Saturday Lipi, Bangla, may 4th week শ্যামাপ্রসাদ সরকার সৌমেন দেবনাথ সুনীতা জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় রবীন জাকারিয়া ইলিয়াস খাঁ গোবিন্দ বর্মন বিষ্ণু পদ রায় সঞ্জীব সেন নইমুদ্দিন আনসারী রূপম শিকদার রূপো বর্মন

Saturday Lipi | Bangla | May, 4th Week

লেখক

লিপি

আনন্দস্বরূপা

শ্যামাপ্রসাদ সরকার

আর একদিন পর থেকেই এ বৎসরের মতো কার্তিকী কৃষ্ণপক্ষের শুরু। আর সেই রোরুদ্যমানা ভয়াল অন্ধকারেই আসন্ন বহুকাঙ্খিত দীপাবলির মহাপূজার ক্ষণটি।

এর একটি মাস আগে থেকেই পিতৃলোকের আরাধ্য দেহাত্মাগণ তাঁদের বংশজদের উত্তরণ ঘটাতে এই মর্ত্যভূমিতে অবতরণ করেন আর তাদের হাতে তিলাঞ্জলির পিপাসা নিবারণের পর বংশধরদের ইহজীবনটি ধন্য করেন। এবারে কিন্তু মাসাধিককালের অন্তে তাঁদের উন্মার্গগমনের সেই পরম সময়টি ক্রমেই যে উপস্থিত তা তো আর কারো অজানা নয়!

মধ্যরাত এখন অতিক্রান্ত। বাতাসে কার্তিকের ঈষৎ শৈত্য মৃদুমন্দ আভাসে জানিয়ে দিচ্ছে এবারে আদিত্যদেবের অতিপরিচিত সেই দক্ষিণায়ণটির ক্রমপ্রাবল্য।

এদিকে এক পর্ণকুটিরের সামনে সুরধ্বনিময় গঙ্গার বুকে কান পাতলে ক্রমে আবার যেমন একটি নতুন জোয়ারস্রোতের কলস্বর শোনা যাচ্ছে বটে আবার সেই গৃহকর্তাটি অন্য রাতগুলির মত এ রাতেও একেবারে বিস্রস্ত, সুপ্তিহীন, বিনিদ্র ও অটলগম্ভীর। মহানিশার এই বিছানায় সুষুপ্ত সব প্রতিবেশী আর পরিবারের লোকজনদের কথা বরং আজ থাক।

এখন আমাদের ওই গৃহকর্তা স্বয়ং কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশকে নিয়েই ক্রমে অগ্রসর হওয়াই ভাল।

একদা তিনিও নবদ্বীপরত্ন শ্রীচৈতন্যের সহপাঠী ছিলেন বলে শ্লাঘা বোধ করেন। যদিও সে মহাযুগ এখন ইতিহাসের কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে, যখন তিনি, রঘুনন্দন শিরোমণি, রঘুনন্দন ভট্টাচার্য ও শ্রী গৌর একই টোলে নানা জটিল শাস্ত্র অধ্যয়ন করতেন আর বহু তাত্ত্বিক বিতর্ক বাঁধিয়ে তাবড় সব পূর্বতন নৈয়ায়িকদের দর্পচূর্ণ করতেন এই শান্তিপুর-নবদ্বীপে অবস্হান করে। চোখ বুজলে এককালে যে তাঁরও সেই বহ্নিসদৃশ কিশোর গৌরহরির মধ্যে যে একটা প্রগাঢ় বন্ধুত্ব ছিল তা যেন আজও বিস্মরণে তিনি অক্ষম।

পরবর্তীকালে তাঁর সতীর্থটি বৃন্দাবনাশ্রিত সখীভাবে কৃষ্ণভজনের পথে গেলে, দুজনের মধ্যে আদর্শগত মনোমালিন্য হয় ও কৃষ্ণানন্দ তখন শাক্ত পথ অবলম্বন করেন। অবশ্য প্রিয়বন্ধু গৌরের এই নতুন শ্রীচৈতন্যরূপটি যদিও তিনি একদা রামকেলীর আসরে দূর থেকে একবার দেখে অশ্রুমার্জনা করে নীরবে ক্ষমা চেয়ে এসেছেন নিজে, শেষ পর্যন্ত দূরবর্তী দর্শকের আসন থেকেই।

গত নিশাকালটি মনোরম হলেও তিনি এখন বড়ো উতলা। তিনি আসলে মনের মধ্যে কেবল খুঁজে চলেছেন নিভৃত সমর্পণের আদর্শ সেই পরমআরাধ্যা অতিগূহ্য চিন্ময়ীর মাতৃস্বরূপটি।

যা বহু কঠিন শাস্ত্রমন্থনেও সেই রূপটি যে এখনো তাঁর নিজেরই অধরা।

আসলে চৈতন্য-পরবর্তী যুগে, যখন ধীরে-ধীরে বৈষ্ণব-আধিপত্য কমে আসছে স্বয়ং ভিত্তিভূমি নবদ্বীপে, তেমনই এক সময়ে সাধক হিসাবে আত্মবিকাশ “আগমবাগীশ কৃষ্ণানন্দে”র।

বাংলায় শক্তিচর্চাও তখন বিক্ষিপ্ত, অধোগামী। হাল ধরতে এলেন আগম-নির্গম সব তন্ত্রের সারাৎসার যাঁর ধমনীর মধ্যে সেই তিনিই। বিভিন্ন তন্ত্রশাস্ত্র ঘেঁটে, রচনা করলেন ‘তন্ত্রসার’। লোকে তখন থেকেই “আগমবাগীশ” বলে তাঁর কাছে গুরুজ্ঞানে প্রণত হয়।

কিন্তু মেজাজটি আর সাধকোচিত বশে নেই। থেকে থেকেই অকারণ অস্হির লাগছে বড়োই। স্বয়ং চিদানন্দস্বরূপা রূপপ্রকাশের খেলাটিতে কি তবে সত্যিই তাঁর প্রতি নিছক অনুদার?

মনের মধ্যে গুঞ্জরিত হয় এযাবৎ চর্চিত সেই শাস্ত্রবাক্যগুলি। আজ অজানিতেই সেগুলিকে সর্বতঃ ব্যর্থ বলেই তবে কেন মনে হচ্ছে কৃষ্ণানন্দের?

একটু ধীরগতিতে এসে তিনি সেই পূণ্যসলিলা গঙ্গোদকে পাদস্পর্শ করলেন। তারপর কিঞ্চিৎ স্বচ্ছতোয়ার ধারা হাতে তুলে এবার যেন নিজের মাথায় ছিটিয়ে আত্মশুদ্ধি করলেন।

নাহ্ ! তাঁর যে আর আজকাল নিদ্রাই যে আর আসেনা। অথচ স্বপ্নাদেশ অনুযায়ী ব্রাহ্মপ্রত্যূষে নিদ্রাভঙ্গের পরই তো সেই কাঙ্খিত মাতৃমূর্তিটি প্রকট হওয়ার কথা। তারই প্রলোভনে যে কত রাত তিনি বিনিদ্র আর অপেক্ষমান সেটা আর কাকেই বা তিনি বলবেন?

শাক্ত তন্ত্রে এখনো পর্যন্ত মহাশক্তিযন্ত্র ও ঘটে আরাধনা হলেও দেবীর মাতৃস্বরূপটি সবারই অজানা। স্বয়ং তিনিও কি পারবেন এতদিনপরে সেই অভ্রংলিহ কারুণিকের দেবীরূপটিকে একবার চাক্ষুষ করতে?

পূবদিকে শেষরাতের মায়াময় স্নিগ্ধতা কাটিয়ে এবার অরুণোদয় ক্রমআসন্ন। এ যেন আরও একটি ব্যর্থতম দিনের উদ্ভাস !

হায়! আক্ষেপ করে ওঠেন সাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ। গত পক্ষকালের মত এই রাত্রিটিও বিফল হল তবে!

নিরন্তর তন্ত্রসাধনায় তিনি বুঝেছেন যে সাধারণ মানুষ নিরাকারের পূজা ও তার মর্ম সঠিকভাবে বুঝবে না। অতএব মৃণ্ময়ী মূর্তিতেই এবারে হোক দেবীর আরাধ্যা রূপের প্রকাশ।

ঈষৎ মনস্তাপের সাথে তিনি নবোদিত সদ্যোজাত ক্ষীণ রশ্মিসম্পন্ন সূর্যকে অভ্যাস মতো একবার প্রণাম করলেন। তারপর আচমনের জন্য সামান্য জল তাঁর কন্ঠস্পর্শ করল সভক্তিভরেই।

তাহলে! সেই ছদ্মরূপা মহাশক্তি আজও তবে তাঁর কাছে ধরা দিলেন না ! আর একপক্ষকাল পরেই তো অমাবস্যা। দেবী ভগবতী কি তার আগে একটুও এই অধমসাধকটির ওপর সদয়া হতে পারেন না?

মধ্যবয়স্ক বৃষস্কন্ধ কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ স্থির করলেন এবারে এই ব্যর্থ অসহায় মনুষ্য দেহটিকে তবে না হয় এজন্মের মত সেই মুক্তকেশী করালবদনাকেই নিজের হাতে প্রণামীর জন্য দিয়ে আসবেন আগামী মহাপূজার শেষে, অমাবস্যাটি বিগত হলেই।

তন্ময় সাধকের পথে হঠাৎই গোচর হয় এক নিম্নবর্ণীয়া গোপবধূ। তার ডান পা একটি বারান্দার ওপর তোলা, আর বাঁ পা মাটিতে। ডান হাতে তার কিছু গোময়ের স্তুপ আর বাম হাতটি উঁচুতে তুলে ঘুঁটে দিতে সে এখন উদ্যত সীমানার বেড়াটির গায়ে।

রমণীটির কুঞ্চিত মেঘকালো চুলটি আলুলায়িত ও খোলা, যদিও পরণে তার কোনওভাবে পরিধান করা একটি ছোট শাড়ি তবুও সেই শ্যামবর্ণা প্রায় প্রায়উলঙ্গিনী পরমাপ্রকৃতিটি অত ভোরে স্বয়ং কৃষ্ণানন্দকে দেখে লজ্জায় জিভটি কেটে আবার সঙ্গে সঙ্গেই পিছন ফিরে দাঁড়াল।

কৃষ্ণানন্দ স্বয়ং এ দৃশ্যে অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন।

কিন্তু কে যেন অলক্ষ্যে বসে তাঁর প্রতি অট্টহাস্য করে বিদ্রুপ করে বলছে- ”রে মূর্খ! এই তো সেই আরাধ্যা চিন্ময়ী স্বরূপা রে! যার ধ্যানে বসলে তুই নিজেই মুগ্ধকন্ঠে বলিস্ তো,

– ঘোরদ্রংষ্ট্রাং করালাস্যাং পীনোন্নতপয়োধরাম্।। শবানাং করসংঘাতৈঃ কৃতকাঞ্চীং হসন্মুখীম্।সৃক্বদ্বয়-গলদ্রক্ত-ধারা-বিষ্ফুরিতাননাম্।।

ঘোররাবাং মহারৌদ্রীং শ্মশানালয়বাসিনীম্।

বালার্ক মণ্ডলাকার-লোচনত্রিতয়ান্বিতাম্।।

দন্তুরাং দক্ষিণব্যাপি-লম্বমান কচোচ্চয়াম্।শবরূপ-মহাদেব-হৃদয়োপরিসংস্থিতাম্।।

শিবাভির্ঘোররাবাভিশ্চতুর্দ্দিক্ষু সমান্বিতাম্। মহাকালেন চ সমং বিপরীত রতাতুরাম্।।সুখপ্রসন্নবদনাং স্মেরানন-সরোরুহাম্।

এবং সঞ্চিন্তয়েৎ কালীং সর্ব্বকাম-সমৃদ্ধিদাম্”

হঠাৎ তাঁর মনোজগতে এক অসীমপরিবর্তন ধেয়ে আসছে যেন। কৃষ্ণানন্দের মুখের স্মিত হাসিতে এখন বিশ্বজয়ী সাধকপ্রবরের এক নবঅনুরাগের ক্রমউন্মেষ।

আহা! এই তো সেই বহুপ্রতীক্ষিত তাঁর মাতৃকার চিন্ময়ী আনন্দস্বরূপার স্বরূপটি। রূপকের আড়ালে যিনি তো সদাই ভক্তকল্পতরু।

ধন্য আজ নিশাবসান! আর তদ্বজনিত প্রকাশমানা আজকের পরম ব্রাহ্মমুহূর্তকালটি!

তাঁর দুটি চোখে ততোক্ষণে নেমে এসেছে ভক্তির অশ্রুধারা। বিগলিত কন্ঠে সুরধ্বনীর তীরে শুয়ে আভূমি প্রণত হন তিনি, আর মন্দ্রকন্ঠে উচ্চারণ করেন দক্ষিণাকালিকার প্রতি পুষ্পাঞ্জলি প্রদানের সময়ে সেই বহুচর্চিত ও উচ্চারিত মহামন্ত্রটি –

“আয়ুর্দ্দেহি যশোদেহি ভাগ্যং ভগবতি দেহিমে।পুত্রান্ দেহি ধনংদেহি সর্ব্বান্ কামাংশ্চ দেহিমে।। দুর্গোত্তারাণি দুর্গে ত্বাং সর্ব্বাশুভ-নিবারিণি।ধর্ম্মার্থমোক্ষদে দেবি নিত্যং মে বরদা ভয়।। কালি কালি মহাকালি কালিকে পাপহারিণি।ধর্ম্মকামপ্রদে দেবি নারায়ণি নমোহস্তুতে।।”

বেশ অভাবনীয়ভাবেই স্বয়ং চিন্ময়ীকে আজ প্রত্যক্ষ করেছেন শেষপর্যন্ত। এবারে কালাকালের ভাবতরঙ্গে সেই রূপটিকেই ভবিষ্যতের জন্য মৃন্ময়ী আকার দিয়ে যেতে হবে। তাঁর আয়ুষ্কালটি এবার গত হলেও এই রূপেই দেবী চিরদিন ধরা থাকবেন।

আগমবাগীশের ঐশী সাধনার শেষপর্বটি আজ বড়োই যে মধুর সমাপনে চিরউজ্জ্বল হয়ে রইল।

বিগলিত কৃষ্ণানন্দ অবশেষে সানন্দে আজ তাঁর কুটিরের পথে পা বাড়ালেন।

লিপি

টুলিপের বিয়ে

সৌমেন দেবনাথ

মাসান্তে যে বেতন পাই সংসার আর ঘরভাড়া সামলে উঠা দায়। তার উপর নিয়মিত নিমন্ত্রণ লেগেই আছে। আজ কলিগের ছেলের বিয়ে, কাল কলিগের মেয়ের বিয়ে, আজ কলিগের বিয়ে, কাল কলিগের ছেলের জন্মদিন, মেয়ের অন্নপ্রাশন, ছেলের সুন্নতে খৎনা। আজ ছাত্রের বিয়ে তো কাল ছাত্রীর বিয়ে। প্রথম দিকে সব নিমন্ত্রণ রক্ষার চেষ্টা করলেও এখন যাওয়া কমিয়ে দিয়েছি।
টুলিপের বিয়ের সময় বিভাগের তিন স্যার পড়েছি বিপদে। দুদিন পরপর ফোন করে আর বিয়ের তারিখ মনে করিয়ে দেয়। তিনজনেই সিদ্ধান্ত নিলাম টুলিপের বিয়েতে যাবো।
বিয়ের দিন হাতে কোন টাকা নেই। তিনজনের কাছ থেকে ব্যর্থ হয়ে চতুর্থজনের কাছে পাঁচশত টাকা ধার পেলাম। গেলাম টুলিপদের বাসায়। আত্মীয় স্বজনে ভরা। কে কার খোঁজ নেয়? বাবার আত্মীয়দের বাবা, মায়ের আত্মীয়দের মা খোঁজ নিচ্ছেন, আমরা টুলিপের স্যার, আর টুলিপ আছে বৌ সেজে, যাকে ঘিরে নিকটজনদের হৈহট্ট। তাই তার সাথে দেখা না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে খেয়ে নিলাম।
হীনমন্যতা, ইতস্তততা আর বিড়ম্বনায় পড়লাম আশীর্বাদ টেবিলে আশীর্বাদস্বরূপ টাকা দেবার বেলায়। সবাই দিচ্ছে তিন হাজার, চার হাজার, পাঁচ হাজার টাকা করে। সেখানে পকেট থেকে পাঁচশত টাকা বের করি কি করে!
তিন স্যারই একই সমস্যায় পড়ি। পরে সিদ্ধান্ত নিলাম তিনজনের টাকা একত্রে জমা করে একজনের নামে জমা দেবো। কাজল স্যার সিনিয়র হওয়াতে তাঁর নামে জমা করে বিয়ে বাড়ি থেকে ভেগে পড়লাম।
টুলিপ যেদিন বিয়ের পর প্রথম কলেজে এলো আমাকে দেখেই বললো, স্যার, এত করে বলার পরও আমার বিয়েতে যাননি, খুব কষ্ট পেয়েছি।
টুলিপের কথাতে সাময়িক খারাপ লাগলেও ওর বিয়ের দিন যে বেইজ্জতি হইনি, এটাও যেন একটা প্রাপ্তি।

লিপি

হরিণী সময়সূচী

সুনীতা

হরিণী চোখের সজলতা দিয়ে নামিয়ে আনো নব্যমাংসস্তূপে!
এলোমেলো লতানো অন্ধকার, ভীষণ ঘুম পায়, হাই ওঠে, রঙীন অবসাদ
জিভ আড়ষ্ট ফেরারী; আঙুলের ডগায় গজিয়ে ওঠে বন্য ছত্রাক-
সেই মুহূর্তে চট‍্কা ভেঙে গাছেরা বেড়ে ওঠে চড়চড় করে,
খরগোশদের ভয় পাওয়ার কৌমার্যে প্রতীকী আলো বের হয় সূর্য থেকে
হূল ফোটানো, তীক্ষ্ণভাবে শরীরে গেঁথে যায়, আলো!
কিন্তু কি আশ্চর্য!
কোন পরিচর্যা শব্দ বেরিয়ে আসে না অচেনা লতার ঝোপ থেকে; বেতসী নদীরা
এগিয়ে এসে হাল ধরে – উথলে ওঠে জল, সে জলে
মাংসবিচ্ছিন্ন শরীর ধুয়ে যায়,
রক্ত বয়ে চলে যায় নদীতে;
মাঝরাতের প্রকান্ড পাহাড়, হাঁফ ধরানো: নিয়ম মেনে পৌঁছতে হয় আলো ফোটার আগে
বেতসী নদীতে বয়ে গেছে মাংস ছাড়ানো রক্ত–
এখন একমাত্র নিদান গাছেদের আলিঙ্গনে গভীরতর শীতঘুম।

লিপি

বিকল্প

জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়

পারি না এমন নয় ভেঙে দিতে সব ব্যবধান
তুমি যে উত্তরহীন এটুকু দূরত্ব প্রায় উড়ে যায়
জেলখানা গান।
প্রথমে আগুনই ছিল সকাল পরিবর্ত বিকেলে
তুমি আসবে ভাবনার আটচল্লিশ ঘণ্টা সময়
কাকের ডানায় ঠিক উড়ে যেত।
এখন মুহূর্তগুলো খুব ভারি বিমল অভ্যন্তর
বহিরঙ্গ উপচানো নর্দমায় গেছে।
তুমিও আসো না বলতে দ্বিধা নেই যদি আসো তবু
নিশ্চিত জানি এই গ্র‍্যানাইট দৃঢ় অন্ধকার অভঙ্গুর।
এত চেনা মুখ শব্দ পরম্পরা কীভাবে রাখার?
তার চেয়ে কংক্রিট পথ ফেলে নেমে যাই ভূমিজ পাড়ায়
নগণ্য চাওয়ার পাশে হাঁস-মুরগি সংসার কোলাহল গান
ওখানে অন্ধকার মাঠে জোনাকির ফুল…. আলো আর আলো।

লিপি

ঈবাদাহ্র ঈবাদাত

রবীন জাকারিয়া

আমাদের একমাত্র কন্যা৷ বাইয়াতুন ঈবাদাহ্৷ সকলে ঈবাদাহ্ নামেই ডাকে৷ ছোট্ট মেয়ে৷ ভাঙ্গা ভাঙ্গা কথা বলে৷ মিষ্টি লাগে৷ তাই সকলে ওকে খুব ভালবাসে৷ এমনকি ওর স্কুলের শিক্ষকরাও৷ ও শহরের একটি মান সম্মত স্কুলের নার্সারিতে পড়ে৷ স্কুলটির নাম নর্থ ব্রিজ স্কুল৷ ওর ক্লাশে ও সবচেয়ে ছোট৷ কিন্ত পড়াশুনায় খুব ভাল৷ মেধাবী৷ সকল Exam-এই সে সেরা তিনে থাকে৷ ওর স্কুলের পরিচালনা পর্ষদের প্রায় সকলেই সাহিত্য-সংস্কৃতির সাথে জড়িত থাকার কারণেই বোধ হয় স্কুল ছুটির পর বিকেলে সহপাঠক্রমিক শিক্ষার অংশ হিসেবে চিত্রাঙ্কন, গান ও ধর্মীয় শিক্ষার ব্যবস্থা করেছেন৷ আমার মেয়েটিও আনন্দের সাথে নিয়মিত উপস্থিত থাকে৷ কোন ক্লাস মিসড করে না৷ অবশ্য করলে জরিমানা দিতে হয়৷

প্রতিদিনের ধর্মীয় ক্লাস করার পর ওর মনে প্রশ্ন জাগে “ঈবাদাত কী?” বাসায় এসে একদিন আমাকে জিজ্ঞেস করলো, “বাবা ঈবাদাত কী?” ও ছোট মানুষ তাই এ প্রশ্নের উত্তর এক কথায় বলা কঠিন৷ আমি তাই সহজ করে বললাম, ঈবাদাত মানে হচ্ছে এই ধরো নামাজ, রোজা, সত্য কথা বলা, অন্যের ক্ষতি না করা এইসব৷
আচ্ছা! আমিতো তোমার সাথে নামাজ পড়ি (মাঝে মাঝে ও আমার সাথে নামাজ পড়ে৷ কখনো পিঠে উঠে৷ কখনো কোলে বসে থাকে৷ কিন্ত রাগ করিনা কখনো৷)৷
তাহলে আমাকে রোজা থাকতে হবে তাই না বাবা? ক”দিন পর পবিত্র রমজান শুরু হবে৷ আমি ভয়ে ভয়ে বললাম এখন তোমাকে রোজা থাকতে হবে না৷ একটু বড় হও মা৷ তখন রোজা রেখো৷ কিন্ত সে রোজা থাকবেই জেদ ধরলো৷ চিন্তা করলাম রোজা আসতেতো আরো কিছুদিন বাকি আছে৷ এর মধ্যে ও ভুলে যাবে ভেবে বললাম ঠিক আছে৷ রোজা থেকো৷
ক’দিন পর রমজান শুরু হলো৷ প্রথম রমজান৷ সবাই সেহরি-ইফতারের ব্যবস্থা নিচ্ছি৷ রাতে সে হুট করে বললো রোজা সে থাকবেই৷ কী আর করা সেহেরির সময় ডেকে তুললাম৷ সেহেরি করলো৷ তখনো আমরা জানি এটা শুধু ওর জেদ৷ আর কিছু নয়৷ ফজরের নামাজ আদায় করে ঘুমোতে গেলাম৷ সকালে উঠে শুনি মেয়ে কিছু খায়নি৷ রোজা আছে৷ ভয়ংকর কথা৷ আবার ভাবলাম কিছুক্ষণ পর ও নিজেই খেয়ে নেবে৷ তাই কথা বাড়ালাম না৷
ঠিক চারটা কিংবা সাড়ে চারটার দিকে আমার মেয়ে শুধু একটু পানি খেতে চাচ্ছে৷ মুখ মলিন৷ খারাপ লাগছে৷ কষ্ট হচ্ছে৷ তবুও সিদ্ধান্ত নিলাম৷ যেভাবেই হোক এ মাসুম বাচ্চাটার রোজাটা পরিপূর্ণ হোক৷ তাই মটর সাইকেলে করে ওকে শহরে ঘুরতে বেড়ালাম৷ আরতো দুইটা ঘন্টা৷ চিড়িয়াখানা, সুরভী উদ্যান, ঘাঘটের পাড় দেখাতে নিয়ে গেলাম৷ কিন্ত যেখানেই যাই৷ সেখানেই ইফতারের দোকান৷ খাবারের দোকান দেখলেই সে খাবার কিনছে৷ আমিও এভাবে অনেক ইফতার কিনে ফেললাম৷ সময় প্রায় কেটেই গেল৷ বাড়ি ফিরে এলাম৷ ও একটা বড় প্লেটে সব ইফতার নিয়ে বসলো৷ একাই খাবে৷ আল্লাহ্ আল্লাহ্ করছি৷ যেন মেয়েটা রোজাটা পূর্ণ করে৷
অবশেষে মসজিদ থেকে মুয়াজ্জিনের আযানের ধ্বনি শুনতে পেলাম৷ আল্লাহু আকবর, আল্লাহু আকবর…৷
বিসমিল্লাহ্ বলে মেয়েটা এক ঢোঁকে এক গ্লাস শরবত পান করলো৷ মুখে একটু নাস্তা দিয়ে বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লো৷ বিশাল প্লেটে পড়ে থাকলো সমস্ত ইফতার৷ আর ঈবাদাহ্ নিজেই বুঝিয়ে দিল ঈবাদাত কী?

লিপি

ট্রাম্পেটবাদক

ইলিয়াস খাঁ

কিন্নর, এই অধরপুরী ঘোর নিরালা বাতিক। সর্বোচ্চ উচ্চতা
থেকে নিম্নগামী স্নায়বিক যাত্রাপথে বিষাদ-জানলা। ক্রমশ
বাদলাবেলায় মসীবর্ণ বোলতার চালচিত্র রতনপুরের ট্রাম্পেটবাদক।
গঙ্গায় ভেসে যাচ্ছে যতগুলো গন্ধর্ব লাশ। যানবাহনের বিদায় বেলায়
রক্তাক্ত অক্ষর-স্বজন সেইসব অজানা রাতপাখির আর্তি-বিহ্বল
ডানা-ভাঙা বিচ্যুতি তুলে আনো মসীবর্ণ বোলতার চালচিত্র, রতনপুরের
ট্রাম্পেটবাদক!
অধরপুরীর নিরালা বাতিক, কিন্নর, আশঙ্কায় ছয়লাপ ভ্যাকসিন প্রক্রিয়াকরণ।
গাও, কিন্নর, অধরপুরীর মৃত্যু-সমাপতন।

 
লিপি

ভঙ্গুর

গোবিন্দ বর্মন

সীমাহীন দিগন্তে একচিলতে সূর্য।
ভাসমান স্বপ্ন আজ বিদ্ধ, যেন অপুস্পক বৃক্ষ।
কালিমালিপ্ত দৃষ্টি ধৃতরাষ্ট্রের প্রাদুর্ভাব,
মাংসবিহীন কঙ্কাল অ্যাসিডের কারবার।

রাজার রাজ্যে নারী-তন্ত্র সীমাহীন উল্লাস!
রক্তচোষক মাকড়সা যেন স্বাস্থবান হাতি।
‘বিনায়ক’ আজ অকর্মক মনসার ছলনায়।
সৃষ্টিকর্তার ধ্বংস রূপ মহাদেবের বিকার!
বুদ্ধিজীবী আজ শান্ত যেন স্বভাবের দোষ।
আহা! রাবনের কারাবাস, এ যেন লংকার সর্বনাশ!

লিপি

লুকোনো অশ্রু

বিষ্ণু পদ রায়

মাঝ রাতে হঠাৎ শব্দ পেলাম শুনতে
কে যেন ডুকরে কাঁদছে, তার গোঙানিতে
সমস্ত ঝিঝি পোকার গান স্তব্ধ, মেহগুনীর অন্ধকার
এই মহলটাকে জাঁকিয়ে তুলেছে, জোনাকিরা
সূক্ষ্ম আলোয় খুঁজতে বেরিয়েছে, অজানা উদ্দেশ্যে
পাবে বলে, হারিয়ে যাওয়া সম্পদ এই দেশে।।

শিকারের দল এই বুঝি আসছে ধেয়ে গন্ধ পেয়ে
কিছু শীর্ণ দেহধারী প্রাণী রক্ত শুষে নিচ্ছে, ইচ্ছেমতো
এদিক ওদিক ঘুরে ফিরে আবার নিংড়ে নিচ্ছে
খুঁজে পেয়েছে জোনাকিরা একটি দেহ, ছেড়া-ফাটা
কাপড় ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলে দেওয়ার মতো
শুষে নিয়েছে সব, প্রাণটুকুও ছাড়েনি সবকিছু পেয়ে।।

জোনাকিরা কি পেরেছে ফেরাতে তাদের
বহুকাল আগে যেভাবে ফিরিয়েছিল বাবুই পাখিদের?

লিপি

সহমরণ

সঞ্জীব সেন

গোয়ালন্দে সেই মেয়েটি। কি যেন নাম,
অতসী না নয়না, কি চোখ কি ঠোঁট!
বলেছিল চোখে আর ঠোঁটে একটাই ভাষা
ভালবাসি ভালবাসি।এতদিন পরেও,

আজও মেয়েটা, শিবের থানে, ব্রত আজও
হেসে বলে একদিন না মানে হ্যাঁ ছিল মনে
তার নামে গোপনে সোম শুক্র ব্রতোপবাস
তারপর হ্যাঁ-এর খুব কাছে রাতে ঘুমে স্বপ্নে।

তখন থেকে একটাই নাম চোখে রাখা
তখন থেকে একটাই ভাষা ঠোঁটে রাখা
ভালবাসি ভালবাসি। কত ঝড় বৃষ্টি জল।
হেসে বলল ভালবাসা মানে তো সহমরণ।

লিপি

ভালোবাসা

নইমুদ্দিন আনসারী

দুটি মন দুটি জায়গায়
ঘুরে বেড়ায় একা একায়।
একটি আমার গ্রামে,
আর একটি তোমার শহরে।
অভিমান আর রাগ করে আদরে,
ভালোবাসে, স্নেহ করে আর কান্নাও করে,
তবে তা সবটায় দুজনের মনের অন্তরে।
তোমাকে নিয়ে আমার মন কবিতা লিখে,
হয়তো তোমার মন টাও সান্ত্বনা দিতে শিখে।
দুজন আজ দুজনের কাছে হয়েছি অপরিচিত,
যদিও কিছুদিন আগে দুজনে ছিলাম পরিচিত।
আমি নিশ্চিত তুমি হাজারো ব্যস্ততায় ভুলোনি,
সেইসব পুরনো দিনের হাজারো স্মৃতির তরণী।
বেঁচে থাক ভালোবাসাটা না হয় মনের অন্তরে,
আমাদের এই অবাক সমাজের বিচিত্র বিচারে।

লিপি

করোনা

রূপম শিকদার

করোনা, তুমি কেন গো এসেছো
এই ধরণীর বুকে?
তোমার জন্য বিশ্ববাসীর
ঘুম তো গিয়েছে চুকে।
করোনা, তুমি নিয়েছো যে কেড়ে
সবার শান্তি-সুখ,
তোমার জন্য আজ বিবর্ণ
মানুষের হাসিমুখ।
স্কুল বা কলেজ, বন্ধ তো সব
যত মন্দির-মঠ,
পরীক্ষা সব স্থগিত, বাতিল
খুলবে কবে এ জট!
লাফিয়ে বাড়ছে জিনিসের দাম,
বন্ধ যানবাহন,
কেউ ঘরে বসে পাচ্ছে বেতন,
কেউ করে অনশন।
চাকরি-বাকরি উঠেছে শিকেয়,
শিক্ষা পায় না দাম,
কেউ পথে বসে দিচ্ছে ধর্ণা,
কারো বা ছুটছে ঘাম।
অক্সিজেন ও টিকা বাড়ন্ত,
প্রতিদিন রোগী বাড়ে,
হাসপাতালেও বেড ফাঁকা নেই,
বাড়িতেই কত মরে।
সেই মরদেহ ঘরে পড়ে পচে,
কে বা করে সৎকার!
এতই ছোঁয়াচে, কেউ নেই কাছে,
কি করুণ দশা তার।

করোনা, তুমি হও গো বিদায়,
নিয়ে সবার যাতনা,
সুদূর আকাশে উড়ে চলে যাও,
করি এই প্রার্থনা।

লিপি

প্রিয় আম

রূপো বর্মন

তোমাকে হারানোর ভয় মনে থাকে সবসময়
কেন জানো
পড়েছে গ্রীষ্ম ঋতু
এই ঋতুতে আসে কালবৈশাখী ঝড়
যদি সে এসে কেড়ে নিয়ে যায় তোমায়
আমার কাছ থেকে
এতোদিন তোমার আশায় বসে ছিলাম
আজ যখন তুমি কাছে এলে
তবুও তোমায় হারানোর ভয় আমায় কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে
জানিনা তোমায় ধরে রাখতে পারবো কিনা
কিন্তু তুমিও চেষ্টা করো আমার সাথে থাকার
গা ভাসিয়ে দিও না
কালবৈশাখী ঝড়ের সাথে
জানি এই ঋতুতেই তোমার মন মুগ্ধ সুবাস ছড়াবে তুমি সারাবিশ্বে
সুবাস টা ছড়িয়ে দিও
কিন্তু কারো হয়ে যেও না
যতটা কাছে পেয়েছি তোমায়
ততটা কাছেই থাকবো
কোনোদিন আরো কাছে চাই বলে
তোমায় কষ্ট দেবো না
জানি তুমি প্রকৃতির দান
বেশী দিন থাকবে না
তাই তোমার সাথে কাটানো
ক্ষণিকের স্মৃতি গুলোকে ঘিরে
আমি আবারও তোমার অপেক্ষায় বসে থাকবো
তোমাকে দেখে জিভে জল আসলেও
তোমার অঙ্গে রক্তপাত ঝরাবো না
খুব ভালোবাসি তোমায় আমার প্রিয় আম।

Share This

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on telegram
Share on email

Editorial Board

  • Reviewed by Gobinda Sarkar (Editor)
  • Designed & Published by Akshay Kumar Roy (Editor)

For More Information, Click Here

For any type of Suggestion, Question, or Help, please contact us at this mail – contact@lipimagazine.com

Follow Us

Related Articles

শনিবারের লিপি – ১৭ তম সংখ্যা – সপ্তাহিক প্রত্রিকা

২০৫০ সালের বইমেলা (গল্প),
আমারে দেব না ভুলিতে,
আমি অবোধ কবি,
আপডেট,

শনিবারের লিপি – দশম সংখ্যা – সপ্তাহিক প্রত্রিকা

ইতি মাতৃমঙ্গলেষু, পাওয়ার বিড়ম্বনা, আয়াতের তেলওয়াতে আয়াত, রামধনু, ইটভাঁটা, পিতৃঋণ, ফেকু প্রেম

Saturday Lipi | Bangla | May, 1st Week

ফাঁপা লেখক, সাঁকো, যোগ- বিয়োগ, নুন, কালচক্র, যে গল্পের শেষ হলো না, মঁচশিল্প, ভোলার নয় সখি সেই দিনের কথা.., ঠিকানা, মা জননী, শিশু মন, মনের ডায়েরি, মায়ের স্নেহ

Saturday Lipi | Bangla | May, 5th Week

আমার সাধ না মিটিল, যাজ্ঞসেনী আর পাঁচজন, যোগসূত্র, সেই জানলাটা আজও বন্ধ, ছয় পুরুষ , তরুণ সন্ন্যাসী, একজোড়া ফুলকপি ও শীতকালীন বনভোজন, মোহনার চরিত্র, কলরব, করি খুশির ঈদ, অহংকারী

শনিবারের লিপি – ১৩ তম সংখ্যা – সপ্তাহিক প্রত্রিকা

শব্দপদী | দুই বসন্ত | নিশি না ফোরাতে…. | আসমানিরা | চরিত্র অমনিবাস | অভাজন আত্মার | পরিনাম

Responses

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Submission (English & Bangla)

Please read the guidelines – English & Bangla