী। সংসারের সব নিয়ম সেখানে খাটে না।  ‘সত্য বল সুপথে চল’ ধ্রুবপদ তার ধ্যানজ্ঞান। রসিকার মত চক্ষুষ্মতী কি করে তায় মজলো এও এক বিস্ময়। গোঁসাই পদ গায় , তা অবশ্য আহামরি কিছু নয়, তবু রসিকা সেগুলোকে আশ্রয় দেয় তার  খাতাটিতে। সে পদগুলি এক ঘটমান জীবনের স্রোত বৈ আর কিছু নয়। তবু বুকের মধ্যে দরদ আছে, অন্তরমহলে আছে দরদী দালান, মনের মানুষ সেখানেই আকাশবৃত্তি করে।

গোঁসাই জিজ্ঞাসা করে তাকে -‘ মজলি ক্যেনে রে ক্ষেপী? কীই বা আছে আমার ! বাপ মা নেই, চাল চুলো নেই ! এমনকী চক্ষুরত্নটিও দয়াল কেড়ে লিছ্যেন !’

রসিকা তার মুখ চেপে ধরে সজোরে। বলে ‘চুপ ! চুপ! সব আছে তোমার! আমি তো আছি! আমার চোখদুটো কি তোমার নয় গোঁসাই ! ‘

গোঁসাই এর অন্ধচোখে জোয়ারের জল নামে। রসিকার ঠোঁটে কাঁপন ধরে সুন্দর হাসিতে। গোঁসাইএর অন্তরলোকে সেই উৎসর্জনের হাসি আলো হয়ে প্রবেশ করে। একতারার তারে আসল টানটি লাগে। বিত্তবাসনা এখানে মিথ্যা হয়ে ফিরে যায়। চরণদাসী বদলে যায় নর্মসহচরীতে।

 বাউলের সাধ্য সাধন তত্ত্বের এ এক অতীব সৌন্দর্য। আখড়ার গোছানো সংসার তার নয়, কিন্তু ‘পিকিতি’ প্রেমের  রূপোলী আলোর জ্যোৎস্নায় তা টলটল করে। দুনিয়াদারির মধ্যে চলে নিরন্তর আশমানদারির খেয়ার উজান। গোঁসাইএর একতারা  সুরে কথা বলে তার রসিকার জন্য,

‘সখী পিরিতি আখর তিন

পিরিতি আরতি যেজন বুঝেছে

সেই জানে তার চিন!

নয়নে নয়নে বাণ বরিষণে

তাহাতে জন্মিল ‘পি’

অধরে অধরে সুধা পরশনে

তাহাতে জন্মিল ‘রি’

…আর হৃদয়ে  হৃদয়ে ভাব বিনিময়ে

তাহাতে জন্মিল ‘তি’!

*****************************

** (ঋণ স্বীকার : 

১. বাউল ফকির কথা – সুধীর চক্রবর্তী

২. গভীর নির্জন পথে – সুধীর চক্রবর্তী

৩. সাধ্য সাধন তত্ত্ব – স্বামী পরাশরানন্দ

৪. কোথায় পাব তারে – কালকূট )

0 0 votes
Writing Rating
Share This
Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on telegram
Share on email
Share on linkedin
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
হাত ধরো, অনন্ত বৈশাখী ঝড় এসে গেছেআমি খড়কুটো হয়ে উগ্র বাসনার সাথে উড়ে,চল, কার্ণিশে গিয়ে আজ দাঁড়াইএকটু না হয় ভিজি! তারপর! আজ প্লাবন এলে …
 (১) শরৎআকাশ আজকাল তাহার রৌদ্রজ্জ্বল প্রভাটির কথা ভুলিয়া কিছুদিন হল মুখটি লুকাইয়া আছে। যদিচ বর্ষণধারার এই  প্রাবল‍্য গঙ্গাবিধৌত পূর্বদেশে বিরল নহে, তথাপি শ‍্রাবণের দিনযাপনের …
সম্প্রতি কৃষ্ণনগরাধীশ প্রসাদের উপর তুষ্ট হয়ে একখানি দূত প্রেরণ করেছেন কুমারহট্টের এই সংসারদীর্ণ ভদ্রাসনে। আগমবাগীশ মহাশয়ের কাছে প্রসাদের নিরন্তর অন্নপানের সমস‍্যার কথা শুনে কিছু …
এপিটাফে খুঁজে দেখেছি নামএই মৃত্যু জীবনের চেয়েও রঙীন,এ কথাটা স্বীকার করেছে শেষকালে,এত বিষণ্ণমুখে তবে আর কেন?ছেড়ে যেতে দ্বিধা? এই চৌকাঠটুকু?এত দুর্নিবার টান?অমোঘ! মরণের অভিমুখ …
এখন প্রায় রাত দশটা বেজে গেছে। সূতীব্র হূইসেল বাজিয়ে ‘ ক্রান্তিসূর্য স্পেশাল এক্সপ্রেস’ নামের এই ট্রেনটা এই খানিক আগেও বোধহয় মালিহাবাদের কাছে কোন একটা …
ঝকঝকে পেতলের সাজ পড়ানো টাঙ্গাটা নিয়ে আবু যখন  বাজারের স্ট‍‍্যান্ডে এসে দাঁড়ায়, ওকে ঠিক যেন এক মোঘল বাদশাহদের মতই লাগে। ওর নির্মেদ, ঋজু চেহারাটায় …
Read More
হাত ধরো, অনন্ত বৈশাখী ঝড় এসে গেছেআমি খড়কুটো হয়ে উগ্র বাসনার সাথে উড়ে,চল, কার্ণিশে গিয়ে আজ দাঁড়াইএকটু না হয় ভিজি! তারপর! আজ প্লাবন এলে …
 (১) শরৎআকাশ আজকাল তাহার রৌদ্রজ্জ্বল প্রভাটির কথা ভুলিয়া কিছুদিন হল মুখটি লুকাইয়া আছে। যদিচ বর্ষণধারার এই  প্রাবল‍্য গঙ্গাবিধৌত পূর্বদেশে বিরল নহে, তথাপি শ‍্রাবণের দিনযাপনের …
সম্প্রতি কৃষ্ণনগরাধীশ প্রসাদের উপর তুষ্ট হয়ে একখানি দূত প্রেরণ করেছেন কুমারহট্টের এই সংসারদীর্ণ ভদ্রাসনে। আগমবাগীশ মহাশয়ের কাছে প্রসাদের নিরন্তর অন্নপানের সমস‍্যার কথা শুনে কিছু …
এপিটাফে খুঁজে দেখেছি নামএই মৃত্যু জীবনের চেয়েও রঙীন,এ কথাটা স্বীকার করেছে শেষকালে,এত বিষণ্ণমুখে তবে আর কেন?ছেড়ে যেতে দ্বিধা? এই চৌকাঠটুকু?এত দুর্নিবার টান?অমোঘ! মরণের অভিমুখ …
এখন প্রায় রাত দশটা বেজে গেছে। সূতীব্র হূইসেল বাজিয়ে ‘ ক্রান্তিসূর্য স্পেশাল এক্সপ্রেস’ নামের এই ট্রেনটা এই খানিক আগেও বোধহয় মালিহাবাদের কাছে কোন একটা …
ঝকঝকে পেতলের সাজ পড়ানো টাঙ্গাটা নিয়ে আবু যখন  বাজারের স্ট‍‍্যান্ডে এসে দাঁড়ায়, ওকে ঠিক যেন এক মোঘল বাদশাহদের মতই লাগে। ওর নির্মেদ, ঋজু চেহারাটায় …