Saturday Lipi, Bangla, May 5th Week, Lipi Magazine

Saturday Lipi | Bangla | May, 5th Week

লেখক

লিপি

আমার সাধ না মিটিল

শ্যামাপ্রসাদ সরকার

১৭ নম্বর বটকৃষ্ণ পাল এ্যাভিনিউর হলদে ছোপধরা বাড়িটার বেশ বয়স হয়েছে। তিনপুরুষের মুখোপাধ্যায়দের বসত ভিটে। অষ্টাদশ শতকের গোড়ায় নিমকমহলের দেওয়ানী করতেন রামকমল মুখুজ্যে। তারপর সাহেবদের ক্লিয়ারিং এন্ড ফরোয়ার্ডিং এজেন্ট হয়ে বেশ অর্থ সম্পদের অধিকারী হয়ে এই ভদ্রাসনটির পত্তন করেন। তারপরের পুরুষ তারাচাঁদ মুখুজ্যে বেঙ্গল থিয়েটারে টাকা ঢেলে ফতুর হয়ে যান প্রায়। সেই থেকে প্রথম এ বাড়িতে গান বাজনা ঢোকে। তারাচাঁদের রক্ষিতা ছিলেন মানময়ী দাসী। সেসময়ের নাম করা এ্যাকট্রেস। কুসুমকুমারীর সাথে টক্কর দিতেন। তাঁর কীর্তনাঙ্গের গানে ছিল ঈশ্বরপ্রদত্ত প্রতিভা। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর ওঁকেই বিবাহ করেন স্কটিশ চার্চ কলেজের প্রাক্তনী তারাচাঁদ আর এই পৈতৃক ভদ্রাসনে স্থান দেন। সে নিয়ে বিস্তর কেচ্ছা কাহিনী এই বাড়ির শিকড় বাকড়ে এখনো কান পাতলে শুনতে পাওয়া যায়। তারাচাঁদের পর নামকরা উকিল যুগলকিশোর মুখুজ্যে আর সেই শাখায় দুটি সন্তান মৃত্যুঞ্জয় আর প্রাণকৃষ্ণ। আজ এঁরা দুজনেই প্রতিষ্ঠিত গায়ক। আসর, রেডিও, জলসা সবেতে মৃত্যুঞ্জয়েরই ডাক আসে বেশী। আজকাল তো ফিল্মেও গাইছেন। আধুনিক গানের তাঁর বেসিক রেকর্ডগুলোর ভালোই বিক্রি এছাড়া টপ্পা আর ভক্তিগীতিও তাঁর কন্ঠে বেশ জনপ্রিয়। প্রাণকৃষ্ণ অবশ্য আরো উচ্চমানের গায়ক হতে পারতেন। গলাও তাঁর বেশী ভাল, একটু চিকন -মিহি, চড়া পর্দার আরোহণেও স্বর স্বাভাবিক থাকে। ওস্তাদ আসাদ খাঁর কাছে খেয়ালেরও তালিম নিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি স্বভাবে কুন্ঠিত ভীরু স্বভাবের মানুষ। একটু নিভৃতচারণপ্রিয়। সেজন্য আজও জনপ্রিয়তা পেলেও অগ্রজের থেকে সামান্য পিছিয়ে আছেন ঠিকই; তবে একটি প্রকার ঐশ্বর্য তাঁরও আছে যা বোধহয় মানময়ী দাসীর উত্তরধারার ক্ষীণরক্তধারা বাহিত। শ্যামাসঙ্গীত আর কীর্তনে তিনি একচ্ছত্র সম্রাট। ভক্তিগীতির এই ধারাটিতে তিনি যে মৃতু্ঞ্জয়বাবুকে হারিয়ে দিয়েছেন এটা বাংলার মানুষও মানে।

রোববারের সকালবেলা লুচি বেগুনভাজা আর সুজির হালুয়া এ বাড়ির জলখাবারে বাঁধা। এখন এ পরিবারের কর্তা মৃত্যুঞ্জয় বাবু ই। ফর্সা রাশভারী চেহারা। চোখের সোনালী হাফ রিমের চশমাটা হাল ফ্যাশানের হলেও এ বাড়ির পুরুষরা এখনো ধূতি ফতুয়া ত্যাগ করেন নি। সত্তরের দশকে টেরিলিন বলে একধরণের কাপড় বোম্বাই ফিল্মের দেখাদেখি ছেলে ছোকরারা পড়লেও ওনার নিজের সাবেকী পোশাকই পছন্দ। লুচির টুকরোটা ছিঁড়ে মুখে পুরতে পুরতে বললেন, ‘ পানু কোথায় ! এখনো ওঠেনি বুঝি?’ স্ত্রী নীপময়ী বলেন ‘ না ! ঠাকুরপোদের ঘরের দরজা বন্ধ এখনো ! উঠবে এবার ! ‘ মৃত্যুঞ্জয় স্বগতোক্তি করেন, ‘পানু টা আর একটু সিরিয়াস হলে আরও নাম করতে পারত। ওর ভক্তিগীতি লোকে ভালবাসে বলে আমি তো আজকাল দু একটা ছাড়া গাওয়া ছেড়েই দিয়েছি ! কিসের ঘোরে যে ও সর্বদা থাকে ! মা গঙ্গাই জানেন !’

প্রাণকৃষ্ণ রেডিওর অফিস থেকে বেরিয়ে একটা ট্রাম দেখতে পেয়েই উঠে গেল। এখন কোথায় যাওয়া যায় ! এই ট্রামটা মনে হয় কালীঘাট ডিপো অবধি যাবে। পকেটে দুবারের আসাযাওয়ার পয়সা রুম্পা রেখে দিয়েছে ঠিক। নিজের ওসবের খেয়াল রাখার দায় নেই। বাকী সব কিছুতেই মাথার ওপর দাদা তো আছেনই। আজকের গানটা ভালো জমেনি। রজনীকান্তের ‘আমি সকল কাজের পাই যে সময়’ ওর নিজের খুবই প্রিয় গান । কিন্তু আজ যেন সুরে তালে জমল না। কেউ সেটা ধরতে পারেনি যদিও, কিন্তু ও নিজে জানে। রেডিওতে গান রেকর্ডিং থাকলে বীরেনদাও আসেন। চুপ করে গান শোনেন নস্যির কৌটো হাতে স্থির হয়ে। দু একবার বীরেনদার চোখে চিকচিকে জলও দেখেছে যেন। ট্রামটা কালীঘাট ব্রিজের কাছে আসতেই টুক করে নেমে যেতে হবে।

নাটমন্দির থেকে দুটো চক্কর দিয়ে ওপারের পথ ধরল প্রাণকৃষ্ণ। ওদিকে কেওড়াতলা। ওখানটায় যেতেই খুব মন টানে আজকাল। দুপুরবেলাটা একটু নির্জন থাকে একটা ঝুপসি বটতলা। ওখানে চুপ করে বসে থাকতে ইচ্ছা হয়। চিতার আগুনে ফট্ ফট্ শব্দ হয়। চামড়া পোড়া গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে থাকে। মনটা খুব হু হু করে ওঠে কেমন। চিতা কাঠ গুলো কি তবে ওকে ডাকে?

বিডনস্ট্রীটের নবরাগ সঙ্ঘের সেক্রেটারি মাখন বাবু আর তাঁর অনুচর কিঙ্কর এখন বৈঠকখানায় বসে। বিজয়া সম্মিলনীতে ওদের মৃত্যুঞ্জয় বাবুকে চাই। সম্প্রতি একটা বাংলা ছবি জুবিলি করেছে। তার সবচেয়ে হিট গানটা আবার ওনারই গাওয়া। এজন্য বেশ মোটা অঙ্কের টাকা অফার করতেও ওরা রাজী। বম্বে থেকে আরেক জন নামজাদা বাঙালি গায়ক উনিও উত্তর কোলকাতারই ছেলে তাঁকেও এবার আনছে নবরাগ সঙ্ঘ। কেবল আমহার্স্ট স্ট্রীটের একটি ক্লাবকে টেক্কা দিতে হবে এবার। ওরা হেমেনবাবুকে অলরেডি বুক করে রেখেছে। হেমেন মৃত্যুঞ্জয়ের বন্ধুস্থানীয়। দুজনেই দুজনার গুণগ্রাহী।

মৃত্যুঞ্জয় বাবু রাজী হলেন কেবল একটি শর্তে। একঘন্টার একটা স্লটে প্রাণকৃষ্ণও গাইবেন একক শ্যামাসঙ্গীত। তার জন্য আলাদা পয়সা দিতে হবেনা। উনি নিজে হাজার টাকা কমেই গেয়ে দেবেন, বাকীটা ভাই এর সাম্মানিক হিসাবে দিতে হবে।

এরমধ্যে পূজোয় আর একটা রেকর্ড বেরিয়েছে প্রাণকৃষ্ণর। ‘ মায়ের পায়ের জবা ‘ র বিক্রির রিপোর্ট মোটামুটি ভালই। চারটি গান দুটি পিঠ মিলিয়ে। এরমধ্যে
‘ আমার সাধ না মিটিল ‘- টাই বেশী হিট হয়েছে।
আজকাল আসরগুলোতে এই গানটা গাইতেই হচ্ছে। নবরাগ সঙ্ঘেও এই গানটারই দুবার এনকোর কল এল। শেষে
সবমিলিয়ে দুহাজার টাকা প্রাপ্তিযোগ। রুম্পার হাতে এসে টাকার খামটা তুলে দিয়ে একটু হাসিমুখে তাকাল ও। রুম্পার প্রতি অবহেলা করতে মন চায়না মোটেও, তবুও কি করে যেন সব গন্ডগোল হয়ে যায়!
দাদা বৌদিই পাত্রী পছন্দ করে এনে বিয়েটা দিয়েছিল। ধনিয়াখালীর কাছে শ্বশুরবাড়ি ওর। যদিও বিয়ের পর আর নিজে যায়নি দ্বিতীয় বার। তিন বছরে দুটি পুত্রের জনক হয়েছে প্রাণকৃষ্ণ। তারা আবার পিঠোপিঠিই জন্মেছে। দাদা বৌদির ওরা নয়নের মণি। ষোল বছর আগে দাদার বিয়ে হলেও এবাড়িতে সন্তান শুধু প্রাণকৃষ্ণেরই। রুম্পা একটু রুগ্ন স্বাস্থের।বউদি তাই রুম্পার ওপর সংসারের অহেতুক ভার চাপায় নি কখনো সহমর্মী হয়েই।

সন্ধ্যের পর প্রাণকৃষ্ণ আজ গায়ে ঘুষঘুষে জ্বর নিয়েই বাড়ি থেকে বের হলো। নিমতলা শ্মশানের গায়ে ভূতেশ্বরের মন্দিরের আশপাশটা গাঁজার ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন । পূজো শেষ, বেশ শিরশিরে একটা হাওয়া এদিকটায়। ও শ্মশানের ভিতরে গিয়ে বসলো। আজকাল যে কোন শ্মশানই ওকে খুব টানে। নিমতলার এদিকটায় মড়ার খাটগুলো একদিকে স্তুপ করা, ফুল, মালা, তোষকগুলোও ডাঁই করা। আজকে অবাক কান্ড এখন কোনও চিতা জ্বলছে না। কিছু পোড়া কাঠ ইতঃস্তত ভাবে তাকিয়ে আছে কালাকালের উদ্ধারিণী গঙ্গার দিকে। কয়েকটা তার মধ্যে ভাসছেও। এসবই ওকে হাতছানি দিয়ে ডাকে এক অতীন্দ্রিয় জগতে। কানে কানে অজস্র মৃত্যু যেন ফিসফিস করে কথা বলে যায়। তার মধ্যেই কখনো কখনো একটা জ্যোর্তিবলয়ের মধ্যে ত্রিনয়ন জ্বলজ্বল করে। ঘোর তামসী রূপ, কিন্তু না তাকিয়ে পারা যায় না কোনওমতেই। চারপাশের জগতটা তুচ্ছ হয়ে যায় তখন। এরই মধ্যে হঠাৎ হরিধ্বনি দিতে দিতে একটা মড়া এলো। একজন ডোম মদ খেয়ে টলছে। সেই টলতে টলতে চিতার সরঞ্জাম জোগাড় করতে গেল।
মৃতদেহটি একজন কমবয়েসী সধবা মহিলার। বড়জোড় পঁচিশ ছাব্বিশ হবে। চওড়া পাড়ের লাল শাড়ি আর একমাথা লাল টকটকে সিঁদূরে কি বীভৎস লাগছে। প্রাণকৃষ্ণ উঠে পড়তে চাইল। কিন্তু সেই মৃতা নারীর মুখটা কিছুতেই চোখের সামনে থেকে যাচ্ছে না। কোথায় যেন দেখেছে সে এই একই মুখ? দূর থেকে আসা একরাশ নীলাভ আলোর তরঙ্গে নেচে নেচে ভেসে আসছে সেই ত্রিনয়ন সেটা আবার খুবই দীপ্তিময়। অলৌকিক ভাবেই ওই মৃতা বউটির মুখটায় এসে চোখগুলো যেন মিলিয়ে গেল ! মাথার ভিতরটা ঘুরছে কিরকম ওর।
সে রাত্রে আর বাড়ি ফেরা হলোনা ওর।

পাড়ায় কালীপূজোর প্যান্ডেলের বাঁশ পড়েছে সবে। এখনো দিন চারেক বাকী।
পাড়ার ছেলেপুলেরাই করে পূজোটা বাড়ি বাড়ি চাঁদা তুলে। ভাইফোঁটার পরদিন একটা ছোট করে জলসা হয়। মৃত্যুঞ্জয় বাবু আর প্রাণকৃষ্ণ এদের দুজনের গান তো থাকেই,কখনো সখনো মৃত্যুঞ্জয় বাবুর খাতিরে দু একজন প্রতিষ্ঠিত শিল্পীও এসে যোগ দেন। কেউই কোন টাকাপয়সা নেন না। মুখোপাধ্যায় বাড়িতে একটা বড় রকমের ভোজ হয় সেদিন। প্রায় একশো জনের পাত পড়ে। সবাই নিজের হাতে খাবার পরিবেশন করে। সে এক হৈ হৈ ব্যাপার।

প্রাণকৃষ্ণ এই ক’দিন আর কোথাও বের হয়নি। সকালে একটু রেওয়াজ করা ছাড়া আর তার গলার আওয়াজও কেউ পায়নি। মোহনবাগানের খেলা ছিল এরমধ্যে। বন্ধু পুলক ডাকতে এসে ফিরে গেছে। কেমন একটা একাকী ঘোরের মধ্যে কেটে যাচ্ছে দিনগুলো। দাদা বৌদি মিলে নিজেদের গাড়ীতে করেই রুম্পা আর বাচ্চাদের ওর বাপের বাড়ি রেখে এসেছে। কালীপুজো-ভাইফোঁটা কাটিয়ে ওরা ফিরবে বোধহয়। রুম্পা আবার নতুন করে সন্তানসম্ভবা। তাই এই বাড়তি সতর্কতা।ওরা যখন যাচ্ছে বারান্দা থেকে ওদের যাওয়াটা দেখতে দেখতে একটু মনখারাপ হয়ে গেল। ঘরে ঢুকে গানের খাতাটা বের করে রামপ্রসাদী গানগুলো দেখছিল প্রাণকৃষ্ণ।

” দিয়েছ এক মায়া চিন্তে, সদাই মরি তারই চিন্তে, না পারিলাম তোমায় চিনতে, চিন্তা কূপে ডুবে মরি ! “

পুরো লাইনটাতে ‘মরি’ শব্দটায় বারবার এসে চোখ আটকে যাচ্ছে। ঘরে বৌদি খাবার ঢাকা দিয়ে গেছে। আজ তো চোদ্দশাক খেতে হয় না? কালীপূজোও এসে গেল তবে। একসময় ভাল তুবড়ি বানাত ওরা কজন বন্ধু মিলে নিজেরাই । সেইদিনগুলো আর কখনো ফিরবে না।

প্রাণকৃষ্ণ একটা প্যাডের পাতা টেনে কিছু লেখার চেষ্টা করতে বসলো। কিছু কথা, যেটা বলে হয়ে ওঠা হয়নি কখনো। কিন্তু কাকে লিখবে? দাদা? বৌদি? রুম্পা কে?
মাথা কাজ করছে না। কি লিখলে ঠিক হবে?
প্রাণকৃষ্ণর মাথার ভিতর আবার ব্যথা শুরু হয়। ওই নিমতলায় দেখা সধবা মহিলার লাল টকটকে সিঁদূর মাখা মুখটা কেন বারবার চোখের সামনে আসছে? এইবার !এইবার সেই নীলচে সবুজ জলতরঙ্গের মতো আলো আর ত্রিনয়ন ! এবার একটা বিশাল মুখব্যাদান করা করাল হাঁ মুখ, ওকে গিলে খেতে আসছে যেন !

প্রাণকৃষ্ণ যন্ত্রচালিতর মত পরণের কাপড়টা নিজের অজানিতেই কখন খুলে গলায় ফাঁস পড়িয়ে দিল। না, নিজে নয়, অন্য একটা জল্লাদের হাত যেন, কি দৃঢ়, কি পেশীবহুল কালো একটা হাত !কার হাত ওটা? শেষবারের মত জ্ঞান হারানোর আগে অনাগত সন্তান যার এখনো পৃথিবীর আলো দেখার সময় আসেনি তার মুখটুক দেখবার বড় সাধ হচ্ছিল আর সাথে সাথে তা না মিটতে পারার দুঃখও।

কালীপূজোর দিন সকালে যখন প্রাণকৃষ্ণর নিষ্প্রাণ দেহটা সি ডি ভ্যানে পুলিশ তুলে নিয়ে যাচ্ছিল তার খানিক আগেই পাড়ার প্যান্ডেলে রেকর্ড প্লেয়ারে প্রাণকৃষ্ণর গাওয়া শ্যামাসঙ্গীত গুলোই একটার পর একটা করে বাজছিল।

যদিও এখন পুরো পাড়াটায় মৃত্যুর নির্মম কাঠিন্য শুধু জেগে আছে।

(সব চরিত্র কাল্পনিক নয়!)

লিপি

যাজ্ঞসেনী আর পাঁচজন

সঞ্জীব সেন

জানি, বালুচরে লিখে রাখা নাম
একটু পরে মুছে যাবে ঢেউ এলে
তবুও তো লিখে রাখি,

যাজ্ঞসেনী কি আসবে রিইউনিয়নে! আসলে কতদিন পর দেখা হবে বলত! আচ্ছা ও কি ফেসবুকে নেই। কতভাবে ওকে ট্রাই করেছি। জানিস ওর খবর। ও কী আগের মতই প্রাণখোলা আছে। দেখা হলে ছুঁটে আসবে আগের মত। কি ভালই না ছিল দিনগুলো! সময়ের হাতে কী আগুন থাকে! পুড়িয়ে দেয় সব কিছু ! যাজ্ঞসেনী খবর কার কাছে পাবো বলত। কথাগুলো শুনে মনে হল রণজয় ড্রিঙ্ক করে আছে। পেটে জল পরলে দুঃখ গুলো কবিতা হয়ে বেরিয়ে আসে। রণজয় অনেকক্ষণ ধরেই বকে যাচ্ছিল। ওর কথা শেষ হতেই বললাম যাজ্ঞসেনীর সব খবর পাবি অরিন্দমের কাছে। সেদিন ফোন করেছিল। ও এখন সানফ্রান্সিসকো। কলেজের প্রফেসর। ও তো আসবেই বলেছে। ওই বলল যাজ্ঞসেনী এখন নিউইয়র্ক। যাজ্ঞসেনীকে বলেছ রিইউনিয়নের কথাটা। যাজ্ঞসেনী হ্যাঁ বা না কিছুই বলেনি। রণজয় বলল রাতুল শমীক শচীন ওরাও আসবে আমায় বলেছে! রণজয় বলল যাজ্ঞসেনী কে একটা গান করতে বলিস! মনে পরে গেল কথাটা শমীক আর শচিন কে দেখতে ভাই ভাই আমরা নিজেদের ভিতর বলতাম ওরা নকুল সহদেব আর রাতুল ছিল ফিসক্যালি ভীম আর আমায় ওরা বড়ভাই মানে যুধিষ্ঠির বলত। মনে মনে হেসে উঠলাম। তালে অর্জুন কে! এই প্রশ্নে রণজয় কেন নীরব থাকত! দেখতে দেখতে রিইউনিয়ন এসে গেল। অজিত বলল আপাতত কুড়ি জনের সঙ্গে যোগাযোগ করা গেছে। অজিতের এসব ব্যাপারে হাতযশ আছে। সাংগঠনিক কাজ ভালই পারে। বাকি বন্ধুরা সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কেউ হয়ত ইহজগৎ ছেড়ে চলে গেছে। যাজ্ঞসেনী নবীনবরণে একটা গানটা করেছিল গিটারে। অরিন্দম আগে থেকে চিনত। ওই বলেছিল কলেজে দারুণ একটা মেয়ে ভর্তী হয়েছে নাম যাজ্ঞসেনী ওয়েস্টার্ন গান জানে। যাজ্ঞসেনী পরে বলেছিল গানটা জন ডেনভার এর “কান্ট্রি রোডস টেক মি হোম।” তারপর থেকেই আমরা পাঁচজন আর ও বন্ধু হলাম। কলেজেও সবাই বলত আমারা পাঁচজন ওর অশ্বারোহী। যাজ্ঞসেনী এয়ারপোর্ট থেকে ফোন করল। বলল- “কি রে জয় সব ঠিকঠাক আছে তো! তবে দেখা হচ্ছে কাল। আমার দারুণ আনন্দ হচ্ছে। অজিত দারুণ একটা কাজ করেছে বল! ও না হলে সম্ভব হত না!” এখানে পা দিয়েই ওর মনে পরে গেল সব স্মৃতি। যাজ্ঞসেনীর মনের বাতিঘর ছুঁয়ে যাচ্ছে সব স্মৃতি। ওর চোখে জল চলে আসছে। কেন সময় এভাবে দ্রুত ছোটে। গঙ্গার দিক দিয়ে আসা হাওয়া ওর চুল উড়িয়ে নিচ্ছে। যাজ্ঞসেনী যে গানটা গাইবে মনে মনে গেয়ে নিল “আমি শুনেছি সেদিন তুমি নীল ঢেউয়ে চেপে নীল জল দিগন্ত ছুয়েঁ এসেছ…. আবার যেদিন যাবে আমাকেও সঙ্গে নিও…বলো নেবে তো আমায়।” যে কুড়ি জন আমরা মিলন উৎসবে জড়ো হয়েছি যাজ্ঞসেনী ছাড়া সবাই আগত। অজিত একটা প্রোগ্রাম কনডাক্ট করেছে। যাজ্ঞসেনী গাইবে। আমি একটু দূরে বসে ছিলাম। মন খারাপের মেঘ কার ভিতরে না নেই! তবুও তো সবাই ফ্লুরোসেন্ট হাসি মেখে নেয় ঠোঁটে। তবে আমি পারছি না কেন? একটু আধতু লেখালিখি করি। তাই হয়ত ভাবনা চিন্তা গুলো গভীরে নিয়ে যায়। না সবেতেই গল্পের রসদ খুঁজি! না যাজ্ঞসেনীর প্রতি আমারও একটা সফট ফিলিং ছিল, তাই! যাজ্ঞসেনীর সঙ্গে দেখা হবে দীর্ঘ পঁচিশ বছর পর। ভেবেছিলাম যাজ্ঞসেনী হয়ত পালটে গেছে। কিন্তু এতটা ভাবিনি যে পা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত পোগ্রামটা ও একাই কনট্রোলে নিয়ে নেবে। গিটার নিয়ে আসবে সঙ্গে করে। উনিশ বছরের মত লাফিয়ে স্টেজে উঠে গান ধরবে ‘আমি শুনেছি সেদিন তুমি নীল ঢেউয়ে চেপে…আমি তাকিয়ে থাকলাম। মনে হল জীবনের পঁচিশ বছর কেউ যেন ডিলিট করে দিয়েছে। অনুষ্ঠান শেষে ও আমার কাছে এল। বলল নিউইয়র্ক গেলি আমার ওখানে যেতে পারলি না। বলল তুই লেখক হয়ে যাবি বোঝা যাইনি। তোর বই আমি আমাজন থেকে নিই তো। জানিস পুরী-তে গেলে আমি বালুচরে লিখে রাখতাম তোদের নামগুলো। আর ঢেউ এলে মুছে যেত। জানতাম তবুও লিখে রাখতাম । আমি যাজ্ঞসেনির দিকে তাকিয়ে থাকলাম। তখনই ঘুমটা ভেঙে গেল। চাঁদের আলোয় চরাচর ভেসে যাচ্ছে। এতক্ষণ ধরে স্বপ্ন দেখছিলাম। সেরাতে আর ঘুম এল না। মনে পড়ে গেল কলেজের দিনগুলো। মনে হল সেদিনের ঘটনা। যাজ্ঞসেনী ওয়েস্টার্ন গানের ভক্ত ছিল। ব্রায়ন এডামস ওর প্রিয় গায়ক। রণজয় ওকে প্রোপজ করেছিল। তবে ফিলিংস আমাদের সবারই একটা ছিল। ভোরে মর্নিং ওয়ার্কে বেড়িয়ে অজিতকে ফোনে ধরলাম। যাজ্ঞসেনী আসছে তো! অজিত বলল মনে হয় যাজ্ঞসেনী আসবে না! অজিত বলল অরিন্দম কে ফোন কর ও হয়ত ডিটেলে বলতে পারবে। অরিন্দমকে ফোন করলাম। বললাম তুই যাজ্ঞসেনীর ব্যাপার কিছু জানিস ও কি আসবে! অরিন্দম বলল যাজ্ঞসেনী বলেছে এটা সারপ্রাইজ থাক।

অজিত ইডেন গার্ডেনের কাছে একটা কমিউনিটি হল বুক করেছিল। গিয়ে দেখি অজিত দারুণ আয়োজন করেছে। অজিত ফোন করেছে। যাজ্ঞসেনী এসেছে। ও বলছে ওকে যে পাঁচজন অশ্বারোহী ঘিরে থাকত তারা এসে যদি নিয়ে যায় তবেই যাবে। অজিত বলল আমি তোদের পাঁচজনকে ফরোয়ার্ড করে দিয়েছি। আমরা পাঁচজন যাজ্ঞসেনীর বাড়িতে পৌছে গেলাম। গিয়ে দেখি ওখানে একটা বহুতল হয়েছে। যাজ্ঞসেনী বাবার নাম জানিনা। কার নামে খুঁজব। রণজয় বলল রিসেপসনে বললে বলে দেবে ল্যান্ডলর্ড কোন ফ্লোরে থাকে। আমরা যাজ্ঞসেনীর ফ্লাটে পৌছে গেলাম। নক করতে যে দরজা খুলে দিল তার দিকে তাকিয়ে আমরা সবাই ফিউজ হয়ে গেলাম। সামনে দাড়িয়ে উনিশ বছরের যাজ্ঞসেনী। মেয়েটি বলল আপনারাই তাহলে মায়ের পাঁচজন অশ্বারোহী। যাজ্ঞসেনী এসে দাঁড়িয়েছে নীল রঙের চুড়িদারে। কে বলবে চল্লিশ পেরলে মেয়েরা বুড়ি হয়ে যায়। আমরা পাঁচজন ভাসাহীন দাঁড়িয়ে আছি। যাজ্ঞসেনী বলল চল এরপর যেতে দেরি হয়ে যাবে। যাজ্ঞসেনী গিটারটা কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে এল। ওলা তে যেতে যেতে আমরা সবাই বললাম একটা গান গাইবি, অন্যরকম। যাজ্ঞসেনী গাইল- “হয়েন ইউ সে নাথিং এট অল” আমরা সবাই তাল দিচ্ছি। রণজয় সামনে চুপচাপ বসে আছে। আমাদের ভিতর যে স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দ ওর ভিতর নেই। জানি আমরা কারণটা। ওর ভিতর একটা পাপবোধ কাজ করছে। রণজয় যাজ্ঞসেনীকে প্রোপজ করেছিল। যাজ্ঞসেনীর প্রত্যাক্ষান মন থেকে মেনে নিতে পারিনি আজও। যাজ্ঞসেনী বলেছিল তোরা পাঁচজন আমার অশ্বারোহী। তাই বলে আমি কিন্তু মহাভারতের যাজ্ঞসেনী নই। আর তুইও অর্জুন না। যাজ্ঞসেনীকে মাঝখানে রেখে আমরা এনট্রি নিলাম ।

লিপি

যোগসূত্র

ইলিয়াস খাঁ

অনাবশ্যক যোগসূত্র মাঝে মাঝে বিরুদ্ধ
পথে ছিন্ন হয়ে যায়।
অন্তত কুড়ি হাজার জাদুবলয় ঘিরে রাখে
ভুবনডাঙা মাঠ।
ধানজমি শস্যশূন্য
বিগত রাশি রাশি বীজানুকীট আমারই
অস্বচ্ছ প্রহেলিকায় ধারণ করে সমাহিত পুকুর।
সত্তার মতো বিকল অথচ ট্রেনগামী ল্যাম্প পোস্ট
বিদায়-সমাবেশ।
সমাহিত পুকুর ধারণ করে কুড়ি হাজার জাদুবলয়
ভুবনডাঙার মাঠ।

লিপি

সেই জানলাটা আজও বন্ধ

শুভজিৎ দাস

সেই জানলাটা আজও বন্ধ!
জানলার চটে যাওয়া রং-এ গুঁড়ো গুলো আজ হাতছানি দিয়ে বাতাসকে ডাকছে।
এই জানলাটা এখনও কেন বন্ধ,
এই প্রশ্নবানে বিদ্ধ করে তারা হা করে তাকিয়ে থাকে আর জানলার কপাটে লাগানো বিজ্ঞাপনকে গিলে তারপর আকাশের দিকে তাকাতে তাকাতে এক কানাগলির দিকে চলে যায় ।

কেটে গেল ১৯৪৭,
কেটে গেল ১৯৭৫ এর বিভীষিকা,
ঘরহীন উল্লঙ্গ হাভাতেরা তখনও তাকাত এই জানলাটা খুলবে হয়তো!
বয়ে যাচ্ছে বিশের বিভীষিকা,
মলীন পোশাক পরে সেদিন সেই লোকটাও
আজ আর অবাক হলো না এই বন্ধ জানলা দেখে,
শুধু মনে মনে ভাবল
‘ জানলাটা আজও বন্ধ?’

লিপি

ছয় পুরুষ

রূপো বর্মন

আমার জীবনে প্রথম পুরুষ এলো
তার সুবাসে ভরা ভালোবাসার মাঝে ছিল
ঝড় বৃষ্টি তপ্ত রোদের আভাস
তবুও আপন করে নিয়েছিলাম তাকে
কারণ তার মাঝে ছিল শুভ নববর্ষের সুর
সে ষাট দিনের মতো ঘর করে চলে গেল
আমার ঘরে দ্বিতীয় পুরুষের প্রবেশ
অতীতের সব ভুলে তার সাথে বেশ কাটছিলো দিন
সোনালী রোদে আলতো বৃষ্টির ছোঁয়া
একহাঁটু জলে কলার ভেলায় ভাসা
দল বেঁধে সবাই মিলে খাল বিলে মাছ ধরতে যাওয়া
জোরালো বৃষ্টির সাথে পুকুরে সাঁতার কাটা
সকাল সকাল আঙিনা ঝাড় দিতে দিতে
তার মিষ্টি প্রেমের ছোঁয়া ভোলা বড় দায়
কিন্তু সেও আট সপ্তাহ থেকে চলে গেল
তৃতীয় পুরুষের চরণ পড়লো আমার আঙিনায়
সে সাজালো আমায় লাল পাড় সাদা শাড়িতে
নূপুর বাঁধানো পায়ে দিলো আলতা পরিয়ে
আমার হাত ধরে হাঁটলো সেই পথে
যেই পথের ধার গুলি কাশফুলে ভরে গেছে
চাঁদনী রাতে ঠাকুর দেখাতে নিয়ে যেত আমায়
খুশির সুরে মন্ডপে মন্ডপে
হঠাৎ চারটি পক্ষ যেতে না যেতেই
চতুর্থ পুরুষ এসে আমায় ছিনিয়ে নিল তার কাছে থেকে
সেও ভালোবেসে ছিল আমাকে
তবে পূর্ণিমা রাতে নয় অমাবস্যার অন্ধকারে
একদিন ঘোর অন্ধকারে প্রদীপ জ্বালিয়ে ছিল
বাজি পটকা ফুটিয়ে ছিল আমায় পাওয়ার খুশিতে
নতুন ধানের ভাত খেতে দিয়ে ছিল আমায়ে সে
ভালোবেসে নবান্ন উৎসবে
তখন শুনলাম পঞ্চম পুরুষ ডাকছে আমায়
পিঠে পুলি ক্ষীর আরও নানান স্বাদের খাবার খেতে
আমিও স্বাদের লোভে চতুর্থ পুরুষের সাথে দু মাস ঘর করে
ছুটে চলে গেলাম পঞ্চম পুরুষের কাছে
সব স্বাদের খাবার খেতে দিয়েছিলো আমায় পৌষপার্বণে
কিন্তু আমাকে সবসময় জড়িয়ে ধরে থাকতো সে
তার ছোঁয়ায় যে আমার শরীর বরফ হয়ে যেতো
সেটা কিছুতেই বুঝতে চাইতো না
একদিন ঘর থেকে বেরিয়ে এসে দেখলাম
হলুদ মাখানো সর্ষে ক্ষেত থেকে
ষষ্ঠ পুরুষ আমায় হাতছানি দিয়ে ডাকছে
ও যেন চাইছে
আমাকে হলুদ শাড়ি পরিয়ে খোঁপায় গাঁদা আর পলাশ ফুল গেঁথে দিতে
সব পুরুষের মতো পঞ্চম পুরুষের সাথেও ঘর করেছিলাম তত দিনই
তারপর রঙিন ভালোবাসার টানে চলে গেলাম ষষ্ঠ পুরুষের কাছে
সে রামধনু রঙে সাজালো আমায়
রাধা কৃষ্ণের মতো রঙ মাখালো অঙ্গে দোল পূর্ণিমার দিনে
নিজের হাতে খাইয়ে দিল তেল পিঠা
চরকের মেলা ঘুরলো আমার হাত ধরে
কিন্তু ফেরার পথে বললো
তুমি এখন বাড়ি যাও
আমি তোমার কাছে আবার ফিরে আসবো দশ মাস পরে
ছাড়তে মন চাইছিলো না আমার প্রিয় বসন্তের হাতটি
কিন্তু আগের পাঁচ পুরুষও তো প্রতিশ্রুতি দিয়েছে
তারাও আসবে আবার দশ মাস পর পর
তাই কষ্ট হলেও বসন্তের হাত ছেড়ে দিয়েছিলাম
গ্রীষ্ম বর্ষা শরৎ হেমন্ত শীত বসন্ত যে
আমার ছয় পুরুষ
যাদের সাথে আমি দু মাস করে ঘর করে
বছর টা কাটাই।

লিপি

তরুণ সন্ন্যাসী

বদরুদ্দোজা শেখু

একটা সন্ন্যাসী যায় রাস্তা ধ’রে আনমনে হেঁটে,
মুখ তুলে আশপাশে চায় না সে, চুলদাড়ি ছেঁটে
ফেলেনি সে বহুদিন, কাঁধে ঝোলানো থলি, পরনে
পুরাতন পরিচ্ছদ, পট্টি দেওয়া চপ্পল চরণে;
কেউ কেউ ব’লে উঠে- ‘একেবারে বয়সে তরুণ’,
কেউ বলে ‘বাউন্ডুলে’; ঘুণ-ধরা আত্মার উকুন
বাছার বিশ্বাস কিছু হেঁটে যায় পদক্ষেপে, বুক
অনিশ্চয়তা-স্পন্দিত, চোখ প্রত্যাশার স্বপ্নভুক।

কোথায় গন্তব্য তার বোঝাই যায়না, হয়তো সে
নিজেও জানে না, কোনো তীব্রতর তাড়নার বশে
বেরিয়ে পড়েছে পথে অকস্মাৎ তারুণ্যের তোড়ে,
খুঁজবে সে নির্বাণের পথ জীর্ণ জীবনের মোড়ে
মোড়ে একনিষ্ঠ তপে, তাই গৃহত্যাগী হয়তো-বা
বেকার বুদ্ধের কপি হেঁটে যায় হতাশায় বোবা।।

লিপি

একজোড়া ফুলকপি ও শীতকালীন বনভোজন

সুনীতা

খাতা খোলার পুরষ্কার ফুলের তোড়াতে ভবঘুরের ঘোলা চোখজোড়া আটকে থাকে
কি যেন এক ভয়ঙ্কর সূচালো, হারিয়ে গেছে সবজি মান্ডিতে, জোড়া ফুলকপিতে গেঁথে;
দ্রব্য-তেলের ঊর্ধ্বগতিতে; ডাল জলের তারল্যে উজ্জ্বল সারখেকো পোকার নাব্য-ভাসমান স্হিতি;
যানের পথে রাখা আছে শুকনো কাশি, শীতের দরদে পীচ ঢেকে যায় – হিমকণা সাঁটা ঘন শ্লেষ্মা-
এরপর আমরা ধরি জীবনমুখী গান, শব্দগুলি টাঙানো থাকে প্রাসাদের সামনের শালগাছে;
রাত হলে জোনাক পোকা তরলের মত ঢুকে আসে, শরীরের মাঝে; শিরায় শিরায় কণা কণা আলো
উল্কাপাতের উর্বরতা মিশে থাকে এ মাটিতে, সবজি-ফলের সবুজে, শ্যাওলা ধরা ঝিমানো আলোতে।
কালো পীচ রাস্তা ঢেকে কালিক লালমাটির ধুলো, দেশিভাব অস্মিতা: অমরত্ব দিয়ে সব তুলে রাখা আছে-
সারসার তপশিলে লেখা আছে হিমঘরে থাকা গত মরশুমের সবজি ফলের স্বাস্থ্যসচেতনতা সংক্রান্ত অধিবিদ্যক আঁকিবুকি।
প্রস্তাবিত পরিবেশ সংরক্ষণ প্রকল্পের অধীনে মাটিখেকো কেঁচোরা ফসফেট খেয়ে মিলিয়ে যায় ধ্রুবক চলনে
ভেসে থাকে কালপুরুষের লিখনে শীতরাত্রির উত্তরগাথা ঝুলন্ত বারান্দায়: বমনে জ্যোৎস্না উদ্রেককারী-
আমরা শীত দিনের উল্লাসে নদীর অববাহিকায় বনভোজনে ভিড়ে যাই প্রভূত খাদ্যদ্রব্যের সাথে
প্রাচুর্য যা কিছু চৌর্যগীতি মুখরিত পথে আসে।

লিপি

মোহনার চরিত্র

সৌমেন দেবনাথ

এইচএসসি পাশের পর যে যার যোগ্যতায় বিভিন্ন ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে গেলাম। নতুন নতুন বন্ধু আর পরিবেশ সবার জীবনে আসলো। পুরাতন বন্ধুগুলোর স্থানে নতুন বন্ধুরা জায়গা পেলো। আমাদের কলেজ জীবনের বন্ধুদের মধ্যে দূরত্ব স্বাভাবিক কারণে বাড়লেও আমার সাথে মোহনা আর সাব্বিরের সম্পর্ক কলেজ জীবনের মতই অটুট থাকলো। মোহনা প্রায় বলে, তোর ইউনিভার্সিটির কোন বন্ধুর সাথে আমার প্রেমের ব্যবস্থা করে দে না! স্বপন তার ইউনিভার্সিটির এক ছেলের সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। সে ছেলের সাথে আমার প্রেম জমে ক্ষীর। তুই আমার প্রিয় বন্ধু, তোকে বলতে দ্বিধা নেই। প্রেম তো না টাইম পাস করবো।
আমি মোহনার কথা শুনে হতবাক। মোহনার নাম উল্লেখ না করে ব্যাপারটি সাব্বিরকে বললাম। সাব্বির বললো, আমার নম্বরটা তোর সেই বান্ধবীকে তবে দে।
আমি মোহনার এ ব্যাপারটা সাব্বিরকে কি করে বলি? ওর পিড়াপিড়িতে বললাম, বন্ধু সে মেয়ে আর কেউ না, আমাদের বান্ধবী মোহনা। প্রেমের নামে বিভিন্ন ছেলেদের সাথে টাইম পাস করে এখন।
এ কথা শুনতেই সাব্বির চুপ হয়ে গেলো। মোহনার সাথেই তো সে গত দু বছর প্রেম করছে।

লিপি

কলরব

দেবা

বেদুইনের মতো ঘুরেছি কত, দেখেছি কত ছল,
বিনাপানিতেই নত মস্তকে, ফুটেছিল শতদল।
তারই আশিস মাথায় নিয়ে, ঢুকেছি শিক্ষা শিবিরে,
হাসবো, খেলবো, শিখব, হবো সাধারণের সম্বল।।

চিন্তাধারা ধূলিসাৎ, ঘিরেছে অবসাদ, হয়েছি নীরব,
রাজনীতিরই পদকমলে, সঞ্চিত যত ক্ষমতা সব।
বিদ্যে-বুদ্ধি মাথায় নিয়ে, বসে আছি খিদে নিয়ে,
ভাতা নয় চাকরি চাই, হচ্ছে তারই কলরব ।।

লিপি

করি খুশির ঈদ

রবীন জাকারিয়া

চারিদিকে খাবার কত
খেতেই পারি ইচ্ছে যত
থাকি তবু সোজা
ইচ্ছে হলে যেতে পারি
মন্দ কাজের বাড়াবাড়ি
আছি আমি রোজা
দু’হাত তুলি খোদার তরে
দিও তুমি দু’কূল ভরে
ভাল কাজে জড়াও
পাপ করেছি কত শত
চলছি পথ নিজের মত
সরল পথে চলাও
বিশ্ব ভরে করোনা
আমরা মোটেই বড় না
পালিয়ে গেছে নিদ
তুমিই হলে রহমান
সুখটা থাক বহমান
করবো খুশির ঈদ৷

লিপি

অহংকারী

মেরাজুল হাসান

জমি নেই,
আছে জমিদারী।
টাকা নেই,
বোঝায় পকেট ভারী।
ডিগ্রী নেই,
দেখায় ডিগ্রিধারী।
বড়ো নয়,
ছোটো করে সবই।
সন্মান নেই,
বোঝায় সম্মানধারী।
দেনা আছে,
বলে পাওনাদারি।
আয় নেই,
দেখায় ব্যবসাদারি।
বাড়ি আছে,
ঋণে ভরা সবই।
গাড়ি আছে,
আয়ের নয় চাবি।
জ্ঞান নেই,
বোঝায় অধিক জ্ঞানী।
অহং নেই,
শুধুই অহংকারী।।

Share This

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on telegram
Share on email

Editorial Board

  • Reviewed by Gobinda Sarkar (Editor)
  • Designed & Published by Akshay Kumar Roy (Editor)

For More Information, Click Here

For any type of Suggestion, Question, or Help, please contact us at this mail – [email protected]

Follow Us

0 0 votes
Writing Rating

Related Articles

Subscribe
Notify of
guest
1 Comment
Newest
Oldest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Merajul Hasan
4 months ago

Thanks for publishing my little work.