শনিবারের লিপি – ২০ তম সংখ্যা

লেখক

রবীন জাকারিয়া <img class="alignnone wp-image-6202" src='https://sp-ao.shortpixel.ai/client/q_lqip,ret_wait/https://www.lipimagazine.com/lipicontent/uploads/2021/06/-জাকারিয়া-e1624635468598-286x300.jpg' data-src="https://www.lipimagazine.com/lipicontent/uploads/2021/07/Verification-Badge-4.svg" alt="" width="17" height="17" />

রবীন জাকারিয়া

রংপুর, বাংলাদেশ | View Profile

ডাক পিয়ন আনবে চিঠি

ডাক পিয়ন আর আসে নাতো
চিঠি নিয়ে বাড়ি
চিঠির খবর শুনতে পেলে
জমতো লোকের সারি
কে দিয়েছে, কী লিখেছে
পড়না তাড়াতাড়ি৷
কে পড়বে, কে শুনবে
চলতো কাড়াকাড়ি৷
টাকা চাওয়া, বিয়ের চিঠি
থাকতো ভরা খামে৷
প্রেমের চিঠি হাতে পেলে
ভরতো শরীর ঘামে৷
সেদিনগুলো পেড়িয়ে যাবার
হলো বছর কুড়ি
চিঠি এখন কেউ লেখেনা
কিশোর-যুবা-বুড়ি৷
ফেসবুকেতে চলছে কথা
দিবানিশি জুড়ে৷
চিঠি আসার ডাকটা তাই
কানে বাজে সুরে৷

শ্যামাপ্রসাদ সরকার <img class="alignnone wp-image-6202" src='https://sp-ao.shortpixel.ai/client/q_lqip,ret_wait/https://www.lipimagazine.com/lipicontent/uploads/2021/06/শ্যামাপ্রসাদের-224x300.jpg' data-src="https://www.lipimagazine.com/lipicontent/uploads/2021/07/Verification-Badge-4.svg" alt="" width="17" height="17" />

শ্যামাপ্রসাদ সরকার

কলকাতা

কোরক

‘শিশুনিকেতন’ চালাতে যে মোটা রকম একটা খরচ আছে সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। একটা সরকারী গ্রান্টের জন্য আবেদন করা হলেও কবে যে সে টাকা আদৌ আসবে তা বলা কঠিন। বন্দনা মিত্র মানুষটি একটু অন্যরকম, ঠিক আর পাঁচজনের মত অ্যাভারেজ চিন্তাধারার নন বলেই সব প্রতিকূলতা বাঁচিয়ে এই শিশুনিকেতন’টিকে রক্ষা করে আসছিলেন।

ওঁর স্বামী উইং কমান্ডার সুকোমল মিত্র ছিলেন এয়ারফোর্সের সম্ভাবনাময় পাইলট। সুন্দর,ঝকঝকে,সুপুরুষ আর উদারমনস্ক।
উত্তর কোলকাতার যৌথপরিবারে বড় হওয়া বন্দনা বিয়ের পর দিল্লীতে গিয়ে সংসার পাতেন সেই সত্তরের দশকের গোড়ায়।

সারা কলকাতাটা তখন যেন জ্বলছে। হীরের টুকরো ছেলেগুলো শ্রেণীহীন সমাজের স্বপ্নে মশগুল। যৌবনের সারিবদ্ধ মৃতদেহের স্তুপ তখন ক্রমশ মিশে যাচ্ছে বন্দুকের নল উৎসারিত বারুদের ধোঁয়ায়। দমদম, কাশীপুর, টালা, মতিঝিল তখন দিনদুপুরেও লোকে যেতে দু’বার ভাবত। ফরোয়ার্ড ব্লকের হেমন্ত বসুর মত পিতৃপ্রতীম নেতাও দিনদুপুরে প্রকাশ্যে হঠাৎ খুন হয়ে গেলেন।

ঠিক সেই সময়ে দিল্লীর লোদী কমপ্লেক্সের উচ্চবিত্ত ফ্ল্যাটে স্বপ্নের উড়ানটা বন্দনার অবশ্য ভালোই শুরু হয়েছিল।

কিন্তু ওসব সুখ অবশ‍্য বেশীদিন স্থায়ী হয়নি। ভারতের হয়ে মিসেস গান্ধী যে বাহিনীকে পূর্ব পাকিস্তানের রণাঙ্গনে পাঠিয়েছিলেন সেই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে গিয়ে সুকোমল আর ফেরেননি।

তেরঙায় মোড়া সুকোমলের ট্রাঙ্ক আর কিঞ্চিৎ ঝলসে যাওয়া টুপিটা শুধু ফেরৎ পেয়েছিলেন। শক্ত হয়ে সেসব বুকে নিয়েই ২৬শে জানুয়ারী মরণোত্তর পরমবীর চক্রটিও একাই আনতে গেছিলেন।

শত উপরোধেও বাপের বাড়ীতে আর তিনি ফেরেননি। ফ্যামিলি পেনশন আর কোল ইন্ডিয়ার কম্প্যাসনেট গ্রাউন্ডে পাওয়া ক্লার্কের চাকরিতে তিরিশ বছর ধরে তিনি একাই জীবনটিকে নিয়ে এগোতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়ে ছিলেন। বছরে দু একবার কলকাতা আসতেন ছুটিছাটায় তাও যতদিন বাবা মা ছিলেন ততোদিন। রিটায়ার করার পর সোজা একেবারে ‘শিশুনিকেতন’এই এসে ওঠেন।

সুখচরে বন্দনার বাবার বিঘে পাঁচেক জমি ছিল। আটের দশকের মাঝামাঝি সম্পত্তি ভাগাভাগি হলে ওই জমিটুকু নিজের জন্য ভাই দের কাছ থেকে চেয়ে নেন। পরিবর্তে বসতবাড়ীর দাবিটুকু ছেড়ে দেন সানন্দে। সেই থেকে সুখচরে একটু একটু করে ‘শিশু নিকেতন’ কে গড়ে তুলেছেন। এখন রিটায়ার করার পর তো আর কোনই পিছুটান নেই।

‘শিশু নিকেতন’ শুধু মাতৃপরিত্যক্ত অনাথ শিশুদের আশ্রমই শুধু নয় সঙ্গে কো- অপারেটিভ করে দুঃস্থ মেয়েদের লোন দিয়ে বৃত্তিমূলক কাজ শিখিয়ে নিজের পা’য় দাঁড়াতেও সাহায্য করে। একটি বা দুটি শিশু নয়, আজ যেন অজস্র শিশুর মধ্যে মাতৃত্বের আনন্দটা খুঁজে পান। এই পুরো ব্যাপারটায় অবশ্য আর একজনের সাহায্য ছাড়া সম্ভবই হত না; সে হল অপরেশ ! অপরেশ মিত্র, সুকোমলের পরের ভাই।

বন্দনা আর অপরেশ একসাথে ইউনিভার্সিটিতে এম এ ক্লাসে পড়তেন। সে সময়ে হাল্কা মুগ্ধতার দৃষ্টিটুকু ছাড়া আর কিছুই কখনো বিনিময় হয়নি সেভাবে। বিয়ের দিনই হঠাৎ আবিষ্কার করলেন যে সেই তার একমাত্র দেওর। বন্দনা কিন্তু দেওর আর বৌদির নির্মল সম্পর্কটাকে অহেতুক পূর্বপরিচিতির চাপে কখনো নষ্ট হতে দেননি।

সুকোমলের মৃত্যুর পরে ওবাড়ির বোধহয় একমাত্র অপরেশই রিটায়ারমেন্ট অবধি আজও যোগাযোগ রেখেছে। অপরেশ বিয়ে করেনি। অতিবাম রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছিল যুগের হাওয়ায় সেই সময়। পরে অবশ্য মোহভঙ্গ হয়ে সুন্দরবনের দিকে একটা সরকারী ইস্কুলে চাকরি নিয়ে সেখানেই সারাটা জীবন থেকে যায়। বছরে অন্ততঃ একবার দিল্লী এলে দেখা করে যেত সবসময়। কাজের ছুতো নিয়ে দিল্লী এলেও বন্দনা জানতেন যে তার জন্যই ছুতোটুকু কষ্ট করে সে তৈরী করে। অমলিন বন্ধুত্বটুকুর সীমা লঙ্ঘন করেনি বলেই জীবন সায়াহ্নে এসে অপরেশকে ‘শিশুনিকেতনে’র দায়িত্বে যোগ করতে সংশয় হয়নি বন্দনার।

গতসপ্তাহে গুজরাত থেকে একটি দম্পতি আবেদন করেছে এখান থেকে একটি বছর তিনেকের শিশুকে দত্তক নেবার ইচ্ছা প্রকাশ করে। সবে একবছর হল সরকারি নিয়ম মেনে শিশু দত্তক দিচ্ছে ‘শিশু নিকেতন’। কোনও টাকাপয়সা দাবী করা হয়না শুধু দত্তক নেওয়া শিশুটির সঙ্গে আশ্রমের আরো একটি যে কোন শিশুর একবছরের ভরণপোষণ ও পড়াশোনার খরচটি অনুদান হিসেবে নেওয়া হয়।সরকারী গ্রান্ট এসে গেলে বন্দনা সেটিও বন্ধ করে দেবেন বলেই স্থির করেছেন। দত্তকের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সব তৈরী হয়ে গেছে। সামনের সোমবার দম্পতিটির আসার কথা। বন্দনা বলে দিয়েছেন এইবারের সব কিছু অপরেশের হাত দিয়েই হবে।

উনি ওদিনটায় ছুটি নেবেন ব্যক্তিগত কারণের জন্য। একথা শুনে অপরেশ ভাবেন সোমবার সতের তারিখ; দাদার মৃত্যুদিন বলেই কি বন্দনা নিজেকে আত্মমগ্ন নিভৃতিতে রেখে স্মৃতিমন্থন করতে বসবেন? যুক্তি দিয়ে যদিও এসবের ব্যাখ্যা হয়না। তবুও অপরেশের না বলার উপায় নেই।

বেলা এগারোটার মধ্যে কাগজপত্রের কাজ সব মিটে গেলে ওরা শিশুটিকে নিয়ে চলে গেল। সাড়ে তিনবছরের ছোট্ট ‘দয়িতা’র নাম দিয়েছিলেন বন্দনাই। ওরা চলে যাবার পর দুপুরের দিকে দোতলা থেকে নেমে একসময় অফিসঘরে আসলেন বন্দনা।

খুব নির্ভার লাগছে নিজেকে এবার। তিন বছর আগেকার একটি স্মৃতি মনে পড়ে গেল। এক ধনী গুজরাতি পরিবারের মেয়ে অস্মিতা তার প্রেমিকের সাথে সহবাসে প্রেগনেন্ট হয়ে পড়ে। প্রেমিকটি স্বাভাবিক নিয়মেই এ্যাবরশনের পক্ষেই জোর করে। মেয়েটির অটল জেদের সামনে শেষে রণে ভঙ্গ দিয়ে ব্রেকা-আপের পথই বেছে নেয়। কিন্তু মেয়েটি অত্যন্ত সাহসের সাথে, তীব্র জেদের সঙ্গে সেই বাচ্চাটিকে জন্ম দেয় একটা ছোট অখ্যাত নার্সিংহোমে, বাড়ির লোকের একরকম অমতেই। মেয়েটি তার বাড়িতে পরিচারিকার কাজ করা বউটির মাধ্যমে তাদের ‘শিশুনিকেতন’এর খোঁজ পায় আর তার পাঁচদিনের সদ্যোজাত কন্যাসন্তানটিকে নিয়ে এক সন্ধ্যায় এসে হাজির হয় আর বন্দনার জিম্মায় রেখে দেওয়ার একান্ত অনুরোধ জানায়। বন্দনার নিজের অনিচ্ছাসত্ত্বেও মেয়েটিকে সেদিন না বলে ফেরাতে পারেননি। তার নিষ্পাপ দৃষ্টিতে ছিল দৃঢ়তার অশনি সংকেত। সেই থেকে ছোট্ট ‘দয়িতা’ আর পাঁচটি বাচ্চার সাথে ‘শিশু নিকেতনে’ বড় হতে থাকে সময়ের সাথে সাথে।

তারপর এই সাড়ে তিনবছরে সেই মেয়ে নিজের কেরিয়ার গড়ে সমাজে শুধু নিজেকে প্রতিষ্ঠিতই করেছে তাই নয়, গুজরাতের নামী রত্নব্যবসায়ী পরিবার মানসুখানি বাড়ির বড়লোক গৃহবধূ হয়েও নিঃসন্তান থেকে গেছে ইচ্ছা করে।

বন্দনাকে সে নিজে মাসখানেক আগে তার জীবনের সবকথা চিঠিতে লিখে জানায় আর বলে সে তার নিজের কুমারী জীবনের সেই সন্তানটিকেই দত্তক নিতে চায়, বন্দনা যেন তার যথাযথ ব্যবস্থা করেন সব গোপনীয়তা বজায় রেখেই।

তার জীবনের প্রথম কোরকটিকে আশ্রয় দিতে একদিন সে সত্যিই অপারগ ছিল, কিন্তু আজ সে সমাজে প্রতিষ্ঠিতা। সেইজন্য সেই আত্মজাটিকেই প্রথমে বুকে তুলে নেবার জন্য সে ইচ্ছে করেই এখনো দ্বিতীয়বার মা হয়নি।
যৌবনের প্রথম অর্ঘ্যটিকে তার যথার্থ স্বীকৃতি দিয়েই সে তারপর আবার নতুন করে দ্বিতীয়বার মাতৃত্বের স্বাদ পেতে ইচ্ছুক।

বন্দনা সে চিঠি পড়ে অবাক হয়ে খানিক্ষণ চুপ করে বসে থাকেন। কি যে ঠিক করণীয়, তা ভাবতে ভাবতে ভিতরে ভিতরে অধৈর্য্য লাগে যেন। অবশেষে একজন মা’এর মনটাই জিতে যায় এই দু’জন অসমবয়সী নারী’র প্রার্থনা আর মঞ্জুর হওয়া সিদ্ধান্তের আবেশটিতে।

আজ যেন সেই বৃত্তটি সম্পূর্ণ হল অবশেষে।সুকোমলের মৃত্যুদিনটি এতদিন শুধুই এক প্রহর শেষের স্মৃতি হয়েই আচ্ছন্ন ছিল, আজ থেকে তা যেন সূচনার আলোয় ঐশ্বর্যবানও হয়ে উঠল নতুন করেই।

সৌমেন দেবনাথ <img class="alignnone wp-image-6202" src='https://sp-ao.shortpixel.ai/client/q_lqip,ret_wait/https://www.lipimagazine.com/lipicontent/uploads/2021/07/Somen-Debnath-300x287.jpg' data-src="https://www.lipimagazine.com/lipicontent/uploads/2021/07/Verification-Badge-4.svg" alt="" width="17" height="17" />

সৌমেন দেবনাথ

বাংলাদেশ

ভম্বল দাসের চিন্তা

ভম্বল দাস ডাক্তারের কাছে গেলো। ডাক্তারকে বললো, স্যার, আমার পালিত মুরগিগুলো ডিম পাড়ে। কিন্তু ডিম খুব ছোট দেয়। কি করলে মুরগির ডিম বড় হবে?
ডাক্তার একটু গোঁফে হাসলেন, তারপর বললেন, আপনার এলাকায় কি ঝোঁপঝাড় কিংবা জঙ্গল বেশি?
ভম্বল দাস বললো, হ্যাঁ, তা তো আছে। বাড়ির সামনে একটি হলুদের ক্ষেত ও কিছু ঝোঁপঝাড় আছে।
ডাক্তার বুঝতে পারলেন বিষয়টি, তখন বললেন, শিয়াল, খাটাশ, বেজির উপদ্রব আছে, তাই না?
ভম্বল দাস হ্যাঁ-সূচক মাথা ঝাঁকালো। ডাক্তার বললেন, শিয়াল, খাটাশ, বেজির ভয়ে আপনার মুরগির পর্যুদস্তু অবস্থা। তাই ডিম ছোট হচ্ছে। শিয়াল, খাটাশ, বেজির উপদ্রব যদি কমে তবে আপনার মুরগির ভয় দূর হবে, ডিম দেবে বড়। মানুষের ক্ষেত্রেও তাই। গর্ভবতী মা যদি মানসিক সমস্যায় ভোগেন, মাথায় দুশ্চিন্তা থাকে, শব্দ দূষণ আশপাশে থাকে কিংবা স্বামী-সংসার দ্বারা নির্যাতিত হন তবে সে মায়ের বাচ্চা আন্ডারওয়েট হতে পারে।
ভম্বল দাস সব বুঝতে পারলো। বাড়ি এসে মুরগির ঘর খুলে তাদের সাথে কথা বললো, তোদের এত ভয় তা আমাকে আগে বলিসনি কেন? শিয়াল, খাটাশ, বেজির ভয়ে ছোট ছোট ডিম দিচ্ছিস?
এক মুরগি বললো, শিয়াল, বেজির ভয়ে খুশি মতো বেড়াতে পারি না।
আর এক মুরগি বললো, ঘর থেকে পা ফেললে ঘরে ফেরার অনিশ্চয়তা।
এক মুরগি মা বললো, বাচ্চাগুলোকে বাগান ঘেঁটে কিছু পতঙ্গ খাওয়াতে পারি না। আমার বাচ্চাগুলো এ জন্য অসুস্থ হয়ে পড়ছে।
এক মুরগি ছানা বললো, ডানা না থাকলে সেদিন বেজির খাদ্য হতাম আমি। আমার সেদিন থেকে খাওয়া দাওয়া নেই।
এক অসুস্থ মুরগি বললো, আমার শরীরে এক বেজির দাঁতের আঁচড়ের দাগ, ওহ কি ব্যথা!
আর এক মুরগি মা বললো, আমার চার চারটা বাচ্চা খেয়েছে বেজি।
এক মোরগ বললো, রাতে ঐ বাগানে খাটাশ ডাকে। ভয়ে আমি আর সকালে বাক দেই না।
এক চঞ্চল মুরগি বললো, তাই ঐ বাগানে মোরগের সাথে আমি ঘুরতে যাচ্ছি না।
একটি হাঁস বললো, রাতে খাটাশ এসে দরজায় বসে। কবে দরজা খুলে আমাদের টুটি যে টেপে!
এক ডিম পাড়া মুরগি বললো, ভয়ে মুখে জল থাকে না। আমি বুঝতে পারছি না কেনো ডিম ছোট হচ্ছে, আমার মা বললো, আমি বড় বড় ডিম দিতাম, তোদের যে কি হলো!
ভম্বল দাস সবাইকে থামালো। বললো, চুপ, সব চুপ। তোদের মনে এতো প্রশ্ন, এতো ক্ষোভ আমি কি জানতাম? তোরা যাতে নির্বিঘ্নে চলতে পারিস, উড়তে পারিস, তার ব্যবস্থা করছি। তোরা নিশ্চিন্তে থাক।
পরদিন কয়েকজন শ্রমিককে নিয়ে জঙ্গল পরিষ্কার করে ফেললো ভম্বল দাস। জঙ্গল অভাবে শিয়াল, খাটাশ, বেজি পালালো। বেশ ক দিন অবস্থা ভাল থাকলো।
একদিন বৃষ্টি ভেজা দুপুরে শিয়াল ছাগলের দড়ি ধরে টানাটানি শুরু করে দিয়েছে। ছাগল ওর সাথে যাবে না। শিয়াল তা বুঝতে চাচ্ছে না। ভম্বল দাস এলে শিয়াল পালালো। ছাগল বললে, প্রায়ই শিয়াল এসে আমার সাথে ভাব নেয়। ওর সাথে যেতে বলে। আমার এক সখি ওর সাথে গিয়েছিলো। আর ফিরে আসেনি। তাই আমি ওর কথায় রাজি হয়নি। আজ নিয়ে যাওয়ার জন্য টানা হেঁচকা করছিলো।
ভম্বল দাস মহাচিন্তায় পড়লো। ছাগলটাকে পতিত মাঠে বেঁধে দিয়েও কোন নিশ্চয়তা নেই। তাই বাড়ি নিয়ে এলো।
ভম্বল দাস কুকুর সর্দারের কাছে গেলো। কুকুর সর্দার ভম্বল দাসকে বসতে দিলেন। ভম্বল দাস বললো, আপনার সহয়তা আমার খুব দরকার।
কুকুর সর্দার হো হো করে হেসে নিয়ে বললেন, আমার সহয়তা তো সবাই-ই নেয়। তা বল, কিভাবে সহয়তা করতে পারি?
ভম্বল দাস বললো, আমার কিছু হাঁস, মুরগি, ছাগল আছে। এলাকায় শিয়াল, খাটাশ, বেজির উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় মহাসমস্যায় পড়েছি। আপনার তো বিশাল কুকুরবহর আছে। আমার হাঁস, মুরগি আর ছাগলগুলোকে পাহারা দেওয়ার জন্য কিছু কুকুর দিতে হবে।
কুকুর সর্দার ভম্বল দাসকে আশ্বস্ত করলেন। ভম্বল দাস নির্বিঘ্নে বাড়ি এলো। হাঁস মুরগি আর ছাগল এতো দিনে নিশ্চিন্ত হলো। ছাগল জাগর কাটতে লাগলো। তার ছোট ছোট বাচ্চাগুলো দৌঁড়াদৌঁড়ি করছে। মুরগি আর মোরগগুলো গোল হয়ে বিশ্রাম নেচ্ছে। উঠতি বয়সী মোরগটি আর মুরগি আলাদা স্থানে বসেছে। তারা গল্প করছে। মোরগটি বললো, ছোট খাটো তুমি, সুন্দর পালক আমাকে মুগ্ধ করেছে।
মুরগিটি বললো, তোমার গলার নিচে কি সুন্দর লতা, মাথায় কি আকর্ষণীয় লতা, লেজটি কি সুন্দর! আমি পাগল হয়ে যাই। তাই তুমি খেতে খেতে কুটকুট করে ডাকলে আমি ছুটে চলে আসি।
মোরগটি বললো, আমার খুব হাসি পায়, জানো, মুরগিদের চেয়ে মোরগগুলো সুন্দর, গাভির চেয়ে এঁড়ে গরু সুন্দর, মেয়ে ছাগলের চেয়ে খাসি সুন্দর, সিংহীর চেয়ে সিংহ সুন্দর। অর্থাৎ সবক্ষেত্রে পুরুষরাই সুন্দর। কেবল মানুষের ক্ষেত্রে ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা সুন্দর।
মুরগিটি বললো, ঠিকই, ভম্বল দাসের চেয়ে তার বৌটি কি দারুন!
পাঁচ সাতটি কুকুরের পদচারণা এলাকাতে বেড়ে গেলো। ভয়ে শিয়াল, খাটাশ, বেজি গভীর বনে চলে গেলো। শিয়াল একটু জল খেয়ে বললো, খাওয়া দাওয়া কমে গেলো। মাংসাশী প্রাণী আমরা, মাংস না খেলে ভালো লাগে?
বেজি বললো, চুপটি মেরে বসে থাকতাম। মুরগি ছানা পেলে নিয়েই দৌঁড় দিতাম। বৌ আর আমি মিলে মিশে খেতাম। আহ, সব দুঃস্বপ্ন!
খাটাশ বললো, তোমরা তো দিনে খেতে পেতে। দিনে তো আমি গর্তে থাকতাম। সেই গর্তও ভম্বল দাস বন্ধ করে দিয়েছে। রাতে একটু বের হতাম। কুকুর পাহারা দিচ্ছে। আমাকে দেখলেই ডাক জুড়ে দেয়। মানুষগুলো তখন বের হয়ে আসে। পালাই আমি। পিছন পিছন দৌঁড়ায় কুকুরগুলো। কবে যে ধরায় পড়ি বুঝতে পারছি না। আচ্ছা, আমরা কি খেটে খাওয়া প্রাণী? অন্যের পোষা প্রাণী খেলে কুকুরের এতো দোষ কেন? কত দিন না খেয়ে থাকা যায়?
বেজি বললো, আমার বাচ্চাগুলোর নাজেহাল অবস্থা। আমাকে দেখলেই কেউমেউ করে। ক্ষুধার জ্বালায় ওরা শেষ। এখন কি আর সেই দিন আছে? আহা, কত খেয়েছি মুরগি ছানা! ভূড়ি হয়ে গিয়েছিলো। তেল তেল করতো শরীর। আমার স্বামী বলতো, দিন গেলেই তোমার শরীরের বাড় বাড়ছে, আর এখন থুত্থুরে বুড়ি।
শিয়াল বললো, আমার বুদ্ধিতে কাজ হচ্ছে না। মিষ্টি মিষ্টি কথা বলেও ছাগলটাকে আনতে পারলাম না। এখন ভম্বল দাসের নজরদারি। আবার কুকুরের বাড়াবাড়ি। আমাদের যেন দুর্ভিক্ষ এলো। বাঁচবো না আর। কি দিন যে এলো।
কুকুরগুলো মুরগিগুলোর সাথে ভাব নেয়। মোরগ এলে কুকুরগুলো কথা পরিবর্তন করে ফেলে। আজ মোরগ ছিলো না। তাই একটি কুকুর বললো, আমরা তোদের পাহারা দিচ্ছি বলে আর শিয়াল, খাটাশ, বেজি তোদের খাচ্ছে না। আমাদের কোন দিন ধন্যবাদও দিলি না।
একটি মুরগি বললো, সরি, দেরিতে হলেও ধন্যবাদ গ্রহণ করেন।
কুকুরগুলো খুশি হলো, বললো, আমরা জেনেছি তোরা ডিম পাড়িস, লাল ডিম, সাদা ডিম। শুনেছি, খেতে নাকি খুব সুস্বাদু।
একটি মুরগি বললো, হ্যাঁ, সুস্বাদু। ভম্বল দাস বিক্রি করে টাকা রোজগার করে।
এক কুকুর বললো, আমরা তোদের পাহারা দিই, দুটো একটা ডিম দিলে তো পারিস, খেতাম, দেখতাম কেমন স্বাদ।
অন্য মুরগি বললো, ভম্বল দাস যদি রাগ করে?
কুকুর বললো, মাঝে মধ্যে দুটো একটা ডিম না পেলে ভম্বল দাস কিছু মনে করবে না।
অন্য এক মুরগি বললো, আপনারা আমাদের জীবনের রক্ষাকারী, আমরা মাঝে মধ্যে ডিম আপনাদের দেবো।
ছায়াযুক্ত স্থানে দুটো কুকুর বসে জিরাচ্ছিলো। আর সুখ-দুঃখের গল্প করছিলো। এক কুকুর বললো, সর্দারের নজরদারি বেড়ে যাচ্ছে। পাহারাই দিচ্ছি। উপরি পাওনাটা আর হচ্ছে না। আহা, আগে পাহারা দিলে ভাতের মাড় খেতে দিতো ভূ-স্বামী। কত যে হাড়-গোড় খেয়েছি নয়ামিয়ার দরজায় বসে।
অন্য কুকুরটি বললো, কষ্টই করি আমরা। ফল পাই না। যা পাই তাতে কি পেট চলে? এভাবে বেঁচে থাকার নামই কি জীবন? আমাদের শখ আহ্লাদ পূরণ হবে না?
হঠাৎ ওরা শিয়ালকে দেখতে পেলো। ওমনি ওরা শিয়ালকে তাড়ালো। শিয়াল আজ দৌঁড়ে বাগানের মধ্যে ঢুকে গেলো না। সাহস করে দাঁড়িয়ে থাকলো। কুকুর দুটো এলো। এক কুকুর বললো, এই দৌঁড়া, পালা, দাঁড়ালি কেন? পালা বলছি, নতুবা সর্দারের হাতে তুলে দেবো কিন্তু।
শিয়াল বললো, পনের দিন না খাওয়া ভাই। দৌঁড়াতে পারছি না।
অন্য কুকুর বললো, অন্যের গড়া জিনিসে মুখ দিস কেন? লজ্জা করে না?
শিয়াল বললো, কাজ কর্মে মন বসে না। সারা জীবন চুরি করে খাওয়া অভ্যাস বদলাতে পারছি না। এভাবে সূক্ষ্ম ভাবে পাহারা দিলে বাঁচবো না তো। ভাতের মাড় আর হাড় গোড়ই তো খেয়েছেন। মাংস খেয়েছেন? খেলে বুঝতেন স্বাদ কি? শক্তি বাড়বে। দৌঁড়ায়ে প্রথম হতে পারবেন। কোন দিন দৌঁড়ায়ে শিয়াল ধরতে পেরেছেন?
এক কুকুর কান খাড়া করে বললো, কি বলতে চাস?
শিয়াল বললো, দেখেও না দেখার ভান করবেন। আমি ছাগল শিকার করবো। হাড় দেবো, মাংস দেবো। সব উপরি পাওনা আর কি! ঘুমাবেন, শরীর ভাল থাকবে।
অন্য কুকুর বললো, খাওয়া দাওয়ার অভাবে আমরা শীর্ণ হয়ে যাচ্ছি। আর তোদের কি সুন্দর স্বাস্থ্য।
দ্বিতীয় কুকুরটি বললো, সর্দার যেন জানতে না পারে। আমরা দেখেও না দেখার ভান করবো। তোরা আবার অন্যের পোষা প্রাণী ধর, মার, খা।

শিয়াল লেজ নাচাতে নাচাতে বেজি আর খাটাশের কাছে এলো, বেজি শিয়ালের লেজ নাচানো দেখে বললো, লেজ মনে হয় তোমার একারই আছে!
কথাটি বলে বেজিও একটু লেজ নাচালো। খাটাশ বললো, শিয়ালকে যে খুব খুশি লাগছে!
শিয়াল বললো, কুকুরদের সাথে আঁতাত করে এলাম। এবার ভম্বল দাসের হাঁস, মুরগি, ছাগল খেলে কুকুররা আর আমাদের তাড়াবে না। বিনিময়ে ওদেরও কিছু দিতে হবে।
বেজি বললো, সত্যি বলছো? পারো মামা, শিয়াল মামা তুমি সব পারো।
সেদিনের পর থেকে আবারও শিয়াল, খাটাশ, বেজির উপদ্রব বেড়ে গেলো। ভম্বল দাস এলে কুকুরগুলো শিয়াল, খাটাশ, বেজিকে একটু দূরে তাড়িয়ে দেয়। ভম্বল দাস চলে গেলে কুকুরের সাথে শিয়াল, খাটাশ, বেজি এসে গল্প করে। এক কুকুর তো একদিন শিয়ালের গুহাতে গিয়ে থেকে এলো। বেজিও তার সুখ-দুঃখের গল্প করলো অন্য একটি কুকুরের সাথে।
ভম্বল দাস ভ্রূ কুঁচকায়, মাথা চুলকায়। শিয়াল, খাটাশ, বেজি আর কিছু কুকুরের পেট ভরে। ভম্বল দাসের যা কিছু অবশিষ্ট মুরগি থাকলো তারা আবার ডিম ছোট দিতে শুরু করলো। ভম্বল দাস আজো বুঝতে পারছে না পাহারাদার থাকতে তার মুরগিগুলো ছোট ছোট ডিম কেনো দিচ্ছে!

বদরুদ্দোজা শেখু <img class="alignnone wp-image-6202" src='https://sp-ao.shortpixel.ai/client/q_lqip,ret_wait/https://www.lipimagazine.com/lipicontent/uploads/2021/06/বদরুদ্দোজা-শেখু-258x300.jpg' data-src="https://www.lipimagazine.com/lipicontent/uploads/2021/07/Verification-Badge-4.svg" alt="" width="17" height="17" />

বদরুদ্দোজা শেখু

বহরমপুর, মুর্শিদাবাদ

হয়তো হবে না

আমি নিজেই নিজেকে কেমন-যেন ঠিক বুঝে উঠতে পারিনা এখনো।

আমার হৃদয়ে একটা দেবতা আছে
যে সামান্য সাহায্যের অর্ঘ্য চেয়ে আমার কাছে
ব্যর্থ হয়েছে কতোদিন, আমার মনের মধ্যে আছে একটা অতীন্দ্রিয় মন্দির
যার বাইরে স্বার্থপর প্রবৃত্তিগুলো ইতস্ততঃ ভিড়
ক’রে থাকে কিন্তু ঢুকতে পারে না, নীলিমার মতো
একটা বিস্তীর্ণ দেশ উদ্ভাসিত আমার আড়ালে, এবং অনবরত
গান গাইতে চায় আমার আত্মার অভয়ারণ্যের একটা পাখি;
কিছুই দেখি না , অথচ দোহাই দিয়ে যাই সমাজ-কালের অবক্ষয়ের ফাঁকির।
তবু একবার অন্ততঃ নিজেই অন্তরের প্রতিধ্বনি কান পেতে শোনো।

আমি চাই রাস্তার উদ্বাস্তু মানুষগুলোর জন্য
একটা বিশাল রাজপ্রাসাদ বানাতে, মতিচ্ছন্ন
আদর্শের কাঁধটা ঝাঁকিয়ে একনিষ্ঠ বিশ্বাসের ঋজু রাস্তায় দাঁড়াতে, ইচ্ছে হয় —
জীবিকার ধূসর প্রান্তর থেকে মুছে দিই দুর্ভিক্ষের কালো বিপর্যয়,
আমার মনের মৃত্যুমুখি ময়ূরকে প্রাণ খুলে গাইতে দিই গান
বিবেকের বিধ্বস্ত অরণ্যে, ভেঙে ফেলি দাসত্ত্বের পিঞ্জর পাষাণ।

—সে আর হবে না হয়তো জীবদ্দশায়,
কেননা দেখছি —
স্বদেশে বিদেশে স্কন্ধদেশে খড়্গ তোলে প্রতিহিংসা-পরায়ণ কাব্যের কসাই।।

স্বাধীনতা

ইসমোতারা খাতুন

স্বাধীনতা তুমি গুটি গুটি পায়,
এসেছ আমাদের দোরগোড়ায়।
কি দিয়ে সাজাবো তোমায়,
বরণ করিব কিসে –
মোদের জীবন আঙিনায়,
মুক্তির বাতাসে।
তুমি এসেছ আজ
দেশো- প্রাঙ্গণে,
মনের মাঝে
ধরণীর গগনে।
এসেছো যখন –
যেও নাকো আর
আমাদের একা ফেলে,
জীবন প্রদীপ জ্বালতে শিখিও
তোমারি মতো জ্বলে।
ছোট-বড় সকলেই মোদের
বঞ্চিত করিও না পাছে,
দিও আশিষ
তোমার ঝুলিতে যা আছে।
করো মঙ্গোল, করো স্ব-অধীন
করো স্বাবলম্বী মোদের ,
এই আমাদের সশ্রদ্ধ প্রার্থনা
তোমার ও সাথীদের।

Share This

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on telegram
Share on email
0 0 votes
Writing Rating

Related Articles

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments