Saturday Lipi

Saturday Lipi | Bangla | April, 4th Week

লেখক

লিপি

আত্মজন

শ‍্যামাপ্রসাদ সরকার

 

আজ পয়লা বৈশাখ। একটু পরেই হাল খাতার জন্য জনে জনে লোকের মিছিল শুরু হবে

সরু গলির পাশে উপচে পড়া ডাস্টবিনের পাশে একমাথা উকুন আর ছিন্ন পোশাকে তার মা! মা টা পাগলী! মাঝে মাঝে উদোম হয়ে ঘোরে। ডাস্টবিন থেকে খাবার তুলে খায়। কিন্তু সেই যে ওর আসল মা সেটা ও জানে। কেউ বলে দেয়নি, তবু জানে। যেমন বাপ বলে কাউকে সে চেনে না। ছোটবেলাটাও তার মনে নেই। এখানে কতদিন আছে তাও জানে না। চোখ বুজলে মা ছাড়া কিছুর স্মৃতি মনে নেই। মাথার উপর শহরের ধোঁয়াভরা আকাশ আর পাশে মা, সম্পূর্ণ উলঙ্গ। সারাগায়ে আবর্জনা মাখা। তার মধ্যে থেকে কোথা থেকে একটা ছেঁড়া ন্যাকড়ার  পুতুল কুড়িয়ে পেয়েছে সে। শুকনো ঝুলে যাওয়া বুকে পুতুলটাকে ঠেসে ধরে। একটু পর আক্রোশে ছুঁড়ে ফেলে দেয় দূরে। সে দেখতে পেয়ে  পরক্ষণেই একটা শতচ্ছিন্ন কাপড় জোগাড় করে  আনে আর তার  মা  গা টা ঢেকে দেয়। সেটা গায়ে জড়িয়ে এই বৈশাখের নরম ভোরের আলোর মত তার পাগলী মা হেসে ওঠে!

 

গলির সামনে  বড় রাস্তার ওপারে  ফ্ল্যাটবাড়ির পার্কিং লটে যত গাড়ী আছে সবগুলো সে মোছে টাকার বিনিময়ে। ওখানে সবাই ওকে ছোটু বলে ডাকে। মোটামুটি দিনে দুশো টাকা কামাই হয়ে যায়। ফ্ল্যাটবাড়ির লোকগুলো ছোটু বলে না ডাকলে ও জানতেই পারত না ওর কোন নাম আছে ! পাগলী কোনও দিন নাম ধরে ডাকেনি ওকে। খাবার এনে মুখের সামনে ধরলে খানিক দেখে, শোঁকে,  তারপর খেয়ে নেয়। মাঝে মাঝে মনে হয় এখান থেকে  পালিয়ে গেলে বেশ হয়! আসলে পাগলী আর ওর কোমরের নীচে একটা একই রকম জরুলের জন্মদাগ আছে। ওই দাগটার জন্যই পাগলীকে ও মা বলে। ছেড়ে চলে যেতে পারেনা শেষ পর্যন্ত। গুলতির টিপটা খারাপ নয় ওর। দুটো কাকের একটা উড়ে গেল। অন্যটা মুখ থুবড়ে ডাল থেকে পড়ে গেল। কি অদ্ভূত! দুনিয়ার যত কাক যেন জড়ো হয়ে গোল করে চক্কর মারতে লাগলো। পুরো ব্যাপারটাই ফ্ল্যাট বাড়ির সামনে হচ্ছে

 

প্রায় পঞ্চাশটা কাক এখন সমস্বরে চেল্লাচ্ছে ফ্ল্যাট বাড়িটার সামনের  কৃষ্ণচূড়ার ডালে ডালে

 

কাকেদের ডাকটা শহরটার আধুনিক ক‍্যাকোফোনির সাথে বেশ সঙ্গত করে কিন্তু। আসলে  শহরের দিনরাত্রি একটা ছিন্ন তমিশ্রার তন্তু হয়ে যাচ্ছে দিন কে দিন। এখানে প্রেম, ঘৃণা, হতাশা, শরীর সবই সুস্থতর ধনবান নাগরিকের একচেটিয়া। সেখানে এক অর্ধউলঙ্গ উন্মাদিনীর হাসি শুধু  ফুকরে ওঠে খাবারটা মুখে তোলার আগে!

 

সেও এতদিনে জানে প্রতিটি সম্পর্ক আসলে এক জটিলতর স্বার্থের বোঝাপড়াই। মরা কাক কে ঘিরে বাকী কাকেদের সাময়িক বিক্ষোভের মত তা সবই মুহূর্তকালেই তা মিলিয়ে যাবে একই রকম উদাসীন নির্লিপ্তিতে। শুধু রয়ে যাবে  ধূসরবর্ণ চিত্রপটে একটি অপার্থিব দৃশ‍্যকল্প। শহর করুণ হয় মৃতের আবর্জনায়

 

যে  বালকটি  এখন তার  সদ্য  কৈশোরের জাগৃতিতে সে কেবল তার জন্মদাগের স্বার্থশূন্য  কারণেই এক উন্মাদিনী নারীর নগ্নতাকে ঢেকে রাখে  পরম মমতায়। সেই যেন আসলে এক অলীক পক্ষীমাতা। তার নিশ্চিন্ত পক্ষপুটের  আশ্রয়ে সে ঢেকে  রেখেছে ক্ষমাহীন ক্লিন্ন পৃথিবীর শেষ অবশিষ্ট একমুঠো অপত‍্য স্নেহকে। বৈশাখ থেকে চৈত্র কালাকাল এভাবেই তাকে চিরদিন জড়িয়ে রাখে মমতায়

লিপি

রোজ সকালে

বদরুদ্দোজা শেখু

 

রোজ সকালে মন মাতানো সুবাস ছড়ায় শিরীষ ফুলে

অন্যমনে সেই আতরে ডুব দিয়ে যাই জানলা খুলে

বাইরে শুনি, ফজর-জাগা শ্রমিক মানুষের কোলাহল

কাজে যাওয়ার ব্যস্ত পালা চলছে ওদের, আমি কেবল

বসেই আছি, বুকের মধ্যে ঝরছে ধারা কোন্ ভাবনার

হাজার ব্যথার বৃষ্টিপাতেও সাঙ্গ হয়না এ জাল বোনার

 

এই ফুল এই ভাবনা অকূল বিভুল মনে হয় একাকার

অরণ্য আর আকাশ যেন দিগন্ত চায় লেপ্টে থাকার

অনুভূতির অমল পাখায় হৃদয় হলো অপহরণ

চরণকে তাড়ায় জীবিকা, বুকে আমার রক্তক্ষরণ

 

কেউ যেন কয়, জগৎ-জীবন দেখলি না তুই দুচোখ দিয়ে

ভাবের দেশে রইলি বসে পুষ্প পাখি বৃষ্টি নিয়ে

চাখ্লি নে এই চৈত্র-দাহে দাদন খাটার কী দুর্দশা

মানব-জমিন রাখ্লে পতিত হৃদয়-জমিন বৃথাই চষা

জানলি নে এই মাঠের মানুষ মজুর মাঝি কুলি বেগার

জগৎ-রথের চক্র চলে ঘামেই নেয়ে যে দুর্ভাগার, 

খোঁজার মতো খুঁজ্লি নে তুই যশ-প্রতিষ্ঠা-সুখের পাখি, 

টানলি নে তোর মাথার বোঝা, দায়-দায়িত্বে দিলি ফাঁকি:

কেউ বলে, তোর দ্বারা কিস্স্যু হবে না আর কোনো কালে

এমন্ অলস, এমন্ অটল আনমনা এই রোজ সকালে

 

আমি বলি, ভাবের দেশেই শুদ্ধ সবুজ প্রাণের আলো
ধীরেই চলি, আমার এমন্ অল্প সুখেই লাগছে ভালো।

লিপি

অশ্রুধারার দাগ

দেবা

 

স্তব্ধতায়, নিস্তব্ধতায়, কেটে গেছে বহু রাত

নির্মম প্রেয়সী, মিথ্যেবাদী, ছেড়ে দিয়েছ এ হাত।

উল্লসিত মন, বোঝেনি তখন, কিবা ছিল, বিধাতার লিখন

পাগলা ভোলার পরশ বিনেও, তুমি ছিলে অমূল্য রতন।

তোমার স্নিগ্ধতা, শুভ্রতা, আনন্দমুখড়িত মুখ

সূর্যমুখিও নতজানু হেথায়, খ্যাপার ভরত বুক।

কাজলান্বিত, নয়ন জোড়া, মেঘসম কালো কেশ

স্বল্প বিস্তর, প্রেমে মোড়া, কেবল, উন্মাদনার দেশ।

ধ্বংসস্তূপে, পরিণত সব, কেবলই পিয়ার দোষে

লজ্জা চাপা, জটিল বাক্য, “বিদায় বন্ধু শেষে।।”

বিশ্বাসঘাতী, কলঙ্কিনী, তোমার ওপর যত রাগ,
বালিশ আজও, বয়ে বেড়ায়, সেই অশ্রুধারার দাগ।

লিপি

নিয়মটাতো কেউ মানছে না

রবীন জাকারিয়া

 

করোনার কারণে

অফিসের বারণে

কতদিন যাইনাতো আড্ডায়

ধুৎ তেরি ঘন্টা

ভাল নেই মনটা

জীবনতো চলে গেল গাড্ডায়

থাকি তাই বাসাতে

ভাল কিছু আশাতে

মৃত্যুটা একদম থামছে না

টিভিটা দেখি রোজ

বিশ্বের নেই খোঁজ

নিয়মটা কেউ তো মানছে না

টিসিবির গাড়িটা

মানুষের সারিটা

দূরত্বটা হয়নাকো মানা

খাবারের থালাটা

কেড়ে নেয় শালাটা

লুটেরার সবটুকু জানা

পারছিনা বলিতে

ওলিতে ও গলিতে

ওরা তো যায় শুধু শাসিয়ে

সকলের চেষ্টা

বাঁচাবেই দেশটা
হারামীদের আইনে ফাঁসিয়ে৷

লিপি

চারপায়া

সুনীতা

 

চারপায়ে এগিয়ে আছে চার খুঁটি, পেঁচাদের বর্ণনা আভাস

দড়ি ধরে সোজা উঠেছে বায়ুস্তরে: পাকে পাকে বাঁধা,

আলটপকা পা-দানিতে পা রাখতেই ফড়ফড়িয়ে উঠল কবুতরের পাখা

গুছিয়ে ঘুরতে থাকে মঞ্চসজ্জা, আলো-আঁধারি মেখলা

উড়ন্ত ডানায় ভর করে পেড়ে আনে নিকষ ফল;

বৃন্তচ্যুত হতেই দুলে উঠল সকল আবহস্থল

 

 

লিপি

তোমার আশকারা পেলে

সমাজ বসু

 

তোমার আশকারা পেলে আমি কলম ধরি,

মন খারাপের ভার সরিয়ে শব্দের জানলায় চোখ রাখি

আপাদমস্তক মেখে নিই দৃশ্যের রং ও আলো

যে যায় সে যাক—

কিছুতেই যাব না তোমার বৃত্ত ছেড়ে কোন হ্রদে

বাতাসে বাজুক ছায়ানট, নদীর জলে ভাসুক হিরের কুচি

তোমার আশকারা পেলে—

তোমার চোখের পাতায় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকি
চোখ বিষয়ক একটা কবিতার জন্য

লিপি

বাটপার

সৌমেন দেবনাথ

 

নিচ থেকে নাম ধরে কেউ একজন ডাক দিলেন। জানালা দিয়ে চেয়ে দেখি বেশ বয়স্ক একজন মানুষ। কিন্তু আমি তাঁকে চিনি না, বিস্মিত হলাম আমার নাম জানলো কি করে! বললাম, কিছু বলবেন?

বললেন, কচ্ছপ ধরেছি। চার কেজি তো হবেই। অনেক কষ্টে এক হিন্দু বাবুর খোঁজ পেলাম। নিতেই হবে আপনাকে

কচ্ছপের নাম শুনতেই অতীত মনে পড়ে গেলো। কত আগে একটা কচ্ছপ খেয়েছিলাম!

নিচে নেমে লোকটির কাছে গেলাম। বললাম, তো আপনার হাত খালি! কচ্ছপ কই?

বললেন, নেবেন কিনা জানতে এলাম আগে। আপনি চারশত টাকা দেন। আর একটা ছালার বস্তা দেন

চারশত টাকা হাতে দিতেই লোকটি দ্রুত চলে যাচ্ছেন। বললাম, বস্তা নেবেন না?

বললেন, লাগবে না। যাবো আর আসবো

বললাম, দাঁড়ান

আরো পঞ্চাশ টাকা দিয়ে বললাম, দ্রুত যাবেন দ্রুত আসবেন
ঘরে এসে বৌকে জল গরম করতে বললাম। গরম জলে কচ্ছপ ছেড়ে আগে মেরে নিতে হবে। দুপুর গড়িয়ে বিকাল এলো, এলেন না বয়স্ক লোকটি। পেলাম না কচ্ছপটিও

লিপি

ওরে ও মুমিন-মুসলমান চাঁদ দেখতে চল্

নাসিরা খাতুন

 

ওরে ও মুমিন-মুসলমান তোরা চাঁদ দেখতে চল্

উঠেছে ঐ রমজানেরই চাঁদ

সবাই মোরা রাখবো রোজা,

খাবো শেহেরীও ইফতার

করবোনাকো কাজা কভু পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ

রোজার বড়ো নেয়ামত তারাবী পড়া চাই

 

ওরে ও মুমিন-মুসলমান,

তোরা চাঁদ দেখতে চল্

জানতিস যদি তোরা ওরে রোজার কত ফজিলত,

বলতিস ওগো আল্লাহ তুমি সারাবছর,

মোদের দাওনা কেনো এমন নেয়ামত

 

ওরে ও মুমিন-মুসলমান,

ওরে ও পাপি তাপি যে যেথায় আছিস,

আয়রে আয় রোজা রেখে তওবা করি,

খোদার দরবারেতে দু-হাত তুলি

এই রোজার ওসিলায় খোদা করবে মোদের মাফ্

ফিরে পাবো মোরা মোদের ঈমান

 

ওরে ও মুমিন-মুসলমান তোরা চাঁদ দেখতে চল্

চাঁদের উপর নির্ভর করে কটা রোজা হবে এবার

রোজার শেষে উঠবে ঐ ঈদেরই চাঁদ,

মুমিন-মুসলমানের ঘরে আসবে খুশিরই জোয়ার

ওরে ও মুমিন-মুসলমান চল্ চাঁদ দেখতে চল্

লিপি

আঁধার ও আধেয়

ইলিয়াস খাঁ

 

কোনো মানুষের মুখ মনে পড়ে না দিকবিদিক ঘোর আঁধার

অস্পষ্ট ভ্রমণ আয়নার মতো বিস্ফোরণের পরে যত অণুপরমাণুর

বিচ্যুতিমহাশূন্যের আধার আধেয় ক্ষমার কাছাকাছি শুয়ে থাকে

একটাই রোদকাজল বিজলি রাত হরেক রঙের রচনাবলীমানুষ
আর থতমত ঘুঘুপাখির উড়ান যথাসম্ভব বিপদসংকুল

লিপি

কালকূট

গোবিন্দ বর্মন

কালকূটসিক্ত মানবসভ্যতা বিস্ফোরণের ছাই

কার্বন-যুক্ত অক্সিজেন, অগ্ন্যুৎপাতের তপ্ত লাভা

প্রাণ শূন্য জন্তু শিল্পের বিকার!

কৃত্রিমমাংসের রসিক! আজ নিজেই শিকার

 

বিদীর্ণ কাঁটাতারের বেড়া নিদ্রাহীন বন্দুকের পাহারা

চারিদিকে রঙিন পতাকা, মানব জবাই কারখানা!

সভ‍্যবেশী কসাইসভ্যতার অন্ধ চিত্র

নিশিতে অশরীরীর আতঙ্ক দুর্নীতির কারবার

 

হলাহলপানকারী মহাদেব আজ শ্বাসরুদ্ধ!

শহরের বস্তিতে পারিজাতেরগন্ধ!
ইন্দ্রের বজ্র আজ বিদ্যুৎ শূন্য!

লিপি

উষসী

রূপো বর্মন

 

তব আশায় আমি উষসী 

জেগে আছি সারা নিশি

দেখবো বলে তোমার মুখ 

প্রেম নয়নে লাজুক লাজুক

 

ছোট্ট পাখি তার মিষ্টি গানে 

জানতে চাইলো জাগার মানে 

বসে আছি গো তার টানে 
সকাল হয় না যার বিহনে

লিপি

বুকের ভিতর বন্দি কান্না

সঞ্জীব সেন

 

নীশুত রাতে দেখলাম নীল আকাশের নিচে পৃথিবীগানটা শোনা যাচ্ছে, কিন্তু টিভির পিকচারটা আপ ডাউন করছে। ওয়ের্স্টান টিভি ব্লাক আন্ড হওয়াইট। বাবা বলেছিল পুজোয় জামা প্যান্ট না নিলে এবারের পুজোয় টিভি নিয়ে আসব। মহালয়ার আগের দিন টিভি নিয়ে এল। অবশ্য নতুন জামাও হয়েছিল। বাবা কথাটা এমনি এমনিই বলেছিল। বাবা বলল কাল থেকে ইন্ডিয়া পাকিস্তান টেস্ট তখন যদি এমন ডিস্টার্ব করে!  বিরক্ত হয়ে উঠে গিয়ে টিভির উপরে চড় মারল। সঙ্গে সঙ্গে টিভি ঠিক। বাবা চেয়ারে এসে বসল। আমি খাটে বসে  অঙ্ক করছি। মা এসে বলল টিভি টা না দেখলেই নয়। দেখছ ছেলেটা পড়ছে! বাবা টিভিটা বন্ধ করে দিল। বাবা চা খাচ্ছে। মা বলে গেল মনে হয় ঝড় উঠবে! আমি রান্নাঘরে যাচ্ছি। ঝড় উঠলে জানলা টা দিয়ে দিও। ছবিটা হারিয়ে গেল। আবার একটা ছবি। পিন্টু এসেছে কিরে জয় খেলতে যাবি না! বললাম দাঁড়া প্যান্টটা পড়ে আসি। আকাশে মেঘ। মা বলল বৃষ্টিতে ভিজবি না বলে দিলাম। বৃষ্টিতে ফুটবল খেলার মজাই আলাদা। পিন্টু একটু দাঁড়া আসছি। উঠে বসলাম বিছানায়। স্বপ্ন দেখছিলাম। জানালা দিয়ে চাঁদের আলো বিছানা ভিজিয়ে দিচ্ছে। বেড সুউজ জ্বালালাম। ঘড়িতে তিনটে বাজে। নামতে গিয়ে পায়ের ব্যাথাটা অনুভব করলাম। ব্যাথাটা আগের চেয়ে বেড়েছে। ওষুধ কাজ করছে না। আর ঘুম আসবে না।  সিনেমার কথাটা মনে পড়ল। কালী ব্যানার্জী  চিনে ফেরিওয়ালা। তখন কলকাতায় অনেক চিনাম্যান দেখা যেত। সিল্কের ছিট কাপড় বিক্রি করত। নায়িকা কংগেজি, খদ্দর ছাড়া কিছু পড়ে না। কালী ব্যানার্জী সিল্কের কাপড় বিক্রি করতে গিয়ে নায়িকাকে বলছে সিসথার কে বলেছে আমি বিদেশী! আমার চোখ নীল নয়, নাকও তো টিকালো  নয় !আর কি কি যেন বলেছিল! মনে পড়ছে না। বইটা নাকি নিষিদ্ধ হয়েছিল। মৃণাল সেনের পরিচালনায় কালী ব্যানার্জীর কি অসাধারণ অভিনয়। মাত্র সারে তিনটে বাজে। আকাশে স্টিমারের আলোর মত ছোট চাঁদ। আবার খাটে গিয়ে শুয়ে পরলাম। ঘুম এসে গেল

দেখলাম পিঙ্কি শাড়ির আঁচলটা ক্লিপ করে চোখের কাজলটা
, লিপিস্টিকটা ঠিক আছে কিনা দেখে নিয়ে অনলাইনে ক্যাবটা বুক করল। বৃষ্টিরদিনে লোকেশনটা ঠিক করা বহুত ঝামেলার! আমি বললাম আর কত সাজবি! পিঙ্কি বলল এইতো কোথায় সাজলাম! মা ঘরে ঢুকুল। পিঙ্কি বলল কেমন করে শাড়ি পড়েছ মা! আঁচল তো কোমর অবধি উঠে গেছে। প্লিট করবে না! পিঙ্কি ঠিক করে দিল। বললাম মা আমার জন্য মনে করে পার্সেলটা এনো! মা বলল লজ্জা করে আমার! আমি পারব না। আমি বললাম আরে ক্যাটারিং, হেড ধরা থাকে। চাইলেই দিয়ে দেবে। এতে লজ্জার কি আছে। এ বুনু আমার জন্য আনিস। পিঙ্কি বলল দাদা তুই তো যেতে পারতিস, গাড়ি করে তো যাবো! বেশিক্ষণ তো থাকবো না। বললাম না রে! নরমাল সবার মত হাঁটতে না পারলে! ইচ্ছা করে কিন্তু সবার করুণার দৃষ্টিতে দেখা আমার ভাল লাগে না। মনে করে আমার জন্য পার্সেলটা আনিস! ছবিটা পালটে গেল। দেখলাম ব্রততী এলো আমি কলেজের কমনরুমে। একটা উপন্যাস পড়ছিলাম। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়েরনদীর পারে খেলাব্রততী বলল এই জয় যাবি! বললাম কোথায়! ও বলল ত্রিকোন পার্কে, আমরা সবাই যাচ্ছি, বললাম কে কে যাচ্ছে? ও বলল ঋজু, নিতা, অণুত্তমা আমি, বিকাশ আর তুই যদি যাস। বললাম যাবো দাঁড়া। ও তোর বিকাশ যাচ্ছে! ও বলল কেন, তোর অণুক্তমাও যাচ্ছে! আমি হাসলাম, আমার! অণুত্তমা। অণু আজ নীল রঙের চুড়িদার পড়ে এসেছে। বুকের কাছে বোতামের জায়গাটায় নীল। কবজীতে নীল ব্যান্টের ঘড়ি। চড়া মেকাপ নেই। পিঠ অবধী চুল স্টেটিং করা। কি ছিল ওর দৃষ্টির ভিতর। তাকানোর ভিতর না তাকানোর ভিতর! কী শীতল স্পর্শ। মনে হচ্ছে সময় যেন থমকে আছে। মনে হচ্ছে একঝাক  প্রজাপতি কুয়াশা মেখে উড়ে বেড়াচ্ছে ভোরে! অণু আমার পাশে বসল। ওর কাঁধ আমার কাঁধ ছুঁয়ে আছে। বললাম সমুদ্রে মেশার আগে এই নদীটাও মানুষ হয়ে যাবে,  ব্রততী বলল এটা কি কোন  কবিতার লাইন! বললাম হুঁ! কিন্তু কার লেখা মনে নেই! অণু রুমাল বাড় করে ঠোঁটের উপর জমে থাকা শিশিরের মত ঘাম মুঝে নিল। বিকাশ বলল এই জয় একটা কবিতা বল না শুনি তোর লেখা! ঋজু বলল এই শুরু হল পোস্টমর্ডান কবিতা যত্তসব! বললাম প্রথম পোস্টমডার্ণ কবিতা কে লিখেছে বলত। সবাই চুপ করে আছে। বললাম জীবনানন্দ দাশ। সিলেবাসের বাইরে আমরা কতটুকু জানি!মাছরাঙা চলে গেছে আজ নয় কবেকার কথা তারপর বারবার ফিরে এসে ডানাপালকের উজ্জ্বলতা ক্ষয় করে তারপর হয়ে গেছে ক্ষয় মাছরাঙা মানুষের মত সূর্য নয়! অণুত্তমা মাথা নিচু করে শুনছে। আর আমার ভিতর সময় যেন সবকিছু স্তব্ধ হয়ে আছে।আমার দুয়ার  অন্ধকারে কখন খুলেছে তার সুপ্রতিভ হাতে, আমাকে সে  নিয়েছিল ডেকে বলেছিলএ নদীর জল তোমার চোখের মত ম্লান বেতফল, আমি আজও  মেয়েটিকে খুঁজি! নিশুত রাতে এসেছিল অনুত্তমা। দরজা খুলে দেখি দাঁড়িয়ে আছে। হাতে একটা কবিতার বই। কালো রঙের শাড়ি পড়েছে কালো স্লিভলেস ব্লাউজের সাথে। কুয়াশায় ভিজে গেছে চুল। অভ্রুকুচির মত চাদের গুড়ো লেগে আছে চুলে। তাকিয়ে আছে আমার দিকে। বলল তোর একটা করিতার বই আমার কাছে ছিল দিতে এলাম। বনলতা সেন। পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন।জানলা দিয়ে রোদ এসে পড়েছে। শরীরটা ভারী হয়ে আছে। সারারাত জুরে স্বপ্ন দেখলাম। আমার জীবনের পুরনো সব ঘটনা। কে  যেন কুড়িয়ে নিয়ে একসঙ্গে জুড়ে দিয়েছে। মা বলল কি রে এতক্ষণ তো ঘুমাস না! বললাম কাল রাত ঘুম টা ভাল হয়নি। সারারাত জুড়ে স্বপ্ন দেখলাম! মা মনে আছে আমাদের একটা ব্লাক আন্ড হওয়াইট টিভি ছিল। মাথায় চড় কশালে ঠিক হয়ে যেত। কাল দেখলাম আর ওই সিনেমাটা কালী ব্যানার্জী চিনাম্যান। নীল আকাশের নিচে পৃথিবী, চিনাদের সঙ্গে আমাদের ভাল সম্পর্ক ছিল! তাও যুদ্ধ চলছে। মা চা নিয়ে এল। বললাম মনে আছে মা অণুত্তমাকে। আমাদের ব্যাচে  পড়ত। বাড়িতে এসেছিল একদিন। কাল ওকে দেখলাম। সারারাত জুড়ে পুরনো যত ঘটে যাওয়া ঘটনা। মাকে বললাম বাবা কি বেড়িয়েছে। বললাম কেন বেরতে দাও! বয়স্কদের বেশী সাবধান থাকা উচিৎ। আমি আস্তে আস্তে গিয়ে নিয়ে আসতাম। মা কিছু বলল না। আমিই বলে যাচ্ছি। ভাগ্নের মুখেভাতের সময়ও পাটা ঠিক ছিল। অনেকদিন আসে না ওরা। আজ একবার ভিডিও কল করব। মনে আছে মা মন্টি বলে ডাকলে কেমন হাসত। পাঞ্জাবী টা পড়াই হয় না আর। ওই একদিনই পড়েছিলাম। মুখে ভাত দেওয়ার দিন। কোথায় আর যাই যে পড়ব! চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলাম। মোবাইল হাতে নিয়ে  দেখলাম নিউজ আপডেট ভারী বৃষ্টির সম্ভবনা। রেখে দিলাম। মাথাটা ভার হয়ে আছে। আমার বুকের ভিতর বন্দি আছে কিছু কান্না। কেউ বুঝবে না। এলোমেলো কটা লাইন মনে পড়লমনকে যতোই বলি না, যতোই সরিয়ে নিই মুখ তবুও উটের গ্রীবার মত কোন নিস্তব্দতায় ফিরে আসে  যতোই সবকিছু ধামাচাপা দিতে চাই বুকের ভিতর খেলা করে আদিম এক খেলা।

লিপি

কালিদাস

মধুসূদন রায়

 

তুমি বিখ্যাত জগতে !

কত গল্প, কবিতা, নাটক

লিখেছিলে বলে

সংস্কৃতে পড়ি আমি

সব গল্প গুলি

কত নিখুঁত ভাবে লিখেছিলে

তোমার নাটকগুলি

ছোট থেকে সবাই বলে 

তোমার কথা

তাই আমি লিখেছি তোমায় নিয়ে,

মনের কবিতা

মিথ্যা শুনিনি তাই,

সরস্বতীর আশীর্বাদে তোমার মতো
সংস্কৃতজ্ঞ এজগতে আর নাই

লিপি

এক হৃদয়

সুমিত বর্মন

 

আমি অধিক ভালো বেসেছিলাম তোমারে!

রেখেছিলাম তোমারে আমি হৃদয়ের অন্তরে

তোমারে নিয়ে দেখেছিলাম অনেক স্বপ্ন,

একদিন তোরে না দেখলে মন কাঁদে

তোমার ওই মুখের হাসিটা অম্লান শুভ্র

শুধু দু – নয়নের সামনে ভাসতো তোমার ওই মুখ

কারণ রেখেছিলাম তোমারে আমি হৃদয়ের অন্তরে

 

জানি না তোমার হৃদয়ের অন্তরে ছিলাম কিনা?

কিন্তু রেখেছিলাম তোমারে আমি হৃদয়ের অন্তরে

এঁকেছি ওই তোমার মুখমণ্ডল হৃদয়ের অন্তরে,

আজও  ভালোবাসি তোমারে আমি হৃদয় দিয়ে

রেখেছিলাম তোমারে আমি হৃদয়ে,

কিন্তু ভুলে যেতে চাইনি তোরে কখনোই

 

আজও দেখি তোমারে নিয়ে অনেক স্বপ্ন,
কিন্তু তোমারে নিয়ে স্বপ্ন গুলি কবে পুরণ হবে?

লিপি

মনমোহিনীর খোঁজে

নইমুদ্দিন আনসারী

 

মগ্ন আমি আজও ওই ঝর্নার মোহনায়, নিজ্ঝুম নিরালায়,

নীলাকাশে চাহিয়া দেখি উড়িয়া চলিয়াছে পক্ষী সব নিজ নিজ ঠিকানায়

ওই নীলনদী  হারায়নি আজও তার গতি, হারায়াছে মোর মনের  সাথী

শিশির ভেজা সন্ধ্যে বেলায়, মন মাতাইয়া যায় আবেগখেলায়,

বাঁকা গাঁয়ের পথটি বাইয়া রাখাল চলে যায়,

বারেক ফিরে চাহিয়া থাকে মোর মন মায়াবিনীর আশায়

ওগো মোর মনপাখী! হয়তো তুমি ভাবিয়াছো মোরে অহংকারী

হয়তো তুমি আজও রহিয়াছো মগ্ন চালনায় ভুল বোঝাবুঝির তরী

হয়তো আজ আমি বিলীন তোমার বিস্মৃত  স্মৃতির অতল সমুদ্রে

কিন্তু মোহিনী, তুমি আজও সদা বিরাজমান রহিয়াছো মোর হৃদয়ের অন্তরে

না, মোহিনী না, নহে আমি অহঙ্কারী তবে আমি কল্পনাপ্রেমী

কল্পনা দিয়ে আমি আজও হৃদয়পটে অঙ্কন করিয়া চালিয়েছি তোমারই ছবি,

কেবল তোমারই ছবি

কলমের কালি তে আজ প্রকাশিত মোর ব্যথিত, ব্যাকুল  হৃদয়ের বাণী

খুঁজে পাইয়া যায়, কাছে পাইয়া যায়, দেখা পাইয়া যায় তোমায় এই লেখনীর তরে,

ওগো মনমোহিনী, শোন মোর কাহিনী,

কল্পনার তরী নিয়ে আসে মনে মোর ক্ষণিকের প্রশান্তি,
ক্ষণিকের আশা, ক্ষণিকের ভালোবাসা……

সমাপ্ত

Share This

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on telegram
Share on email

Editorial Board

  • Reviewed by Gobinda Sarkar (Editor)
  • Designed & Published by Akshay Kumar Roy (Editor)

For More Information, Click Here

For any type of Suggestion, Question, or Help, please contact us at this mail – [email protected]

Follow Us

0 0 votes
Writing Rating

Related Articles

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments