Saturday Lipi | Bangla | April, 3rd Week

লেখক

আমার সকাল

রতন বসাক

 

ভোর বেলা করে খেলা পাখি গাছে বসে 

লেজ তুলে হেলে দুলে ঠোঁট ডালে ঘষে

কিছু পাখি খুলে আঁখি সুর করে ডাকে

পাতা নড়ে খসে পড়ে নিচে জমে থাকে

 

অলি এসে ভালোবেসে ফুলে বসে গিয়ে

ফুল ধরে মুখে ভরে যায় মধু নিয়ে

পথ দিয়ে গরু নিয়ে চাষী যায় মাঠে

ছেলে মেয়ে দেখে চেয়ে মন দেয় পাঠে

 

মায়ে বলে পড়া হলে পাঠশালা যাবি

স্নান করে জামা পরে চলে আয় খাবি

আছে বাকি রেঁধে রাখি কাজ শেষ করি

আছি কাজে কটা বাজে বল দেখে ঘড়ি?

 

মেঘ ভেসে কোন দেশে চলে যায় উড়ে

কমে আলো মেঘ কালো ছেয়ে আছে দূরে

এই ফাঁকে মেঘ ডাকে বৃষ্টি হতে পারে

সাথে করে হাতে ধরে ছাতা নিয়ে যারে

 

আমি ঘরে যাই পড়ে হাতে নিয়ে বই

চাটা খাও হাটে যাও বউ বলে কই?

ধরে নাও বলি দাও কাছে টেনে ধরি 
ঠেলে দিয়ে সরে গিয়ে বলে এনো বড়ি

কৌশল

অনিমেষ মন্ডল

 

চোরাবালি বুকে ধরে পূর্ণ করে ধর্মজাল

ঘ্রাণের আড়ালে বাসা বাঁধে একান্ত সুখ

পর্যদুস্ত হয়ে যায় জীবন পরিধি

মৃত্যু ভাগ, গমগমে চিত্রনাট্য আর যত স্বার্থমোহ

ধূসর চাদরের মতো শূণ্যতা আনে

আস্তিনে লুকিয়ে থাকে ভূমিষ্ঠ আঁধার

এর কোন শেষ নেই; কেবলই রূপান্তর

সে যে পক্ষই তুলে ধরুক স্বপ্ন ইস্তেহার

এই অশ্রুরেখা কৌশলে রপ্ত হয়…

 

রোদ জলে যে শরীর কুয়াশা ঘেরা

সেখানে ফুরোয় না জীবনের কথকতা

আঙুলে আঙুলে উন্মুক্ত হয় সেই চিরসত্য

পৃথিবীর ধুলো মাটির সুগন্ধি সোহাগ

আঁচলে ঘিরে রাখে হৃদয়ের আলো; সহজ সংগ্রাম

চলো শূ্ণ্যতা, মুখগুলো তুলে ধরো

দুর্বোধ্য মুখোশের মায়াজাল ছিন্ন করে
এই তো ঢের, কৌশল পড়ে থাক ক্ষমতার ইতিহাসে

কড়েনা-গুপচুপ বনাম করোনা (রম্যকথা)

জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়


কলেজ জীবনে কড়েনা নামটা আমি শুনিনি। যদিও বিষ্ণুপুরেই পড়তাম যেখানে এই অদ্ভুত মিষ্টান্নের জন্ম, প্রচলন ও বিবর্তন। ইদানিং কাছাকাছি কিছু গ্রামের বাজারে মিষ্টির দোকানেও এটি পাওয়া যায়। কড়েনা দুরকম, একটি বেসন জলে গুলে তেলে ভাজার পর গুড়ের অতিঘন রস মাখানো হয়। আর অন্যটি বিউলি ডাল বাঁটা বা তার বেসন জলে গুলে তেলে ভেজে চিনির রসে ডুবানো হয়। ভেজাল হিসাবে চালের গুঁড়ো না মেশালে দুটোর স্বাদই খুব ভালো। কড়েনা খুব ছোটো জিলিপি জাতীয় মিষ্টি। গুড়ের পাকের গুলোকে কড়েনা ও চিনির রসের গুলোকে গুপচুপ বলা হয়। অনেকে বলেন, কান-জিলিপি, কারণ এগুলির আকৃতি কানের পাতার মতো।

কড়েনার কথা প্রথম শুনি অলকদা অর্থাৎ অলক বিশ্বাসের কাছে। বি এড পড়ার সময় তিনি আমার সহপাঠী ছিলেন এবং আমার প্রধানশিক্ষক জীবনে তিনি আমার অগ্রজ সহকর্মী ছিলেন। রসিক মানুষ অলকদা আমার ভাষায় নেশা ধরাবার জন্য একটি দুটি করে কড়েনা খাইয়ে ক্ষেত্র প্রস্তুত করে দেন। তিনি জানতেন খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে আমি লাগামহীন। তাই আমার নেশা ধরে গেলে তিনিও ভাগ পাবেন। সত্যি কথা বলতে কী, ভাজাভুজির প্রতি আমি আজীবন দুর্বল। তেলঘি খেয়ে লিপিড লেভেলকে বিপজ্জনক জায়গায় নিয়ে যেতে সফল হয়েছি। তাই এখন লুকিয়ে খাই, ভয়েভয়েও খাই। এবছর কড়েনা-গুপচুপ ইচ্ছেমতো খাবো বলে স্থির করেছিলাম। বেশ চলছিলো আড়ালে ও লুকিয়ে। বাড়িতেও মাঝেমাঝে আনছিলাম। আমার বন্ধু ও দাদারা এবিষয়ে যথেষ্ট উদার। তাঁরা খান এবং খাওয়ান। কিন্তু ভাইয়েরা বা বাড়ির লোকেরা এব্যাপারে খুব নির্দয়। আমার লিপিড প্রোফাইল তাদের নখদর্পণে। ব্ল্যাকমেলিং করার ভয়ে চোরের মতো সন্তর্পণেও সেঁটে এসেছি কতদিন। বাড়িতে আনার আগে টেস্ট করার পদ্ধতি দীর্ঘায়িত হয়েছে কতদিন। বেশ চলছিলো। এভাবেই চলতো বেশ কিছুদিন কিন্তু করোনা ওই করোনা – নভেল করোনা বা কোভিড -১৯ যে নামেই ডাকা হোক, ওই হতচ্ছাড়া ভাইরাস আমার কড়েনা- গুপচুপ খাওয়ার বারোটা বাজিয়ে দিলো!!

মিষ্টির দোকান বন্ধ, মাল নেই, যা আছে তাও বিক্রি করা যাবে না। অন্ধ আতঙ্ক, প্রশাসনের সতর্কীকরণ, বাড়ির লোকেদের প্রবল ব্যারিকেড আমি পুরো গৃহ বন্দীই হয়ে গেলাম! মনে কড়েনা-বিরহের আগুন আর করোনা-কোভিড-১৯-র প্রতি নিষ্ফল অভিশাপ ফাগুন-চত্তিরের দিনগুলো পুড়িয়ে দিলো।

আজ এই বিষণ্ণবিকেলে কড়েনা-গুপচুপের বিরহে কাতর হয়ে এই তিক্তগদ্য পদগুলি রচনা করছি। করোনা জব্দ হয়ে দেশ ও পৃথিবীর মুক্তিস্নানের পর না ঠিক পরই নয়, তার কয়েকমাস পরে কচি দূর্বাঘাসের মতো আমার আশা আমার লোভ জেগে উঠবে কড়েনা গ্রাস করার জন্য।

এসো হে বৈশাখ

সঞ্জীব সেন

 

সকাল থেকে  মৃদঙ্গ বাজছে হাওয়ায় হাওয়ায়…

এসেছিল প্রেম

দোসরও ছিল

ফুল ঝরার দিন দিন শেষ হল

বসন্ত বিদায়

বিদায় বেলায় দাও প্রাণ আনন্দসঙ্গীতে

দূরাগত হাওয়া বলল, মহিমা পেতে চাও

এক হাতে ব্লেড অন্য হাতে কলম

ভাবছ, কোনটা রেখে কোনটা তুলে নেবে

না সমূদয় অস্ত্র ফেলে রেখে ফিরে যাবে জীবনস্রোতে

ভরসা দেবেন কী রবীন্দ্রনাথ!

তাকে চিনেছি আনন্দে প্রেমে বিরহে

তাই বলছি, অতীত বলে কিছু হয় না

ভবিষ্যৎ তো ধারণা মাত্র

বর্তমানে আটকে আছি আমরা সব

তাই, যে আয়োজন করে আছে মনের ভিতর তাকে ফুলের তোরাটি দিয়ে বলো মোরে আরো আরো আরো দাও প্রাণ…

পৃথিবী; স্বাধীনতার খোঁজে

প্রতাপ ঘোষ

 

 

এলো কেশ লুণ্ঠিত কার পদতলে 

যাযাবর পৃথিবী আমি তোমায় খুঁজিয়া ফিরি,

তোমার ঠিকানা দিতে কেহ নাহি পারে! 

সাগর বলে আমি ফিরি কার ঘরে 

পাহাড় বলে, আমি চুমিব কারে

বনমাঝি দিকভ্রষ্ট হইয়া পড়ে

আমাদের সহনশীলতা কাতারে কাতারে মরে

 পৃথিবী, তুমি দাসত্ব ছাড়িবে কবে?

মুক্তাপ্রসবা নদী

গোবিন্দ বর্মন

 

নদীর গর্ভে মুক্তার খোঁজ দিগন্তে সূর্যোদয়

প্রবাহমান স্বর্ণরেণু সূর্যের ফুটন্ত কণা,

শিলাচূর্ণ, বালুকণা, অট্টালিকার কাঁচামাল

জীবন্ত অক্সিজেনের ভান্ডার, পাখির কোলাহল

নদীগর্ভে রঙিন মাছ, হাঙ্গর কিংবা মানুষ খেকো  পিরানহা!

একটু গভীরে মৎসকন্যা, নীল তিমির অবাধ বিচরণ,

আহা! যেন সম্পূর্ণ সুশৃঙ্খল প্রাণী সমাজ

নদীর ধারণ ক্ষমতা আজ ক্ষীণ, মানব সভ্যতার স্পষ্ট ছাপ!

কৃত্রিম-অকৃত্রিম মিলেমিশে একাকার!

প্রতিদানে শুধু অক্সিজেন শূন্য বাসস্থান!

 

মিশরের একসময় সঞ্জীবনীএখন  বিশল‍্যকরনীর খোঁজে!

দোল

সুনীতা

 

কৃত্রিম মাংসখন্ড ঝলসে দিয়ে বুজিয়ে গেল

পৌনঃপুনিক জঠরানল, তবুও খিদে শাশ্বত; ও চাঁদ!

এই মনোহারি সোনাচূড়া থেকে

জলখেলার রঙগোলা মুঠো মুঠো ছড়িয়েছে, যে;

সেইমত দিন সোনাবেলিতে ঠিক আসবে বলে

সোহাগরাশি আলো নিয়ে চলেছিল আগে –

পায়ে পায়ে মিশে গেছে জঠরের কমলারঙা ভোর,

বলে দিয়ে কবে; এই নব-পরিচিতি মহাভিনিষ্ক্রমণ

এত মন্দ্র আলো যুগলে ছড়িয়ে গেল আবীরের মত
সেইসব দোলরঙ মেখে আজন্ম, তারা ফিরেছে অবিরত

কু…

রূপম শিকদার

 

বসন্তে কোকিল ডাকে কু-উ-উ !

সবচেয়ে মিষ্টি স্বর। কিন্তু, কু কেন ?

কু মানে তো খারাপ

 

বাস্তবে অবশ্য সবই কু

পদ্ম, গোলাপ এত সুন্দর,

কিন্তু, উভয়েই কন্টকময়

এত মূল্যবান যে মনি, 

তাকেও মাথার মধ্যে ধারণ করে

বিপজ্জনক বিষধর ফণী

সব ফুলের অন্তরে আছে কীট,

সব রকমের গন্ধে আছে বিষ

দৃষ্টিনন্দন সুন্দর সবুজ পাতা 

ঝরে পড়ে, শুকিয়ে যায়, 

তারপর কর্কশ মর্মর আওয়াজ তোলে

বাতাসে বা প্রাণীদের পদপিষ্ট হয়ে

নিষ্পাপ শিশু বড়ো হয়ে

কুটিল চরিত্রের অধিকারী হয়

দুদিনের জন্য যে বসন্ত আসে,

তারও দোসর কালবৈশাখী

 

প্রেম তো স্বর্গীয়, তাতেও আছে যাতনা,

আছে কষ্ট, আছে বিরহের বেদনা

যৌবন লুকায় বার্ধ‍ক‍্যের আড়ালে

 

আসলে যা কিছু সুন্দর বা সু,

সবার সঙ্গেই জড়িয়ে আছে কষ্ট বা কু

যে কোকিলের গলা থেকে মধু ঝরে, 

তারও গায়ের রং কালো, কুৎসিত

 

কোকিলরা কি জানে এসব?
আর, তাই কি সর্বদা গায় কু-উ-উ?

দেহঘড়ি (ছোটগল্প)

বিষ্ণু পদ রায়

 

আকাশটা বড্ড গুমোট হয়ে আছে আর এই গুমোট, যেন আরো বেশি করে মন খারাপ এর কারণ হয়ে দাঁড়াল। যেখানে দিগন্তের রেখা ছুঁই ছুঁই, ঠিক তার পাশেই মনে হয় শান্তির সব হেতু দাঁড়িয়ে। তাকে ধরতে চাওয়ার ইচ্ছে, স্বপ্নবিলাপ ছাড়া আর কিছু নয়। খর-খর শব্দে চমক যখন ভাঙলো, দেখি হিম ধরানো প্রাণীটি সামনে দিয়ে যাচ্ছে। সাধারণ হতে একটু সময় লাগলো। ইতিমধ্যে নৈঋত কোন থেকে কালো পতাকা হাতে নিয়ে ধেয়ে আসা মেঘের দল, সম্পূর্ন নীলাভ আকাশকে, মুহূর্তের মধ্যে গ্রাস করে নিলো। লাখ-লাখ তির যেন আকাশ থেকে নিক্ষেপ হচ্ছে। সহস্র স্মৃতি এই ভাবেই হানা দেওয়া শুরু করলো দেহ-ঘড়িতে

      বসন্ত তখনো শুরু হয় নি, তবে বসন্তের আগমনী বার্তায় মনটা বেশ কদিন ধরে ভালো মেতে উঠেছে। অনুপম দার লেখা গান টা –বসন্ত এসে গেছে….কুহু কুহু শোনা যায় কোকিলের কুহুতায়হাত বাড়িয়ে দেয় বসন্ত-কে চিনতে। ভাগ্গিস পাখিটা ছিল, তা না হলে যে এই বসন্তের স্বয়ম্বর লীলার কথা কিংবা বসন্ত কালের বার্তা সূচক এই পাখিটি বা কালের দিন খন জানাই হতো না। রাত ৮ টা, কখন যে বিকেল থেকে রাত হয়ে গেল তার কোনো খেয়াল নেই। কাল যে টিউশনি আছে সেটা ভুলক্ষনে ভুলে গেছে, এই তার স্বভাব, তাই সময় নষ্ট না করে তড়িঘড়ি পড়তে বসলো। মুই-কে জাগালেই বিপদ সহজে দূরে থাকতে চায় না সেটা ভুলেই গেছিলো দিপু। একটা বহু প্রচলিত কথা আছে না, পীড়িত যে কাঁঠালের আঠা লাগলে পরে ছুটে না, এমনি অবস্থা তার। কেউ একজন ডেকেছিল সাড়া না দেওয়াতে বার বার মুই নক্ করছে।  

         যাকগে ৯.১৮ বাজে ১ টা পর্যন্ত পড়লে হয়ে যাবে, পড়া শুরু করলেও ১২ টা বাজতে না বাজতেই আবার পাশে চলে এসছে। চিৎকার করে বলেই চললো, তোমাকে যে ডাকছে উত্তর দেও না কেন হে

       আচ্ছা আমি কি পাল্টে গেছি? নিশ্চই গেছি, তা না হলে রাজা স্যের এত বকা দেওয়া সত্ত্বেও কি করে মুই-এর সাথে সময় নষ্ট করি। একে তো পড়া করে না যাওয়া তার উপর দেরি করা, কে আর সহ্য করবে। রান্না সেড়ে খাওয়া শেষ করলো কিনা মুই আবার চিৎকার শুরু করে দিয়েছে। এইটা হয়েছে আরেকটা আপদ, যেই বসেছি অমনি ডাক দেয়। 

        তোমার কি কান্ড জ্ঞান লোপ হয়েছে, বলিহারি যাই বোঝাতে বোঝাতে! কালকে যে ভদ্র মানুষটি ডেকেছিল, আজকে আবার ডাকছে। শুনতে কোথায় এমন সময় চলে যাচ্ছে। 

         তা ঠিক করে না ডাকলে কি উত্তর দিব। দরকার যদি এতোই থাকে তাহলে ভালো মতো না ডাকার কি কোনো মানে হয়। 

       ফেলুদার মতো রহস্যের হাল খুঁজতে মাঠে নেমেও গতকাল পারেনি কারণ সময় তখন ঘড়ির ৩ এর ঘরে আঁকিবুকি করা শুরু করেছে, সূর্য্যের চোখ খুলতে তখনও দেরী

        অচেনা কে না কে, পাত্তা না দেওয়াই ভালো, ইগনোর করে কপাট দিয়ে পড়ায় মন দেওয়াই হলো বুদ্ধিমানের কাজ। আবার, কে এমনটা করতে পারে? ওপারের ভারী চঞ্চল সভাবীয় গলার স্বর শুনে একটুও বুঝতে দেরি হলো না কে। রাত-টাকে আজ একটু বেশিই ভালো লাগছে হুট করে। জানলা দিয়ে  চাঁদের আলো ঘরে আসায় কালো নীলচে আলোয় সব ভাসছে। এদিকে পাশের কোনো এক গাছ থেকে ভেসে আসা পাখির গান, রাতের ফাল্গুনী ঠান্ডা বাতাস কে যেন অবিরাম ঢেলেই চললো; যেন সব কিছুই ওজনহীন স্বপ্ন

        পাখিদের হুই-হুল্লোড় তখনো থামেনি, এদিকে সূর্য ঈশান স্টেশন ছেড়ে অনেক দূর চলে গেছে। ছাদের এক কোনে তখনো খেলতে ব্যাস্ত দুটো কাঠবিড়ালির বাচ্চা। পাশের একাকী রাস্তাটি এখন শূণ্যহীন, ব্যাস্ত নানান গল্প শুনতে। 
এমন সকালে আবার কে কল করে, হ্যালো….

১০

অবহেলিত মা…

নইমুদ্দীন আনসারী

 

রঙ্গীন ধরিত্রীর বুকে সাদা কালো জীবন,

মাঝ পথে থেমে যায় সহস্র  স্বপ্নবুনন,

ভোরবেলায় লালচে রবির সোনালি ডালি,

মনের ভিতরে কয় এবার হাজার স্বপ্নপূরণের পালি,

ভারাক্রান্ত বুকে ভাবনাগুলোর গাড়ি আঁটসাঁটো হয়ে নিজ পথে দেয় পাড়ি,

ওই দুর্বিষহ দিনে দুরুদুরু বুকে ক্ষণিকের অবসরে,

কতই না দেখি প্রতিশ্রুতির পাহাড় মনের মন্দিরে,

কতই না দেখি নাটক জীবনের রঙ্গমঞ্চের আসরে,

ব্যাগ হাতে 

ট্রেনের কামরায় জানালায় দাঁড়িয়ে,

হঠাতেই শুনি রুগ্নবেশে স্নেহময়ী সুরে,

বাবুগণ, খায়নি কিছু আজ সারাদিন গড়িয়ে,

দেবেন দু টাকার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে?’

বাবুগণ বোবাবেশে নাহি কিছু কথা কহে মাথা হতে টুপি নামিয়ে,

চকচকে পথের ধারে, অট্টালিকার পাশে আজ মা কাঁদে,

কারণ কহিতে না কহিতে 

নিভৃত নয়নে যতনে কহে মা,

বাবা, ছেলে আমার ডাক্তার,

খুলেছে আমার কক্ষে চেম্বার,

বউমা আছে আজ সিরিয়ালে ব্যস্ত!

কাজের শেষে ফিরিবার বেশে 

ওই শহরের বুকের কোণে অন্ধকূপস্বরূপ বৃদ্ধাশ্রম হতে নেমে আসে ওই অসহায় মায়াবিনী, মমতাময়ী মায়েদের  আনন্দমিশ্রিত হাহুতাশ কণ্ঠে নম্ব নয়নে এক ফোঁটা জল!

এতসব দেখে মন শুধু কহে,

বুকের ভিতর থাকা হাজারো স্বপ্ন বৃথা,
যদি পথের ধারে, বড় অট্টালিকার পাশে, বৃদ্ধাশ্রমের ধারীতে মা কাঁদে!

১১

সম্পর্কের রোজনামচা

জয়শ্রী দাস

 

আমাদের সম্পর্কটা কচুরিপানায় ভরা ঝিলের মতো

অর্ধদগ্ধ গাছের পাশে ভাঙা চাঁদ ওঠে

নক্ষত্রচূর্ণ মিশে যায় মুড়ি আমচুড়ে

মাঠভরতি‌‌‌‌‌‌‌‌‌ ঝড়ে উড়ে যায় আমার প্রিয় মানিক, সমরেশ

তোমার প্রিয় লাল নীল জামা আর হলুদ গল্পেরা আদরে থাকে সুটকেসে

আমাদের মধ্যে ছুটে চলে ট্রেন

ডানা ছড়িয়ে নেমে পড়ে সন্ধ্যা আঁধার,
অমিলরা নিদ্রাগত হলে মোম জ্বালে প্রেম

১২

সম্মান (অনুগল্প)

সৌমেন দেবনাথ

 

রাত বারোটা বেজে গেছে। কোনো রিক্সা নেই। যদিও একটা রিক্সা পেলাম কিন্তু আমার বাসা অভিমুখে আসবে না। নির্জন রাস্তা বলে। অনেক জোরাজুরির পর রিক্সাওয়ালা রাজি হলো। রিক্সাতে উঠতে রিক্সাওয়ালা বললো, স্যার আপনাকে চিনি। কলেজের স্যার। আপনি হয়ত আমার উপর রাগ করেছেন। এদিকে ভয়ে আসতে চাই না। ছিনতাই হয়। আমার রিক্সাটাই সম্বল। 

আমি বললাম, তোমার সমস্যাটা আমি বুঝতে পেরেছিলাম

কিছু দূর যেতেই মুখ ঢাকা এক লোক লাফ মেরে রিক্সায় আমার পাশে উঠে বসলো, ছুরি বের করলো আর বললো, মোবাইল, মানিব্যাগ দে। ছিনতাইকারীর কবলে পড়তেই রিক্সাওয়ালা রিক্সা ফেলে দৌড় দিলো। আমি মানিব্যাগ আর মোবাইল দিতে এক সেকেন্ডও ব্যায় না করে রাজি হয়ে গেলাম। মানিব্যাগ বের করতেই ছিনতাইকারী রিক্সা থেকে নেমে দৌড় দিলো। তার শেষের একটি কথা শুনতে পেলাম, অ্যাঁ ছি! স্যার যে…

১৩

তোমাকে পাবো বলে

রবীন জাকারিয়া

 

তুমি একবার তাকাবে বলে

পতিতালয়ের মেয়েদের মতো উদ্ভট সাজে কলেজের গেটে দাঁড়িয়ে থাকি ঘড়ির কাঁটা দেখে

তুমি যদি কথা বলো?

মুখ থেকে সস্তা সিগারেটের গন্ধ তাড়ানোর জন্য দুটাকার চ্যুইংগাম চিবোতে থাকি অবিরত

তুমি যেন দরিদ্র না ভাবো

তাই বন্ধুদের ধার করা পোষাকে 

পাল্টাই নিজেকে প্রতিদিন

তোমার গিফটের প্যাকেটের জন্য

প্রতিদিন সাফা করি দরিদ্র বাবার পকেট 

সস্তা বাজার করে টাকা বাঁচিয়ে ধোঁকা দিই মাকে

বাসি ভাত খেয়ে কলেজে যাওয়া ছেলেটাই

বিকেলে চাইনিজ রেস্তোরায় মেন্যুবুক দেখে 

খাবার খেয়ে মুক্ত হাতে টিপসদেয় 

সার্ভিস বয়কে এক আশ্চর্য সাবলীলতায়

তোমাকে পাওয়ার আশায় দরিদ্র ঘরের মেধাবী ছেলেটাই ছিঁড়ে ফেলে পিতা-মাতার স্বপ্ন বুনন

হঠাৎ কেন জানি তুমি হলে নিরুদ্দেশ

কত যে খুঁজেছি

এপাড়া-ওপাড়া, পরিচিত, বন্ধু-স্বজন

জেনেও বলেনি কেউ

বিত্তবানের বধুসাজবার মধুরতম মূহুর্তের কথা

নিজেকে ভেঙ্গেছি বারংবার

সময় পাল্টায়, পাল্টালাম নিজেকেও

আবারো শুরু করলাম শুন্য থেকে

অবশেষে আশাহত পিতা-মাতার স্বপ্নকে

পূর্ণ করলাম,

এখন আমি এ শহরের একজন প্রথিতযশা ডাক্তার

চেম্বারের সরু বেডটাতে শুয়ে আছো তুমি—

এক ডিভোর্সি নারী

তোমাকে এক চিলতে দেখবো বলে 

একদিন যাকে বাবার টাকা চুরি করতে হয়েছে

আজ দেন মোহরানার টাকা দিয়ে

সেই তুমি শরীরের সবটুকু দেখাতে এসেছো

এখন তোমার রোগটুকু ছাড়া

আর কোন কিছুই দেখবার 
রুচি নেই যে প্রিয়!

১৪

পয়লা প্রতিশ্রুতি (ছোটগল্প)

তনুশ্রী দাস

 

তখন আমি অনেক ছোট…..

আমরা ভাড়া বাড়িতে থাকতাম। ছোট্ট সংসার ছিল আমাদের… মা, বাবা, আমি

আমাদের আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না। অর্থই জীবনের সবকিছু নয়। ভালোবাসায় তৈরি করা এই ছোট্ট সংসার টি বেশ চলছিল…. আসতে আসতে আমার বেড়ে ওঠা, বাবা সবসময় চেষ্টা করত আমাদের খুশি রাখার

সামনেই ছিল পয়লা বৈশাখ। সবার কাছে যা টাকা ধার নেওয়া হয়েছে সবকিছু মেটাতে হবে…. এই চিন্তায় বাবা-মায়ের রাত দিন ঘুম হত না…….

আমার বয়স কম হলেও আমি খুব সেনসিটিভ ছিলাম, বাবা-মায়ের কষ্ট বুঝতে পারতাম কিছুটা হলেও কিন্তু ছোট তাই কোন সাহায্য করতে পারতাম না… নিজেকে বড় অসহায় মনে হতো

পয়লা বৈশাখে আর দুদিন বাকি এমন সময় একদিন রাত্রে খবর এলো বাবা ফিরবে না কোথাও কাজে গেছে পরের দিন সকালে ফিরবে। পরদিন সকালে মা আমাকে স্কুলে নিয়ে যাচ্ছে

হঠাৎ পাড়ার একজন এসে খবর দিল বাবা অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে, খুব খারাপ অবস্থা। মা আর আমি দৌড়ে হাসপাতালে গেলাম….. খুব গভীর চোট লাগায় বাবাকে বাঁচানো গেল না

মার তো কপালে হাত একেই বাবাকে হারানোর শোক তারপর বাড়ি ভাড়া মেটানোর চিন্তা….

সময়মত ভাড়া না দিতে পারায় পয়লা বৈশাখের দিন মাকে আর আমাকে প্রচন্ড অপমান করা হয় এবং ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বাড়ি থেকে বার করে দেওয়া হয়

মায়ের চোখের জল দেখে আমি মাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম সেদিন যে আবার মাকে মায়ের সম্মান ,বাড়ি সব ফিরিয়ে দেব। 
কিছুদিন আমাদের জীবনটা খুব কষ্টে কাটলো… মা আমাকে লেখাপড়া শেখালো, বড় হলাম। …. আজ আমি চাকরি করি…… ছোটবেলার মতো আর অসহায় নেই মাকে সসম্মানে সেই পুরনো বাড়ি টা ফিরিয়ে দিয়েছি। এখন আমরা আর ভাড়া বাড়িতে থাকি না। বাবাকে হারানোর কষ্ট আজও মায়ের মনে আছে। সেই কষ্টটা না পূরণ করতে পারলেও, বাবার সেই ভালোবাসা দিয়েই গড়ে তুলছি ছোট্ট সংসার টাকে……. সেই মানুষটা না থাকলেও সেই মানুষটার ভালোবাসায় গড়া ছোট্ট সংসার এর উপর আমি আর কোনও আগুনের আঁচ আসতে দেবো না। এই আমার মাকে দেওয়া পয়লা  প্রতিশ্রুতি যা হয়ত আমি ভাষায় সেদিন বলতে পারিনি কিন্তু আজ বললাম……

১৫

আক্ষেপ

নাসিরা খাতুন

 

আমি আজ সুখেই আছি,

শুধু আক্ষেপ এটাই আজ তুমি আমার নও,

হয়তো বিয়ে করে কারোর সাথে বেঁধেছো সংসার

তাতে আমার দুঃখ নেই,

শুধু আক্ষেপ রয়ে গেলো তুমি কখনও বুঝলেনা আমায়

আমি আজ সুখেই আছি,

ভালো মাইনের চাকুরী করি, বেশ আরামেই কেটে যাচ্ছে দিনকাল

শুধু আক্ষেপ একটাই গরীবের মেয়ে বলে তুমি আমাকে করলে ত্যাগ

আজ নেই কোনো মান অভিমান,
আমি আজ সুখেই আছি

১৬

শুধু তুমি নেই

রূপো বর্মন

 

ভুলে গেছো কি সেই সব স্মৃতি 

ক্লাসে প্রথম সারিতে বসে মন দিয়ে পড়া 

টিফিনে এক থালায় খিচুরি খাওয়া 

কবছর পর উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে 

কলেজের সেই সরু গলি দিয়ে বাড়ি ফেরা 

 

মনে আছে তোমার ওই কৃষ্ণচূড়া বৃক্ষের ছায়ায় 

আমার কাধে মাথা রেখে তুমি ঘুমাতে

আমিও চেয়ে থাকতাম 

আর সরিয়ে দিতাম বার বার 

তোমাকে ঘুমঘোরে বিরক্ত করতে আসা 

আলতো হাওয়ায় ওড়ানো তোমার এলোমেলো 

চুল

 

তোমার নিঃস্বার্থ প্রেমের তুলনা নেই 

তবে সেদিনের কথা খুব মনে পড়ে 

যেদিন তুমি হ্যাপি কিস ডে বলে 

করেছিলে আমায় ক্ষুধার্ত শুকুনির মতো

চুম্বন 

 

আজ আমার সবই আছে জানো

নিজের বাড়ি নিজের গাড়ি সরকারি চাকরি

চাকর-বাকর ইত্যাদি 

শুধু তুমি নেই 

জানি তোমারও আছে 

বাড়ি গাড়ি সরকারি চাকরিওলা স্বামী-সন্তান ইত্যাদি

 

তাই তো বলছি তোমার কি মনে পড়ে না 

পুরোনো সব স্মৃতি 

হয়তো সংসার গোছাতে গোছাতে ভুলে গেছো 

কিন্তু জানো 
আমার আজও খুব মনে পড়ে!

Share This

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on telegram
Share on email

Editorial Team

  • Reviewed by Gobinda Sarkar (Editor)
  • Designed & Published by Akshay Kumar Roy (Editor)

For More Information, Click Here

Follow our Social Media for latest updates

Related Articles

Saturday Lipi | Bangla | May, 2nd Week

Post Views: 636 লেখক লিপি দুই পুরুষ বদরুদ্দোজা শেখু এতো রাতে কে বাজায় মরমীয়া ভাটিয়ালি সুর বাঁশের বাঁশিতে? কিহে, ক’টা বছরেই সব ভুলে  গেছো বেমালুম?

কবিতা | Saturday Lipi | Bangla | 1st Week

Post Views: 331 সূচীপত্র   কবিতা প্রেম লিখেছেন – বনমালী নন্দী   জামার ভিতর গভীরতম এক জামা প্রেম সম্পর্ক মৃত্যু অন্ধকারের ভিতর শুধু মেঠো পথ

Saturday Lipi | Bangla | April, 2nd Week

নইমুদ্দিন আনসারী | সঞ্জীব সেন | সৈকত চক্রবর্তী | রবীন জাকারিয়া | সৌমেন দেবনাথ | বনমালী নন্দী | ইলিয়াস খাঁ | গোবিন্দ বর্মন | বদরুদ্দোজা শেখু | তীর্থঙ্কর সুমিত | রূপো বর্মন

Saturday Lipi | Bangla | April, 4th Week

আত্মজন, রোজ সকালে, অশ্রুধারার দাগ, নিয়মটাতো কেউ মানছে না, চারপায়া, তোমার আশকারা পেলে, বাটপার, ওরেও মুমিন-মুসলমান চাঁদ দেখতে চল্, আধার ও আধেয়, কালকূট, উষসী , বুকের ভিতর বন্দি কান্না, কালিদাস, এক হৃদয়, মনমোহিনীর খোঁজে….

Saturday Lipi | Bangla | May, 5th Week

আমার সাধ না মিটিল, যাজ্ঞসেনী আর পাঁচজন, যোগসূত্র, সেই জানলাটা আজও বন্ধ, ছয় পুরুষ , তরুণ সন্ন্যাসী, একজোড়া ফুলকপি ও শীতকালীন বনভোজন, মোহনার চরিত্র, কলরব, করি খুশির ঈদ, অহংকারী

Responses

Your email address will not be published. Required fields are marked *