12TH-ISSUE-BANGLA, Lipi Magazine, Poetry Story

শনিবারের লিপি – দ্বাদশ সংখ্যা

লেখক

লিপি

লাল দোপাটি (গল্প)

শ্যামাপ্রসাদ সরকার

 

তার সাথে প্রথম দেখা ফাগুনদিনেই। তখন বয়সে সবে উন্মেষের ফুল একটা দুটো ফুটতে শুরু করেছে। পরের দিন ছিল দোলপূর্ণিমা। কলেজে ছুটি দুদিন, বারটা ছিল বৃহস্পতির। আমরা ক্লাস শেষের পর কিঞ্চিৎ আবির রঞ্জিত হবার বাসনায় জড়ো হয়েছি প্রাঙ্গণের একপাশে। সে এল তখনই ! সবুজ শাড়ীতে তার বসন্তের হিল্লোল। আমার গালে একমুঠো আবির মাখিয়ে দিয়েই হঠাৎ আসা ঝড়ের মতন সে চলে গেল সহসা। বাকি সহপাঠীদের উল্লাসধ্বনি মিশল ছদ্মবিদ্রুপের আবহে ! সে দিন তার নাম জানলাম ‘অনিতা’।

পরেরবার দেখা লাইব্রেরীতে। একজামিনের সমুদ্রলঙ্ঘনের উচ্চাশায় রত্নাকর মন্হন করতে গিয়ে। আমি খুঁজছিলাম সেই বহুচর্চিত বইটি। সুনীতিবাবুর ORDBL টি তার জিম্মায় ছিল তখন। বই দেয়ানেয়ার ছলে ডাকাডাকিটা এবার একটু নিকটে এল যেন।

তারপর আবার দেখা একজামিনের শেষদিনে। সামান্য পুঁজি সম্বল করে একটি ইভনিং শো’তে বায়োস্কোপ। ছবি দেখা হল কম ! নৈকট্য এল সুগম হয়ে। হাতখানি নিভৃতে ধরবার অধিকার মিলল পারিতোষিকে।

রেজাল্ট বেরোনোর দিন হল চারচক্ষের ভাববিনিময়। সুপ্রাচীন কলেজ বিল্ডিং এর একদিকে ঔপনিবেশিক যুগের গম্ভীর করিন্থীয় স্হাপত্য। সেখানেই এক নিরালা কোণ খুঁজে নিলাম। চোখে চোখ রাখলাম চিরকালের দূর্নিবার আকর্ষণে। সে ঝোলার ভিতর থেকে একটি দোপাটির চারা উপহার দিয়ে বললে ‘আমাদের এই ভাব বিনিময়ে অন্ততঃ একটি জীবিত সাক্ষী থাকুক অভিজ্ঞান হয়ে’। তার বাড়িতে নাকি এই পুষ্পগুচ্ছ মঞ্জরীত হয়েই থাকে। বলল বাড়ি যাচ্ছে ছুটিতে ! সেই চারমাস পর আবার ফিরবে। এতদিনের অদর্শনের কারণ জিজ্ঞাসায় বললে ‘বাবার তলব’। এমন কি তার বিয়ের পিঁড়িতে বসার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া গেলনা কোনওমতেই।

চারাটি বাসায় ফিরে রোপণ করলাম। নিত্য পর্যবেক্ষণ আর চর্যায় সেটি বৃদ্ধি পেল যথাসময়েই সঙ্গে দাত্রীর সাথে অদর্শনে বাড়লো দুর্নিবার বিরহ। এরই মধ্যে একদিন পত্রযোগে এল দুটি লেফাফা। প্রথমটির ভিতরে অদর্শনজাত কিঞ্চিৎ আক্ষেপ আর দ্বিতীয়টিতে একটি দূর্যোগের পূর্বাভাস। বুকের একটি অসুখ ধরা পড়েছে তার, হৃদযন্ত্রে ছন্দপতন আর সংজ্ঞাহীনতাই তার মূল উপসর্গ। চিন্তায় মন ভারাক্রান্ত হল। পত্রদুটিরই শেষে ছিল সেই দোপাটিচারাটির কথা। অভিজ্ঞানকে অস্বীকার না করার অঙ্গীকার আদায়ের সনির্বন্ধ অনুরোধ।

তারপর আরও একটি পত্র এলো দেরীতে। ভাবলাম আরোগ্যের সুবাতাস হয়তো বইবে। কিন্তু যা সংবাদ এল তা বিভ্রান্তের। সে লিখেছে হাসপাতালে শুয়ে, অপারেশান করবার আগের রাত্রে। শরীর তার খারাপ হয়েছে দ্রুত। অন্ধকার আকাশ ঘনিয়ে আসছে চোখে ! জীবনের সঞ্চয় তার ফুরিয়ে এল বুঝি? তবে কি না ফেরার ঠিকানাই হবে তার আগামী গন্তব্য! পত্রের একদম শেষদিকে কম্পিত অক্ষরে তার বাড়ির দোপাটি গাছে নতুন ফুল আসার কথা।

সেই শেষ। তারপর আর কখনো আসেনি তার কাছ থেকে কোনও মুখবন্ধ লেফাফা। ভেবেছি হয়তো আরোগ্যের পর সে বিস্মৃত হয়েছে তার এইসব ছেলেমানুষি বা হয়তো সত্যিই না ফেরার ঠিকানা থেকে মেঘের দেশের ডাকপিয়ন একদিন তার বিলম্বিত পত্রাঘাত বয়ে আনবে এমনই কোনও হেমন্তবিকেলে!

তবে তার অভিজ্ঞানটি সযত্নে বর্ধিত হয়েছে এই ক’মাসে। তাতে এসেছে লাল ফুলের অকাল বসন্তের নির্ঘোষ, তার স্বহস্তে দেওয়া প্রথম দিনের আবীরের মতোই।

লিপি

কাপড়ে মোড়ানো নগ্ন দেবী (গল্প)

রবীন জাকারিয়া

সমন্বিত খামার করবো বলে আমি আর আমার এক বন্ধু উপশহরগুলোতে চাষাবাদী জমি খুঁজছি৷ জমি কিনবো, খামার বানাবো৷ কিন্ত উপযুক্ত জমি পাচ্ছিনা৷ আবার পেলেও দামে কিংবা একসাথে এত জমি মিলছেনা৷ এরই উদ্দেশ্যে বন্ধু তথা পার্টনারকে নিয়ে চিলমারীর চরগুলোতে খামারের দৃশ্যমানতা ও যৌক্তিকতা যাচাইয়ের জন্য ব্রহ্মপুত্র নদের বিভিন্ন চর যেমন অষ্টমির চর, মানুষ মারার চর, ঝুনকার চর, নাইয়ার চর ঘুরে অবশেষে সন্ধ্যার দিকে বন্ধু শাহীন রাত্রি যাপনের জন্য নিয়ে গেল নয়ারহাট চরে৷ থাকার ব্যবস্থা হলো সাবেক ইউপি চেয়ারম্যানের বাড়িতে৷
খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা অন্যত্র৷
এলাকায় আমার বন্ধুটির প্রচন্ড প্রভাব৷ জোতদার বংশের ছেলে আর রাজনৈতিক প্রভাব দু’টো মিলে বলা যায় সে এলাকার হিরো৷ আমাদের আগমনের কারণ শুনে সকলে সাধুবাদ জানাচ্ছে, কোন প্রকার সমস্যা হবে না৷ হলেও তারা সহযোগিতা করবে বলে নিশ্চয়তা দিচ্ছে৷

বেশীরভাগ এলাকাবাসী আমাদের কোটিপতি ব্যবসায়ী হিসেবে ধরে নিয়েছে৷ তাই চলছে বাড়তি যত্ন৷ কে রাতে, কে সকালে আর কে-ইবা দিনে খাওয়ার আয়োজন করবে তা নিয়ে চললো বিতর্ক৷ মানুষের এত গুরুত্ব বেশ উপভোগ করছি৷ সারাদিন ট্রাভেল আর রাত অবধি আড্ডায় শরীর ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত৷ তাই ডিনারটা শাহীনের বাসায় সেরে চেয়ারম্যানের বাড়িতে ঘুমোতে এলাম৷ ক্লান্তি আর টিনের চালে বৃষ্টির মনোরম ছন্দে বিছানায় শুয়ে পড়তেই ঘুমিয়ে পড়লাম৷
পরদিন বেলা এগারোটা নাগাদ ঘুম ভেঙ্গে দেখি পাশে শাহীন নেই, একাকী শুয়ে আছি নির্জন একটি কক্ষে৷ বৃষ্টি থেমে গেলেও চারিদিকে অন্ধকার৷ সৌর বিদ্যূতের মিটমিটে আলো৷ একটা ঘোর লাগা অনুভূতি৷
হঠাৎ এক যুবা নারী হাতে টেবিল ফ্যান নিয়ে ঘরে ঢুকলো৷ বিব্রতকর পরিস্থিতি৷ তাড়াতাড়ি টি-শার্টটা গায়ে জড়িয়ে বিছানায় বসে পড়লাম৷ দূরে প্লাস্টিকের একটি চেয়ারে অপরুপা বসলো৷ ভেবে পাচ্ছিনা কীভাবে শুরু করবো? তারচেয়ে ওই শুরু করুক ভেবে চুপ রইলাম৷ অপরুপা বললো, ও জয়িতা৷ চেয়ারম্যানের মেয়ে৷ কুড়িগ্রাম কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে ছাত্রী৷ আমাদের জন্য বরাদ্দকৃত রুমটি আসলে তার পড়ার ঘর৷ চারিদিকে বই৷ পাঠ্য বই, গল্পের বই, প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার গাইড, পুলিশ সাব ইন্সপেক্টর নিয়োগ পরীক্ষার গাইড অন্যান্য৷ গত রাতে ক্লান্তির কারনে দেখা হয়নি কিছুই৷
আমিও একই সাবজেক্টের ছাত্র শুনে বেশ আগ্রহী হয়ে চেয়ারটা নিয়ে কাছে এসে বসলো৷ বুকটা ধক্ করে উঠলো৷ আচ্ছা আমার পা দু’টো কি কাঁপছে?
আমাদের খামারটাতে কী করতে চাই জানতে চাইলে বললাম ডেয়ারি, পৌল্ট্রি, ফিশারিজ ছাড়াও তৈরী করবো একটা রিসোর্ট৷
যেখানে কপোলরা আনন্দ করতে এখানে আসবে৷ বললাম “মনপুরা” ছবিটা দেখেছ? মাথা নাড়ালো উপর-নীচ৷ আসলে এই চরের জীবন ওর কাছে একটা অবরুদ্ধ কারাগার মনে হয়৷

কলেজ পড়ুয়া একজন মেধাবী ও স্মার্ট মেয়ের জন্য হয়তো এটা তার বাসযোগ্য স্থান নয়৷
আমার রিসোর্টটা হলে তুমি যাবে?
আমারতো এখনি যেতে ইচ্ছে করছে বলে অনেকটা সময় চুপ থেকে জয়িতা লজ্জা জড়ানো কন্ঠে বললো, “ইচ্ছে থাকলে অবশ্য এ রুমটাকেও রিসোর্ট ভাবা যায়৷” আমি হতবাক৷ হার্ট বিট বেড়ে যাচ্ছে৷ কথা বেরুচ্ছে না অথচ সবাই আমাকে বাকপটু বলে৷ কী করবো ভাবতে পারছি না৷ শুধু জানি এ কাজটা পুরুষকেই শুরু করতে হয়৷
পাশে বসা মেয়েটাকে মনে হচ্ছে গ্রীক দেবীর নগ্ন মূর্তিকে কেউ কালো কাপড়ে ঢেকে রেখেছে৷ এক ঝটকায় উম্মোচিত করি দেবীর নগ্ন রুপ৷ অপরুপ ভাষ্কর্য৷ শিল্পী যেমন শিল্পের গর্ব করে তেমনি শিল্পও চায় নিজেকে বিকশিত করতে৷ চায় তাকে উপভোগ করুক৷ এটা চরম সত্য৷ তাই উঠে পড়ে লেগে যাই সত্য উদঘাটনে৷ গভীর থেকে আরো গভীরে৷ হারিয়ে না যাওয়া অবধি৷
হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে ফিরে আসি বাস্তব পৃথিবীতে৷ জয়িতাই দরজা খোলে৷ সেখানে দাঁড়িয়ে আছে ওর বাবা৷ সমস্ত ঘরে চোখ বুলিয়ে নির্ণিমেষ তাকিয়ে আছে আমার দিকে৷ ক্রুর দৃষ্টি৷ আচ্ছা উনি কি কিছু বুঝে ফেলেছেন কিংবা সন্দেহ? কিছুটা ভীত লাগছে নিজেকে৷ অন্যদিকে চোখ ফেরালাম৷ ব্যাগ গোছাতে হবে৷ চলে যেতে এখনি৷ শাহীন এখনো আসছে না৷ ব্যাক প্যাকটা কাঁধে ঝুলিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম দ্রুত৷ গন্তব্য নৌকো ঘাট৷ রাস্তায় শাহীনকে পেলাম৷ হাতটা শক্ত করে ধরে বললাম Lets go. Quick. ও কিছু না আমাকে অনুসরন করলো৷ না ফিরেও বুঝতে পারছি ক্রুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে চেয়ারম্যান৷ মনকে বোঝালাম ক্ষমতা হারানো চেয়ারম্যানের ক্ষমতাই বা কতটুকু?

লিপি

অভিপ্রায়

সুনীতা

 

বৈদ্যুতিন কাঠুরেদের আহ্বান জানাই, সবথেকে ধারালো কুঠার হাতে
কেটে নিয়ে যাক‍্ শব্দ-প্রত্যঙ্গগুলি একে-একে
মুখ বুজে পড়ে থাকি সারাদিন ছাতুবাবুর হাটে
পৌরসভা গাড়ি এসে তুলে নেবে বাকি কান্ডটুকু
কখন সে প্রতীক্ষায় ;
এ যাওয়া তবে সে যাওয়া নয়
যাওয়ার মত যাওয়া হত
শালবল্লারা সবই যদি ঝড়নিরোধী খুঁটি হত

লিপি

শেষের কবিতার শেষ পৃষ্ঠা (ছোটোগল্প)

সৌমেন দেবনাথ

 

শ্বেতার বসন-ভূষণ, গমন, চঞ্চল-চলন, নড়ন, নূপুর-নিক্বণ, অলংকার-শিঞ্জণ, হাস্য-ভাষ্য বা অঙ্গ প্রতঙ্গের নানান ভঙ্গিমাতে কে উৎক্ষিপ্ত বিক্ষিপ্ত প্রক্ষিপ্ত হবে না! এতো বিকশিত সৌন্দর্য চোখ যুগলকে ধাঁধিয়ে দেয়, তাঁতিয়ে দেয়। তার সদা লাবণ্যোচ্ছ্বাসে প্রফুল্ল হৃদয় অত্যাশ্চর্যে নৃত্য করে। বিস্ময় অপেক্ষা স্বতন্ত্র সৌন্দর্যে উত্তাল হৃদয় সাগর৷ মনোভাবকে প্রচ্ছন্ন না রাখতে পেরে নির্মল বললো, আপনার সৌন্দর্য নয়না-নন্দনা নায়িকা অপেক্ষা ন্যূন নয়।
শ্বেতার স্বভাব সুলভ হাসি। নির্মলের মুগ্ধ দৃষ্টি দ্বারা শ্বেতা আক্রান্ত হয়। শ্বেতার চক্ষু দুটো যে কারোর শরীর মনে ভালো লাগার আবেশ প্রবাহ কেন্দ্র। নির্মল নির্লজ্জের মতো আবার উচ্চারণ করলো, আপনার সৌন্দর্য সৌন্দর্যের সংগা অপেক্ষা সুন্দরতর।
শ্বেতা নিজ কর্মে মনোনিবেশ করতে করতে বলে, যার হৃদয় যত সুন্দর তার দর্শনে তত সৌন্দর্য ধরা দেয়।
বলেই শ্বেতা একটা হাসি দিলো। মুক্তো হয়ে ঝরলো হাসি। লাবণ্যমাখা মুখটিতে হাসি জাগলেই বিভা ছড়িয়ে পড়ে চৌদিকে। না দেখার ভান করে দেখে নিয়ে নিজেকে লুকাতে গিয়ে শ্বেতার চোখে ধরা পড়লো নির্মল। শ্বেতা বললো, সুন্দরী হলে নানা সমস্যা, মানুষ শুধু চেয়ে চেয়ে দেখে।
নির্মল হেম-অগ্নির মতো পবিত্র আর কাশফুলের মতো শুভ্র শ্বেতার দিকে চেয়ে বললো, সুন্দরের প্রতি মানুষ চিরকাল দুর্বল। সুন্দর আর সৌন্দর্য দেখারই। পুরুষ দেখবে, পুড়বে, জ্বলবে, ভাববে, ভাবে পড়বে, হিংসা করবে, প্রশংসাও করবে। অন্তত দেখতে মানা করবেন না।
শ্বেতা শুনে আবারও হাসি দেয়। তা দেখে নির্মলের রেঙে উঠে হৃদয়। শরীর মনে বয়ে যায় অন্য এক আবেশ। অবাক বিস্ময়ে চেয়ে থেকে মনে মনে ভাবে, তোমায় দেখে আমার জীবনে সুখ ফলছে জামের মতো থোকায় থোকায়।
নির্মল কাজে উদাসীন হয়ে পড়ে। বারবার নজর ঐ নজরনন্দন নারীটির দিকে চলে যায়। নির্মল হেসে বললো, আপনার অমিয় বাক্য আর বাক্য উচ্চারণ ভঙ্গিমা শিহরণ দেয় মানসপটে।
শ্বেতা বললো, নির্মল বাবু, বড় নির্মল মনের আপনি। নির্মল আকাশের মতো চোখে সব স্বচ্ছ লাগে।
নির্মল অবাকদৃষ্টে চেয়ে বললো, আপনার রূপের আগুনে না জানি কতো প্রাণ জ্বলে মরেছে!
শ্বেতা বললো, অন্তত আপনি যেন অগ্নি অভিমুখে পতঙ্গ হয়ে না ছোটেন, তবেই রক্ষা। শোনেন, চটকে চোখ জুড়ালে ঠকতে হয়। আমি যদি আপনার সামনের ডেস্কে না বসতাম, আপনি আপন মনে কাজ করতে পারতেন। এখন তো আপনার কাজে ব্যাঘাত ঘটছে। চকচকে ডুবে অনেক বীর পর্যন্ত ডুবেছে। মনকে প্রশ্রয় দেবেন না, মনকে কাজে লাগান।
উৎফুল্ল হয়ে উঠে নির্মল। এতো কাছে শ্বেতা থাকে বলেই মনে তার এত পিয়াস। মনের মধ্যে আনন্দের স্রোত দুঃখ কষ্ট হতাশার তৃণগুলোকে ভাসিয়ে দিলো।
দু জনে কাজে মন দেয়। কিন্তু নির্মলের অস্থির মন বারবার শ্বেতার জন্য ব্যাকুল হয়। মায়াভরা মুখখানা চিত্রপটে সদা জেগে উঠে। ওষ্ঠপ্রান্তের মায়াবী হাসি অবাক বিস্ময়ের জন্ম দেয়। তার সৌন্দর্যের লেলিহান শিখায় দগ্ধ হতে থাকে ও। তার রূপের চুম্বকীয় আর আকর্ষণীয় শক্তি সাংঘাতিক আঘাত করে নৈমিত্তিক কাজের মাঝে। মন আকাশের আঙিনায় পূর্ণ চাঁদ থাকলে কখনো কি কাজে মন বসে! সাজানো গোছানো চুলগুলো বাতাসে উড়ে উড়ে তাকে বিরক্ত করছে। চুলে অবারিত আনন্দের ঢেউ। এমন মায়াবী চেহারার নারীকে দেখলে কেনো মায়া বাড়বে না! শ্বেতা কাজ থেকে চোখ তুলতেই দেখলো নির্মল ওর দিকে চেয়ে আছে। শ্বেতা বললো, কাজে এত অমনোযোগী কেনো? স্যার বকলে আমার কোনো দায় থাকবে না! কখনো বলিনি কাজে ফাঁকি দিয়ে আমাকে দেখেন!
নির্মল নির্লজ্জের মতো বললো, আপনার চোখে মাত্রাতিরিক্ত মায়া। কেবলি দাহ্য হই। আপনার রূপ মাধুর্য অনন্য অপূর্ব। যত দেখি, তত ভাবি, তত ভালো লাগে!
শ্বেতা একটু বিরক্তির স্বরে বললো, পুরুষ হয়ে উঠেন। এত ছেলেমি কথা ভালো না।
শ্বেতা লাজুক হেসে মুখ নামিয়ে নিলো। নিতান্ত অকারণেই তার মুখাবয়বে ক্ষীণ আরক্ত লজ্জাভা দেখা গেলো।
অফিসের অন্যান্য কলিগরাও শ্বেতার দিকে বিশেষ নজরে তাকায়। সূর্যের সামনে চন্দ্র যেমন অর্থহীন, চাঁদের সামনে তেমনি ওরা অস্তিত্বহীন। শ্বেতা বিশেষ আনন্দ অনুভব করে। লেখাপড়াকালীনও কত বড় ভাই, বন্ধু এমনটা করতো। আলোচনার কেন্দ্রে, তুলনাতেও অতুলনীয়ার স্থান। পুরুষ সমাজকে মনোরঞ্জনে যেমন সে পারদর্শী আবার পুরুষ সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করতেও সে পাকা পক্ব দূরদর্শী। সুন্দরীদের মস্তিষ্ক অনুর্বর হলেও একেবারে ঊষর নয়। সুন্দরীরা জীবনে অনেক ভুল সিদ্ধান্ত নেয়, মুহূর্মুহূ বিপদেও পড়ে। যদিও সবার সহযোগিতা সে আবার আগেই পায়। শ্বেতা একটি কাজ বুঝতে না পারায় নির্মলের সাহায্যপ্রার্থী হলো, নির্মল সাহায্য করার জন্য উদগ্রীব। প্রত্যাশিত জন কারণে অকারণে সান্নিধ্যে এলে ভালো লাগা বেড়ে যায়। শ্বেতা বললো, জবটা পেয়েছি রূপের জন্য, গুণের বালাই নেই আমার মাঝে। কেনো যে মানুষ রূপবিচারী? আগে গুণবিচারী পরে দর্শনধারী এ বাক্যে যারা বিশ্বাসী আমি তাঁদের শ্রদ্ধা করি।
নির্মল বললো, সবার দর্শন সমান নয়। কেউ তো সকল গুণে গুণান্বিত নয়। সব বিষয়ে পণ্ডিত এমন পণ্ডিত বিশ্বে আছে বলে আমি মনে করি না। দেখতে দেখতে, বুঝতে বুঝতে, শুনতে শুনতে, ঠেকতে ঠেকতে মানুষ অভিজ্ঞ হয়ে উঠে।
শ্বেতা বললো, ও আচ্ছা, আপনিও তবে দর্শনধারীতে বিশ্বাসী?
নির্মল বললো, আমি না, পৃথিবীর সবাই রূপবিচারী, রূপ দেখলে মানুষ গুণের কথা তেমন বিবেচনা করে না। রূপৈশ্বর্যের বন্যায় ভাসছে পৃথিবী। রূপসী বৌয়ের কাঁচা রান্নাও ততোধিক স্বাদের হয়। রূপসীদের ভুল কেউ ধরেও দেখে না।
শ্বেতা বললো, এক সময় রূপের প্রতি অভক্তি জন্মে যায়। রূপ দিয়ে মানুষের মন জয় করে রাখা যায় না দীর্ঘদিন। গুণের কদর আজীবন থাকে। রূপ বিপর্যয়ও আনতে জানে, গুণ কখনো ঠকাবে না। রূপ দেয় মোহ, গুণ দেয় সাফল্য।
নির্মল দ্বিমত পোষণ করে বললো, চাঁদ দেখে কেউ কখনো বিমুখ হয়েছে বলতে পারবেন? পাহাড় দেখে কেউ কখনো মন্দ বলেছে? কল্লোলিত স্রোতস্বিনীর বয়ে চলা দেখে কেউ কী ক্ষুব্ধ হয়েছে?
শ্বেতা বললো, রূপ মরীচিকা। রূপে ডুবে অনুতপ্ত হয়নি এমন যুবক নেই। রূপ একটা মায়া, আলেয়ার আলো। রূপের পিছে দৌঁড়ানো আর পঙ্কিলে ডোবা একই। গুণীরা রূপ বিচার করে না, মূর্খরা রূপ বিশ্লেষণে সময় নষ্ট করে, রূপ ব্যবসায়ের জন্য, বিজ্ঞাপনের জন্য, সংসারে অশান্তি সৃষ্টির জন্য; গুণ পৃথিবী রক্ষা ও সৌন্দর্যের জন্য।
নির্মল হেসে বললো, রূপবতীরা গুণবতী হয় না?
শ্বেতা বললো, রূপ আর গুণ কখনো একসাথে পাওয়া যায় না। রূপবতীরা প্রায়শই গুণহীন। গুণবতীরা প্রায়শই রূপবতী না।
নির্মল অপলক চেয়ে বললো, আপনি গুণবতী নন?
শ্বেতা বললো, আপনি তো নাছোড়-যুবক। শুধু কথা বাড়ান।
চলে যেতে যেতে আর একবার পিছনে ফিরে শ্বেতা বললো, মনে রাখবেন, রূপের জাজ্জ্বল্য কমেই, গুণের ঔজ্জ্বল্য বাড়েই।
শ্বেতা মিষ্টি হেসে নিজের কাজে চলে গেলো। নির্মল শ্বেতার ছন্দময় প্রস্থান প্রত্যক্ষ করলো। ওদিকে নজরুল নারায়ণকে বললো, নারায়ণ বাবু, কর্মই কী সব? কর্মে ডুবে থাকেন, অফিসে যে একজন হিন্দু কলিগ এসেছেন পরিচিত হয়ে ভাব জমাতে তো পারেন! আপনার সাথে মানাবে ভালো।
নারায়ণ বললো, অনাবশ্যক ব্যাপারে অত্যাবশ্যকতা দেখানোতেই আপনার মহা-আনন্দ।
অপ্রত্যাশিত উত্তর পেয়ে নজরুল থমকে গেলো। তবুও বললো, ভালো কিছু তো আপনার চোখেই পড়ে না! শোনেন, দ্রুততার যুগ। দ্রুত আগুয়ান না হলে অন্য নজোয়ান নিয়ে ভেঙে পড়বেন!
নারায়ণ বললো, শোনেন, ভাগেরটা কেউ নেয় না, পড়ে থাকে। আমার জীবনে যে আসবে সে আসবেই, দুর্যোগ কিংবা মহামারী পেরিয়ে হলেও।
নজরুল বললো, চোখের সামনে হীরা উজ্জ্বলতা ছড়াচ্ছেন, আপনি আছেন ভবিষ্যতের দোলাচল নিয়ে! সম্মুখ থেকে আহার ছোঁ মেরে চিল নিয়ে গেলে বুঝবেন আফসোস কি?
নারায়ণ বললো, আপনার হাতে অনেক কাজ। আপনি কাজে মন দেন।
নজরুল বললো, ক্ষমতাহীন মানুষকে কেউ সম্মানও করেন না, স্বপ্নেও আঁকেন না। অফিসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদে আসীন আপনি। শুধু হাত বাড়ান, পেয়ে যাবেন। মেয়েরা তো সুখের পায়রা, সুখী ও স্বচ্ছল বাড়িতেই বসবাস করতে চান। অভাব অনটনের বাড়ি থেকে পায়রা উড়ে যান। আপনার অর্থ ও যশ আছে, সুন্দরী মানেই অর্থলোভী, যশস্বী স্বামী চান।
নারায়ণ রেগে বললো, অযাচিত কথা বলে বলে কর্মপরিবেশ নষ্ট করবেন না। আমি মধুও চিনি, স্বর্ণও চিনি, আমাকে জ্ঞান দিতে হবে না।
ওদিকে নাদিয়া সদা নাক বাঁকায়। অন্যায় রকম সৌন্দর্যের কারণে শ্বেতাকে মনে মনে গাল পাড়ে, হিংসা করে। এক নারী অন্য নারীকে কারণ ছাড়াই কখনো সহ্য করতে পারে না। আর এক সুন্দরী তো অন্য সুন্দরীকে সহ্যই করে না। আর যখন এক সুন্দরী অন্য সুন্দরীর কারণে গণনায় অগণ্য হয়ে উঠে তখন তো প্রবল হিংসার জন্ম হয়ই। অফিসের কলিগদের তার প্রতি আর নজর আগের মতো পড়ে না। কলিগদের কাছে তার গুরুত্ব যেন কমে যাচ্ছে, মোড় বাঁকিয়ে গুরুত্ব এখন শ্বেতার দিকে ধাবিত। মানুষ যতই সুন্দর হোক দেখতে দেখতে চোখের তৃপ্তি কমতে থাকে। নতুন কিছু দেখলে তাতেই তুপ্তি বেশি পায়। মানুষ বৈচিত্র্যে বেশি আনন্দিত হয়, সম্মুখে থাকতে থাকতে স্বর্ণও স্বর্ণালী রং হারায়। ভালো লাগার শরীরে মরীচিকা পড়ে, ভালো লাগার সংগা পরিবর্তন হয়ে যায়। নতুনের প্রতি চিত্ত বেশি আকর্ষিত হয়। নজরুল নাদিয়াকে বললো, টপ টু বটম কেমন সাজগোজ করেন শ্বেতা ম্যাম। স্বর্গ থেকে দেবী এসেছেন আমাদের অফিসে।
নাদিয়া খুব রেগে গেলো। এমনিতেই শ্বেতার প্রতি মহাহিংসা তার। আবার তার প্রশংসা শুনে ক্ষোভে নাদিয়া ফুসলো। নাদিয়া রাগ বুঝতে না দিয়ে বললো, তিনি সুন্দর তা দেখানোর কী আছে! যা সুন্দর তা দেখানোর কিছু নেই, সুন্দর প্রকাশ পায়ই। মনে রাখবেন, যে যত সুন্দর তার ভেতর তত সমস্যা! ওদের দশটা প্রেম করেও মন ভরে না, দশ স্বামীর ঘরে যেয়েও ঘর বাঁধতে জানে না। সুন্দর চেহারার মানুষ সবচেয়ে বেশি প্রতারক হয়। পুরুষ নাচিয়ে বেড়ায়, রূপ ভাঙিয়ে তহবিল গড়ে। আর ওদের মন ভরে না কখনো, না অর্থে, না স্বর্ণে।
নজরুল বললো, আমার মনে হয় শ্বেতা ম্যাম অনেক ভালো। পোষাক পরিচ্ছদে শালীনতার অাভিজাত্য। ব্যবহারেও অাভিজাত্য বিরাজমান।
নাদিয়া আরো রেগে বললো, উপর দিয়ে যে যত সুন্দর, ভেতর দিয়ে সে তত অসুন্দর। খোঁজ নিয়ে দেখেন তাঁর কোনো অনুভূতিই নেই পুরুষদের ঘষা খেতে খেতে।
নজরুল বললো, কী বলেন এসব? শ্বেতা ম্যামকে হিংসা করছেন কেনো? নাদিয়া জ্ঞান দেয়ার মতো করে বললো, মনে রাখবেন, সৌন্দর্য শরীরে না, সৌন্দর্য মনে। সৌন্দর্যকে যারা সম্বল করে ধরে নেবেন অহংকারী, সংসারী না। সুন্দরীরা ঘর পায়, ঘরণী হতে হতে পৌঢ়া হয়ে যায়।
নাদিয়ার কাছ থেকেও অপ্রত্যাশিত উত্তর শুনে নজরুল মনে মনে মার খেলো। রাতে নির্মল শ্বেতাকে কল দিলো। রিসিভ করার পূর্বে শ্বেতা তাচ্ছিল্যের হাসি দিলো। নির্মল বললো, আজ রাতের আকাশটা দেখেছেন?
শ্বেতা বিস্ময়ের ছলে বললো, আজ তো আকাশে চাঁদ নেই! তাই জ্যোৎস্না মেখে পরীরাও স্নান করছে না। কী দেখবো? মায়াময় চাঁদই যদি না থাকে আকাশে, রাতের আকাশের কী দেখার থাকতে পারে! চাঁদ দেখার মতো তো তারা দেখে দেখে আশ্চর্য হওয়া যায় না।
নির্মল এক প্রকার ধরা খেলো। অপর জনের সহযোগিতা না পেলে গল্প এগোনাে যায় না। নির্মল কথা ঘুরিয়ে বললো, দেখেন, আকাশ এক বুক তারা নিয়ে ঘুমিয়ে। তারাদের মেলা বসেছে আজ। তারাদের চোখে ঘুম নেই ।
শ্বেতা তারা দেখার জন্য বাইরে গেলো না। বললো, চাঁদ না উঠলে রাত মায়াবী হয় না।
নির্মল বললো, কিন্তু আমার মনের আকাশে ছড়িয়ে পড়ছে জ্যোৎস্না। আপনার সাথে কথা বলছি যে…
শ্বেতা হেসে বললো, এত উৎফুল্ল হয়েন না। আমৃত্যু মানুষ পাশাপাশি অবস্থান করেও একে অপরকে চিনে উঠে না। কাউকে দেখে, একদিন দুদিন কথা বলে চেনা যায় না।
নির্মল বললো, একদিন দুদিনে চেনা না গেলে কখনোই আর চেনা হয়ে উঠে না। মানুষ মানুষ চিনতে দেরী করে না, ভুলও করে না। অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে অন্তর্লোক উদ্ধার করা যায়। অন্তরতলের অতল রহস্যও উদঘাটন করা যায়।
শ্বেতা বিরক্তির স্বরে বললো, আপনি আকাশের তারা দেখেন, তারা গোণেন, তারাদের নাম দিতে থাকেন। আমি রাখি।
নির্মল টুক করে কথা ঘুরিয়ে নিলো। বললো, আমি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গল্পগুচ্ছ’ পড়ছিলাম। আসলে একনিষ্ঠ চিত্ত না হলে রবীন্দ্রনাথ পড়ে কিছু উদ্ধার করা যায় না। অস্থির চিত্তমনাদের জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা নয়।
শ্বেতা বিরক্তির ঢঙে বললো, আপনার চিত্ত একনিষ্ঠ নেই কেনো? কার জন্য এতো অস্থির হয়ে থাকেন শুনি?
নির্মল বললো, জীবনের ভুলগুলি অংকের খাতার ভুল হলে রবার দিয়ে মুছে সংশোধন করা যেত।
শ্বেতার অনাগ্রহ থাকলেও জানতে চাইলো, কী এমন মহাভুল করেছেন যে এত খেসারত দিচ্ছেন?
নির্মল বললো, শুধু অব্যক্ততার কারণে আজ আমার যত অপ্রাপ্তি। আমি পারি না আমার চাওয়াগুলোকে উপস্থাপন করতে। আমার চাওয়া সসীম, কিন্তু আমি যা হারিয়েছি তা আমার অসীম চাওয়ার ফল ছিলো। যদি বলেন আপনার সঞ্চয় কি? আমি বলবো আমার জীবনের যোগ বিয়োগের ফল শূন্য।
শ্বেতা বললো, আশাহত হতে নেই। প্রতিটি শ্বাস প্রশ্বাসে আশাকে জাগিয়ে রাখতে হয়। নিবিড় চিত্তে যদি আপনি কাউকে কামনা করেন কালের চাকা ঘুরে নতুন কাল এলেও আপনি তাকে পাবেন। আচ্ছা, আপনার কাছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস ‘শেষের কবিতা’ আছে?
নির্মল বললো, আছে। দুই বার পড়েছি।
শ্বেতা বললো, দিয়েন তো। খুব নাম করা উপন্যাস। আমার অবশ্য পড়া হয়নি।
পরের দিন সবাই অফিসে এসেছে। নির্মল শ্বেতাকে ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাস দিলো। কথা হলো না কিন্তু চোখেতে চোখ পড়ায় দু জনই হেসেছে। যেন দু জন দু জনের কত কাল আগে থেকে পরিচিত। কাজের ফাঁকে ফাঁকে কর্মকর্তারা আলোচনা না করলে অস্বস্তি লাগে। হুমায়ুন কবীর এক মনে বলেই চলছেন, নিজেকে এতো জ্ঞানী মনে করেন যাকে সামনে পান তাকেই জ্ঞান দেন। সামনে কেউ না থাকলে একা একা বকেন। আর অন্যায্য ব্যাপারে অনন্য ভূমিকা রাখেন সব সময়।
নাদিয়া বললো, নিশ্চয় নজরুল সাহেবের কথা বলছেন? উনার নির্বুদ্ধিতা আর বোকামিতে বিশিষ্টতা আছে। আগ বাড়িয়ে কথা বলা স্বভাব। অতিশয় অতিরঞ্জিত উক্তিতে অতি পাকা। বুড়ো মানুষের ছেলেমানুষী অসহ্য লাগে।
নারায়ণ তাচ্ছিল্যের স্বরে বললো, অন্যকে সেবা করার, লালন করার, উপকার করার প্রবল ক্ষুধা আছে অন্তরে। কেউ উনার সাহায্য গ্রহণ না করলেও সাহায্য করেই ছাড়বেন। পরকে সুখ দেয়া, পরকে নিশ্চিন্ত রাখা, পরকে আপন করা, পরের সংকট নিরসন করায় যেন উনার কাজ! এত ধিক্কৃত হন তবুও লজ্জা হয় না।
হুমায়ুন কবীর বললো, আত্ম-সমীক্ষার মধ্য দিয়ে আসে বিবেচনাবোধ। নজরুল সাহেব নিজেকে কখনোই ভাবেননি। যাকে তাকে যা তা বলবেন। নিজেকে আঁতেল পর্যায়ে নামিয়ে ফেলেছেন। মানুষ নিজের সম্মান নিজের কর্মগুণেই হারিয়ে ফেলেন।
নারায়ণ বললো, ঠিকই, আত্ম-দর্শনে খোলে আত্মার সিংহদরজা। অন্য আমাকে কী বলছেন যদি তাতে কান না দিই তবে কান না থাকায় ভালো। কানকাটা। আমি কী বলছি আমি তা নই, মানুষ আমাকে কী বলছে আমি তাই।
নাদিয়া বললো, উনার অনুভূতিই নেই। বোধ-বুদ্ধি লোপ পেয়েছে। দেখা বোঝার শিকড় বাকড় শুকিয়ে গেছে।
শ্বেতা নারায়ণকে একটা ফাইল দিতে এসে বললো, সবার মুখ ভার! ভারি ভারি কথা হচ্ছে নিশ্চয়? জ্ঞানীদের সম্মেলন অফিসটি। ভারী ভারী কথায় ভারাক্রান্ত আমি। অদৃষ্টের রুদ্রলীলায় আমি ভরা গাঙে এসে পড়েছি।
হুমায়ুন কবীর বললো, ভারি মজা করে কথা বলেন শ্বেতা ম্যাম। ম্যামের হাসিমাখা কণ্ঠের কাকলীতে চমকে যাই।
মুখ ভেংচি কেটে নাদিয়া বললো, হাসি তো না কালবৈশাখীর ঝড়। কলিগদের হৃদয় সাগর লণ্ডভণ্ড করে দিলো।
কথাটি শুনতেই শ্বেতা থমকে গেলো। বললো, আমি কী আমার অজান্তে আপনাকে কষ্ট দিয়েছি, ম্যাম?
নাদিয়া বললো, না, না, কষ্ট দেবেন কেনো? যে জাদু-মায়া আপনার দখলে কেউ কষ্ট পেতেই পারেন না।
শ্বেতা অসন্তুষ্টচিত্তে চলে গেলো। হুমায়ুন কবীর বললো, নাদিয়া ম্যাম, শ্বেতা ম্যামকে এভাবে কথা বললেন কেনো?
নাদিয়া বললো, শ্বেতা ম্যামের রূপে তো আপনি নিমজ্জিত, তাঁকে নিয়ে কিছু বললে তো আপনার বাঁধবেই। আগুনে মুগ্ধ হলে ফাগুনে উচ্ছ্বসিত হবে কে? জলে ডুবলে বায়ুতে উড্ডীন হবে কে? বৈশাখী ঝড়েই তো আপনার বুক ভেঙেছে বাসন্তী পবন গায়ে মাখবেন না? আলো ঝলমলে তাক লাগে, কিন্তু আপন নিভৃত ঘর থেকে সুন্দর না।
হুমায়ুন কবীর বিস্মিত হয়ে নাদিয়ার কথা শুনলো। নারায়ণও মুগ্ধ হয়ে শুনলো আর বললো, নাদিয়া ম্যামের বিশ্লেষণ যথার্থ। লাবণ্য ত্বকের নারীকে সামলানো কষ্ট। এত ভুল করেন, বকতে চেয়েও বকতে পারি না। হেসে দেন, হেসে দিই।
নাদিয়া রেগে বললো, আমরা ভুল করলে অন্যায়, শ্বেতা ম্যাম ভুল করলে ভুলই। আমরা ভুল করলে জবাবদিহিতা, শ্বেতা ম্যাম ভুল করলে নমনীয় ভাবধারা প্রকাশ।
নারায়ণ বললো, সব সময় কঠোর হলে কাজ উদ্ধার করা যায় না।
নাদিয়া তীর্যক চোখে চেয়ে বললো, রূপের ফাঁদে পা দিয়েন না, রূপের কবলে পড়লে দেবী দেবালয় ছেড়ে আপনার আলয়ে এসে উঠবে কিন্তু!
নারায়ণ রাগ করে বললো, আপনিও তো নজরুল সাহেবের মতো কথা বললেন। বিয়ে না হয় করিনি, তাই বলে যাকে তাকে বিয়ে করবো? যাকে বিয়ে করবো তাকে শিক্ষিত, চাকরীজীবী, রূপবতী হতে হবে এমন নয়। অধস্তনকে বিয়ে করলে সম্মান নষ্ট হয়। তারচেয়ে আপন কর্মক্ষেত্রের বাইরের অপেক্ষাকৃত গরীব, স্বল্প শিক্ষিতকেও বিয়ে করা যায়। অপেক্ষাকৃত কম যোগ্যতাসম্পন্না বৌয়ের কাছে পূজনীয় হয়ে থাকা যায়।
সবাই আবার নিজ কাজে মনোনিবেশ করলো। হঠাৎ শ্বেতার সেটে মেসেজ এলো, নির্মল দিয়েছে। বিরক্তির স্বরে পড়লো, সত্য অনুভূতি প্রকাশ করা সত্যই কঠিন কাজ।
শ্বেতার মন খারাপ। কিন্তু তা প্রকাশ করলো না। নির্মলের মেসেজের উত্তরে লিখলো, যত কঠিনই হোক সময়ের সাথে সাথে সব সহজ হয়ে যায়।
মেসেজটি পেয়ে নির্মল শ্বেতার দিকে তাকালো। শ্বেতা হেসেই মুখ নামিয়ে কাজ করতে থাকলো। নির্মল আবার মেসেজ দিলো, আচ্ছা, অপ্রকাশ্য কিছু কী থাকে? অপ্রকাশ্য থেকে প্রকাশের কিছুই কী বিচ্ছুরিত হয় না?
বেশক্ষণ ভেবে নিয়ে শ্বেতা উত্তর দিলো, অপ্রকাশ্য কিছুই থাকে না। তবে প্রকাশিত সূর্য কিরণের চেয়ে অপ্রকাশিত সূর্য কিরণের প্রত্যাশাস্বাদ বেশি। তবে যাকে নিয়ে অপ্রকাশ্য, অব্যক্ত ভাব থাকে তার কাছে প্রকাশিত বা ব্যক্ত না হলেও সে বার্তা পৌঁছে যায়!
শ্বেতার কাজে ভুল পেয়েছে অথবা নাদিয়া বলে বলে শ্বেতার বিরুদ্ধে নারায়ণকে হয়ত বিষিয়ে তুলেছে। তাই তো নারায়ণ এসেই শ্বেতাকে বকা দিতে লাগলো, কাজে আপনি অন্যমনস্কা। ফাঁকি দিতে হলে ফাঁক খুঁজতে হয়, চতুর হলে চাতুরী করা যায়, চুরি করা যায়।
নারায়ণের উচ্চ বাক্যে সবাই চকিত হলো। গ্রাম্য অঞ্চলে ঝগড়া বিবাদের সময় রাগান্বিত পুরুষের মত নারায়ণের কর্কশ কণ্ঠ। নির্মল উঠে এলো। রেগে বললো, আপনি ভদ্রতার সীমা অতিক্রম করেছেন। শ্বেতা ম্যাম অফিসে নতুন। ভুল হতেই পারে। তাই বলে যা ইচ্ছে তাই বলা আপনার বাড়াবাড়ি। নিতাই স্যারকে আপনি রিপোর্ট করতে পারতেন।
নারায়ণ বললো, উনি নিয়মিত ভুল করছেন। উদাসীন আর উদভ্রান্ত মনের মানুষ। ক্লাস রুম নয় যে উদাসীন হয়ে থাকবেন। ভুল করাই উনার স্বভাব। একটু ভুল অনেক গরমিলের কারণ। বারবার ভুলের বারবার ক্ষমা হয় না। ভুলোমনে ভুল হবেই। এক কাজের সাথে হরেক কাজ করতে গেলে সেটাকে কাজ বলে না, অকাজ বলে। অকাজ আমি ক্ষমা করবো, কুকাজ না।
নির্মল আরো রেগে বললো, আপনি অকাজ থেকে কুকাজ পর্যন্ত চলে গেলেন? বলুন, তিনি কখন অকাজ করলেন, কখন কুকাজ করলেন? আপনাকে সুবিবেচক হিসেবেই জানি, অবিবেচকের মতো কথা কখনো বলবেন না।
নারায়ণ বেশি কথা বাড়িয়ে অফিসের পরিবেশ নষ্ট করলো না, নিজ ডেস্কে চলে গেলো।
অফিসটা বেশ ভারী হয়ে গেলো। খুব মন খারাপ শ্বেতার। এমন উচ্চারণ জীবনে শোনেনি। শ্বেতা বুঝতে পারলো বাস্তব জীবন এমন, কাজ ছাড়া প্রশংসা পাওয়া যায় না। এটাও বুঝলো, উর্ধ্বতনকে খুশী করে রাখাও কাজের বড় একটা অংশ। কাজ পাগল মানুষগুলো অবসর সময় ছাড়া রূপের দিকে নজর দেয় না।
সেদিনের পর থেকে সমস্যায় পড়লেই নারায়ণের কাছে যায় শ্বেতা। শ্বেতা অপরাধের সুরে বললো, স্যার বিশ্বাস করুন, আমি খুব চেষ্টা করি। আমার আন্তরিকতার অভাব নেই। বুঝে উঠতে সময় লাগে। আমার কোনো ভুলই ইচ্ছাকৃত নয়।
নারায়ণ নরম সুরে বললো, সবাই সব বোঝেনও না। সবাই সব শিখে জন্ম গ্রহণ করেনও না। আর ভুল একটা স্বাভাবিক বিষয়। আমি চাই, আপনি মনোযোগী হন। মনোযোগ দেন, দেখবেন আপনার বিরুদ্ধে আর কোনো অনুযোগ, অভিযোগ থাকবে না।
বলেই নারায়ণ শ্বেতার মুখের দিকে তাকালো। শ্বেতা ভাবনার চেয়েও মধুর, মধুরতর। চোখ দুটো লেগে গেছে চোখের কণিকায়। শ্বেতার মুখে লাজুক রঙের আভা। একটি অনিন্দ্য হাসি দিয়ে চলে গেলো। একমুঠো টাটকা বাতাস বয়ে গেলো।
নারায়ণের সাথে শ্বেতার বেশ সখ্যতা বা আন্তরিকতা গড়ে উঠলো। নজরুল সব পর্যবেক্ষণ করে। তাই বললো, নারায়ণ বাবু, আপনার বুদ্ধির তারিফ করতে হয়। বিশেষ কৌশলে বিশাল সফলতার দিকে অগ্রসর হচ্ছেন বৈকি! ভালোবাসা দিয়ে ভালোবাসা পেতে দেখেছি এতকাল। শাসন আর ধমক দিয়ে ভালোবাসা পাওয়ার দৃশ্য এই প্রথম দেখলাম। বড় মাথার বড় বুদ্ধি। উর্বর মাথা থেকে উর্বর বুদ্ধিরই জন্ম হয়।
নারায়ণ নজরুলের কুমতলব বুঝতে পেরেছে। তাই বললো, আপনি একটা গাধা, সব ময়লা গায়ে মাখেন। হাস দেখেন না? ময়লা কাদা ঘাটলেও শরীর পরিষ্কার রাখে।
নজরুল বললো, আমাকে যা-ই বলেন না কেনো, শ্বেতা ম্যামকে আপনার মনে ধরেছে, বুঝে ফেলেছি। অস্বীকারের কিছু নেই তো!
নারায়ণ বললো, আপনার শরীর যন্ত্রের বিকার তো অনেক আগেই হয়েছে, এবার হৃদয় যন্ত্রের বিকার হয়েছে।
নজরুল বললো, আমাকে যত পারেন তত বকেন। কিন্তু সত্যটা হলো, আপনি শেষ। চোখ মেলে আপনি এখন যত না দেখেন চোখ বন্ধ করে আপনি এখন তারচেয়ে বেশি দেখেন। আপনার না বলা কথার মধ্যেও অনেক বলা কথা লুকিয়ে। শ্বেতা ম্যামের রূপের আলোর বৈভবে আপনার ভুবন রেঙে রঙিন হয়ে উঠেছে।
বলেই নজরুল হাসতে লাগলো। অসহ্য লাগলো নারায়ণের। বললো, রামের ধনুক সহ্য হয়, আপনার মতো হনুমানসদৃশের দাঁত মিচকিনি সহ্য হয় না।
নজরুল এ অপমানে অপমানিত না হয়ে বললো, দেবীর পূজাতে লেগে যান। দেখেন কোন ফুল-ফল ভালোবাসেন, কোন পত্র-পল্লবে নারাজী। কোন বাদ্যে ধন-সম্পদ বর্ষণ করেন!
নির্মল অসংখ্য মেসেজ দিলো কিন্তু কোনো ফিডব্যাক পেলো না। ওর বিষণ্নে মনটা ভরে গেলো। বারবার তাকাচ্ছে কিন্তু শ্বেতা মাথা নিচু করে কাজ করছে। অফিস শেষে যে যার মতো বাড়ি চলে গেলো। রাতে শ্বেতা কল দিলো। বললো, আমরা একটা নিয়ম শৃঙ্খলার মধ্যে আছি। অফিস চলাকালীন মেসেজ দেবেন না। আমার অন্যান্য কলিগরা তো এমনটা করেন না! কাজে সহযোগিতা করেন বলে কী কাজে ব্যাঘাতও করবেন?
শ্বেতা কল কেটে দিলো। বিষণ্নতায় নির্মলের মুখটা ফিকে হয়ে গেলো। নির্মল ভাবলো, আসলেই বাড়াবাড়ি করেছি। সুন্দরীর সৌন্দর্য দর্শনে যত বেশি উচ্ছ্বসিত হওয়া যায়, তার মুখনিঃসৃত কটাক্ষাচ্চারণে তার চেয়েও বেশি ক্ষত জর্জরিত হতে হয়।
বেশ রাতে শ্বেতা আবার ফোন দিলো। ক্ষমা, অনুশোচনা আর অনুতাপ প্রকাশ করছে সে। নির্মল বললো, আপনি নারায়ণ স্যারের সাথে এত মেশেন কেনো?
শ্বেতা বললো, বড় স্যার। ম্যাচিউর। Hand হচ্ছে বলের শক্তি, Head হচ্ছে বুদ্ধির শক্তি, Heart হচ্ছে ভালোবাসার শক্তি। তিনটিই উনার ভেতর বর্তমান।
নির্মল চুপ হয়ে থাকলো। শ্বেতা বললো, কথা বলছেন না কেনো? আমি অবশ্য এমন ম্যাচিউর ছেলেদের পছন্দ করি না। ওমন গুরুগম্ভীর, রাশভারী লোক মোটেও আমার ভালো লাগে না। উনাদের সময়ের অনেক দাম। ব্যস্ততার মধ্য থেকে সময় বের করতে পারলেও সময় দিতে চান না। ওমন মানুষকে নিয়ে সংসারও করা যাবে না। কাজের অজুহাত দেখিয়ে শুধু চলে যাবেন। আমার পছন্দ পাগল পাগল টাইপের ছেলে। যার শিশুসুলভ আচরণ, সান্নিধ্যে লেগেই থাকবে। আমার অসহ্য রকমের প্যাচাল শুনবে রাতদিন। ঐ ছেলেই আমার পছন্দ যে প্রগলভ টাইপের, শুধু বলবে ভালোবাসি ভালোবাসি।
নির্মল মন দিয়ে কথাগুলো শুনলো। তারপর বললো, নারায়ণ স্যারের সাথে মিশবেন না।
শ্বেতা বললো, আমি কার সাথে মিশবো, কার সাথে মিশবো না, এটা কিন্তু একান্তই আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমার স্বাধীনতায় আপনার মতামত প্রকাশ কিন্তু অনধিকার চর্চা। এটা মনে রাখবেন আমি ভালোও বুঝি, মন্দও বুঝি। মানুষও চিনি, অমানুষও চিনি। কেউ ইট মারলে পাটকেলও মারতে জানি। কেউ গরল দিলে ঘোল তাকে ঠিকই খাওয়াবো।
নির্মল কল কেটে দিলো। খুব খারাপ লাগছে তার। ভাবতে লাগলো, মনের গভীর এক কোণে তোমায় রেখেছি সযতনে, তুমি বুঝতে পারো না? নয়নের গভীরে যে স্বপ্ন আঁকা তা তোমাকে ঘিরে, তুমি কী বোঝো না? তুমি দূর আকাশের কল্পনাতেই থেকে যাবে কী? এতটুকুও কী আমার জন্য মনে ভাবনা জাগে না?
তখনই শ্বেতা আবার ফোন দিলো। বললো, ভদ্রতার ফাঁকে মানুষ দুর্বলতা খোঁজে। এটা কী ঠিক?
নির্মল চুপ থাকে। শ্বেতা আবার বললো, ইনিয়ে বিনিয়ে অপছন্দের মানুষ অনুষঙ্গ কামনা করলে কেমন লাগে বলুন তো?
নির্মল এবার বললো, সংযত হলে সব সামলানো সম্ভব। সাবধান থাকলে শত প্রতিকূলও জয় করা সম্ভব। শত বিপদ মাঝে স্মরণ করবেন, সহযোগিতা পাবেন।
শ্বেতা বললো, সহযোগিতা দেবে এ অজুহাতেই তো মানুষ সুযোগ খোঁজে। কাছে ঘেঁষে।
নির্মল ইঙ্গিত নিজের ঘাড়ে নিয়ে চুপ হয়ে গেলো। শ্বেতা বিষয়টি সুদৃঢ়ভাবে বুঝতে পারলো। তারপর বললো, সবার সব গুণ ভালো লাগে না। আপনার কিছু গুণ আমার ভালো লাগে। যে কারণে আপনাকে ভীষণ বিশ্বাস করি। বলতে পারেন আপনাকে আলাদা চোখেও দেখি।
শুনে নির্মলের মন ভালো হয়ে গেলো। মেয়ে মানুষের কথার কী মহিমা, তার এক মিষ্টি কথাতে যাবতীয় জীবন যাপনে সুখের বারিধারা বয়, আর একটি তীর্যক বচনে যাবতীয় জীবন যাপনে কষ্টের অগ্নিধারা বয়।
নির্মল ভাবলো, সকল সুন্দরী অনর্থক অহংকারী আর অবিবেচক হয় না। সকল সুন্দরী হৃদয় ভাঙার ব্যবসায় করে না।
মধুর কষ্টের শেষ হলো। বললো, কাল তো শুক্রবার। চলুন বাইরে কোথা থেকে ঘুরে…
শ্বেতা নির্মলের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললো, আসলে আমি সারা সপ্তাহ পরিকল্পনা করেছি শুক্রবারটা বাসায় নিত্য প্রয়োজনীয় কিছু কাজ করবো।
নির্মল চুপসে গেলো। জোরারোপ করলো না। জোরারোপ করার জন্য অধিকার থাকতে হয়। কোন অধিকারে সে জোরারোপ করবে! ভাবলো, সুন্দরীদের মনের নাগাল পাওয়া সাধারণ মানুষের সহজ সাধ্য কাজ নয়। সত্যই, সত্য মনের নাগাল না পেলে এক ডাকে কেউ কখনো বাইরে ঘুরতে যাবে না। লোভনীয় বাদাম, আইসক্রিম বা ফুচকায় প্রলোভিত হবে না। মনের সাথে মনের জোড়া না লাগলে হাতে অঢেল সময় থাকলেও সময় নেই অজুহাতে বের হবে না।
পরদিন সবাই কর্মক্ষেত্রে হাজির হলো। একটু পরেই শ্বেতা নারায়ণ বাবুর কাছে গেলো। কাজ বুঝে নিতে বা সমস্যা সমাধানে বা কাজ বুঝিয়ে দিতে। কিছুক্ষণ পরে নিজের ডেস্কে বসতেই নির্মল মেসেজ দিলো। যদিও শ্বেতা মেসেজ দিতে নিষেধ করেছিলো, তবুও নির্মলের থেকে মেসেজ পেয়ে বিরক্ত হলো না। ও পড়লো, আমি কী সমস্যার সমাধান করে দিতে পারি না?
উত্তরে শ্বেতা লিখলো, আপনি দূরত্ব বোঝেন না। কানের সাথে লেপ্টে সাহায্য করেন। আমার চুলের গন্ধ সব শুষে নেন।
শ্বেতার মেসেজ পড়ে নির্মল আনমনা হয়ে পড়লো। শ্বেতা বেশক্ষণ ধরে লিখে বড় একটা মেসেজ দিলো, একদিন নাদিয়া ম্যাম আমার সাথে দুর্ব্যবহার করেন। সামনে নারায়ণ স্যার ও হুমায়ুন স্যার ছিলেন। দেখে মজা নিচ্ছিলেন! আর একদিন নারায়ণ স্যার আমাকে চরম ভাবে বকা দেন। অফিস ভর্তি কেউ আমার পক্ষে দাঁড়াননি। একজন প্রতিবাদ করেছিলেন, আমার চোখে তিনি আলাদা, স্পেশাল।
অফিসের বড় বাবু নিতাই বাবু। বড় কড়া লোক। বড় লোকের শত্রুর সংখ্যা ঢের বেশি। তাঁর শাসনে কখনো শৈথিল্য দেখা যায় না। অফিসের শিরোভূষণ সাধারণ কর্মকর্তাদের সংস্রব মাখেন না। শ্বেতা ডাক পেয়েছে। নির্মলকে মেসেজ দিলো, স্যার ডেকেছেন। স্যার নাকি প্রচণ্ড রাগী?
নির্মল মেসেজে লিখলো, অসামান্য প্রতিভাধর ব্যক্তিদের সামান্য কথাও ভক্তি সহকারে শুনতে হয়। যিনি যত ভয়ংকর তাঁর ভেতরটা তত কোমল। পুরুষের পুরুষালীতে প্রকৃত পরিচয়। তাতে দোষ দেখতে নেই।
নির্ভয় পেয়ে শ্বেতা বড় বাবুর রুমে গেলো। আর নির্মল ভাবলো, শরৎকালে সরিয়ে রাখে, বিপদকালে অবলম্বন করে!
বেশক্ষণ হয়ে গেলো শ্বেতা বড় বাবুর রুমে। নিতাই বাবু হরেক কথা বলছেন। কাজের কথার ফাঁকে ফাঁকে ব্যক্তিগত, পারিবারিক কথাও জানছেন। এমন পরমা সুন্দরী সামনে থাকলে কার না মন চায় দুটো মিনিট বেশি কথা বলতে!
শ্বেতা ফিরে এলে নির্মল মেসেজ দিলো, স্যার কী বললেন?
শ্বেতা মিষ্টি হেসে মেসেজ দিলো, বলেছেন, আমার কানের দুলে, নাকের নাকফুলে, গলার চেনে, আঙুলের আংটিতে, কপালের টিকলিতে কখনো সোনা কম পড়বে না!
নির্মলের হাত থেকে কলম পড়ে গেলো। মুখ তুলে শ্বেতার দিকে তাকালো। শ্বেতা মিষ্টি হেসে মুখ নামিয়ে নিলো। মিষ্টি হাসির রহস্য বুঝতেই পারলো না নির্মল।
পরদিন বড় বাবু আবারও শ্বেতাকে ডেকেছেন। শ্বেতা আজ নির্ভয়ে স্যারের রুমে গেলো। ভাবগতি ধরা গেলে মোকাবেলা করা সহজ সে জানে। নিতাই বাবু বললেন, অফিস টাইমে নির্মল বা নারায়ণ বাবু কারো সাথে অতি আন্তরিকতার দরকার নেই।
বিমর্ষ হয়ে শ্বেতা ফিরে এলো। নির্মল মেসেজ দিতেই শ্বেতা উঠে নির্মলের কাছে এসে বললো, আপনি কী চান না জবটা আমি করি?
অপ্রত্যাশিত আচরণ পেয়ে নির্মল থমকে গেলো। শ্বেতা বললো, আত্মীয় স্বজন দ্বারা, পথের পথিক দ্বারা, সহপাঠীদের দ্বারা, কলিগ দ্বারা উত্যক্তের শিকার হচ্ছি, কত সহ্য করা যায় বলেন? এত বিরক্তি, এত বাঁধা, এত ভয় নিয়ে তো জীবন নির্বাহ করা যায় না।
মহিউদ্দিন আর নির্মল একসাথে বাসা ভাড়া করে থাকে। সময় পেলে গুরুত্বপূর্ণ অগুরুত্বপূর্ণ অনেক কথা তাদের মাঝে হয়। ওদিন রাতেই মহিউদ্দিন নির্মলকে ধরলো। বললো, শ্বেতা ম্যাম শিল্পীর তুলিতে আঁকা এক অনন্য অসাধারণ প্রতিমা। মানুষ এত অসহ্য রকম, অবিশ্বাস্য রকম সুন্দর হতে পারেন জানা ছিলো না। সব নারীর ভেতরে কিন্তু শাশ্বত নারীর রূপ থাকে না। যেভাবে অগ্রসর হচ্ছেন তাকে বলা চলে শম্বুকগতি। কোনো বাজপাখি উড়ে এসে না আবার তাঁর মনের জমিন দখল করে নেন। ম্যামকে শুধু মেসেজ দিয়ে দখলে আনতে পারবেন?
নির্মল বললো, শম্বুকগতিতে অগ্রসর হলে কিছু কিছু কাজের ফল অত্যন্ত মিষ্টি হয়।
মহিউদ্দিন বললো, শ্বেতা ম্যামের পাশে বসার কারণে ম্যামের সাথে আমার বোঝাপড়া ভালো। আপনার হয়ে আমি কী একটু ওকালতি করবো?
হ্যাঁ না অনুমতি পাওয়ার আগেই নির্মলের সেটে কল এলো শ্বেতার। মহিউদ্দিন থেকে নির্মল সরে বাইরে গেলো। শ্বেতা বললো, কেমন একটা ভয় আমাকে চেপে ধরেছে! আমি এখন শঙ্কিত থাকি। চিন্তিত থাকি। আমি প্রত্যাখ্যান করতে করতে প্রত্যাখ্যাত হয়ে গেছি। আমি বড় একা হয়ে পড়েছি।
নির্মল আগ্রহ সহকারে বললো, কী হয়েছে আপনার? হঠাৎ এমন বাক্য শুনে আমারও তো খারাপ লাগছে।
শ্বেতা বললো, ছোট বেলা থেকে প্রশংসা শুনতে শুনতে আমি ক্লান্ত। প্রশংসা শুনলে আমার ভালো লাগতো। এখন ভয় করে, ভীষণ ভয় করে। আজ অফিসে রাগের মাথায় কী না কী বলে ফেলেছি, কিছু মনে করবেন না। আমাকে মানিয়ে নিতে শেখেন, কাজ দেবে।
এভাবে ওরা বেশ রাত পর্যন্ত কথা বললো। পরদিন অফিসে যে যার ডেস্কে বসে কাজে লেগে গেলো। পাশাপাশি বসে বলে মহিউদ্দিনের সাথে শ্বেতার বোঝাপড়া ভালো। মজাচ্ছলে বললো, ম্যাম, পরম শান্তিপূর্ণ দুর্লভ সুখ মানুষ কখন পায় জানেন? সংসার জীবনে! আর সে সংসারে একটা সন্তান থাকলে তো স্বর্গ বিরাজ করে!
শ্বেতা মিষ্টি হেসে বললো, শতাব্দীর সেরা কৃষ্ণ চাই না। চাই না সুবেশসুন্দর কার্তিক। প্রগলভ টাইপের কেউ এসে যদি বলতো ‘ভালোবাসি’। বলেই দিতাম তাকে ভালোবাসি।
মহিউদ্দিন বললো, রান্না করতে জানেন তো? বৌয়ের হাতের রান্না কিন্তু স্বামী সমাজ গপাস গপাস করে খায়।
শ্বেতা হেসে বললো, তরকারি কুটতে পারি না, তরকারি রান্নাও জানি না। স্বামী, শ্বশুর-শ্বাশুড়ির গঞ্জণা শুনে মরতে হবে আমাকে।
মহিউদ্দিন পাণ্ডিত্য ফলাতে ফলাতে বললো, গাইতে গাইতে গায়েন। কোনো মেয়েই মায়ের ঘরে ঠিক করে রান্না শেখে না। স্বামীর ঘরে এসেই রাধুনি হয়ে উঠে। সফল কর্মকর্তার পাশাপাশি আপনাকে কিন্তু সফল রাধুনিও হতে হবে।
মহিউদ্দিন বললো, এ জীবন কিছুই নয়, বুদবুদ। বাতাসে একদিন মিলে যাবে। মানুষ প্রতিষ্ঠা প্রাপ্তির জন্য নেশায় মত্ত থাকে। প্রকৃত প্রতিষ্ঠা জীবনে কখনোই আসে না। সংসার জীবনে প্রবেশ করেন। অনেক অপ্রাপ্তি থাকলেও প্রাপ্তির সংখ্যাও কম থাকবে না।
শ্বেতা বললো, মানুষ কেবল প্রশংসা করেন। কেউ তো প্রকৃত ভাবে অনুভূতিতে এসে ধাক্কা দিলেন না। কেউ তো কোনো দিন এসে জিজ্ঞাসা করলেন না -কী ভাবছি! কেউ তো এমন স্বপ্ন দেখালেন না বিকেলের সূর্যকে কর্জ করে এনে কপালের টিপ করে দেবেন।
মহিউদ্দিন বললো, দেখুন, চাওয়া মাত্রই প্রত্যাশিত জিনিস পাওয়া যায় না। কেউ একজন আপনাকে খুব ভালোবাসবে, ভালোবেসে সে নিঃস্ব হবে, ভালোবেসে আপনাকে ধন্য করবে, ঋণী করবে, এতো ভাবাও ঠিক না।
শ্বেতা মাথা ঝাঁকিয়ে বললো, তা ঠিক। খুব বেশি প্রত্যাশা করা ঠিক না। আচ্ছা দেখি, আমার প্রত্যাশার ডালপালাগুলোকে ছাটতে পারি কিনা!
অফিস শেষে নির্মল অপেক্ষা করলো শ্বেতার জন্য। শ্বেতা কারো কাছে না যেয়ে নির্মলের কাছেই এলো। শ্বেতা আর নির্মল আজই প্রথম একসাথে হাটছে। কে কিভাবে এবং কী বিষয়ে কথা বলবে বুঝতে পারছে না। এভাবে বেশদূর ওরা চলে গেলো। তারপর দুজন দুজনের দিকে চেয়ে হেসে দিলো। শ্বেতা হাসি নিয়ন্ত্রণ করে বললো, কী কিছু বলবেন না?
নির্মল বললো, রূপের প্রশংসা করলে তো ভয় জাগবে। এটা সত্য আপনার সৌন্দর্য দেখার আনন্দ আমার সবচেয়ে বড় আনন্দ।
মিটমিট হেসে শ্বেতা বললো, কখন সৌন্দর্য দেখেন? কোনো দিন তো চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে পারলেন না! নারায়ণ স্যার তো ঠিকই চোখের দিকে চেয়ে কথাও বলেন, বিস্ময়ে বুদ হয়ে যান।
নির্মল মাটির দিকে চেয়ে থাকে। শ্বেতা বললো, বড় বাবু মধ্যরাতে কল করেন!
নির্মল কথাটি শুনেই বিদ্যুৎবেগে শ্বেতার দিকে তাকালো আর বললো, মানে? কি বলেন?
শ্বেতা দাঁতে ঠোঁট কেটে নাকে হাসে। আর বলে, খুব মিষ্টি করে কথা বলেন। সাজিয়ে কথা বলেন। উনার মাথার কাঁচা-পাকা চুল আমার খুব পছন্দ।
নির্মল সবই বুঝতে পারলো। একবার ভাবলো, অর্থহীন ব্যক্তির কর্তৃত্ব নেই, আধিপত্য নেই। অফিসের ছোট কর্তার দিকে কারো কী কখনো নজর যায়? ধন সম্পদও এক ধরনের শক্তির নিদর্শন। তাছাড়া শ্বেতার সৌন্দর্য সম্ভারের সামনে আমি মূর্তিমান দূর্ভিক্ষফণাক্ষত অস্থিকঙ্কালসার অগণ্য।
শ্বেতা নির্মলের নিষ্প্রভতা প্রত্যক্ষ করলো। বললো, অল্পতে সন্তুষ্টতা মানুষের বড় গুণ। কিন্তু অপ্রাপ্তিতে মনকে সন্তুষ্ট করে রাখা যায় না।
নির্মল মনে মনে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। ভাবলো, আমার জীবন নামক পদ্মবনে মদমত্তহস্তী বারবার এসে সব লণ্ডভণ্ড করে দেয়। জীবনের নাট্যলীলায় আমি এক ব্যর্থ ও ক্লান্ত অভিনেতা। দুঃখ ভোগ, ব্যর্থতা ভোগ আর শোক ভোগ যার সম্বল তার বারবার স্বপ্ন দেখা বিলাসিতা।
শ্বেতা নির্মলকে খুব সূক্ষ্মভাবে প্রত্যক্ষ করলো। তারপর বললো, বড় বাবুর ওমন মিষ্টি করে কথা বলা আমার আবার ভালো লাগে না। অত সাজিয়ে গুছিয়ে কথা বলাও আমার ভালো লাগে না। মেয়েদের সাথে কথা বলতে গেলেই মিষ্টি করে, সাজিয়ে গুছিয়ে কথা বলা পুরুষদের এক ধরনের ফ্যাশান। আমার ওসব আদিখ্যেতা ভালো লাগে না।
পরদিন থেকে অফিসে নির্মল আর তেমন উচ্ছ্বসিত থাকে না। শ্বেতা বিষয়টি লক্ষ্য করে মেসেজ দিলো, অন্তরে অভেদ, বাইরে প্রভেদ।
প্রতিউত্তরে নির্মল লিখলো, অন্তর যন্ত্রে শত চেষ্টাতেও আর সুর উঠবে না।
শ্বেতা লিখলো, অব্যক্ততা আপনার বড় গুণ। যে আপনার অব্যক্ততা বুঝতে পারেনি সে বড় অভাগা।
নির্মল ফিডব্যাক দিলো না। শ্বেতা রাগ করলো না। পাশ থেকে মহিউদ্দিন বললো, রান্না করা শিখছেন তো?
শ্বেতা বললো, হ্যাঁ, শিখছি।
মহিউদ্দিন বললো, তাহলে এবার সুবেশসুন্দর শতাব্দীর সেরা কার্তিকীয় যুবক খুঁজতেই হয়।
শ্বেতা হাসে আর বলে, প্রশস্ত হৃদয়ের হলেই হবে।
তারপর তারা কাজে মনোনিবেশ করে। বেশক্ষণ পরে শ্বেতা বললো, আপনি আর নির্মল স্যার একসাথে থাকেন না?
মহিউদ্দিন হ্যাঁ-সূচক মাথা ঝাঁকালো। শ্বেতা বললো, মধ্যরাত পর্যন্ত আপনারা বাইরে আড্ডা দেন কেনো?
মহিউদ্দিন বললো, আমাদের দুজনের শাসন করার কেউ নেই তাই!
বলেই মহিউদ্দিন হেসে দিলো। শ্বেতা হাসতে হাসতে বললো, শাসন লাগবে? ঠিক আছে!
হঠাৎ মহিউদ্দিন বললো, সেদিন হুমায়ুন স্যার, নাদিয়া ম্যাম মিলে নারায়ণ স্যারের সাথে আপনার বিষয়ে কথা বলছিলেন। নারায়ণ স্যারকে আপনার কেমন লাগে?
শ্বেতা তীর্যক চোখে চেয়ে বললো, ভালো। খুব ভালো।
বাসা ফিরে মহিউদ্দিন সব বলে দিলো নির্মলকে। নির্মলকে গরমের স্বরেই মহিউদ্দিন বলছিলো, আপনি মনে প্রাণে চান নি। আপনার চাওয়ার মধ্যে খাঁদ ছিলো। আপনি দ্বিধান্বিত ছিলেন। বনের সবচেয়ে সুন্দর হরিণীটি পড়ে থাকে না, আগেই বাঘের খপ্পরে পড়ে। গাছের ডালে কূজনরত সুন্দর পাখিটিই আগে শিকারীর শিকারে পরিণত হয়। ক্ষেতের সুন্দর ফল বা সবজিই আগে কৃষক দখলস্থ করে। আগেই বলেছিলাম খরস্রোতা নদীর মতো বেগবান হন। হলো তো? আফসোস আর আস্ফালন নিয়ে থাকেন।
নির্মলের উত্তরের অপেক্ষা না করে মহিউদ্দিন চলে গেলো। নির্মল বিমর্ষ হয়ে বসে পড়লো। বিবর্ণ দেখাচ্ছে তাকে।
পরদিন অফিসে নির্মল শ্বেতার সাথে কোনো কথাও বললো না। অফিস শেষে শ্বেতা নির্মলকে সাথে করে বের হলো। শ্বেতা কৌতুহলের স্বরে বললো, ইদানিং আমার ব্যাপারে আপনি অনেক উদাসীন। আগ্রহটা যেন মরেই গেছে।
নির্মল বললো, সুযোগ থাকলে আগ্রহ বাড়ে। সুযোগ দিলে আগ্রহ বাড়ে। ক্ষুদ্রতায় থেকে তো বৃহৎ স্বপ্ন দেখাও ঠিক না। আবদ্ধ জীবন, মৌণ জীবন। আবদ্ধ পুকুরে কখনো ঢেউ উঠে না। আবদ্ধ পুকুরে কেউ কখনো সুখের সাঁতারও কাটে না। গোলাপ দেখলে মানুষ বনফুলের দিকে তাকায় না। বনফুলের তাতে কোনো কিছু আসে যায় না।
শ্বেতা বললো, প্রদীপ যতটুকু আলোয় অঞ্চল আলোকিত করে ততটুকুতেই মানুষ স্বপ্ন ফলায়।
নির্মল নির্বাক নয়নে সম্মুখে চেয়ে বললো, আমার অনুভূতি ধাক্কা খেতে খেতে ভোঁতা হয়ে গেছে। অমানিশা পূর্ণিমা আমার কাছে দুই-ই সমান।
শ্বেতা বললো, জীবনে চাওয়া পাওয়ার সময় কখনো ফুরায় না। মরা নদীও জেগে উঠে। কূল প্লাবিত করে। শুধু অপেক্ষা দরকার।
নির্মল নির্লিপ্ত নয়নে বললো, আমার আত্ম-বিশ্বাসের সলতে শুকিয়ে গেছে।
শ্বেতা বললো, স্বপ্নকে তো কখনো স্বপ্নের মতো করে চাননি। আর তাই নীরব চোখের স্পষ্ট ভাষাও বুঝতে পারেন না। ভালবাসলে অপেক্ষার আগুনে পুড়তে হয়। ভাব সাগরের জলে ভাসতে হয়। আগুনে পুড়লে মানুষ ছাই হয়। ভালোবাসার আগুনে পুড়লে মানুষ খাঁটি হয়। কলস রমণীর কাখে আগুনে পুড়ে তবেই ওঠে।
নির্মল কাঁধ বাঁকিয়ে বললো, আপনার কী মনে হয় না আপনার জীবনটা অপূর্ণ? প্রেম ছাড়া পূর্ণ হয় জীবন?
শ্বেতা কথা ঘুরিয়ে ফেললো। বললো, বাসে উঠতে আমার খুব কষ্ট হয়। তাছাড়া শারীরিক নির্যাতনের শিকারও হই। আপনি কী আমাকে আজ বাসে তুলে দেবেন!
নির্মল তত আগ্রহ দেখালো না। শ্বেতা নির্মলের নারাজী দেখে বললো, সব পরীক্ষায় ফেল মারলে শূন্য বুক কখনো পূর্ণ হবে? বিয়ের পর নারী কিন্তু চেনা পথও একা চলতে পারে না। স্বামী পেলে নারী স্বামীর উপর নির্ভরতাতেই সুখী হয় বেশি।
নির্মল শ্বেতার সাথে হাটতে অনাগ্রহ প্রকাশ করলো। শ্বেতা ঠোঁটের কোণে একটু হাসি ফুঁটিয়ে কাঁধ ব্যাগ থেকে নির্মলের দেয়া উপন্যাস ‘শেষের কবিতা’ বের করে দিয়ে বললো, অবশ্যই শেষ পৃষ্ঠাটা পড়বেন।
শ্বেতা দ্রুত হেটে চলে গেলো। নির্মল বইটি হাত ব্যাগে রেখে দিলো। বাসায় ফিরলো। একবার শেষ পৃষ্ঠা পড়তে চেয়েও পড়লো না। দুবার পড়া ভেবে বইটি বুক সেলফে রেখে দিলো।
পরদিন নতুন একটা শাড়ি পরে শ্বেতা অফিসে এসেছে। গতানুগতিকের বাইরে যেয়ে একটু অন্য রকম করে সেজেছে। এসেই নির্মলের দিকে লজ্জা লজ্জা চোখে তাকালো। দেখেও না দেখার ভান করলো নির্মল। কখনো মিষ্টি হেসে, কখনো প্রফুল্ল চিত্তে শ্বেতা নির্মলের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করলো। অন্যান্য দিনের মতো নির্মলের তেমন সাড়া পেলো না। শ্বেতার মনে নানা চিন্তার বাতাস ঘূর্ণন খেলো। একটু পরে হুমায়ুন কবীর এলো। শ্বেতাকে দেখে বললো, ভালো দিনেই আরো পরিপাটি হয়ে এসেছেন। নারায়ণ স্যার তো মরেছেনই, এবার ভস্ম হবেন।
হুমায়ুন কবীর যেতে না যেতেই নাদিয়া এলো। বললো, এত দিনে নারায়ণ স্যার বিয়ের নাম মুখে এনেছেন। আপনার কপাল একটা! চাইলেনও না, সাম্রাজ্য পেয়ে যাচ্ছেন।
নজরুল এসে বললো, আমরা অফিসের সবাই চাই নারায়ণ স্যারের সাথে আপনার বিবাহটা হোক। অমত করেন না। খুব সুখী হবেন জীবনে। নিতাই স্যার আজ আপনাকে সব জানাবেন।
শ্বেতার মুখটা মলিন হয়ে গেলো। ও তৎক্ষণাৎ পদত্যাগ পত্র লিখে নিজ ডেস্কেই রেখে অফিস থেকে বের হয়ে গেলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই অফিসের সবাই জেনে গেলো শ্বেতা চাকরি ছেড়ে চলে গেছে। শুনে নির্মল বিভ্রান্ত হলো। শ্বেতা এমনটা কেনো করলো! অফিস শেষে বাসা এলো। মনটা ছটফট করছে ওর, কেনো শেষ পৃষ্ঠাটা পড়তে বলেছিলো জানার জন্য মন চাঞ্চল্য হলো। ‘শেষের কবিতা’ বুক সেলফ থেকে বের করে শেষের পৃষ্ঠায় চোখ ফেললো। লেখা, “নির্মল, অমিত ও লাবণ্য পরস্পর পরস্পরকে আপ্রাণ ভালোবেসেছে, কিন্তু নানা কারণে অমিত কেতকীকে, লাবণ্য শোভনলালকে বিয়ে করবে সিদ্ধান্ত নেছে। নির্মল, আমি অমিত বা লাবণ্যর মতো নই; আমাকে যে ভালোবাসে, আমি যাকে ভালোবাসি, নানান বাঁধা পেরিয়ে হলেও আমি তাকেই বিয়ে করবো। ভালোবাসি, খুব ভালোবাসি, তোমাকে”।
কথা কয়টি পড়ে নির্মল বইটি বুকে চেপে ধরলো। শ্বেতার ভালোবাসা আর ভালোবাসার দৃঢ়তায় সে বাক্যহারা হয়ে গেলো।

যশোর, বাংলাদেশ

লিপি

কাল্পনিক

 দীপঙ্কর সরকার

 

মাঝ পথেই থেমে গেল স্বপ্ন রচনা।
ইনিয়ে বিনিয়ে দিব্যি লিখছিলাম বন্যার কথা,
প্রসঙ্গক্রমে এসে গেল গরু,
ইদানিং গোমাতা নিয়ে দারুণ বিড়ম্বনা।
আমি তাই বদলে ফেললাম আমার ঠিকানা,
বেনামে লিখে গেলাম চিল ও শকুনের কথা;
ভাগাড়ে দৃষ্টি যাদের সে নিয়ে উচ্চ বাচ্য নেই,
কোনোদিন হয় না কোনো কাব্য আলোচনা।
প্রকারান্তরে ঝাউগাছ আর ক্যাকটাসের,
ফুল নিয়ে ভরিয়ে তুললাম ভুরি ভুরি সাদা পৃষ্ঠা।
পৃষ্ঠার কী দোষ বলো,
যদি কেউ না-ই ছাপে অগ্রন্থিতই থাক,
না অস্ফুট হৃদয়ের তামাম কথামালা।
কালের কষ্ঠি পাথরে একদিন ঠিক মূল্য পাবে আমার যত স্বপ্ন রচনা।

লিপি

এমন সন্ধ্যায়

বদরুদ্দোজা শেখু

 

কোন্ দিকে যাবো?
ভাড়াটে কুঠিতে কড়ি-কাঠ গোনা নিঃসঙ্গ প্রহর,
বন্ধুদের অনুবন্ধ আদর্শিক বিদ্বেষে বিলীন, পাশাপাশি
খিস্তি-খেউড়-মুখর বস্তিবাসী ঘিঞ্জির ঝঞ্ঝাট,
উঠতি গুণ্ডা অধ্যুষিত সরীসৃপ পার্ক, নদীতট,
সামনে পরস্পরের শীর্ণ শ্বাস চুষে-খাওয়া বিরক্ত শহর
আমাদের মতো অশাকীন উদ্বাস্তু বাসিন্দা ভর্তি;
বহুদিন পরিত্যক্ত পাড়াগাঁর বসতবাড়িতে
কোনোক্রমে অতিথি সৎকার করা অনাগ্রহ মনোভাব
বিদায় দেওয়ার প্রতিকল্প আড়ষ্ট উচ্ছ্বাসে
খামার বাড়ির খড়ের গাদার প্রান্তে পৌঁছে দিয়ে যায়
অস্তগামী সূর্যের মতোই, পরাঙ্মুখ প্রকৃতিও বাড়ায় না হাত
ঘাসের গালিচা পেতে বিষয়-ধূসর শীতের শহরে।
এমন সন্ধ্যায় কোন্ দিকে যাবো?

এখন নিজেকে দূর থেকে দৃশ্যমান
একটা গগনচুম্বী চিমনির মতো আষ্টেপৃষ্ঠে
টান-টান বাঁধা মনে হয়— কোনোদিকে
যাওয়ার সামর্থ্য নেই হৃদয়ের পোড় থেকে বাঁচার আশায়।
বিমর্ষ চিন্তার বিচ্ছিন্ন প্রবাহ-ক্লিষ্ট দ্বিধান্বিত মন
অসংলগ্ন চরণে চলায়। বিলম্বিত
গোধুলির অন্ধকারে চুপি চুপি চ’লে যাওয়া শেয়ালের মতো
উঞ্ছবৃত্তি ইচ্ছা কিছু হেঁটে যায় চৌরাস্তার মোড়,
মোচ্ছবের ঝোপঝাড়
দুর্গন্ধ নর্দমা,অন্ধকার গলি, অকিঞ্চন বেশ্যার সরণি
আসক্তির কামনা-মঞ্জুল।
পশুত্বের চঞ্চুগুলো ব্যগ্রভাবে উগ্র হ’তে চায়
সন্নিকট আঁধারের অপগণ্ড লোভে।
নির্বিঘ্ন শান্তির উৎস
সদ্যোজাত কবিতার গর্ভিনী চাঁদের উষ্ণ আলিঙ্গন
এখন কোথায়? এখন কেবল
কিশোরীর উৎফুল্ল শাড়ির পিছু ধাবমান মাংস-লিপ্সু ময়ূরের চোখ,
ধোপ-দুরস্ত সফেদ ডানায় ছদ্মবেশী চঞ্চুবান চিল,
এবং আত্মিক নন্দনতত্বের অলৌকিক মাধুকরী
এখন অমিল সবখানে।
শহরতলীর গোধুলির ছায়ান্ধ রাস্তায়
হেঁটে যাই নিঃসঙ্গ শেরপা এক আদিম যুগের,
বওয়ার সামর্থ্য নেই তবু কাঁধে দুর্বহ দায়িত্ব আছে
পরিবেশ নির্বিঘ্ন করার; চোখে ভাসে
শান্তির রহস্যভরা শিখরের অভিনব উদ্ভাসন। অকস্মাৎ
প্রতিবার পদক্ষেপে পরিপার্শ্ব মানুষের চোখে
নিজেকে ক্যামন্ মনে হয়
আজন্ম বিদেশী।।

লিপি

বাবা তুমি

নাসিরা খাতুন

 

বাবা তুমি সূর্য সমান
আলোর ঝিকিমিকি,
বাবা তোমার আলোয় আলোকিত
হয় যে মোদের সবই।

বাবা তোমার বুকের ভিতর,
জ্বলছে শত কষ্টেরই বারুদ,
কষ্টে কষ্টে বাবা তোমার,
বুকের ভিতর হচ্ছে পুড়ে ছাই,
তবুও বাবা তোমার বুকে,
সদায় ভালোবাসা রয়।

বাবা তোমার মিষ্টি হাঁসি,
মায়াবি ঐ চোখে,
আমি দেখি সবই,
কষ্ট যত আছে,,,।

বাবা তুমি সূর্য সমান,
আলোর ঝিকিমিকি,,,
সেই আলোতে থাকি,
মোরা সদাই হাঁসি-খুশি।।

সমাপ্ত
  1. লেখা নেওয়া হবে প্রত্যেক রবিবার থেকে শুক্রবার বিকেল ৫ টার মধ্যে। 
  2. লেখা প্রকাশ হবে প্রত্যেক শনিবার সকাল ৯ টায়।  
  3. লেখা পাঠাতে পারেন –
    1. কবিতা
    2. গদ্য
    3. ছোটগল্প
    4. প্রবন্ধ
  4. মেইলে টাইপ করে অথবা MS Word ফাইলের লেখা নেওয়া হবে। 
  5. আপনি কিভাবে লেখা পাঠাবেন তার কিছু নমুনা দেওয়া হলো। – Download 
  6. লেখা পাঠাতে আমাদের এই মেইলটি ব্যবহার করুন – [email protected]
  7. লেখার সাথে আপনার লেখক পরিচিতি, প্রথম পুরুষে, ৬০ থেকে ১০০ শব্দের মধ্যে, এবং আপনার ছবি পাঠান। 
  8. সপ্তাহে একজন একটি বিভাগে লেখা পাঠাবেন। 
  9. লেখা বাছাইয়ের মধ্যে দিয়ে নির্বাচিত করা হবে। 
  10. আবেদনকারীর সমস্ত লেখা নিজের হতে হবে, যেটি অন্য কোথাও প্রকাশিত হয়নি।
  11. লেখার মধ্যে কোনো ব্যাকরণগত ভুল থাকবে না, থাকলে সেটিকে বাতিল করা হবে।
  12. আবেদনকারীকে ফোন নম্বর অবশ্যই দিতে হবে মেইলের সাথে।
  13. পিডিএফ ও পিকচার এর মাধ্যমে পাঠানো লেখা গ্রহণ করা হবে না।
  14. লিপি ম্যাগাজিন ওয়েবসাইটে একাউন্ট তৈরির সময় আপনার লেখক পরিচিতি, ঠিকানা, এবং ছবি আপলোড করতে হবে।
  15. প্রত্যেক মাসে Amazon Kindle প্লাটফর্মে এবং পিডিএফ প্রকাশ করা হবে (মাসের সমস্ত লেখা)
  16. তিনমাস অন্তর সমস্ত লেখা পিডিএফ এবং Google Book or Amazon Kindle with ISBN Number সাথে প্রকাশ করা হবে।   

Share This

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on telegram
Share on email

Editorial Board 

  • Reviewed, Designed & Published by Akshay Kumar Roy (Editor)

For More Information, Click Here

For any type of Suggestion, Question, or Help, please contact us at this mail – [email protected]

Follow Us

0 0 votes
Writing Rating

Related Articles

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments